somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রাজনৈতিক দল গঠনের মতো জনপ্রিয়তা ইউনুস সাহেবের ছিলো না ।

০৮ ই মে, ২০২৬ রাত ২:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মাঝে মাঝে আমি ইউটিউবে বা মাহফিলে গিয়ে হুজুরদের ওয়াজ শুনি। শোনার কারণটা ধর্মীয় যতটা না, তার চেয়ে বেশি হলো আমাদের সমাজের হুজুররা দেশীয় অর্থনীতি বা সামাজিক ইস্যুগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের মগজে আসলে কী ঢোকাচ্ছেন, সেটা বোঝা। বহু বছর আগে আমাদের দেশের আলোচিত বক্তা তারেক মনোয়ার সাহেবের সাথে আমার সরাসরি দেখা হয়েছিল এক আত্মীয়র বিয়েতে, তিনি সেখানে কাজী হয়ে এসেছিলেন। তখন থেকেই আমি এই ঘরানার মানুষদের চিন্তাধারা পর্যবেক্ষণ করছি।

ডক্টর ইউনূস সাহেবকে নিয়ে আমার আগ্রহ দীর্ঘদিনের। তিনি নোবেল পেয়েছিলেন : এটা একজন বাঙালি হিসেবে আমার কাছে গর্বের ছিল। যদিও আমার ছোটো মামা বলতেন: তিনি ডোনেশন দিয়ে শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন, অর্থনীতিতে তো পাননি। তবুও পাঠ্যবইয়ে উনার গল্প পড়া আর ছোটবেলায় মিরপুরে গ্রামীণ ব্যাংকের সদর দপ্তর দেখতে যাওয়া , সব মিলিয়ে উনার প্রতি একটা ইতিবাচক ধারণা আমার মনে ছোটবেলা থেকেই ছিল।

কিন্তু তারেক মনোয়ার সাহেবদের ওয়াজে চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। তাদের বয়ানে ইউনূস সাহেব ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যিনি গ্রামীণ ব্যাংক খুলে গ্রামের গৃহবধূদের ঘর থেকে বের করে তাদের ‘চরিত্র নষ্ট’ করছেন। উনাকে ‘সুদখোর প্রো ম্যাক্স’, ‘বেয়াদব’ আর ‘আমেরিকান দালাল’ বলে গালিগালাজ করা হতো অহরহ। দেশের একমাত্র নোবেলজয়ীকে এভাবে মাহফিলের মঞ্চে তুলোধুনা করতে দেখে সত্যিই মনটা খারাপ হয়ে যেত।

আমি ইউনূস সাহেবের ‘সোশ্যাল বিজনেস’ কোর্স করেছি এবং সরাসরি উনার হাত থেকে সার্টিফিকেট নিয়েছি। খুব অল্প খরচে উনার বক্তব্য শোনার সুযোগ পেয়েছিলাম, যা শুনতে বিদেশিরা ডলার খরচ করে। সেই অনুষ্ঠানেই আমার মনে হয়েছিল মালয়েশিয়ার সাথে উনার চমৎকার একটি যোগসূত্র আছে। পরে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হওয়ার পর যখন আনোয়ার ইব্রাহিম আকস্মিক ঢাকা সফরে এলেন, তখন সেই ধারণা আরও স্পষ্ট হলো।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের পর যখন ছাত্ররা ইউনূস সাহেবকে ফ্রান্স থেকে উড়িয়ে এনে দেশের দায়িত্ব দিল, তখন দেখলাম আমাদের তারেক মনোয়ার হুজুররা একদম ৩৬০ ডিগ্রি ইউ-টার্ন নিলেন। যে মানুষটাকে সারাজীবন গালি দিলেন, হঠাৎ তাকে বলতে শুরু করলেন ‘জাতির ত্রাণকর্তা’। এমনকি করোনা ইব্রাহিম হুজুরের মতো লোকরাও বলতে শুরু করলেন যে, ইউনূস সাহেবের মনোনয়ন নাকি ‘ঐশ্বরিক’! একদল হুজুর তো তাকে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হিসেবে প্রচার শুরু করে দিলেন।

হুজুরদের এই ভোলবদল দেখে অবাক হলেও আসল নাটক শুরু হলো ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন শেষ হওয়ার পর। ইউনূস সাহেব ক্ষমতা ছাড়ার পর সেই তারেক মনোয়াররাই আবার পুরনো চেহারায় ফিরলেন। এখন তারা আবার বলছেন যে শয়তানও নাকি এত সুদ খায় না, যতটা ইউনূস সাহেব খান! তিনি নাকি দেশের বারোটা বাজিয়ে দিয়ে গেছেন। যুগ যুগ ধরে এই হুজুররাই সাধারণ মানুষের মনে গেঁথে দিয়েছেন যে ‘ইউনূস’ মানেই ‘সুদ’। তাদের এই ‘শর্ট টার্ম মেমোরি লস’ আসলে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল।

ইউনূস সাহেব যে রাজনীতি করতে চাননি, তা নয়। ২০০৮ সালেও পর্দার আড়ালে আন্তর্জাতিক শক্তির ইশারা ছিল, কিন্তু তিনি স্বল্প মেয়াদে ক্ষমতা নিতে আগ্রহী ছিলেন না। ‘নাগরিক শক্তি’ নামে দল গড়তে গিয়েও তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ আমলে শেখ হাসিনা উনাকে সবসময় চাপের মুখে রাখতেন। দাবি করা হতো যে ইউনূস সাহেব নাকি আমেরিকার কানে ‘পড়া’ দেন, এমনকি তাকে পদ্মা সেতু থেকে চুবিয়ে মারার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, যখন ইউনূস সাহেবকে এভাবে হয়রানি করা হচ্ছিল, তখন বিদেশের ২০০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি উনার পক্ষে খোলা চিঠি লিখলেও আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো বড় প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। বিএনপি-জামাতও তখন সেভাবে উনার পক্ষে উচ্চবাচ্য করেনি। সিভিল সোসাইটি বা বুদ্ধিজীবীরা প্রতিবাদ করলেও সাধারণ জনগণ তাকে কোনোদিন নিজেদের সুখ-দুঃখের অংশ মনে করেনি। তিনি তৃণমূলের কাছে কখনো আপনজন হয়ে উঠতে পারেননি।

এর জন্য অনেকাংশেই দায়ী তারেক মনোয়ারদের মতো বক্তারা, যারা বছরের পর বছর গ্রামীণ মানুষের কানে ‘সুদখোর’ তকমা দিয়ে বিষ ঢেলেছেন। সাঈদী সাহেব বেঁচে থাকলে আজ ইউনূস সাহেবকে নিয়ে কী ওয়াজ করতেন, সেটা শোনার খুব ইচ্ছা ছিল। আসলে জুলাই আন্দোলনের পর আমরা ইউনূস সাহেবের যে বিশাল ফ্যানবেস দেখলাম, তাদের বড় একটা অংশই ছিল ‘সুসময়ের মাছি’। বিশেষ করে ডানপন্থী ঘরানার রাজনীতি যারা করেন, তারা ইউনূস সাহেবের ইমেজকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছেন।

আজ এনসিপির মতো দল যে পার্লামেন্টে বসে আছে, সেটার পথ আসলে ইউনূস সাহেবই প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন। কিন্তু কাজ শেষে এখন আর সারজিস বা হাসনাতদের মুখে উনার গুণগান শোনা যায় না। স্বার্থ ফুরিয়ে গেলেই মানুষটা আবার তাদের কাছে সেই পুরনো ‘সুদখোর’ হয়ে গেছেন। ডক্টর ইউনূস একজন সফল ব্যক্তিত্ব হতে পারেন, কিন্তু তিনি কোনোদিন সফল রাজনীতিবিদ হতে পারতেন না। আর এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারিগর হলেন তারেক মনোয়ারদের মতো হুজুররা। তারা গ্রামগঞ্জে উনাকে ‘সুদখোর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে উনার রাজনীতির বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের মানুষ দুই পরিবারের বাইরে কাউকে চেনে না-এটা যেমন সত্যি, তার চেয়ে বড় সত্যি হলো ইউনূস সাহেব কোনোদিন সাধারণ মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো সেই মেঠো পথের নেতা হয়ে উঠতে পারেননি। তিনি ছিলেন ড্রয়িংরুমের বা হাই-প্রোফাইল মিটিংয়ের নেতা। তৃণমূলের মানুষ হুজুরদের ওয়াজ শুনে বিশ্বাস করে বসে আছে যে ‘ইউনূস’ আর ‘সুদ’ সমার্থক শব্দ। এই মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল তিনি কোনোদিন ভাঙতে পারেননি। ফলে স্বার্থের রাজনীতি শেষে আজ তিনি আবারও সেই নিঃসঙ্গ একলা মানুষেই পরিণত হয়েছেন।

-



সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মে, ২০২৬ রাত ২:৪২
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রফিকুল ইসলামের ২য় বিয়ে করার যুক্তি প্রসঙ্গে chatgpt-কে জিজ্ঞেস করে যা পেলাম...

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ০৭ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১২:৫০



ইসলামে একাধিক বিয়ে বৈধ, তবে সেটা বড় দায়িত্বের বিষয়। শুধু “বৈধ” হলেই কোনো সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তম বা সবার জন্য উপযুক্ত হয়ে যায় না। Qur'an-এ বহু বিবাহের অনুমতির সাথে ন্যায়বিচারের শর্তও... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ দ্বিতীয় বিয়ে কেন করে?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭



যাদের চরিত্র খারাপ তারাই দ্বিতীয় বিয়ে করে।
দ্বিতীয় বিয়ে করা অন্যায়। একজন নীতিবান মানুষ কখনও দ্বিতীয় বিয়ে করে না। দ্বিতীয় বিয়ের ফল তো ভালো হয় না। আমাদের দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এখনই কওমী মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করে দিন

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৭ ই মে, ২০২৬ রাত ৮:৪৮


মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এখনই কওমী মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করে দিন। এর জন্য যদি আকাশ ভেঙে পড়ে, তাহলে ভেঙে পড়ুক। এর কারণে যদি দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা-ই হোক। এখনই উপযুক্ত সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমজনতা আর রাজনীতি

লিখেছেন কিরকুট, ০৭ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:১৮

দেশটা এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে চায়ের দোকানের বেঞ্চি থেকে শুরু করে ফেসবুকের কমেন্টবক্স পর্যন্ত সবাই ভূরাজনীতির গোপন উপদেষ্টা। কেউ ন্যাটো বুঝে, কেউ "র" এর ফাইল পড়ে ফেলেছে বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাজনৈতিক দল গঠনের মতো জনপ্রিয়তা ইউনুস সাহেবের ছিলো না ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই মে, ২০২৬ রাত ২:২৬


মাঝে মাঝে আমি ইউটিউবে বা মাহফিলে গিয়ে হুজুরদের ওয়াজ শুনি। শোনার কারণটা ধর্মীয় যতটা না, তার চেয়ে বেশি হলো আমাদের সমাজের হুজুররা দেশীয় অর্থনীতি বা সামাজিক ইস্যুগুলো নিয়ে সাধারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×