সামহোয়্যার ইন-এ বাংলা ব্লগিংএর আঙ্গিনায় যারা নিয়মিত আসেন তারা জানেন যে, মাসুদা ভাট্রীর লেখা উপন্যাসের দু'টি পর্ব এখানকার কতর্ৃপক্ষ মুছে দেয়ার প্রতিবাদে বাংলা ব্লগের মুক্তচিন্তার অনুসারীরা একএে মার্চের 5 ও 6 তারিখে 48 ঘন্টার জন্য লেখা থেকে বিরতির কর্মসুচী নেন। এর ফলে যে তেমন উল্লেখযোগ্য কোন লেখা প্রকাশ পায়নি, তা কতর্ৃপক্ষকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেয়ার জন্যেই এ আয়োজন। তার সফল সমাপ্তি উপলক্ষ্যে আমার এই লেখা। আমি জানি এই লেখা আরও অনেক তর্ক-বিতর্ক, সহানুভূতি-সমর্থন এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাতের জন্ম দিবে। কিন্তু ধর্মান্ধ কুপমন্ডুকতার কাছে নিজের মুক্ত ভাবনাকে জিম্মী না করে বরং তাকে মুক্ত বিহঙ্গের মতো বিচরণের সুযোগ সৃস্টিতে সামান্য বিতর্ক ও দ্বন্দের সূএপাত কোনভাবেই অযৌক্তিক ও অপ্রাসঙ্গিক নয়। তাই আশা করব, কিছুটা সময় নিয়ে আপনারা অন্তত এই লেখাটি সম্পূর্ণভাবে পড়ুন, ভাবুন, মন্তব্য করুন এবং প্রয়োজনে একাত্মতা প্রকাশ করুন। এতে গ্রীক দর্শনের সুবর্ণ মধ্যক বা গোল্ডেন মীন খুঁেজ না পেলেও তার কাছাকাছি যে যাওয়া যাবে সে আত্মবিশ্বাস আমার আছে।
আমাদের জীবনবোধে শালীনতা ও স্বাধীনতার মাঝখানে যে সূক্ষ্ম ব্যবধানগত মানদন্ড আছে তা বোঝার মতো বোদ্ধা ও সচেতন লোকের অভাব ও ঘাটতি প্রচুর আছে। শালীনতাকে আপেক্ষিকতার নিক্তিতে মাপতে গিয়ে অহেতুক লেখকের স্বাধীনতাকে বিড়ম্বিত করা এবং শিল্পকর্মকে বিসর্জন করার ঢালাও চেস্টার প্রতিবাদে আমরা সোচ্চার হয়ে এগিয়ে এসেছি। ব্লগিং মুক্তচিন্তার হাতিয়ার, একে নিয়ন্ত্রনের হাতিয়ার নয়। তাই, যখনই মুক্তচিন্তাকে অবরুদ্ধ করা হবে, তখনই আমাদের কন্ঠ চারদিকে প্রতিধ্বনিত হবে, শ্ল্লোগান হবে, আন্দোলন হবে। আমাদের ও আগামী প্রজন্মের জন্য মুক্তি ও স্বাধীন মননশীলতার প্রতিচ্ছবি নির্মাণে এই সচেতন কন্ঠ হবে পরিবর্তনের হাতিয়ার আর অগ্রসর চিন্তার উপায়-উপকরণ।
আমাদের অগ্রজ প্রজন্মে এরকম কন্ঠে আজ থেকে 35 বছর আগে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল, "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম"। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের সেই সাহসী ডাকের প্রতিশ্রুতিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে রাজনৈতিকভাবে, কিন্তু দেশ স্বাধীন হতে পারেনি ধর্মান্ধতা ও কুপমন্ডুকতার শৃংখল থেকে। তাই যারা মুক্তচিন্তাকে এগিয়ে নিবে তাদেরকে শর্তহীনভাবে স্বতস্ফুর্ত সমর্থন করবে এরকম বিকল্প কোন শক্তি এদেশে এখনো গড়ে উঠেনি। কারণ, বিশ্বাসঘাতকতা, হত্যা, ষড়যন্ত্র ও মোহগ্রস্ততার সংস্কৃতি রাজনৈতিক শক্তিকে বিকলাঙ্গ করে রেখেছে। তাই, বাংলাদেশে একটি বিকল্প সংস্কৃতিমনা শক্তি সুসংহত হলে অন্তত: নরঘাতক রাজাকার জামাতী ও মৌলবাদী চক্র কোনদিনও মুক্তিযোদ্ধাদের শহীদি রক্তে ভেজা বাংলার মাটিতে পূনর্বাসিত হতে পারত না। কলঙ্কিত করতে পারত না এদেশের স্বাধীনতার রক্তিম পতাকাকে। গতানুগতিক দেশজ রাজনীতিবিদদের পরাজয় এখানেই। তাই রাজনীতিবিদরা যেখানে লজ্জাজনকভাবে পরাস্ত, সেখান থেকে শুরু করছি আমরা আমাদের বন্ধুর পথযাএা। আহবান জানাচ্ছি সকল মুক্তচিন্তার মানুষকে শামিল হতে ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে। আপনি আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা অন্য কোন দলের সমর্থক হোন অসুবিধে নেই, মৌলবাদী রাজাকার-জামাতী শক্তির ছোবল থেকে এদেশকে বাঁচাতে আপনি এগিয়ে আসতে পারেন। প্রয়োজন সাহস ও আপোষহীন চেতনা।
আমার এই পটভূমি বিশ্ল্লেষণে হয়তো অনেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। মাসুদা ভাট্রীর লেখাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে তার লেখার পটভূমিকে আমাদের বুঝতে হবে। মাসুদার উপন্যাসে যৎসামান্য অশ্লীলতা ছিল না, তা আমি বলব না। কিন্তু তার লেখার পটভূমি কোনক্রমেই অশ্লীল ছিল না, যা আমি পড়ে ও বিশ্লেষণ করে পেয়েছি। বরং একটি মাদ্রাসার ছেলেকে হুযুর কিভাবে পারলৌকিক হুরের কথা দিয়ে ধর্মান্ধতায় উদ্বুদ্ধ করছিল তার কিছুটা গ্রাফিক বিশ্ল্লেষণ ছিল। তাহলে সেজন্যই কি তার লেখাকে মডারেটরের বলীর পাঁঠা হতে হলো? না, তাও নয়। ব্যাপারটা আরেকটু জটিল।
মাসুদার উপন্যাসের পটভূমি কেবল মাদ্রাসার জঙ্গীবাদ সৃস্টির নেপথ্য কাহিনী হলে সমস্যা কিছু ছিল না। তার সাহসী ও খুরধার রাজাকার-জামাত বিরোধী লেখা রাজাকার ও জামাতী চেলাচামুন্ডাদের চক্ষুশূলের কারণ অনেক আগের থেকেই। কারণ, মাসুদা তার উপন্যাসকে মাদ্রাসা থেকে পাবনার মইত্যা রাজাকারের ঘাঁড়ে নিয়ে যাবেন না, তার গ্যারান্টী কোথায়? সেজন্যই মূলত: তার লেখা নিয়ে বেশ কিছু পাঠক শুরু করল হৈচৈ। এ ব্লগের অনেক লেখাতে অশ্লীলতা ছুঁেয়ছে যদিও তা নিয়ে তেমন একট উচ্চবাচ্য হয়নি। এক তথাকথিত ধমর্ান্ধ ব্লগার তো সংখ্যালঘুদের শ্লীলতাহানি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক লেখা দিয়ে অবচেতনভাবেই শালীনতার প্রান্তিকীকরণ করেছে যা হয়তো অনেকের গোচরে আসেনি। আসেনি মডারেশনের আওতায় কারণ এ নিয়ে কেউ চীৎকার করেনি। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, বিধি নিষেধের সীমানার শুরু আর শেষ কোথায় ? সত্যি কথা কি শালীনতা মানুষের অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ যা অত্যন্ত আপেক্ষিক প্রপঞ্চ।
মাসুদার লেখা ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করেছে বলে মিথ্যে বিভ্রান্তির চেস্টাও চলছে। অথচ জামাতের আদর্শিক গুরু মওদুদীর যে বিভ্রান্তিকর ও কোরান-হাদীসের অবমাননাকর লেখা বাংলাদেশে অহরহ প্রকাশ পাচ্ছে এবং সাধারণ মুসলমানদের বিশ্বাসকে আঘাত করছে, কই তা নিয়ে তো কোন মিছিল বা ঘেরাও হয় না। এধরণের লেখার কিছু নমুনা তো আমার ব্লগে পাওয়া যাবে, পাওয়া যাবে আরও অনেক ওয়েব পেজে, পাওয়া যাবে ঢাকার বইয়ের দোকানগুলোতে। এখানেই আমাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব। আমাদের সমস্যা হচ্ছে এদেশে অনেকের ধর্মবোধ অন্ধের হাতী দেখার মতো অতি সীমিত গন্ডিতে সক্রিয়। পূণর্াঙ্গভাবে দেখার, উপলদ্ধি করার ও অনুশীলনের বড্ডো অভাব। আমাদের এই অজ্ঞতা আর অসচেতনতার সুযোগ নেয় ধমর্ান্ধ অপশক্তি। এরাই বিভ্রান্ত করে এদেশের সাধারণ মুসলমানদেরকে। এরাই বানায় এদের অনেককে জঙ্গী আর সন্ত্রাসী। যেমনটা করেছিল 71'এ, যেমনটা করে চলছে আজকের বাংলাদেশে।
সুষম সমাজের স্বপ্ন নিয়ে টমাস মুরের "ইউটোপিয়া" লেখা ও আপোষহীনতার কারণে তিনি ফাঁসী বরণ করেছিলেন ইংল্যান্ডে। ক্যাথলিক চার্চের দু'শ বছর লাগে শুধু তার লেখাকে বুঝতে যখন তারা তাকে সাধুত্বের উপাধিতে ভূষণ করে। অন্তত: আমাদের যুগে মাসুদার লেখাকে বুঝতে আমাদের অতোদিন লাগবে না। মাসুদা ধর্মান্ধতা আর অন্ধকারের প্রাণীদের চিএ-চরিএ তুলে ধরছিলেন। তাই ধর্মান্ধ রাজাকার ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গোরা চীৎকার শুরু করল চিলে কান নিয়ে গেল বলে। মাঝখানে হারিয়ে গেল তার লেখা। হায় খোদা। কারণ, অন্ধকার ও বিভ্রান্তি যাদের রসদ, তারা আলোর দিশা তাড়াতে ব্যস্ত থাকবেই।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, সমাধান কোথায়? মুক্তচিন্তা ও লেখনী কি মডারেটরের কাঁচির সামগ্রী হবে আর আমরা চুপচাপ বসে থাকব? না, তাতো নয়। আমরা যারা পড়ি ও লিখি, তারা তাদের ভাবনাগুলো তুলে ধরি এই ব্লগে। এখানে হরেক রকমের লেখা আসবে। সামহোয়্যার ইন-এর মডারেটররা দিন-রাত অহরহ পাহারা দিয়ে শ্লীলতা, শালীনতা, ভদ্রতা-শিস্টতা বজায় রাখার স্ব-আরোপিত সংজ্ঞায় সৌদী নৈতিক পুলিশের মতো কাঁচি-ছুরি ব্যবহার করে মডারেশন করে যাবেন ও ব্ল্লগে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখবেন, তা হলে বলব তারা দু:স্বপ্নকে স্বাগত জানাচ্ছেন। লজিস্টিকলি এটা সম্ভব নয়। কারণ, ব্লগারের সংখ্যা ও তাদের লেখার কলেবর দ্রুত বাড়ছে। নৈতিকতা ও শালীনতার পরিধি অতি আপেক্ষিক এবং সাবজেক্টিভ তা তাদের বুঝতে হবে। আর একান্তই মডারেশন করতে হলে তারও যুক্তিযুক্ত ও ভারসাম্য পদ্ধতি আছে। যাতে মডারেশনের নামে অযথা বিড়ম্বনা ও বিসর্জনের সংস্কৃতির উত্থান ও লালন না হয়। কারণ, মাসুদার লেখার পাশাপাশি আরও কয়েকটি লেখা একই সময় সমান্তরালভাবে মডারেশনের আওতায় আসেনি। এটা যে ইচ্ছাকৃত, সে অপবাদ আমি দিব না। কিন্তু মডারেশনের এই ব্যবস্থা যে অপ্রতুল ও হুযুগে, তা দিনের আলোর মতো এতে স্পস্ট হয়ে উঠে। "মাথা ব্যথা, তাই মাথা কেটে ফেলুন"-এই প্রেসক্রিপশনে অন্তত: এখানে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান নয়, এটা বুঝার মতো লোকের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। সেখানেই আমাদের আনন্দ, সাফল্য ও সম্ভাবনা বাস করে।
মাসুদার লেখায় অনেকে কিছুটা অশ্লীলতার গন্ধ পেতে পারেন, সেই অনুভূতিকে আমি খাটো করব না। মাসুদার যেমন লেখার অধিকার আছে, অন্যদেরও আছে তা না পড়ার। কিন্তু তাই বলে তার লেখাকে মুছে ফেলা হবে লেখকের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্যের উপর নগ্ন ও অযৌক্তিক আগ্রাসন। কারও লেখায় অন্যরা আপওি পেলে তারা না পড়বে, বা সতকর্ীকরণ বাণী দিবে, অথবা মূল সামহোয়্যার ইন পেজ থেকে সরিয়ে লেখকের নিজস্ব ব্লগে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যারা পড়তে চান, তারা কেবল নিজ দায়িত্বে পড়বেন। এধরণের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আমি সনির্বন্ধ অনুরোধ করব সামহোয়্যার ইন-কে। আশা করি, অন্য ব্লগাররা আরও সুনির্দিস্ট প্রস্তাবনা নিয়ে আসবেন। কোন ধমর্ান্ধ নির্বোধ বা তার সহচররা নামে-বেনামে মুক্তচিন্তাকে নির্বাসন করতে পারবে না, তাদের সাথে যত বড়ো নরঘাতক ধর্মব্যবসায়ীর দলই থাকুক না কেন। মুক্তচিন্তায় এই বিশ্বাস ও আস্থা সৃস্টিতে যারা অক্লান্তভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, তারাই আগামীতে সুস্থ ও সংস্কৃতিমনা বাংলাদেশ নিমর্ান করবেন এনিয়ে অন্তত আমার কোন সন্দেহ নেই।
প্রয়োজনে এই প্রতিবাদ, প্রতিবাদী লেখা ও আন্দোলন শুধু বাংলা ব্লগে নয় বরং বিষয়টি ব্লগারদের আন্তজর্াতিক পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। আমরা আমাদের ভাবনা আর লেখনীকে ধর্মান্ধ কুপমন্ডুকদের কাছে পণবন্দী হতে দেব না। তাই চাই লেখকের বিমূর্ত স্বাধীনতা, চাই স্বীকৃতি তার সৃস্টির বৈচিএ্যের ও অনন্য সওার। আসুন শিল্পচর্চা ও সৃজনশীলতাকে শালীনতার কঠিন মোড়কে আটকে না রেখে তাকে স্বতস্ফূর্ত প্রকাশের গ্রহণযোগ্য সুযোগ করে দেই। এতে লেখক ও পাঠকের প্রতি সমানভাবে সুবিচার করা হবে। কারণ, আঁধার হাতড়ে এক ক্রোশ চলার চেয়ে আলোর স্পস্টতায় দু' কদম চলাও অনেক বেশী অর্জন। সামহোয়্যার ইন-কে অনুরোধ, নির্বিচারে কাঁচি না চালিয়ে মডারেশন/সম্পাদনার গ্রহণযোগ্য নীতিমালা তুলে ধরুন। প্রয়োজনে আমরা সবাই এগিয়ে আসব এ নিয়ে একটি সুনির্দিস্ট নির্দেশনা তৈরীতে।
একই সাথে আমার একান্ত আবেদন মাসুদা, শ্রেয়সী সহ সকল মুক্তমনা লেখকদের কাছে, দয়া করে আপনারা পিছিয়ে যাবেন না। প্রতিটি রাত একটি শুভ্র সকালের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসে। অন্তত: 7ই মার্চের এই ঐতিহাসিক দিনটিতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখুন, আলোকিত বাংলাদেশ গর্বে আর প্রতিজ্ঞায় উদ্ভাসিত, যেমনটা হয়েছিল আজ থেকে 35 বছর আগে। ধন্যবাদ।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মার্চ, ২০০৬ রাত ৯:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



