লেখাটি বেশ কিছূ দিন আগের। চেতনা'71-এর সৌজন্যে। মূল লেখা নেয়া হয়েছে বাংলারইসলাম.কম থেকে। কিন্তু এ লেখা এখানে পুনপর্্রকাশ খুব জরুরী। কারণ, নতুন প্রজন্মের অনেকে ইতিহাস নিয়ে সচেতন হতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য নিবেদিত এ লেখা। ধর্ম সচেতন এসব নতুনদের জন্য এটি অনেকটা আলোর ছোঁয়া দিতে পারবে বলে আমি আশা করি। কারণ, বিভ্রান্তির কারণে তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করে দেখতে ভালবাসে, তাই তাদের জন্য শুভেচ্ছাসহ এ লেখাটি তুলে দিলাম।
"গত বুধবার ঢাকায় পল্টন ময়দানে জামাতে ইসলামী আয়োজিত মহাসমাবেশে দলের নেতারা সবাই একযোগে বলেছেন, একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা তারা করেননি। তারা বলেছেন, কেউ প্রমাণ করতে পারবে না একাত্তরে জামাত খুন-ধর্ষণসহ কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল। কিন্তু বিভিন্ন সময় সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য এই বক্তব্য সমর্থন করে না।
বিএনপি-জামাতের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন 4 দলীয় জোট সরকারের শিল্পমন্ত্রী হলেন স্বাধীনতাবিরোধী জামাতে ইসলামীর আমির মওলানা মতিউর রহমান নিজামী। বিগত 2001 সালের 1 অক্টোবরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-1 আসন থেকে (সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলার একাংশ) তিনি সাংসদ নির্বাচিত হন। যারা নতুন প্রজন্মের তাদের অনেকের কাছে মতিউর রহমান নিজামীর আসল চেহারা অজানা। বর্তমানে জামাত আমির মতিউর রহমান নিজামীকে পাবনার মানুষ '71-এর কুখ্যাত 'মইত্যা রাজাকার' হিসেবে জানতো। এই নিজামী এবং তার দল জামাতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধেই শুধু অবস্থান নেয়নি, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যাযজ্ঞ ও যাবতীয় ধ্বংসলীলায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে। নিজামী ও তার সহযোগীরা মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের হত্যা, মা-বোনদের সম্ভ্রম হরণ, সম্পদ লুটপাট করা, বাড়িঘরে আগুন দেওয়াসহ ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
এদিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি দলিলে সনি্নবেশিত তথ্য অনুযায়ী 1971 সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সব রকমের সহযোগিতা করতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দলীয় নেতাকমর্ীদের ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন নিজামী। ইসলামি ছাত্র সংঘের তৎকালীন সভাপতি হিসেবে জামালপুরে সংগঠনের এক সভায় বক্তৃতাকালে এ নির্দেশ দেন তিনি। এ সভায় তিনি আরো বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী সময়োপযোগী সিদ্ধান্তনিয়েছে। সেনাবাহিনী যেভাবে কাজ করছে তাতে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করা সম্ভব। সেপ্টেম্বর মাসের 16 তারিখ সিলেটে ছাত্র সংঘের এক সভায় নিজামী আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে তীব্র বিষোদগার করে বলেন, তারা পাকিস্তানের বির"দ্ধে পাকিস্তানি মুসলমানদের খেপিয়ে তুলছে। হাত মিলিয়েছে ভারতের সঙ্গে। তিনি বলেন, পাকিস্তানকে রক্ষা করতে হবে। অন্যদিকে 6 সেপ্টেম্বর মতিউর রহমান নিজামীর নেতৃত্বে ইসলামি ছাত্র সংঘ ঢাকা মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় 'পাকিস্তান প্রতিরক্ষা দিবস' পালন করে। এদিন তারা পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষায় সর্বাত্মক কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মতিউর রহমান নিজামী গংদের এসব দুষ্কর্ম সম্পর্কে একাত্তরের ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধী সম্পর্কে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্টে বিশদ বর্ণনা রয়েছে। ঐ রিপোর্টে বলা হয়_
1. 1971 সালে এই জামাত নেতা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে তার যাবতীয় কর্মতৎপরতা পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি জামাতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন। তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিহত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিমর্ূল করার জন্য আলবদর বাহিনী গঠন করা হয়। মতিউর রহমান নিজামী এই আলবদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন। নিজামীর এই বদর বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে সহযোগী হিসেবে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধরত বাঙালি জনগোষ্ঠীকে পাকিস্তানি তথা ইসলামী জীবন দর্শনে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীকে রূপান্তরিত করা। আলবদরের নেতারা বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা প্রণয়ন করেন এবং তাদের নির্দেশে ডিসেম্বর মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে শত শত বরেণ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়। নিজামীর নেতৃত্বে পরিচালিত আলবদর বাহিনীর হাতে বুদ্ধিজীবী হত্যার ভয়াবহ বিবরণ দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
2. দৈনিক সংগ্রামে নিজামীর লেখা একটি নিবন্ধে তখন বলা হয়েছে, 'আমাদর পরম সৌভাগ্যই বলতে হবে, পাক বাহিনীর সহযোগিতায় এদেশের ইসলামপ্রিয় তরুণ সমাজ বদর যুদ্ধে স্মৃতিকে সামনে রেখে আলবদর বাহিনী গঠন করেছে। সেদিন আর খুব দূরে নয়, যেদিন আলবদরের তরুণ যুবকরা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হিন্দু বাহিনীকে (শত্রুবাহিনী) পযর্ুদস্ত করে হিন্দুস্থানের অস্তিত্ব্বকে খতম করে সারা বিশ্বে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করবে।' (14 নভেম্বর, 1971)।
3. শান্তি কমিটি গঠনের পর 12 এপ্রিল, 1971 ঢাকায় প্রথম মিছিল বের করা হয়। এ মিছিলে নেতৃত্ব দেন গোলাম আযম, খান এ সবুর, মতিউর রহমান নিজামী প্রমুখ। মিছিল শেষে গোলাম আযমের নেতৃত্বে পাকিস্তান রক্ষার জন্য মোনাজাত করা হয়। (তথ্য সূত্র : দৈনিক সংগ্রাম, 13 এপ্রিল 1971)।
4. পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করেছে তাদের ধ্বংস করার আহ্বান সংবলিত নিজামীর ভাষণ ও বিবৃতির বহু বিবরণ একাত্তরের জামাতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক 'সংগ্রামে' ছাপা হয়েছে। যশোরে রাজাকার সদর দপ্তরে সমবেত রাজাকারদের উদ্দেশ্য করে নিজামী বলেন, 'জাতির এই সংকটজনক মুহূর্তে প্রত্যেক রাজাকারের উচিত ঈমানদারীর সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত এ জাতীয় কর্তব্য পালন করা এবং ঐ সকল ব্যক্তিকে খতম করতে হবে যারা সশস্ত্র অবস্থায় পাকিস্তান ও ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। (দৈনিক সংগ্রাম, 15 সেপ্টেম্বর, 1971)।
এছাড়া মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে তার এলাকাবাসী ও হত্যা লুটতরাজ, অগিড়বসংযোগ, ধর্ষণ, নির্যাতন ইত্যাদির অভিযোগ এনেছেন। বেড়া থানার বৃশালিকা গ্রামের আমিনুল ইসলাম ডাবলুগণতদন্ত কমিশনকে জানিয়েছেন, তার পিতা মোঃ সোহরাব আলীকে একাত্তরে নিজামীর নির্দেশেই হত্যা করা হয়েছে। তিনি আরো জানান যে, নিজামীর নির্দেশেই তাদের এলাকার প্রফুল (পিতা : নয়না প্রামাণিক), ভাদু(পিতা : তিীশ প্রামাণিক), মনু (পিতা : ফেলু প্রমাণিক) এবং ষষ্ঠী প্রামাণিককে (পিতা : প্রফুল প্রামাণিক) গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার কয়েকজন প্রত্য সাীও রয়েছে বলে তিনি জানান।
1971-এ সাত নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কুদ্দুসকে (পিতা : মৃত. ডা. সৈয়দ আলী শেখ। সাং-গ্রাম :মাধবপুর, পো : শোলাবাড়িয়া, থানা : পাবনা) আলবদররা ধরে নিয়ে গেলে তিনি প্রায় দুসপ্তাহ আলবদর ক্যাম্পে অবস্থান করেন। ক্যাম্পে অবস্থানের সময় তিনি সেখানে আলবদর কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা, অগি্নসংযোগ, ধর্ষণ ইত্যাদির পরিকল্পনা প্রত্যক্ষ করেন। এই পরিকল্পনায় মতিউর রহমান নিজামী নেতৃ ত্ব দিয়েছেন বলে তিনি জানান। 26 নভেম্বর সাত্তার রাজাকারের সহযোগিতায় ধুলাউড়ি গ্রামে পাকিস্তানি সৈন্যরা 30 জন মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে। মতিউর রহমান নিজামীর পরিকল্পনা ও নির্দেশ অনুযায়ী সাত্তার রাজাকার তার কার্যক্রম পরিকল্পনা করতো বলে তিনি জানিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা কু্দ্দুস আলবদর বাহিনীর একটি সমাবেশ এবং গোপন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন। বৈঠকে মতিউর রহমান নিজামীও উপস্থিত ছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধকে প্রতিহত এবং মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সমূলে ধ্বংস করার নির্দেশ দেন বলে কু দ্দুস জানান। বৈঠকে কোথায় কোথায় মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি এবং আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের বাড়ি আছে তা চিহ্নিত করা হয়। তিনি জানান যে, নিজামী বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধদের হত্যা, ঘাঁটি ধ্বংস এবং আওয়ামী লীগারদের শেষ করার নির্দেশ দেন। বৈঠকের পরেরদিন রাজাকার বাহিনীর সহযোগিতায় বৃশালিকা গ্রাম ঘিরে ফেলে গোলাগুলি চালায়, নির্যাতন করে, লুটতরাজ করে এবং বাড়িঘর আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। তিনি আরো জানান যে, নিজামী তার গ্রামের ঝুটি সাহার ছেলে বটেশ্বর সাহা নামক একজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেন।
নিজামীর বিরুদ্ধে প্রায় অনুরূপ অভিযোগ এনেছেন সাঁথিয়া থানার মিয়াপুর গ্রামের মোঃ শাহজাহান আলী (পিতা : জামাল উদ্দিন) যুদ্ধের সময় রাজাকারদের হাতে ধরা পড়লে আরো কয়েকজন আটক মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে তার গলায়ও ছুরি চালানো হয়েছিল। অন্যদের জবাই করলেও শাহজাহান আলী ঘটনাচক্রে বেঁচে যান। গলায় কাটা দাগ নিয়ে তিনি এখন পঙ্গু জীবনযাপন করছেন। তার সহযোদ্ধা দ্বারা চাঁদ, মুসলেম, আখতার, শাহজাহানসহ আরো অনেককে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে গরু জবাই করার লম্বা ছুরি দিয়ে জবাই করে হত্যা করা হয়। সে দিন প্রায় 10/12 জন মুক্তিযোদ্ধা জবাই হয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা কবিরের গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকান্ডের নীলনকশা মতিউর রহমান নিজামীই রচনা করেন বলে শাহজাহান আলী জানিয়েছেন।
গত 7 ডিসেম্বর 2000 তারিখে জামাতের আমীর হিসেবে নিজামীর শপথ গ্রহণের দিন ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একাত্তরের ঘাতক দালাল নিমর্ূল কমিটি আয়োজিত এক গণসমাবেশে মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে পাবনা থেকে এসেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ। একাত্তরের নিজামীর হাতে নির্যাতিত নিজামীরই নির্বাচনী এলাকা পাবনা জেলার বেড়া থানার বৃশালিকা গ্রামের অধিবাসী আব্দুল লতিফ সেদিন সমবেত জনতার সামনে বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাবনায় যিনি 'মইত্যা রাজাকার' হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনিই জামাতে ইসলামীর নতুন আমির মওলানা মতিউর রহমান নিজামী। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফের ভাষ্য 'একাত্তরের নিজামীর আরেকটা পরিচয় ছিল। পাবনার বেড়া-সাঁথিয়ার মানুষ তাকে মইত্যা রাজাকার হিসেবে চিনতো। তার (নিজামী) মতো খুনি আজো টিকে আছে যা দুঃখজনক।
একাত্তরে নিজামীর দুষ্কর্মের বর্ণনা দিয়ে আবদুল লতিফ বলেন, নিজামী আলবদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন। 3 ডিসেম্বর (1971) রাতে নিজামীর নেতৃত্বে আলবদর ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর যৌথভাবে তাদের গ্রাম ঘিরে ফেলে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ এবং বাড়িঘর অগি্নসংযোগ করে। সেই আক্রমণে বেশ কয়েকজন নিহত হয়। সেই রাতে হামলাকারী আলবদর ও পাকিস্তানি হানাদাররা তার মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে ধরে নিয়ে যায় এবং নির্যাতনের পর তাকে গুলি করে হত্যা করে। এর আগে মুক্তিযুদ্ধের সময় 13 আগস্ট আব্দুল লতিফকে আলবদর বাহিনীর সদস্যরা বেড়াবাজার থেকে ধরে নগরবাড়ী পাকিসত্দানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পাকিসত্দানি সেনাদের পাশাপাশি মতিউর রহমান নিজামীও তার ওপর নির্যাতন চালায় (ভোরের কাগজ 8 ডিসেম্বর 2000)।
দেলোয়ার হোসেন সাঈদী 2001-এর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-1 (সদর ও নাজিরপুর এলাকা) আসনে চারদলীয় জোটের প্রাথর্ী হিসেবে সাংসদ নির্বাচিত হন জামাতে ইসলামীর নেতা মওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী। বিগত সপ্তম সংসদ নির্বাচনেও একই আসন থেকে নগন্য ব্যবধানে জয়ী হলেও সাঈদীর এই জয়ের পিছনে ছিল সামপ্রদায়িক অপপ্রচার, হিন্দুদের ওপর নির্যাতন, ভোট চুরিসহ নানা গুরুতর অভিযোগ। পবিত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে একজন 'মওলানা' হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে সাঈদীর অপকর্মের নজির শুধু বিগত নির্বাচনেই নয়, 1971 সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও রয়েছে। সে সময় তিনি ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজ জেলা পিরোজপুরে হিন্দু সমপ্রদায়ের ঘরবাড়ি, সম্পদ লুট করেছেন। পাকিসত্দানি হানাদার বাহিনীকে গণহত্যা ও নির্যাতনে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছেন সাঈদী। পিরোজপুরে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, নির্যাতন, লুটতরাজসহ নানা যুদ্ধাপরাধের অন্যতম হোতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী। তার এসব অপকর্মের বহু নজির ও সাক্ষী আজো পাওয়া যাবে তার হাতে নির্যাতিত ও তিগ্রসত্দ হয়ে বেঁচে থাকা পিরোজপুরের স্বজনহারা মানুষের ঘরে। কিন্তু স্বাধীনতার 34 বছর পর সাঈদী তার ঘাতক, যুদ্ধাপরাধীর চেহারা গোপন করে ধর্মের নাম ভাঙিয়ে প্রধানত তরুণ প্রজন্মের অজ্ঞতার সুযোগে তাদের কাছ থেকে ভোট পাওয়ার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পিরোজপুর ও নাজিরপুরের নতুন ভোটার যারা, যাদের বয়স 30-35 বছরের নিচে তারা সাঈদীর আসল চেহারা চেনেন না বলেই তার মতো ঘাতক পার হয়ে যান নির্বাচনী বৈতরণী। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতাবিরোধী ও ঘাতক সাঈদীর দুষ্কর্মের কিছুবিবরণ প্রকাশিত হয়েছে 'একাত্তরের ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে জাতীয় গণতদনত্দ কমিশনের রিপোর্ট'-এ। ওই রিপোর্টে বলা হয়- 1971 সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই জামাত নেতা পাকিসত্দান হানাদার বাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য তার নিজ এলাকায় আলবদর, আলশামস এবং রাজাকার বাহিনী গঠন করেন এবং তাদের সরাসরি সহযোগিতা করেন। 1971 সালে তিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না, তবে তথাকথিত মওলানা হিসেবে তিনি তার স্বাধীনতাবিরোধী তৎপরতা পরিচালনা করেছেন। তার এলাকায় হানাদারদের সহযোগী বাহিনী গঠন করে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে লুটতরাজ, নির্য াতন, অগি্নসংযোগ, হত্যা ইত্যাদি তৎপরতা পরিচালনা করেছেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি তার এলাকায় অপর চারজন সহযোগী নিয়ে 'পাঁচ তহবিল' নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন, যাদের প্রধান কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী বাঙালি হিন্দুদের বাড়িঘর জোরপূর্বক দখল করা এবং তাদের সম্পত্তি লুণ্ঠন করা। লুণ্ঠনকৃত এ সমস্ত সম্পদকে দেলোয়ার হোসেন সাঈদী 'গনিমতের মাল' আখ্যায়িত করে নিজে ভোগ করতেন এবং পাড়ের হাট বন্দরে এসব বিক্রি করে ব্যবসা পরিচালনা করতেন।
পাড়ের হাট ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিয়ন কমান্ডের মিজান তালুকদার একাত্তরে সাঈদীর তৎপরতার কথা উলেখ করে জানিয়েছেন- দেলোয়ার হোসেন সাঈদী স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় লিপ্ত ছিলেন। তিনি ধর্মের দোহাই দিয়ে পাড়ের হাট বন্দরের হিন্দু সমপ্রদায়ের ঘরবাড়ি লুট করেছেন ও নিজে মাথায় বহন করেছেন এবং মদন নামে এক হিন্দু ব্যবসায়ীর বাজারের দোকানঘর ভেঙে তার নিজ বাড়ি নিয়ে গেছেন। দেলোয়ার হোসেন সাঈদী সাহেব বাজারের বিভিন্ন মনোহারি ও মুদি দোকান লুট করে লঞ্চঘাটে দোকান দিয়েছিলেন।
দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর অপকর্ম ও দেশদ্রোহিতার কথা এলাকায় হাজার হাজার হিন্দু-মুসলিম আজো ভুলতে পারেনি। (মাসিক নিপুণ, আগস্ট 1987)। এছাড়াও মিজান তালুকদার বলেন, একাত্তর সালের জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে দেলোয়ার হোসেন সাঈদী তার বড়ো ভাই আব্দুল মানড়বান তালুকদারকে ধরে পাড়ের হাটে পিস কমিটির অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে আব্দুল মানড়বান তালুকদারের ওপর সাঈদী পাশবিক নির্যাতন করে এবং তার ভাই মুক্তিযোদ্ধা মিজান তালুকদার কোথায় আছে জানতে চায় ও তার সন্ধান দিতে বলে।
গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা পিরোজপুরের এডভোকেট আলী হায়দার খানও সাঈদীর বির"দ্ধে অনুরূপ অভিযোগ এনেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সাঈদীর সহযোগিতায় তাদের এলাকার হিমাংশু বাবুর ভাই ও আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করা হয়েছে। পিরোজপুরের মেধাবী ছাত্র গণপতি হালদারকেও সাঈদী ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছেন বলে তিনি জানিয়েছেন। তৎকালীন মহকুমা এসডিপিও ফয়জুর রহমান আহমেদ, ভারপ্রাপ্ত এসডিও আবদুর রাজ্জাক এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মিজানুর রহমান, স্কুল হেডমাস্টার আব্দুল গাফফার মিয়া, সমাজসেবী শামসুল হক ফরাজী, অতুল কর্মকার প্রমুখ সরকারি কর্মকর্তা ও বুদ্ধিজীবীদের সাঈদীর প্রত্য সহযোগিতায় হত্যা করা হয় বলে তিনি জানিয়েছেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে তথ্য সরবরাহকারী ভগীরথীকে তার নির্দেশেই মোটরসাইকেলের পিছনে বেঁধে পাঁচ মাইল পথ টেনে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পাড়ের হাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ আলাউদ্দিন খান জানিয়েছেন, সাঈদীর পরামর্শ পরিকল্পনা এবং প্রণীত তালিকা অুনযায়ী এলাকার বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রদের পাইকারি হারে নিধন করা হয়। পাড়ের হাটের আনোয়ার হোসেন, আবু মিয়া, নূর"ল ইসলাম খান, বেনীমাধব সাহা, বিপদ সাহা, মদন সাহা প্রমুখের বসতবাড়ি, গদিঘর, সম্পত্তি এই দেলোয়ার হোসেন সাঈদী লুট করে নেন বলে তিনি গণতদন্ত কমিশনকে জানিয়েছেন। পাড়ের হাট বন্দরের মুক্তিযোদ্ধা রুহুল আমীন নবীন জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় সাঈদী এবং তার সহযোগীরা পিরোজপুরের নিখিল পালের বাড়ি তুলে এনে পাড়ের হাট জামে মসজিদের গনিমতের মাল হিসেবে ব্যবহার করে। মদন বাবুর বাড়ি উঠিয়ে নিয়ে সাঈদী তার শ্বশুর বাড়িতে স্থাপন করেন। রুহুল আমীন জানান, 1971 সালের জুন মাসের শেষের দিকে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রেশন সংগ্রহ করতে পাড়ের হাটে গেলে দেখেন স্থানীয় শান্তিকমিটি ও রাজাকারদের নেতৃত্বে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর 60-70 জনের একটি দল পাড়ের হাট বন্দরে লুটপাট করছিল। পিরোজপুরের শান্তি কমিটি ও রাজাকার নেতাদের মধ্যে সেদিন পাকিস্তানি সেনা দলটির নেতৃত্বদিয়েছিলেন দেলোয়ার হোসেন সাঈদী, সেকান্দার শিকদার, মওলানা মোসলেহ উদ্দিন, দানেশ মোলা প্রমুখ। এ ছাড়াও সাঈদীকে একটি ঘরের আসবাবপত্র লুট করে নিয়ে যেতে দেখেছিলেন রুহুল আমীন।
রুহুল আমীন নবীন আরো জানান, সাইদী এবং তার সহযোগীরা তদানীন্তন ইপিআর সুবেদার আব্দুল আজিজ, পাড়ের হাট বন্দরের কৃষ্ণকান্ত সাহা, বাণীকান্ত সিকদার, তরুণীকান্ত সিকদার এবং আরো অনেককে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছেন। হরি সাধু এবং বিপদ সাহার মেয়ের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন। বিখ্যাত তালুকদার বাড়িতে লুটতরাজ করেছেন। ওই বাড়ি থেকে 20-25 জন মহিলাকে ধরে এনে পাকসেনাদের ক্যাম্পে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদের পিতা ফয়জুর রহমান আহমেদের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দেলোয়ার হোসেন সাঈদী জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শহীদের পুত্র কথাশিল্পী মুহম্মদ জাফর ইকবাল জানিয়েছেন, দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর সহযোগিতায় ফয়জুর রহমান আহমেদকে পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যা করে এবং হত্যার পরদিন সাঈদীর বাহিনী পিরোজপুরের ফয়জুর রহমান আহমেদের বাড়ি সম্পূর্ণ লুট করে নিয়ে যায়। (তথ্যসূত্র : মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ কেন্দ্র)"
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে মার্চ, ২০০৬ রাত ১০:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



