আজ ঐতিহাসিক 7ই মার্চ। এদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক দিন। যারা এসম্পর্কে আরও পড়তে চান এবং জানতে চান তাদের জন্য GbIqvB evsjvi wjsK দিয়ে দিলাম। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের 7ই মার্চের ভাষণে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। যে জ্বালাময়ী বক্তৃতা এই জাতিকে মুক্তিসংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ করেছে তার মধ্যেও আজ ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পাচ্ছে শকুনের দলেরা। তাই, পুরো বক্তৃতাটা তুলে দিলাম যারা জানতে চায় আমাদের গর্বিত ইতিহাস, ঐক্যের ইতিহাস, আর সংগ্রামের ইতিহাস। শ্রদ্ধা জানাই জাতির জনককে ও বীর সংগ্রামী জনতাকে।
"ভাইয়েরা আমার,
আজ - দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দু ঃখের বিষয় আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ, বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তাঁরা অধিকার চায়। কি অন্যায় করেছিলাম? নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে -আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেমবি্ল -বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করবো এবং এদেশকে আমরা গড়ে তুলবো। এদেশের মানু ষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্ক ৃতিক মু ক্তি পাবেন। কিন্তু দু ঃখের বিষয় আজ দু ঃখের বলতে হয় সঙ্গে বলতে হয়, 23 বছরের করুণ ইতিহাস, বাংলার অত্যাচারের বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস, 23 বছরের ইতিহাস মুমূর্ষ নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস, বাংলার ইতিহাস এ দেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস।
1952 সালে রক্ত দিয়েছি। 1954 সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। 1958 সালে আয়ুব খাঁ মার্শাল-ল' জারি করে 10 বছর আমাদের গোলাম করে রেখেছে। 1964 সালে 6-দফা আন্দোলনের 7ই জু নে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। 1969 সালের আন্দোলনে আয়ুব খাঁনের পতন হওয়ার পরে যখন ইয়াহিয়া খাঁন সাহেব সরকার নিলেন। তিনি বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন- গণতন্ত্র দেবেন, আমরা মেনে নিলাম। তারপর অনেক ইতিহাস হয়ে গেল, নির্ব াচন হলো। আমি প্রে সিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি, শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টি র নেতা হিসাবে তাকে অনুরোধ করলাম- 15ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, প্রথম সপ্তাহে মার্চ মাসে হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে, আমরা এসেম্বলি্লতে বসবো। আমি বললাম, এসেম্বলি্লর মধ্যে আলোচনা করবো- এমনকি এও পর্যন্ত বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজন যদিও সে হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।
জনাব ভুট্টো সাহেব এখানে এসেছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন, আলোচনার দরজা বন্ধ না, আরো আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতৃবৃন্দ তাদের সঙ্গে আলাপ করলাম- আপনারা আসুন- বসুন আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করি । তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি এখানে আসে তাহলে কসাইখানা হবে এসেম্বলি। তিনি বললেন, যে যাবে তাকে মেরে ফেলা দেওয়া হবে, যদি কেউ এসেম্বলিতে আসে তাহলে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত দোকান জোর করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম, এসেম্বলি চলবে। আর হঠাৎ 1 তারিখ এসেম্বলি বন্ধ করে দেওয়া হলো।
ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হিসেবে এসেম্বলি ডেকেছিলেন। আমি বললাম, আমি যাবো। ভুট্টো সাহেব বললেন, তিনি যাবেন না। 35 জন সদস্য
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে আসলেন। তারপর হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো, দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানু ষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। বন্ধ করে দেয়ার পরে এদেশের মানু ষ প্রতিবাদ মু খর হয়ে উঠল। আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা হরতাল পালন করেন। আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সব কিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিল। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেড়িয়ে পড়লো, তারা শান্তি পূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য দৃ ঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। কি পেলাম আমরা জামার পয়সা দিয়ে অস্ত্র কেনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরীব-দুঃখী নিরস্ত্র মানুষের মধ্যে- তার বুকের উপর যচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু- আমরা বাঙালীরা যখনই মতায় যাবার চেষ্টা করেছি- তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।
তাকে আমি বলেছিলাম জনাব ইয়াহিয়া খান সাহেব আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার গরীবের উপরে, আমার বাংলার মানুষের বুকের উপর গুলি করা হয়েছে। কি করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে, কি করে মানু ষকে হত্যা করা হয়েছে, আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন। তিনি বললেন, আমি নাকি 10 তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স হবে।
আমিতো অনেক আগেই বলেছি কিসের আরটিসি, কার সঙ্গে বসবো? যারা আমার মানু ষের বুকের রক্ত নিয়েছে, তাদের সঙ্গে বসবো? হঠাৎ আমার সংগে পরামর্শ না করে দশ ঘণ্টা গোপনে বৈঠক করে যে বক্তৃ তা তিনি করেছেন সমস্ত দোষ তিনি আমার উপর দিয়েছেন, বাংলার মানুষের উপর দিয়েছেন।
ভাইয়েরা আমার,
25 তারিখ এসেম্বলি কল করেছে । রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি 10 তারিখে বলে দিয়েছি, ঐ শহীদদের রক্তের উপর দিয়ে পাড়া দিয়ে, আরটিসিতে মু জিবু র রহমান যোগদান করতে পারে না। এসেম্বলি কল করেছে, আমার দাবি মানতে হবে প্রথম- সামরিক আইন মার্শাল ল' উইথড্র করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত যেতে হবে। যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তাদের তদন্ত করতে হবে। আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখবো আমরা এসেম্বলিতে বসতে পারবো কি পারবো না। এর পূর্বে এসেম্বলিতে বসতে আমরা পারি না।
আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানু ষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্ক ার অরে বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারী, আদালত-ফৌজদারী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরীবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সেজন্য সমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলি আছে সেগুলির হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা-ঘোড়াগাড়ি চলবে, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে- শুধু সেক্রেটারিয়েট, সু প্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জর্জকোর্ট, সেমি
গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো ওয়াপদা কোন কিছু চলবে না। 28 তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এরপরে যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর যদি 1টা গুলি চলে, আর যদি আামার লোকদের হত্যা করা হয় -তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দু র্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু - আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবে। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানু ষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি তখন কেউ আমাদের ডুবাতে পারবে না।
আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগের থেকে যদ্দু র পারি তাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করবো। যারা পারেন আমার রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকা-পয়সা পেঁৗছিয়ে দেবেন। আর এই 7 দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছেন, প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের বেতন পেঁ ৗছে দেবেন। সরকারি কর্ম চারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্য ন্ত আমার এই দেশের মু ক্তি না হবে, খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো- কেউ দেবে না। শুনেন, মনে রাখবেন, শত্রু বাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু -মু সলমান, বাঙালী, নন-বাঙালী যারা আছে তারা আমাদের ভাই, তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয়। মনে রাখবেন রেডিও - টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনে তাহলে কোন বাঙালী রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোন বাঙালী টেলিভিশনে যাবেন না। 2 ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানু ষ তাদের মাইনে পত্র নিতে পারে। কিন্তু পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন, টেলিগ্রাফ আমাদের এই পূর্ব বাংলায় চলবে এবং বিদেশের সংগে নিউজ পাঠানো চালাবেন।
কিন্তু যদি এই দেশের মানু ষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়- বাঙালীরা বুঝেসুঝে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্ল্লায় আওয়ামী
লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল। এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক।
মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইন্শাআল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা"।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



