তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, তোমরা নবীন। তোমরা যে বার্তা বহন করে এনেছো সেই বার্তা তোমাদের ভুলে গেলে চলবে না। এই পৃথিবী থেকে সব ধরনের জীর্ণতাকে তোমরা সরিয়ে দিতে এসেছো।
কেননা জীর্ণতাই আবর্জনা, জীর্ণতা যাত্রা পথের বাধা। এই জীর্ণতাকে যারা আপন বলে মমতা করে তারাই সত্যিকার বৃদ্ধ! পৃথিবীতে তাদের কাজ ফুরিয়েছে, মানব তাদের জবাব দিয়েছেন, তারা সরে পড়বে। কিন্তু তোমরা নবীন, তোমাদের হাতেই পৃথিবীর ভার নতুন করে পড়েছে, তোমাদের ভবিষ্যেক আচ্ছন্ন হতে দিও না, পথ পরিষ্কার কর।
১৯১৯ সালের ৭ নভেম্বর শুক্রবার কবিগুরুর সম্মানে কলেজ ছাত্রাবাসে এক বিরাট সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়।
রবি ঠাকুরের উপদেশের ৯৩ বছর পর ছাত্রাবাসটিই পরিষ্কার করেছে আমাদের নবীন প্রজন্মের ধারক ছাত্র নামধারী কতিপয় সন্ত্রাসী। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নিকৃষ্টতম নজির স্থাপন করে তারা জ্বালিয়ে দেয় শত বছরের লালিত ঐতিহ্যের শিক্ষার স্মারক সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাস।
অনেক গুনি ব্যক্তিত্বের স্মৃতিবিজড়িত, শত শত ছাত্রের মাথাগোঁজার ঠিকানা সবুজে ঘেরা ঐতিহ্যবাহী ছাত্রাবাসটি মুহূর্তের মধ্যে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। একানব্বই বছর ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল ছাত্রাবাসটি আজ যেন কঙ্কাল। একটি সংগঠনকে তাড়াতে গিয়ে অন্য একটি সংগঠন জ্বালিয়ে দিল ঐতিহ্যের স্মারক ‘সেমিপাকা আসাম টাইপ’ নির্মিত এমসি কলেজ ছাত্রাবাসটি।
গত ৮ জুলাই রাতে এ ঘটনাটি ঘটে। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এমসি কলেজ
এক-দুই বছর নয়, শত বছরের ঐতিহ্যের স্মারক সিলেটের সরকারি মুরারি চাঁদ (এমসি) কলেজ। কলেজটির যেমন রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, তেমনি ছাত্রাবাসেরও।
সেখানে ডাল-ভাত খেয়ে লেখাপড়া করেছেন দেশের হাজার হাজার ছাত্র। যারা পরবর্তী সময়ে দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে কাজ করেছেন বা করছেন। প্রায় ১১৫ বছর আগে শুধু সিলেট নয়, তত্কালীন আসাম প্রদেশেরও উচ্চশিক্ষার একমাত্র কেন্দ্রস্থল হিসেবে কলেজটির যাত্রা শুরু হয়।
সিলেট শহরের রায়নগরের প্রসিদ্ধ জমিদার মুরারি চাঁদ রায়ের পৌষ্য দৌহিত্র রাজা গিরিশ চন্দ্র রায় মাতামহের স্মৃতি রক্ষার্থে ১৮৮৬ সালে মুরারি চাঁদ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৯২ সালের ২৭ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে মুরারি চাঁদ কলেজের যাত্রা শুরু হয়।
১৮ জন ছাত্র ও ৪ জন শিক্ষক নিয়ে যাত্রা শুরুর পর থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত রাজা গিরিশ চন্দ্র রায়ের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত হয় কলেজটি। চৌহাট্টায় দুটি খড়ের ঘর ছাত্রাবাস হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
১৯১২ সালের ১ এপ্রিল কলেজটি সরকারি হয়। মুরারি চাঁদ কলেজকে সরকারিকরণ, বিজ্ঞান ক্লাস চালু, স্নাতক, সম্মান কোর্স চালু ও বর্তমান মনোমুগ্ধকর স্থানে নিয়ে আসতে যে ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল তিনি হলেন আসাম প্রদেশের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী, সিলেটের কৃতী সন্তান সৈয়দ আবদুল মজিদ।
১২৪ একর ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত কলেজটি যেভাবে সাজানো হয়েছে তা যেমন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মনে ভাবের সঞ্চার করেছে, তেমনি দেশ-বিদেশের ভ্রমণবিলাসীদের আকৃষ্ট করছে। গুরুগম্ভীর ঐতিহ্যমণ্ডিত কলাভবন, লাইব্রেরি বিল্ডিং, টিলার ওপর অধ্যক্ষের অফিস, সুউচ্চ থ্যাকারে টিলায় অধ্যক্ষের বাসভবন, মনোরম পরিবেশে ছাত্রাবাস ও বিশাল খেলার মাঠ কলেজটিকে অন্য যে কোনো কলেজ থেকে স্বতন্ত্র করে রেখেছে।
কলেজের মাঝখানে বিশাল পুকুর কলেজের সৌন্দর্যবর্ধন করেছে। ১৯২৫ সালে ক্যাম্পাস স্থানান্তরের সময় চৌহাট্টা থেকে ছাত্রাবাসটিও স্থানান্তর করা হয়। প্রথমে ৪ জন তত্ত্বাবধায়কের অধীনে ৪টি ব্লক দিয়ে ছাত্রাবাস শুরু করা হয়। ১৯৬৫ সালে আরও দুটি ব্লক বাড়ানো হয়।
৬টি ব্লকের ৫টিতে মুসলিম ও একটিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছাত্ররা থাকে। ছাত্রদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী, সিনিয়র ও যোগ্যতাসম্পন্ন ছাত্র প্রতি ব্লকের ছাত্রাধিনায়ক হিসেবে এক বছরের জন্য মনোনীত হন।
মেধার ভিত্তিতে আসনবণ্টন এই ছাত্রাবাসের নিয়ম। পড়ালেখার সুন্দর পরিবেশের পাশাপাশি খেলাধুলা ও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান, মাসিক ভোজ ও বাত্সরিক শিক্ষা সফর এই ছাত্রাবাসের পুরনো ঐতিহ্য।
সবকটি ব্লকে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ। হোস্টেলের সামনে সুবিশাল মাঠ। খোলামেলা মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ। ৬টি ব্লকে ভাগ করা হোস্টেল ভবন। প্রতিটি ব্লক দৈর্ঘ্যে কয়েকশ’ ফুট লম্বা। এক ব্লক থেকে অন্য ব্লকের দূরত্বও অনেক।
৪র্থ ও ৫ম ব্লকের মাঝে রয়েছে ছাত্রদের গোসলের জন্য পুকুর। ছায়াঘেরা মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশের এমন হোস্টেল বিরল। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো হোস্টেল ভবনের ভিন্নধর্মী স্থাপত্যশৈলী। স্থাপত্যকলার সংশ্লিষ্টদের মতে, সেমিপাকা আসাম টাইপের এত বিশাল ভবন কোথাও হয়তো এখন আর অবশিষ্ট নেই।
নান্দনিক স্থাপত্যের সুবিশাল আয়তনের সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এ কলেজের সাবেক ও বর্তমান হাজার হাজার ছাত্রের আবেগানুভূতি। সুবিশাল আয়তনের এই ছাত্রাবাসে মনোরম দৃশ্য যে কারও নজর কাড়ত। পর্যটকদেরও আকৃষ্ট করত এ ছাত্রাবাস। আজ কেবলই তা স্মৃতি...
তথ্যসূত্র : আমার দেশ (১৪-০৭-২০১২)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



