ভাবছি "দমকল বাহিনীর চাকরি থেকে ইস্তফার" ব্যাপারে একটা ব্যক্তিগত কৈফিয়ত আগামীকাল প্রকাশ করব। বিশেষ করে, চৈএের সাথে তাল মিলিয়ে হঠাৎ দমকা হাওয়াসহ ঝড়ের মতো ব্ল্ল্লগের রাজ্যেও একঝাঁক তর্ক-বিতর্ক আর বিবাদের বজ্রপাতে বিভ্রান্ত ভাবনাগুলো কিছুটা স্পস্টতা সংগতকারণেই আশা করে। যেহেতু লেখাটা একটু সিরিয়াস ধরণের তাই আজকের মতো পুরোপুরি ছুটি দিলাম তাকে।
ছুটির দিনে "ছোটবেলার কথা" নিয়মিত সাপ্তাহিক কলামে দাঁড় করাবার চেস্টা করছি। প্রতি শুক্রবার যখন অবসরে সময় কাটাই তখন পেছনে ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে তাকাতে খুব একটা মন্দ লাগে না। গত সপ্তাহে লিখেছি মায়ের আদরের কথা, তাতে অনেকের মন অতীতে ফিরে গিয়ে বিষহ্ন হয়ে পড়েছিল। তাই আজকে ভাবলাম একটু হালকা মেজাজের লেখা লিখব।
ঠিক ছোট বেলা নয়, যখন কলেজ উতরে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেছি, তখনকার কথা। আমার বড়ো বোন সেসময় হঠাৎ নজরদারি শুরু করে দিল আমার উপর। বাসার কোন বড়ো বোন যদি এ লেখা পড়েন তাহলে কিছু মনে করবেন না। অন্তত: আমার অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে, বড়ো বোনের মূল কাজ হচ্ছে বাবা-মায়ের ছায়া হয়ে একটু অভিভাবকত্ব ফলানো, এতে তার নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা! এবং কর্তৃত্বের একটা রাশভারী ভাব দেখাতে পারে অসহায় ছোট ভাইবোনদের উপর। সেটা নিয়েই হচ্ছে আজকের গল্প।
আমি গান সবসময়ই খুব পছন্দ করি। মোটামুটি আমার রুমে নন্-স্টপ গান চলতো, ইদানীং একটু কমেছে। গানের স্বাদ আবার হরেক রকমের। পুরনো দিনের গান থেকে আধুনিক গান কোনটাই বাদ যেত না। একেক সময় বাজে একেক গান। প্রচুর গানও রেকর্ড করাতাম। কিন্তু আমার গোয়েন্দা বোনের খুব জানার ইচ্ছে কি কি বিশেষ ধরণের গান আমি গীতালী (এলিফ্যান্ট রোডে) থেকে রেকর্ড করাচ্ছি। তার নিজের যে গান শুনার খুব বাতিক তাও না। কিন্তু আমার গান নিয়ে তার অনেক সন্দেহ, আর ব্যগ্র উৎকন্ঠা। কিন্তু ব্যাপারটা আমি কখনও বুঝিনি যে, বড়ো বোন আমার উপর গোয়েন্দাগিরি করছে। কারণটা বেশ স্পস্ট। কলেজ পেড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাএার এই বয়সে প্রেম প্রেম ভাবটা হূদয়ের অনেকটা জুড়ে বসে থাকে। তার সাথে সাথে থাকে গুরুজনদের সন্দেহের মাএাটাও।
যেহেতু কোথাও কিছু পাওয়া যাচ্ছে না ধরার মতো বা জেরা করার মতো, তাই শেষ পর্যন্ত গানের পছন্দের উপর শুরু হলো গোয়েন্দাগিরি। অবশেষে একদিন ক্লান্ত হয়ে তার মুখ ফুটল। আপা সরাসরি আমাকে জিগ্যেস করল, "আচ্ছা বলতো, তুই একেক সময় একেক গান শুনিস্ কেন? কখনো তোর গান শুনে মনে হয়, তুই প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিস্, আবার কখনো মনে হয় ছ্যাকা খেয়ে তুই বনবাসী হয়েছিস? ঘটনা কি"? আমি একটা স্মিত হাসি দিয়ে বললাম, "ব্যাপার কিছুই না, যখন যা শুনতে মন চায়, তখন তাই শুনি। এতে প্রেমে পড়া বা ছ্যাকার কি আছে?" একটা অসম্ভব অবিশ্বাস্য দৃস্টি নিয়ে সে আমার রুম থেকে চলে গেল। তারপর থেকে আমার ক্যাসেট নিয়ে তার নাড়াচাড়াও বন্ধ হয়ে গেল।
গতরাতেও আমি গান শুনছিলাম। বাজছে গান আমার পড়ার রুমে। আমি টেবিলে, তাকিয়ে আছি কম্পিউটারের দিকে। খুব শান্ত চারপাশ। ঘুমন্ত ঢাকার রাত। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি রাস্তার নিসপ্রভ আলোতে দূরে একটা রিকশা ঢিমেতালে তার ডেরার দিকে ক্লান্তভাবে ফিরছে। আমি গানের সুরে মগ্ন। এর মধ্যে শুনলাম করিডোরে কারও পায়ের আওয়াজ। মনে হলো পাশের রুম থেকে কেউ বের হয়ে আমার রুমের খুব কাছে এসে কিছুক্ষণ থেমে থেকে আবার ফিরে যাচ্ছে। জানি না কে? কিন্তু বুঝতে অসুবিধা হলো না ফেরার পথে তার চোখ ভরা কৌতুহুল ও ঔৎসুক্য। হয়তোবা চেস্টা করছে এতো রাতে বেজে উঠা এই গানের অর্থ বুঝার।
সত্যিই আমাদের কৌতুহুলের ও ঔৎসুক্যের কোন অন্ত নেই। দেহ ব্যবচ্ছেদ করে পোস্টমর্টেম করা যায়, ভাগ্যিস হূদয়ের কোন পোস্টমর্টেম নেই। কারণ, কেবল গান শোনার অপরাধে তাহলে হয়তো অনেক হূদয়কে অহেতুক পোস্টমর্টেমের শিকার হতে হতো। গানটা তখনও বাজছিল:
"সুখে থাকো
ও আমার নন্দিনী
হয়ে কারও ঘরণী
জেনে রাখো প্রাসাদেরও বন্দিনী
প্রেম কভু মরেনি
চলে গেছ কিছুতো বলে যাওনি
পিছু তো ফিরে চাওনি
আমিও পিছু ডাকিনি
বাঁধা হয়ে বাঁধিনি
সুখে থাকো
ও আমার নন্দিনী
হয়ে কারও ঘরণী..."
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




