দেশটা এখন এমন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে চায়ের দোকানের বেঞ্চি থেকে শুরু করে ফেসবুকের কমেন্টবক্স পর্যন্ত সবাই ভূরাজনীতির গোপন উপদেষ্টা। কেউ ন্যাটো বুঝে, কেউ "র" এর ফাইল পড়ে ফেলেছে বলে দাবি করে, কেউ আবার চাণক্যের নাতি সেজে রাত জেগে ষড়যন্ত্রের মানচিত্র আঁকে। আর এইসব আলোচনার মাঝখানে ডিমও এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উপাদান হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মুসলমান নাকি ডিমের হালি পাঁচ টাকায় কিনতে চায়, আর ভারতের মুসলমান তিন টাকায় বেচতে চায়। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি, ধর্মনীতি, পররাষ্ট্রনীতি সব মিলেমিশে এখন ডিমতত্ত্বে এসে ঠেকেছে।
অনেকে হঠাৎ করে ইতিহাস আবিষ্কার করে ফেলেছেন। বাংলাদেশের মুসলমানরাই পাকিস্তান এনেছিল এই প্রবাদ তারা এমনভাবে বলেন, যেন ঘটনাটা গত সপ্তাহে ঘটেছে। তারপর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, যারা পাকিস্তান বানাইছিল, তারা ভারতেই থেকে গেল কেন? এই প্রশ্নের ভেতরে ইতিহাসের চেয়ে সন্দেহ বেশি। যেন প্রতিটি মুসলমান জন্মসূত্রেই কোনো অদৃশ্য গোপন পরিকল্পনার সদস্য। কেউ দোকান চালায়, কেউ রিকশা চালায়, কেউ চাকরি খুঁজে বেড়ায়, কিন্তু ষড়যন্ত্রতত্ত্বের বাজারে সবাই যেন আন্তর্জাতিক মানের দাবাড়ু।
এদিকে চট্টগ্রামে পাকিস্তানের জাহাজ ভিড়লে অনেকে কাঁথা মুড়ি দিয়ে বসে যান, খেলা কিন্তু এইবার শুরু! রুশ সেনা ভারতে নামছে, চীন চিন্তিত, আমেরিকা অপেক্ষায়, সৌদি ধাক্কা দিচ্ছে, বার্মা ঠেলছে, তুরষ্ক নাচছে, আর বাংলাদেশ নাকি হয়ে গেছে রুশ-মার্কিন ব্যাটেলফিল্ড। শুনতে শুনতে মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত সুপার পাওয়ার যেন গোপনে ঢাকার মগবাজারে বৈঠক করে। শুধু পাড়ার মুদি দোকানদারটাই এসব জানে না।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই অঞ্চলের মানুষ রাজনীতি নিয়ে যতটা উত্তেজিত, নিজেদের জীবন, কর্মক্ষেত্র নিয়ে ততটা নয়। চালের দাম বাড়ে, চাকরি শুন্য, হাসপাতালে রুগী আছে চিকিৎসা নাই, নদী মরে নালা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ফেসবুকের বীরেরা তখনও কুরুক্ষেত্র আসছে বলে পোস্ট লিখে যাচ্ছে। যেন প্রতিটি মোড়ে মোড়ে মহাভারতের নয়া ট্রেলার চলছে।
বাংলাদেশকে কেউ ভারতের গলার কাঁটা বলে, কেউ আমেরিকার কোলের শিশু, কেউ চীনের দুশ্চিন্তা। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠে শুধু ভাবে, আজকের দিনটা কিভাবে পার হবে। ভূরাজনীতির বিশাল দাবার বোর্ডে তারা কোনো ঘোড়া বা নৌকা নয়, তারা কেবল রাজনীতি নামের বোঝার নিচে চাপা পড়ে থাকা আর্তনাদ ।
শেষরাতে এক লোক চাণক্যের বই খুলে বসে। তিনি রাষ্ট্র বাঁচানোর উপায় খুঁজছেন। অথচ নিজের বিদ্যুতের বিল কিভাবে দেবেন, সেটা নিয়েও নিশ্চিত নন। তিনি ভাবেন, আমি তো সাধারণ নাগরিক, আমার কী করার আছে? তারপর আবার পৃষ্ঠা উল্টান। কারণ এই উপমহাদেশে সাধারণ মানুষদের সবচেয়ে বড় কাজই হলো পৃষ্ঠা উল্টানো। ইতিহাসের, ষড়যন্ত্রের, বিভ্রমের। আর যখন সব পৃষ্ঠা উল্টানো শেষ হয়ে যায় তখন এরা নিজের জীবনের পৃষ্ঠা উলটে দেয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



