somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দেবীপ্রসাদ যাত্রা

২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। চট্টগ্রামের মোমিন রোডের রুচিশীল বই বিপণি কথাকলির বুকশেলফে চোখ বুলাচ্ছিলাম । হঠাৎ একখানি বইয়ের ওপর এসে থমকে গেল আমার চোখ । "ক্ষুদে শয়তানের রাজত্ব " লেখক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় - ভাবলাম হয়তো একখানা দুর্দান্ত রহস্যোপন্যাস বা অভিযানকাহিনী । সংগ্রহ করে গোগ্রাসে গেলার পর মনে হল এ ধরনের বই আগে পড়িনি কেন ? বইটি ছোটদের জন্য লেখা - বিজ্ঞান বিষয়ক । আমাদের চারপাশে অসংখ্য ক্ষুদে শয়তান ঘুরে বেড়াচ্ছে ও এদের চোখে দেখা যায় না । যাদের আমরা জীবাণু বলে জানি ও এদের সম্পর্কে গল্পের ছলে বর্ণনা । শুরু হল আমার দেবীপ্রসাদ যাত্রা । একে একে ছোটদের জন্য উনার লেখা বিজ্ঞান বিষয়ক সকল বই পড়তে শুরু করলাম । বাংলায় অমন ঝরঝরে ভাষায় , আড্ডার ভঙ্গিতে বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে সহজভাবে উপস্থাপনের জন্য বাংলা সাহিত্য উনার কাছে ঋণী । বাংলায় জনপ্রিয় বিজ্ঞান বক্তৃতার ধারনাটা শুরু উনার হাত ধরেই ।


দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

একটা চিঠি দিয়ে লেখাটা শুরু করি । শান্তিনিকেতন থেকে লিখেছেন অন্নদাশঙ্কর রায় , ১৯৫৩ সালের ২৫ এ জুলাই । প্রাপক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ।

প্রীতিভাজনেষু ,
আপনার চিঠি ও আপনার প্রেরিত বিজ্ঞানের বইগুলো যথাসময়ে পেয়েছি ও পেয়ে আনন্দিত হয়েছি । অনেকদিন পরে আপনার খবর পেলুম । আশা করি ভালো আছেন । এই বিজ্ঞানের বইগুলো পড়তে খুব ভালো লাগছে । লেখা একজন সাহিত্যিকের । তাই সাহিত্যের স্বাদ পাওয়া যায় । তার চেয়ে উল্লেখযোগ্য আপনার বিজ্ঞানে বিশ্বাস । আমরা সাধারণত বিজ্ঞানের সুযোগ সুবিধা নিয়ে থাকি , কিন্তু বিশ্বাস করি মন্ত্রতন্ত্র মাদুলি কবচ গ্রহ নক্ষত্র । আপনার চেষ্টায় যদি আমাদের বংশধরেরা সংস্কারমুক্ত ও বিজ্ঞানমনস্ক হয় তা হলে সাংসারিক সুবিধা হোক না হোক , আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে। আপনার বই পাঠ্যপুস্তক হয় নি , অথচ হয়েছে সুখপাঠ্য ......

দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন দর্শন পণ্ডিত , বস্তুবাদী দর্শনে দিকপাল , মার্ক্সবাদে ঋগ্ধ , বিজ্ঞানের ইতিহাস চর্চায় দক্ষ এবং বিজ্ঞান বিষয়ক কিশোর সাহিত্যে কৃতিজন । তিনি শুধু কিশোর সাহিত্য রচনাই যদি আজীবন করে যেতেন , বাংলা সাহিত্য মানুষটির কাছে কত যে ঋণ করে নিতে পারতো তা বলা যায় না । কিশোর সাহিত্যেই তিনি আটকে রইলেন না । তরী বাইলেন আরো দুই সাগরে । একটি ভারতবর্ষের দর্শনের প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটন আর অন্যটি ভারতবর্ষের প্রাচীন সমাজ ও সভ্যতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যথাযথ অবস্থাটির অনুসন্ধান । তাঁর জীবনের দীর্ঘতম সময় তিনি এই দুই ক্ষেত্রে অসীম দক্ষতায় অতুল তরঙ্গরাশির বাধা ভেদ করে তুলে এনেছেন অপরূপ অজানা মুক্তো । ১৯৪২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ "কয়েকটি নায়ক" । প্রচ্ছদ ছিল যামিনী রায় - এর আঁকা । লেখালেখির সুবাদে "প্রগতি লেখক সংঘ" শিবিরে যুক্ত হয়ে যান দেবীপ্রসাদ । এই সংগঠনই পরে "ফ্যাসি বিরোধী লেখক সংঘ" হয়ে যায় । এখানেই তাঁর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয় কবি বিষ্ণু দের সাথে । ক্রমে বুদ্ধদেব বসু , প্রেমেন্দ্র মিত্র , জীবনানন্দ দাশ , সুধীন্দ্রানাথ দত্ত , অমিয় চক্রবর্তী , মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি অনেকেরই প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠেন তিনি ।


রংমশাল পত্রিকা

অতঃপর রংমশালঃ মাসিক কিশোর-পত্রিকা রংমশাল, ১৩৪৩ (১৯৩৬)-এর কার্তিক থেকে প্রকাশিত হওয়া শুরু করে । খগেন্দ্রনাথ সেনের প্রতিষ্ঠিত এই পত্রিকাটিকে বলা যায় তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে অগ্রণী , আধুনিক ও সমাজমনস্ক । এই পত্রিকায় দেবীপ্রসাদের বড় দাদা কামাক্ষীপ্রসাদ আগে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন সম্পাদনা সহযোগী হিসেবে । ১৯৪৪ এর জুন-জুলাই সংখ্যা থেকে রংমশালের সম্পাদনার দায়িত্ব এসে পরে দেবীপ্রসাদ ও তাঁর দাদা কামাক্ষীপ্রসাদের ওপর । অনেকটা এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করেই কিশোর সাহিত্যের ফল্গুধারা অনবদ্য ঝরঝরে গদ্য ভাষায় প্রবাহিত হতে শুরু করে দেবীপ্রসাদের সোনার কলমে । সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়েই দুই ভাই সম্পাদকীয় নীতিমালায় যুক্ত করলেন "রাজনীতি , সমাজনীতি ও বিজ্ঞান কে কিছুতেই কিশোর মন থেকে অচ্ছুৎ করে রাখা যাবে না ।" তাঁদের বক্তব্য , তৎকালীন সময়ে শিশু সাহিত্য বলে যা বাজার মাত করে রেখেছিল তার অনেকটাই শিশুদের সুস্থ মন গড়ে তুলতে সাহায্য করে না । তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন এর বিরুদ্ধে কলম ধরতে হবে , নইলে পত্রিকা প্রকাশের দায়িত্ব অসমাপ্ত থেকে যাবে । এটা দেবীপ্রসাদের বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী ভাবনা প্রকাশের একটা সচেতন প্রয়াস ছিল বৈকি । দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁদের সম্পাদিত রংমশালের প্রথম সংখ্যা মানে শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত হল দেবীপ্রসাদের প্রথম বিজ্ঞান বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা "মিস্টার রোবট" । আর ভাদ্র সংখ্যা থেকে " ক্ষুদে শয়তানের রাজত্ব" রংমশালের পাতায় ধারাবাহিকভাবে রাজত্ব করা শুরু করলো ।



ক্ষুদে শয়তানের রাজত্বঃ রংমশালে দাপিয়ে বেড়ানোর পর ১৯৪৯ সালের ২৮ এ জানুয়ারি বই হিসেবে প্রকাশিত হল । এটা দেবীপ্রসাদের একার কিশোরদের জন্য প্রথম বিজ্ঞানের বই । এই বইয়ের গল্পের মূল চরিত্র কালো কুতকুতে চেহারার এক ভদ্রলোক , যিনি পার্কে পার্কে গিয়ে চেয়ারে দাঁড়িয়ে হাত পা নাড়িয়ে সাস্থ্য বিষয়ে বক্তৃতা দেন । ভদ্রলোকের বক্তৃতায় সেই ক্ষুদে শয়তান মানে জীবাণুদেরই কথা । লিউয়েন হুক থেকে পাস্তুর - বিরাট ক্যানভাস । ভদ্রলোকের কথায় ওই ক্ষুদে শয়তান - মানে ব্যাকটেরিয়া , ভাইরাসদের দমনের কথাও যেমন আছে , তেমনি আছে তাদের সম্পূর্ণ নিকেশ না করার কথাও । তারা না থাকলে মৃত অবশেষগুলো কে মাটিতে মিলিয়ে মাটিকে পুষ্ট করে আমাদের খাবার যোগানোর উপযোগী করবে ? তাই তারা যে দরকারী সেটাও বোঝা দরকার । ঐ ক্ষুদে জীবদের কান্ড কারখানার কথা বলতে গিয়ে সরস গল্প সাজানো চাট্টিখানি কথা নয় । আর কী সরল ও স্বচ্ছন্দ গতির বয়ে চলা গল্প । বিজ্ঞানে বিন্দু মাত্র দাগ না লাগিয়ে বর্ণনায় কী সাহিত্য গুণ । আসুন গল্পের এক টুকরো নমুনা তুলে দিই আপনাদের - পার্কে সাস্থ্য নিয়ে গল্প বলা লোকটার সাথে কিশোর পান্নার কথোপকথনঃ
"দিনরাত যদি আমাদের নাকে চোখে আপনার ক্ষুদে শয়তান ভিড় করে ঢুকত তাহলে আমরা টের পেতুম না বলতে চান ? আমরা তো কচি খোকা নই" ।
"কিন্তু সত্যিই ঢোকে"- ভদ্দরলোক বলল ।
"ঢোকে তো দেখতে পাই না কেন ? " পান্নাকে তর্ক করে হারানো কঠিন।
"কে বললে দেখতে পাইনে ? " ভদ্দরলোক বলল , "আলবাত দেখতে পাই । তবে আসল কথা কী জানো , সেগুলো এত ক্ষুদে যে শুধু চোখে দেখতে পাওয়া যায় না । অণুবীক্ষণ যন্ত্র বলে একরকমের যন্ত্র আছে তার মধ্যে দিয়ে দেখলে তবে দেখতে পাওয়া যায় । এইসব ক্ষুদে শয়তানের নাম দেওয়া হয়েছে জীবাণু"

এইভাবে গল্প এগিয়ে যাচ্ছিল । কিন্তু বয়স্করা স্বাস্থ্য নিয়ে তাদের যা আলোচনার তা পাচ্ছিলেন না । তাই , দেরি দেখে বয়স্করা অনুযোগ করে উঠতে ওই কালো কুতকুতে ভদ্রলোক যে কথা বললেন তাতেই যেন আঁকা আছে এক গভীর শিক্ষা । বললেন ,
"বলেন কি আপনারা ? ছোটোরা হেলাফেলার জিনিস নাকি ? ছোটরাই তো হল আসল , ছোটদের বোঝানোই তো আসল বোঝানো । এতদিন ধরে প্রাণপাত করছি স্বাস্থ্য প্রচারণী সভার জন্য , পাড়ায় পাড়ায় পার্কে পার্কে বক্তৃতা দিতে দিতে জিভ একেবারে ক্ষয়ে গিয়েছে । কিন্তু ফল হয়েছে কতটুকু ? কত লোকই তো আসে , কিন্তু আসে শুধু সময় কাটানোর জন্য । অথচ যদি অন্তত দুয়েকটা ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে আমি পাই , যদি তাদের শেখাতে পারি এক্কেবারে মনের মতো করে , তাহলে কত আশ্চর্য হতে পারে তার ফল । তাদের সামনে পড়ে রয়েছে সমস্ত জীবন , তাদের জন্য প্রতীক্ষা করে আছে একটা পুরো পৃথিবী । আজকে যে কিশোর কাল সে বড় হয়ে উঠবে , - কত বড় হবে কে বলতে পারে ? সে হয়তো বদলে দেবে দুনিয়ার চেহারা , সে হয়তো পৃথিবীতে আনবে নতুন পৃথিবী । "
এই নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন বোনার কাজটাই তিনি নানাভাবে করে গেছেন , তাঁর কিশোর সাহিত্য রচনার নানা পরিসরে ।




যে গল্পের শেষ নেইঃ ১৯৫১ সালে দেবীপ্রসাদ উপহার দিলেন কালজয়ী বিজ্ঞান ভিত্তিক কিশোর সাহিত্য "যে গল্পের শেষ নেই " । কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং এই গ্রন্থ সম্পর্কে তাঁর অনুভব ও মূল্যায়ন ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছিলেন—
" ‘যে গল্পের শেষ নেই’— আমি নিজেই শুধু বিশেষ মনোযোগ দিয়ে পড়িনি, ছেলেদের এবং সাধারণ মানুষদের পড়াচ্ছি । কঠিন কথা, একেবারে অজানা কথা সহজ করে বুঝিয়ে বলা বা লেখার চেয়ে কঠিন কাজ জগতে কমই আছে । বৈজ্ঞানিকদের জন্য বিজ্ঞানের বই লেখার সময় জানা থাকে, তারা কতটা বোঝেন না বোঝেন, তাদের বুদ্ধি আর চেতনা কী ধরনের । কিন্তু, অজ্ঞদের বেলায় পড়তে হয় মুশকিলে। তাদের মগজে কী আছে আর কী নেই - যা আছে তার স্বরূপ কী - এমন আন্দাজ করা কঠিন । অথচ এটুকু আন্দাজ করলেই চলে না । প্রতিনিয়ত তাদের মগজটা কী দিয়ে কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তা না জানলেও চলে না । আপনার বই পড়লে বোঝা যায় যে কেবল সহজ করে বললেই যে কঠিন বিষয় সহজবোধ্য হয়ে যায় না ওই চেতনা আপনার আছে । বিজ্ঞান কে সহজ করে বই লেখার বাস্তব প্রয়োজন ও তাগিদের চেতনা এবং চেতনার ধস্তাধস্তি আপনার বই- এর মধ্যেই পাই । "

যে গল্পের শেষ নেই’ মূলত মানুষের গল্প । এই বইয়ের অন্তহীন গল্প অনাবিল স্বাচ্ছন্দ্যে মানুষের কথা বলে চলে । সে গল্পের শ্রোতা রুণু , কথকের ভাইজি । সে যে কিশোরী তা তো গল্পের শুরুতেই বলে দেওয়া হয়েছে । গল্পের প্রথম খণ্ডে আমরা পর পর দেখি পৃথিবীর জন্ম (বুড়ি পৃথিবীর বয়স কত?) থেকে মানুষের উদ্ভব ( চার পা ছেড়ে দু পা) । এক লাফে নয় মোটেই । মাঝে রয়েছে আরোও মজার মজার নামের নানান অধ্যায় । যেমন , সে এক তুমুল কান্ড , প্রাণের জন্ম , এক যে ছিল অবাক ছেলে , কঙ্কালে কঙ্কালে ভাই ভাই , তোমার যখন লেজ ছিল , ক্ষুদেদের রাজত্ব , মাছ আর মাছখেকো মানুষ , ডাঙ্গায় ওঠার পালা , ইত্যাদি । অধ্যায়ের নাম গুলর মতোই অপূর্ব উপস্থাপন ভঙ্গি । ফলে একদম মনে হয় না লেখক আমাদের ক্রমবিকাশের তাত্ত্বিক পাঠ দিচ্ছেন । প্রায় সাড়ে চারশো কোটি বছরের পুরোনো পৃথিবীতে মানুষ কীভাবে আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে, সেই দীর্ঘ যাত্রার কথাই এই বইয়ে বলা হয়েছে । এটি কোনো কল্পকাহিনি বা পুরাণের গল্প নয়; বরং বিজ্ঞানসম্মতভাবে মানুষের বিবর্তনের ইতিহাস । আদিম এককোষী প্রাণ থেকে ধীরে ধীরে কীভাবে দুই পায়ে হাঁটা, প্রায় দেড় কেজি মস্তিষ্কের অধিকারী আধুনিক মানুষের সৃষ্টি হলো—বইটির প্রথম খণ্ডে সেই বিবর্তনের কাহিনী সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে ।

দ্বিতীয় খণ্ডে রয়েছে সেই মানুষের বেড়ে ওঠার গল্প । গল্প , সভ্যতা গড়ে তোলার । ফলে সেখানকার অধ্যায়গুলোও ভিন্ন নামের । বন্য থেকে সভ্য , নাচ ছবি আর ইন্দ্রজাল , সিন্ধু আর গঙ্গার কিনারায় , বোম্বেটের দল , মুনাফার জন্মকথা , আকাশে শকুন ... এমনি আর কি ! সেখানেই শেষের আগের অধ্যায়টায় এসে দেবীপ্রসাদ লিখেছেন "পৃথিবীতে নতুন পৃথিবী" আনার স্বপ্ন কথা । যে পৃথিবী ছোটরা আনবে বলে তার ভাবনা প্রকাশ পেয়েছে ক্ষুদে শয়তানের রাজত্বে স্বাস্থ্যবিদ ভদ্রলোকের ভাষ্যে । কিন্তু কেমন সে পৃথিবী তা তখন বোঝা যায় নি । এখানে সেই নতুন পৃথিবীতে বিজ্ঞানের ভূমিকা ঠিক কেমন হবে তা স্পষ্ট করে লেখেন দেবীপ্রসাদ। লেখেন- " বিজ্ঞানের অতি আশ্চর্য আবিষ্কারগুলোকে মানুষের কল্যাণে যাতে না লাগানো হয় তারই হাজারো ফন্দি ফিকির । সেই আবিষ্কার কাজে লাগিয়েই মালিকের দল পোওয়া বারো মুনাফা লুটছে , আর তা যে যা পারছে । তার কারণটা হল উৎপাদনের ওপর মুষ্টিমেয় মালিকের মালিকানা - তাহলেই অবস্থাটা যায় একেবারে পালটে । কিন্তু আজকের মালিকদের হঠাতে পারলে এগুলো আসবে কাদের হাতে ? সাধারন মানুষের হাতে । কিন্তু সাধারণ মানুষ তো শুধু আর কথার কথা নয় । তাদের পুরোটা দলকে বলে সমাজ , আজকের সমাজ নয় , সমাজের একেবারে রদবদল করে সত্যিকারের সাধারণ মানুষের স্বার্থে ঢেলে সাজানো নতুন রকম সমাজ । হাজারো কারচুপি করে এই নতুন ছাঁচে ঢালা সমাজটা হাতে গোনা মালিকদের স্বার্থে চলবে না , থাকবে না তাদের দেশ চালানোর ক্ষমতা । এই রকমের একটা সমাজ গড়তে পারলে পুরো দেশের চেহারা পালটে যাবে , আর সব দেশের মানুষ যদি এই নতুন পথে এগোতে পারে তাহলে বদলে যাবে পুরো পৃথিবীর চেহারাটাই । পৃথিবীতে আসবে নতুন পৃথিবী । সেই পৃথিবীতে বিজ্ঞান দিয়ে মানুষ মারার কল বানানোর পালা শেষ হবে । শুরু হবে বিজ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে লাগানোর পালা । "



বিজ্ঞান বিচিত্রা সিরিজঃ এর পরেই দেবীপ্রসাদ তাঁর বন্ধু দেবীদাস মজুমদার কে সাথে নিয়ে মেতে ওঠেন কিশোরপাঠ্য বিজ্ঞান বিচিত্রা সিরিজ নিয়ে । এই সিরিজে ছিল মোট ১২ টি বই । তার মধ্যে এই দুনিয়ায় চিড়িয়াখানা , পায়ের নখ থেকে মাথার চুল , মনের সঙ্গে যুদ্ধ , চল যাই বনবাসে , শোন বলি মনের কথা , আবিষ্কারের অভিযান , বিজ্ঞান কি ও কেন দেবীপ্রসাদের নিজের লেখা । দ্বাদশ সিরিজের এই শেষ বই , "বিজ্ঞান কী ও কেন ? " নিয়েই দু একটা কথা বলি । এই বইতে সত্য বলতে কি দেবীপ্রসাদ অত্যন্ত সরল ভাষায় ও সহজ ভঙ্গিতে বুঝিয়েছেন বিজ্ঞানের প্রকৃতিটা ঠিক কী আর তার কাজের ধরনটা কেমন ? । "খবর পাবার খবর" থেকে "অনুমানের গোঁড়ার কথা " , "নিষ্ঠা নিয়ে দেখা" বেয়ে এগোয় তার অধ্যায়গুলো । তারপর আসে "দেখতে পাবার সীমানা বাড়ানো "। এসবের মধ্য দিয়ে শুধু পঞ্চ ইন্দ্রিয় থেকে সত্য খবর জানা নয় , অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের সত্যতার কথাও জানিয়ে দেন দেবীপ্রসাদ । তাই পর্যবেক্ষণ , সত্যকে সামনে আনার এক অন্যতম হাতিয়ার হয়ে যায় আমাদের কাছে । সেই পর্যবেক্ষণের থামতি দূর করতেই সীমানা বাড়িয়ে টেলিস্কোপ বা মাইক্রোস্কোপের মধ্য দিয়ে দেখার কথা । তারপরেই 'ল্যাবরেটরি কেন " অধ্যায়ে পরীক্ষা নামক হাতিয়ারটির কথা - যা সত্য নির্ণয়ে এক অমোঘ অস্ত্র । এইসব জানা থেকে কার্য-কারণ সম্পর্ক বের করে যখন অজানাতে ঝাঁপ দিয়ে নতুন তথ্য তুলে আনা হয় প্রকৃতি রহস্যের তখন তাকে আমরা বলি বিজ্ঞান । বিজ্ঞানের তথ্য বা জ্ঞান যে সঠিক তা কিভাবে বোঝা যাবে ? কেন - প্রয়োগ করে । জীবনে প্রয়োগ করলেই বুঝে যেতে পারবো ঠিক- ভুল । এসবই শুনিয়েছেন দেবীপ্রসাদ । জানা তথ্য থেকে অজানা সত্যে ঝাঁপ দেওয়ার জন্য নানা রকম পথ বা তত্ত্ব তৈরি করেন বিজ্ঞানীরা । কল্পনার পথ । সত্যি রাস্তা কোনটা তা ধরা পড়ে পরীক্ষায় । তখন ওই রাস্তাই চূড়ান্ত । অন্যগুলো হয়ে গেল বাতিল । এভাবেই বিজ্ঞানের সড়ক ক্রম উন্মুক্ত হয় । এসব কথা শুনিয়ে বইয়ের শেষদিকে বড়ো একটা প্রশ্ন ছুঁড়েছেন দেবীপ্রসাদ। জ্ঞান বড় না কর্ম বড় । এইটা একটা অধ্যায়ের নাম । সে কথার উত্তরও যুগিয়েছেন ।

"বনমানুষদের সেই বংশধরদের সামনের পা - জোড়া বদলে হাত হওয়ার সঙ্গে তাল রেখেই বদল হয়েছে মানুষের খুলির মধ্যেকার সেই জিনিষটি , যার নাম দেওয়া হয় মগজ । হাতের দরুণ কাজ । মগজের দরুণ জ্ঞান । হাতের সঙ্গে মগজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক একেবারে শুরুর যুগ থেকেই । তাই শুরুর যুগ থেকেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কর্মর সাথে জ্ঞানের । "

মানুষের কাজ হল প্রকৃতিকে জয় করা । আর প্রকৃতির নিয়মগুলোকে জানা হল তার জ্ঞান । তাই প্রকৃতিকে জয় করতে গেলে তাকে জানতে হয় । আর সেই কারনেই কাজ আর জ্ঞান থাকে অবিচ্ছিন্ন - হাত ধরাধরি করা । কেউ কেউ ভাবে জ্ঞানটাই মুখ্য - কাজটা নয় , তা ভুল । বইয়ের শেষ বাক্যে তাই দেবীপ্রসাদ লেখেন - " কর্মের কস্টিপাথরে যে জ্ঞানকে যাচাই করা যায় নি সে জ্ঞান জ্ঞান নয় , তার কোন মূল্য নেই " এভাবেই বিজ্ঞান কী ও কেন জানা গুরুত্বপূর্ণ । "



সে যুগে মায়েরা বড়ঃ ১৯৫৬ সালের এপ্রিল মে মাসে যুগের পর যুগ সিরিজের চতুর্থ এই বইটি । এই বইতে দেবীপ্রসাদ দেখিয়েছেন আড়াই লক্ষ বছর আগে মানুষ এলেও সভ্যতার ইতিহাস মাত্র ৭-৮ বছররের । এইটুকু সময়ের মধ্যে সভ্যতার এই বিপুল অগ্রগতির মূল কারণটা হল কৃষির আবিস্কার । আহরক থেকে মানুষ হল উৎপাদক । তাই এ যেন এক বিপ্লব। আর এই কৃষিকাজ মেয়েদের আবিষ্কার । কেন ? সে প্রশ্নেরও উত্তর জুগেয়েছেন দেবীপ্রসাদ। বল্লম আবিষ্কারের পর থেকে শক্তিশালী বলে পুরুষরাই শিকারে প্রধান দায়িত্ব নিয়েছিল। আর মেয়েদের দায়িত্ব ছিল ফলমূল আহরণ ও শিশুপালন । সে কাজ করতে গিয়েই বীজ থেকে অঙ্কুর হওয়ার জ্ঞান পেয়েছিল মেয়েরা । সেই অঙ্কুর থেকে আবার নতুন গাছ ও শস্য । তাই কৃষি ছিল মেয়েদের আবিষ্কার। এর ফলে বসবাসের জায়গার পাশে ক্ষেত তৈরি করে মেয়েরা চাষ শুরু করে দিল । প্রথম থেকে নিড়ানী জাতীয় কিছু দিয়ে কুপিয়ে মেয়েরা যে কাজ করতে পারত , পরে তার জায়গা নিল হাল লাঙল। ফলে পুরুষরা এবার কৃষির মুখ্য ভুমিকায় এলো । কিন্তু কৃষি যে মেয়েদের আবিষ্কার তার স্বপক্ষে অন্তত তিনটি প্রমাণ সাজিয়েছেন দেবীপ্রসাদ। এক , কৃষি সংক্রান্ত উপকথা যা দেশগুলোতে আছে তাতে এই কৃতিত্ব মেয়েদের দেওয়া হয়েছে । দুই , কৃষি বিষয়ে যত ব্রত রয়েছে সবই মেয়েদের ব্রত এবং তিন , পিছিয়ে পড়া যেসব এলাকা বা আদিবাসী এলাকা রয়েছে সেখানে আমরা এখনো দেখি মেয়েরাই কৃষিকাজ করছে মাঠে নেমে । কৃষি এনে দিলো আবিষ্কারের অবকাশ আর নানা আবিষ্কারের আকুতি । ফলে হল বসন , ভূষণ , বাড়ি তৈরি , কুমোরের কাজ । আর এই কৃষিভিত্তিক সমাজে বড়ো আসনটি এল মায়েদের , মেয়েদের ।

ছোটদের জন্য একটা জীবনী সিরিজও করেছিলেন দেবীপ্রসাদ। সেখানে নিজে লিখেছিলেন ভলতেয়ারকে নিয়ে । তাঁর লেখায় এসেছে ভলতেয়ারের অনুগামী দিদরোর প্রসঙ্গ। দেবীপ্রসাদের ভাষায় দিদরো সেদিন বলে ওঠেন " পৃথিবীর শেষ পুরোহিতটির নাড়িভুঁড়ির দড়িতে শেষ রাজাটিকে ফাঁসি না দেওয়া পর্যন্ত মানুষের সত্যিই মুক্তি নেই ।

দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় মানে একজন বস্তুবাদী দার্শনিক , একজন প্রগতিপন্থী লেখক , একজন আজীবন কমিউনিস্ট এবং একজন বিশিষ্ট বিজ্ঞানের ইতিহাস প্রণেতা । মার্কসবাদ ও লেনিনবাদে তাঁর দৃঢ় আস্থা ছিল সবসময় । সেকথা তিনি গোপন না করে সগর্বে বলতেন । বাংলাভাষায় বিজ্ঞানভিত্তিক কিশোর সাহিত্যের জগৎ দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের কলমের ছোঁয়ায় পেয়েছে নতুন বৈচিত্র্য, গভীরতা ও অনন্য লাবণ্য । তাঁর সহজ, প্রাণবন্ত ও কৌতূহলজাগানো লেখনী বিজ্ঞানকে কিশোর পাঠকের কাছে করে তুলেছে আনন্দময় ও আকর্ষণীয় ।
রেফারেন্সঃ
১) অনুস্টুপ ৫৩ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা , ২০১১ , পৃষ্ঠা ৪৮৮
২) ক্লীবতার কাছে নেই ঋণ , সুবীর গঙ্গোপাধ্যায় , ৫৩ বর্ষ , ২য় সংখ্যা , ২০১৯ , পৃষ্ঠা ৯৩-৯৪

সর্বশেষ এডিট : ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:৪৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

গরীবের বউ সবার ভাবি

লিখেছেন অপলক , ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:০২



৩৬ জুলাই আন্দোলনের পর অনেক আশায় ছিলাম। আশার গুড়ে বালি। তত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক গভর্ণর ড. আহসান এইচ মনসুর বুদ্ধিদীপ্ত প্ররিশ্রম করে ২০২৬ জানুয়ারীতে রিজার্ভে রেখে গেছেন ৩৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×