তার মৃত্যুতে দেশে-বিদেশে বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন সংজ্ঞাহীন অবস্থায় নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) ৬৪ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার দেহে একটি ভাইরাস সংক্রমণ ঘটছে, যা শনাক্ত করা যাচ্ছে না বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন।
নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের বেলভ্যু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হুমায়ূন জাতিসঙ্ঘে বাংলাদেশ মিশনের উপদেষ্টা ছিলেন। জাতিসঙ্ঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এম এ মোমেন গত রাতে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের বেলভু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেন। বৃহদান্ত্রে ক্যান্সার ধরা পড়ার পর গত সেপ্টেম্বরে চিকিৎসার জন্য নিউ ইয়র্কে যান হুমায়ূন আহমেদ। সেখানে মেমোরিয়াল স্লোয়ান- কেটরিং ক্যান্সার সেন্টারে চিকিৎসা নিতে শুরু করেন তিনি।
এরপর দুই পর্বে মোট ১২টি কেমোথেরাপি নেয়ার পর গত মাসে বেলভ্যু হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান ডা: জেইন এবং ক্যান্সার সার্জন জজ মিলারের নেতৃত্বে হুমায়ূন আহমেদের দেহে অস্ত্রোপচার হয়।
৬০তম জন্মদিনের এক অনুষ্ঠানে পাবলিক লাইব্রেরিতে তিনি বলেছিলেন, ‘৬০টি বর্ষা দেখেছি। জানি না আর কতটা বর্ষা দেখতে পাবো। আমার কষ্ট হচ্ছে এ জন্য যে, (মৃত্যুর পরও) বৃষ্টি হবে। জোছনায় পৃথিবী ভেঙে যাবে। সেখানে আমি থাকব না।’
তিনি বলেন, ‘আমার মৃত্যুর পর আমার লেখা টিকে থাকবে কী থাকবে না তা নিয়ে চিন্তা করি না। কেউ বলেন মৃত্যুর পর আমি আরো ১০০ বছর বেঁচে থাকব। কেউ দেড় শ’ বছর। কেউ ৫০ বছর। এ রকম বলেন। আমি মৃত্যুর পর যেটা বেঁচে থাকার সেটা জীবিত থাকতে চাই। আমার কষ্ট হয় একটা কচ্ছপ সাড়ে তিন শ’ বছর বাঁচে। অথচ মানুষ এত মেধাবী তবুও ৮০-৯০ বছরের বেশি বাঁচতে পারে না।’
হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ১৯৪৮ সালে নেত্রকোনায়। বাবার কর্মস্থল পরিবর্তনের সুবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে জীবনের অনেকটা সময় কাটান তিনি।
মুক্তিযোদ্ধা বাবার ছেলে হুমায়ূন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি পাস করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডক্টরেট করেন। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তরুণ শিক্ষক হিসেবে খ্যাতি ছিল বলে তার সে সময়কার সহকর্মীরা জানান।
‘নন্দিত নরকে’র পর হুমায়ূন আহমেদ নিয়মিত লিখতে শুরু করেন। পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেন অল্পদিনে। বাংলাদেশে বইয়ের পাঠক সৃষ্টির কিংবদন্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে হুমায়ূন আহমেদকে। শুধু কথাশিল্প নয়, নির্মাতা হিসেবেও তিনি সিদ্ধহস্ত। শিশুদের জন্যও লিখেছেন প্রচুর।
হিমু, মিসির আলী ও ফিহা তার তিনটি অনন্য সৃষ্ট চরিত্র। হিমু হলুদ পাঞ্জাবি তরুণদের প্রিয়। হিমু যুক্তি মানে না। অন্য দিকে মিসির আলী তার বিপরীত। যুক্তির নাটাইয়ে বাঁধা মিসির আলীর কাছে কখনো কখনো রূপসী তরুণীদের চেয়ে মাছিটাই বড় হয়ে দেখা দেয়। ফিহা গাণিতিক সমীকরণে মিলান সব কিছু। এর বাইরেও তার অনেক সহজ স্বভাবসুলভ গল্প-উপন্যাস আছে।
‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকটি দিয়ে তিনি মাতিয়ে তোলেন দর্শক। ওই নাটকে বাকের ভাইয়ের ফাঁসি নিয়ে ঢাকায় মিছিল-সমাবেশ-অনশন পর্যন্ত হয়। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। নাটকের নক্ষত্র হয়ে আবির্ভূত হলেন তিনি। ছবি বানানোতে হাত দিলেন হুমায়ূন। ‘আগুনের পরশমণি’ ছবিটি বানিয়ে তিনি হুলস্থুল ফেলে দেন। কয়েকটি জাতীয় পুরস্কার পান এর জন্য। মুক্তিযুদ্ধ তার সাহিত্যে যেমন এসেছে তেমনি তার বানানো নাটক ও ছবিতেও । তার নির্মিত ‘শ্যামল ছায়া’ পেয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
সাহিত্যের সব শাখায় তিনি সৃষ্টি করেছেন রসবোধ। সাহিত্য নিরেট কাঠখোট্টা কোনো বিষয়Ñ এটা মানতে নারাজ হুমায়ূন আহমেদ। তার গল্প উপন্যাসে দুঃখবোধের চেয়ে হাসি আনন্দটাই বেশি। নগর জীবনের কষ্ট, সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ, বেকারত্বের অভিশাপ, মানুষের বিচিত্র সব ইচ্ছা উঠে এসেছে তার লেখনিতে। মানুষের ভেতরের কথাগুলো তিনি সহজ করে বলেছেন।
হুমায়ূন আহমেদ গাজীপুরে গড়ে তোলেন নুহাশ পল্লী। সেটি তিনি নাটক ও সিনেমার শুটিংয়ের পাশাপাশি নিজের অবকাশ যাপনের জন্য ব্যবহার করে থাকেন। সেখানে আছে হুমায়ূনের একটা নিজস্ব জগৎ। যেখানে তিনি নিজের মতো করে সময় কাটান। সেন্টমার্টিন দ্বীপে তিনি গড়েছেন সমুদ্র বিলাস কুটির। সেখানেও তার জীবনের সুন্দর অবকাশ যাপনের কিছুটা সময় কাটে বছরের শীত মওসুমে।
হুমায়ূন আহমেদরা তিন ভাই। এর মধ্যে একভাই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তিনিও কথাশিল্পী, নাট্যকার ও সায়েন্স ফিকশন লেখক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। অন্য ভাই আহসান হাবীব। কার্টুনিস্ট ও রম্যলেখক হিসেবেই পরিচিত। রম্য ম্যাগাজিন ‘উন্মাদে’র সম্পাদক।
হুমায়ূন আহমেদ লেখক শিবির পুরস্কার থেকে শুরু করে একুশে পদক পর্যন্ত জয় করেছেন। তিনি প্রথম বিয়ে করেন গুলতেকিনকে। বিত্তশালী পরিবারের মেয়ে গুলতেকিন ও হুমায়ূন এখন দুই পথে। এর পর বিয়ে করেন অভিনেত্রী শাওনকে। হুমায়ূনের সঙ্গী শাওন ও তার সন্তান। গুলতেকিন আছেন তিন কন্যাÑ নোভা, শীলা ও বিপাশা এবং একপুত্র নুহাশকে নিয়ে। তাদের ঘিরেই কাটছে তার জীবন।
হুমায়ূনের সর্বশেষ লেখা : হুমায়ূন আহমেদের সর্বশেষ লেখা একটি রাজনৈতিক উপন্যাস ‘দেয়াল’। চার অধ্যায়ের এ উপন্যাসের অংশবিশেষ একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হলে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এর ফলে আদালতের একটি পর্যবেক্ষণ দেয়া হয়। এতে বলা হয়, উপন্যাসটিতে ’৭৫-এর দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় নিহত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের সঠিক ইতিহাসভিত্তিক বর্ণনা উপস্থাপন করা হয়নি।
তার সর্বশেষ সৃষ্টি : পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ঘেটু পুত্র কমলা হুমায়ূন আহমেদের সর্বশেষ সৃষ্টি। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে নির্মিত হয়েছে এ ছবিটি। ছবিটি মুক্তির অপেক্ষায়। হুমায়ূন সম্প্রতি বাংলাদেশে এসে এই চলচ্চিত্রের একটি বিশেষ শো উপভোগ করেন।
রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের শোক : রাষ্ট্রপতি মো: জিল্লুর রহমান বরেণ্য কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যকে যা দিয়ে গেছেন তাতে তিনি আজীবন সবার মাঝে বেঁচে থাকবেন। তার মৃত্যুতে জাতি এক অমূল্য সম্পদ হারাল। তিনি মরহুমের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শোক : নন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলা সাহিত্যের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রের মৃত্যুর ফলে সৃষ্ট শূন্যতা অপূরণীয়। তিনি বলেন, হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্য ও চলচ্চিত্রকে যা দিয়ে গেছেন তাতে চিরদিন তিনি আমাদের মধ্যে জাগরুক থাকবেন। শেখ হাসিনা তার রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
খালেদা জিয়ার শোক : কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের ইন্তেকালে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্ম ও চলচ্চিত্র আমাদের অমূল্য সম্পদ। তার মৃত্যুতে আমাদের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গনে এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো। সে শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। তিনি তার কর্মের দ্বারা চিরদিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন বলে মন্তব্য করেন খালেদা জিয়া। তিনি এই বরেণ্য সাহিত্যিকের রূহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুলাই, ২০১২ সকাল ১০:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



