somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিক্ষা - ২. শিক্ষা বিষয়ক ভ্রান্তি

১৮ ই জুন, ২০১৫ ভোর ৬:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

“শিক্ষা এমন হবে যেন তা মানব জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশের সহায়ক হয়। তা যেন মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠিত করে। যেন তা মানুষের ভিতর বোধ, সহিঞ্চুতা ও ভ্রাতৃত্বের জন্ম দেয়। আর, এসব কিছু, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পৃথিবীর সব মানুষকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা করতে ও তা বজায় রাখতে শেখায়।” মানবাধিকারের সার্বজনীন স্বীকৃতি [Universal Declaration of Human Rights (1948), Article No. 26(2)]

UNESCO-র মতে, যে মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনের সাথে সম্পর্কিত ছোট ও সাধারণ কথা বুঝে পড়তে ও লিখতে পারেন তিনি শিক্ষিত [A person is literate who can with understanding both read and write a short simple statement related to his/her everyday life. সূত্র: Click This Link । এই সংজ্ঞানুসারে, সারা পৃথিবীতে শিক্ষার হার সময়ের সাথে বাড়ছে। UNESCO-র হিসাব অনুযায়ী, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সারা পৃথিবীর প্রাপ্ত-বয়স্কদের (১৫ বছর বা তার বেশি বয়সের মানুষ) শতকরা ১০ ভাগ মাত্র শিক্ষিত ছিলেন। একুশ শতকের শেষে এসে শিক্ষিতের এই হার বেড়ে দাড়ায় ৮০% এর ওপরে [http://www.unesco.org/education/GMR2006/full/chapt8_eng.pdf] ।

সব মানুষের বা মানব জীবনের পূর্ণতর বিকাশের যে কোন ধারণা এই সংজ্ঞায় অনুপস্থিত। অর্থাৎ, সংজ্ঞাটি শিক্ষার একটি খন্ডিত ধারণাকে হাজির করে। অন্যভাবে বললে, শিক্ষা বিষয়ে UNESCO-র সংজ্ঞাটি শিক্ষার কোন সংজ্ঞা নয়। এটি ’অক্ষর-জ্ঞান’ এর সংজ্ঞা। একটু ঘুরিয়ে চিন্তা করলে, literacy-র সঠিক বাংলা প্রতিশব্দটি আমরা বেছে নিতে পারিনি। হয়ত UNESCO literacy বলতে ’অক্ষর-জ্ঞান’ই বোঝাচ্ছে, ’শিক্ষা’ বা ‘education’ বোঝাচ্ছে না! ’শিক্ষা’ বলতে টঘঊঝঈঙ যাই বোঝাক না কেন সারা পৃথিবীতে সেটাই বাস্তবায়িত হচ্ছে।

যাই হোক, শিক্ষা নিয়ে আমাদের ধারণা খন্ডিত। একজন মানুষের নাক, কান, চোখ বা ঠোঁট আলাদা আলাদা করে আঁকলে ওই মানুষটার সঠিক মুখচ্ছবি যেমন পাওয়া যায় না শিক্ষা সম্বন্ধে আমাদের ধারণাও তেমনি।

শিক্ষা সম্পর্কিত অজস্র চিন্তা-ভাবনা ও লেখালিখি হয়েছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অনেক চিন্তাবিদ এর ওপর কাজ করেছেন, এবং অনেকে আজও কাজ করছেন। কিন্তু শিক্ষার সামগ্রিক ব্যাপ্তি নিয়ে হাজার বছরের পুরনো একটা কথা অন্য সব কথাকে ছাড়িয়ে গেছে। কথাটি হলো, দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা। অর্থাৎ, জন্মে জীবনে ও মরনে সর্বত্রই শিক্ষা। লবণ ছাড়া কোন খাবার যেমন যথাযথ হয় না তেমনি শিক্ষা ব্যতিত কোন কাজই সঠিক ভাবে করা যায় না।

শিক্ষা যেমন দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত তেমনি তা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। একজন মানুষ সকালে ঘুম থেকে জেগে রাতে ঘুমতে যাওয়া পর্যন্ত যত কিছু করেন তার প্রতিটি কাজ ঠিকভাবে করতে শিক্ষার প্রয়োজন। যেমন, সকালে ঘুম থেকে উঠে বা রাতে ঘুমতে যাওয়ার আগে তিনি কিভাবে দাঁত পরিস্কার করবেন তাও একটা শেখার ব্যাপার। যেমন, দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে আমি জানতাম না যে ডানে-বায়ে ব্রাশ না চালিয়ে ওপর-নিচ বরাবর ব্রাশ চালানো উচিত আমাদের।

অনেকে বলতে পারেন, সব কাজ এরকম ঠিক করে করার দরকারটা কি? জীবন তো দিব্যি বয়ে চলেছে। এ প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, কোন কাজ নিয়ম মতো করলে কেবল কাজটাই ভালো হয় না নিয়ম-কানুন জানা মানা ও সংযমেরও একটা অভ্যাসও হয় তাতে। আর সংযম আমাদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য অশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তার গুরুত্ব এত বেশি যে কোন এলাকার সব মানুষ যদি অক্ষর-জ্ঞানহীনও হন তবু তারা পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সংযত জীবন যাপনের বলে সহজে ও শান্তিতে মানবিক জীবন যাপন করতে পারেন।
ভোরে ঘুম থেকে জেগে রাতে আবার ঘুমতে যাওয়া পর্যন্ত আমরা নানান ধরনের মানুষ ও পরিবেশ পরিস্থিতির ভিতর থাকি। যত মানুষের সাথে আমরা মিশি, যত জায়গায় আমরা যাই, যা কিছু আমরা করি তার সব কিছুতে শিক্ষার দরকার হয়ে পড়ে। পরিবার, কাজের জায়গা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তা, পার্ক সর্বত্র তার ছোয়ায় হয়ে ওঠে সুন্দর ও মানবিক। তার অনুপস্থিতিতে সকল জায়গা ছেয়ে যায় অসুন্দর ও অকল্যাণে।

মানবাধিকারের সার্বজনীন স্বীকৃতি অনুসারে, মানব জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ, মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতিষ্ঠা, মানুষের ভিতর বোধ, সহিঞ্চুতা ও ভ্রাতৃত্বের জন্ম, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পৃথিবীর সব মানুষের জন্য বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও তা বজায় রাখার জন্য স্কুল বা কাজের জায়গা থেকে শিক্ষা গ্রহণ যেমন দরকার তেমনি দরকার পরিবার, বন্ধু-আত্মীয়, বাজার, খেলার মাঠ, বাস-রেলগাড়ি-প্লেন প্রভৃতি জায়গা থেকেও শিক্ষা গ্রহণ। এসব ক্ষেত্রে আমরা শিখি জীবনাচারের মধ্য দিয়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শিশুর মাতা-পিতা যদি ওপর-নিচ বরাবর দাত ব্রাশ করেন তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশু ওপর-নিচ বরাবর দাত ব্রাশ করবে। আবার অনেক অফিসে এমন হয় যে উচ্চপদস্থরা তাদের অধীনস্তদের অকারনে অপদস্থ করে অযথা আনন্দ পান। পরবর্তীতে ওই অধীনস্ত উচ্চপদস্থ হলে তিনিও একই কাজ করেন। এভাবে এই প্রক্রিয়া একটি অমর আবর্ত (vicious circle) হয়ে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। কিন্তু সব কাজের জায়গায় যদি সুষ্ঠু কাজ করার পাশাপাশি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সাথে শোভনীয় ও মানবিক আচরণ শেখা ও তা প্রয়োগের পরিবেশ তৈরি হয় তাহলে মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে। বর্ণজ্ঞান বা অক্ষরজ্ঞানের সাথে যদি আমরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও সহানুভূতির বিকাশ ঘটাতে পারি কেবল তবেই আমরা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারব।

আমরা মানুষেরা যত প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছি তার প্রত্যেকটা ঠিক ঠিক পরিচালনার জন্য শিক্ষা প্রয়োজন। অফিস আদালতে যেমন শিক্ষার দরকার তেমনি তা দরকার বাজারে বা খেলার মাঠে। আবার, এসব জায়গায় শিক্ষার যেমন দরকার এসব জায়গা থেকে শিক্ষা নেওয়াটাও তেমন দরকার। উদাহরণ হিসাবে আমাদের এই দক্ষিণ এশিয়ার অনেক হাটে বাজারে দোকানীদের উগ্র আচরণের কথা বলা যায়। খেয়াল করলে দেখি আচরণের এই উগ্রতা ও অসহিঞ্চুতা হাট-বাজার পেরিয়ে মাঠ-ময়দান, জাতীয় সংসদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। হয়ত আমরা মনেকরি, কঠিন কর্কশ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে মানুষের বীরত্ব বড়ত্ব ও শক্তি প্রকাশিত হয়! আমি যদি শক্ত না হই অন্যরা আমায় ঠকিয়ে পথে বসাবে যে!

মানুষ হিসাবে আমাদের প্রত্যেকের রয়েছে আমৃত্যু শেখার ক্ষমতা। মানুষ সব সময় শেখে। সে যদি ভালো কিছু না শেখে তবে নিশ্চয় খারাপ কিছু শিখবে। যদি সে সচেতনভাবে না শেখে তাহলে অবচেতনে শিখবে। এখন প্রশ্ন ওঠতে পারে, হাট-বাজার থেকে কোন ধরনের শিক্ষা গ্রহণ করবে মানুষ? এর উত্তরে বলা যায়, সহনশীলতার শিক্ষা, কাউকে না ঠকাবার শিক্ষা, ব্যবসা শুধু ব্যবসা নয় - তা সেবাও ইত্যাদি।

যে কোন জায়গা থেকে বেশিরভাগ সময় আমরা গতানুগতিক বা প্রচলিত ধ্যান-ধারনা, আচার-বিশ্বাস-ব্যবস্থা শিখে থাকি। কিন্তু সব সময় সব জায়গাতে কিছু মানুষ থাকেন যারা গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে ভাবেন শেখেন ও বলেন। যেমন, কোনো কোনো দোকানীর ব্যবহার অতুলনীয় সুন্দর। হয়ত ব্যবসা শুরুর আগে থেকে তিনি ভালো ব্যবহারে অভ্যস্ত। কিন্তু এটা ঘটাও অস্বাভাবিক নয় যে অন্য অনেকের খারাপ ব্যবহারে আহত হতে হতে নিজেকে তিনি মানবিক করে গড়ে তুলেছেন।

মানুষের মানবিক বোধ ও আচার-ব্যবহার মূলত গড়ে ওঠে ও প্রভাবিত হয় তার পরিবার, সমাজ ও পরিবেশের ভিতর। আমরা আমাদের পরিবারের মানুষ-জন, সমাজ বা পরিবেশকে কখনো শিক্ষক হিসাবে দেখিনা, কিন্তু এটা সত্যি যে মানুষ হয়ে জীবন যাপনের জন্য যা কিছু আমারা শিখি তার প্রায় সব কিছু অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। আমাদের জীবনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভূমিকা তুলনামূলকভাবে খুব সামান্য। তা কেবল আমাদেরকে ডাক্তার বা ইজ্ঞিনিয়ার করে কিন্তু একজন মানুষকে মানবিক করে গড়ে তুলতে তার কোন ভূমিকা নেই।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুন, ২০১৫ ভোর ৬:২৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমার মহাজাগতিক ভাবনাকে এআই আমার সেরা পোষ্ট হিসাবে সাব্যস্ত করেছে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:১২



মহাজাগতিক ভাবনা

মহাজগতের প্রথমের পূর্ব অবস্থান শূন্য। কারণ প্রথমের পূর্ব অবস্থান শূন্যই হয়ে থাকে।শূন্য অবস্থানে সীমাদাতা না থাকায় তাতে যা হবে তা’ অসীম হবে।সকল অসীম একত্রে মিলে এক হবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সালমান মুক্তাদিরের বিরুদ্ধে এ্যাকশান নিয়ে সরকার কি বার্তা দিচ্ছে?

লিখেছেন আফনান আব্দুল্লাহ্, ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০৫

সালমান মুক্তাদির দেখি জঘন্য মানুষ। ওয়াইন, ওম্যান আর ওয়েল্থ – পুরুষ নষ্টের এই তিন ডব্লিউ-ই তার অস্থিমজ্জা ও লিভারে ঢুকেছে



এদিক-ওদিক ব্যাপক আম-লিচু করে বেড়িয়েছে। নিজের স্টুডিওতে আজেবাজে শুটিং করেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিনয়: মুমিনের এক অনন্য মহৎ গুণ; কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি বিশ্লেষণ

লিখেছেন নতুন নকিব, ০২ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৫

বিনয়: মুমিনের এক অনন্য মহৎ গুণ; কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি বিশ্লেষণ

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ভূমিকা

মানুষের প্রকৃত সৌন্দর্য তার বাহ্যিক চেহারা, ধন-সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদায় নিহিত নয়। বরং তাঁর চরিত্র,... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন ব্লগার

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:০৯

যখন একজন ব্লগার
টরন্টো সময়ঃ সন্ধ্যা ৭ঃ০৩ ২রা অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশ সময়ঃ ভোর ৫ঃ০৩ ৩রা অক্টোবর, ২০২৬

...বাকিটুকু পড়ুন

ইমাম মাহদী আসার আগে নেতৃত্ব দাবী করা সকল দলই গোমরাহের পথে আছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:১৭

সেক্যুলার দলকে সমর্থন ততো দিন পর্যন্ত দিয়ে যেতে হবে, যতো দিন ইসলামী দলগুলো 'যোগ্য' না হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের কোন ইসলামী দলই দেশ চালাতে সক্ষম নন।

ইসলামে বলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×