জাতীয় স্বার্থে এদেশের মানুষ যত ইতিহাস রচনা করেছে, তার প্রতি ঘটনাতে রাজশাহী মহানগরী অসীম উদ্দিপনায় সাহসী ভূমিকায় অটল থেকেছেন।
এ কথায় সত্য, বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জন ও যে কোন অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ, প্রতিবাদ ও সংগ্রাম গড়ে তোলায় এখানকার মানুষের বৈশিষ্ট্য। জাতির শ্রেষ্ঠ ইতিহাস মহান মুক্তিযুদ্ধ, যার ভিত্তি মহান ভাষা আনন্দোলন, সেই আন্দোলন থেকে পরবর্তীতে পাক শাসক গোষ্ঠীর শোষণ-নিপীড়ন আর অগ্রণতান্ত্রিক আচারণের বিরুদ্ধে যতগুলো আন্দোলন গড়ে উঠেছে প্রায় কোনটাতেই এই মহানগরী পিছিয়ে ছিলনা।
দেখা যায় ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র লড়াই শুরু হয়েছিল বৃহত্তর রাজশাহীর রহনপুরে (বর্তমানে চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত)। এ বিষয়ে মনসুর আহমদ খান সম্পদিত মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী গ্রন্থের ৬৮ প্রষ্ঠায় মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসির মন্তব্যে উল্লেখ আছে, ৭১ সালের ২৩ মার্চ একজন পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে কয়েকজন সৈন্য রহনপুর ইপিআর ক্যাম্পে সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে গেলে বাঙ্গালী সৈন্যরা পাঞ্জাবী সৈন্যদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে।
পরদিন ২৪ মার্চ একজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে কয়েকজন সৈন্য ঘটনা তদন্ত করতে গেলে বাঙ্গালী হাবিলদার আক্কাস পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেনকে গুলি করে হত্যা করেন।
২৩ মার্চের গুলিবর্ষণ ও ২৪ মার্চের পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেনকে হত্যার মধ্যদিয়ে পাক-বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই শুরু করে মুক্তি পাগল বাঙ্গালী ( মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসির মন্তব্যটি ২০/৭/১৯৯৩ তারিখের আসলাম সরকার সম্পাদিত সাপ্তাহিক দুনিয়ায় প্রকাশিত হয়)।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে শুরু হলেও এদেশের মানুষ তার পূর্বেই মানসিকভাবেই আলাদা হয়ে পড়েছিলেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নিবার্চনের বিজয় তারই ফলশ্রুতি। পাক শাসকগোষ্ঠীর গণতন্ত্র ও এদেশের মানুষের প্রতি যে বিন্দু মাত্র ভক্তি ও ভালবাসা ছিলনা তা এই নিবার্চনের ফলাফল থেকেই অত্যন্ত স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ সামরিক প্রেসিডেন্ট লেঃজেঃ ইয়াহিয়া খান ও মার্চে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ঘোষণা করার পরপরই বাংলাদেশের তৎকালের পূর্ব পাকিস্তানের সমগ্র মানুষ জ্বলে উঠেছিল। বিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছিল রাজশাহীতেও। ১ মার্চ দুপুরে রাজশাহী কলেজে খুরশিদ বিন আলমের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল কুদ্দুস (সাবেক প্রতিমন্ত্রী) ঐ সভায় ভাষণ দেন। এছাড়া ছাত্রলীগ নেতা আব্দুস সামাদ, মাহফুজুর রহমান খান, ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হাবিবুর রহমান টুকু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। সভায় একটি ছোট পাকিস্তানী পাতাকায় আগুন লাগানো হয়। খুরশিদ আলম কলেজ অফিসের ছাদে উঠে পাকিস্তানী পাতাকাটিতে আগুন লাগান। সভা শেষে কোর্ট অভিমুখে মিছিল বের হয়। ঐ মিছিল বেতার কেন্দ্র, এসপি অফিস, ডিসি অফিস, জজ কোর্টের পাতাকাতে আগুন ধরায়। ঐ দিন রাজশাহী কলেজের ঐ সভায় এক দফা স্বাধীনতার দাবি করা হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বদলীয় ছাত্র সমাজ ১ মার্চ হতে ৩ মার্চ ক্যাম্পাসে ও শহরে জঙ্গী মিছিল বের করেছিল। ৩ মার্চ হরতাল ও মিছিলের শহরে পরিণত হয়েছিল রাজশাহী। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোর্ট পযর্ন্ত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিলের প্রতিবাদ গর্জে উঠেছিল মিছিলে মিছিলে। পুলিশ লাঠি চার্জ, টিয়ার গ্যাস ও গুলি নিক্ষেপ করে মিছিলে বর্বরতা চালায়। বেলা সাড়ে এগারটার দিকে মালোপাড়া টেলিফোন ভবনের ওপর থেকে বিক্ষোভ মিছিলে গুলিবষর্ণ করে বাটার মোড়ে একজন ছাত্রকে হত্যা করে। এর ফলে রাজশাহীর ছাত্র, বুদ্ধিজীবীসহ সব পেশার মানুষ আরো অশান্ত হয়ে ওঠেন। পাক বাহিনী সান্ধ্য আইন জারী করেছিল এবং ১২ ঘন্টার সময় দিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের হল ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল। উপাচার্য এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে অপসারিত হন। ৫ মার্চ গুলিবষর্ণের প্রতিবাদে ভুবনমোহন পার্কে আওয়ামী লীগ প্রতিবাদ সভা করে। এদিন পাকসেনারা সাহেব বাজারের শাকসজি লুট করে নিয়ে যায়।
৮ মার্চ ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা মিয়াপাড়াস্থ সাধারণ গ্রস্থাগারের চত্বরে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য যোদ্ধা বাছাই কর্মসূচি শুরু করে এবং যুবকরা দলে দলে যোগ দেন। এর নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মালেক চৌধুরী। ১০ মার্চ রাজশাহী শহর থেকে সান্ধ্য আইন তুলে নেয়া হয়। ১১ মার্চ ভুবন মোহন পার্কের জনসভায় এএইচএম কামারুজ্জামান ভাষন দেন। ১২ মার্চ ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চুসহ অন্যান্য শিল্পীরা স্বাধীনতার স্বপক্ষে রাজশাহীর বিভিন্ন রাস্তায় গণ সঙ্গীত পরিবেশন করেন। এদিন রাতে বোমা বানানোর রসদ সংগ্রহের জন্য কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সায়েন্স ল্যাবরেটরী লুট হয়। ১৩ মার্চ জনতার আন্দোলন আরো জোরদার হয়ে ওঠে। ১৪, ১৫ ও ১৬ মার্চ সাংস্কৃতিক কর্মীরা ব্যাপকভাবে মাঠে নামে এবং শিল্পী সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে পথে পথে, ম্মুক্ত মঞ্চে ট্রাকযোগে দেশাত্মবোধক গান, গণসংগীত, নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ১৭ মার্চ স্বাধীণ বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এর আহবায়ক হয়েছিলেন আব্দুল কুদ্দুস ও শরিফ উদ্দিন। এদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ রাজশাহী মহানগরীতে উদ্দীপনামূলক গণসংতীতের আয়োজন করে। ১৮ মার্চ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র কর্মীদের দ্বারা বানানো বোমা পরীক্ষামূলকভাবে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ১৯ মার্চ ভাটাপাড়া লক্ষীপুরে গঠন করা হয় মহিলা সংগ্রাম পরিষদ। এদিনই গঠিত হয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ২০ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার প্রতিবাদে নগরীব্যাপী কালো পতাকা উড়ানো হয়। ২১ মার্চ নগরীব্যাপী স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ছোট ছোট ইউনিট গঠন করে সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু করার উদ্দেশ্যে যুবকদের একত্রিত করার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ২২ মার্চ থেকে প্রকাশ্যে সামরিক প্রশিক্ষণ আরম্ভ হয় এবং রাতে একটি স্কুলের সায়েন্স ল্যাবরেটরী লুট হয়।
২৩ মার্চ পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবসে আতাউর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশ লাইনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশীহী কলেজ তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান রাজশাহী ও রাজশাহী কোর্টেও পতাকা উত্তেলন করা হয়। এদিন মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর হোসেন, ডাঃ আব্দুল মান্নান, মাহফুজুর রহমান খান, আব্দূল মান্নান প্রমুখের নেতৃত্বে নগরীতে ছাত্র- যুবকের সমন্বয়ে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়। ২৪ মার্চ সেনাবাহিনীর টহলের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর টহল চলে মহল্লায় মহল্লায়। ২৫ মার্চ মিছিল ও দিবাগত রাতে ভুবন মোহন পার্কে পাক শাসকদের বিরুদ্ধে রক্ত কথা বলে নাটক মঞ্চস্থ হয়। (মুনসুর রহমান খান সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধের রাজশাহী গ্রস্থে ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে ভুবন মোহন পার্কে অনুষ্ঠিত নাটকটির নাম রক্ত কথা বলে উল্লেখ থাকলে ও রাজশাহী বিভাগীয় মুক্তিযোদ্ধা প্রতিনিধি সমাবেশ ২০০৩ উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় নাটকটি রক্তের রঙ লাল নামে উল্লেখ আছে।) এটি রচনা করেন প্রখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব ও চলচ্চিত্র শিল্পী আতাউর রহমান।
পাক সরকারের নির্দেশে ২৭ মার্চ লাইসেন্সকৃত বন্দুক জমাদান শুরু হয়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় জমা দেওয়ার পথে সাহসী যুবকেরা এসব বন্দুক কেড়ে নিয়েছিল যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য। বন্দুক কাড়াকাড়ির নেতৃত্বে ছিলেন সৈয়দ সারোয়ার হোসেন, ডাঃ শাফিক প্রমুখ। ২৮ মার্চ পাক আর্মি ও পুলিশের যুদ্ধ চালাকালে পুলিশ লাইনের পাশ্ববতী এলাকায় বুলনপুর, ভেড়িপাড়াসহ কোর্ট এলাকা ও নগরীর সাধারণ মানুষ খাদ্যসহ পুলিশকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে। কোর্ট বাজারের ডাক্তার গাফফারের বাড়ীকে হেড কোয়ার্টার বানিয়ে ঐ অঞ্চলের মানুষ সংগঠিত হন ও বিভিন্ন তৎপরতা আরম্ভ করেন। নগরীর পূবাঞ্চলে তালাইমারী মহল্লায় জেবের মিয়ার নেতৃত্বে স্থানীয় জনগণ ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেন। শেখর চক ও আলুপট্টি এলাকায় সূর্যশিখা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর কার্যালয়ে ও হেতমখায়ে মুসলিম হাই স্কুলের ভিতরে একটি কেন্দ্র স্থাপিত হয়। এভাবে নগরীর সবর্ত্র কারো না কারো নেতৃত্বে যুদ্ধেচ্ছুক যুব শ্রেণী ঐক্যবদ্ধ হয়। ১ এপ্রিল পযর্ন্ত পুলিশ, আনসার, দু-একজন প্রাক্তান সৈন্য, ইউওটিসি ও মুজাহিদ ট্রেনিং প্রাপ্তদের সহযোগিতায় প্রতিরোধ যুদ্ধ, চোরাগুপ্ত হামলা ও রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করা হয়। পুলিশ লাইনের পতনের দিনই কোর্ট এলাকায় বশড়ি ইট ভাটার কাছে সেনাবাহিনীর প্রাক্তন কমান্ডার হারুন উর রশিদের নেতৃত্বে পাক সেনাদের একটি টহল দলে আক্রমণ করা হয়। এতে একজন পাক সেনা নিহত ও কয়েকজন আহত হয়। সম্ভবত রাজশাহীর মুক্তিযুদ্ধে পাক সেনার মৃত্যু এটাই প্রথম। ৩১ মার্চ রাজশাহী-নওগাঁর ইপিআর এর ৭নং উইং এর সহকারী উইং কমান্ডার ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী, ৭নং উইং এ সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার মেজর নজমুল হক এক কোম্পানী ইপিআর নিয়ে রাজশাহী পৌছে নগরীর উত্তরে নওহাটায় অবস্থান গ্রহণ করেন। চাঁপাই নবাবগঞ্জ থেকে ৫০০ জন ইপিআর, পুলিশ, আনসার ও ছাত্রদের সমন্বিত একদল মুক্তিযোদ্ধা নগরীর অদূরে পশ্চিমে এসে পৌছে। সারদা ক্যাডেট কলেজে কর্মরত ক্যাপ্টেন রশিদের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা পূর্ব দিক থেকে রাজশাহী নগরীর দিকে অগ্রসর হয়।
সূত্র : আমাদের রাজশাহী

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



