
ভারতের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতন নিয়ে বাংলাদেশে যে পরিমাণ চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে, তা দেখে অবাক না হয়ে উপায় নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই দেখা যায় অদ্ভুত সব তত্ত্ব। ফেইসবুক খুললে দেখা যাচ্ছে একদল পন্ডিত দাবি করছেন, আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় 'চিকেন নেক' আর 'সেভেন সিস্টার্স' নিয়ে যে হুংকার দেওয়া হয়েছিলো, ওপার বাংলার মানুষ নাকি সেই ভয়েই মমতাকে বাদ দিয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে । যদিও ডক্টর ইউনূসের মতো শান্তশিষ্ট মানুষও যখন পপুলিস্টদের মতো সেভেন সিস্টার্স নিয়ে কথা বলেছিলেন , তখন খোদ ইন্ডিয়ানরাই অবাক হয়েছিল। যে মানুষটা জীবনে কখনো কারো বিরুদ্ধে কড়া কথা বলেননি, তার এই হঠাৎ ভোলবদল কেন হলো সেটা আমার কাছেও একটা বড় রহস্য।
আরেকটা মজার আলোচনা চলছে সীমান্তের সমীকরণ নিয়ে। বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় জামায়াত জিতেছে বলেই নাকি ওপারেও একই রেজাল্ট হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর প্রেস অ্যাডভাইজার ডা জাহিদও তার ইউটিউব চ্যানেলে এই নিয়ে লম্বা বিশ্লেষণ করেছিলেন। যদিও ইন্ডিয়াতে তার চ্যানেল ব্যান করা, তাই সামনে কোনো অফিসিয়াল ভিজিটে গেলে ইন্ডিয়ানরা উনার সাথে কেমন ব্যবহার করে, সেটা দেখার জন্য আমাদের অনেকেরই তর সইছে না। এদিকে আবার আওয়ামী লীগের পাল্টে যাওয়া রূপ দেখেও হাসি পায়। মমতাদি শেখ হাসিনার পতনের পর ইউনূস সরকারকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন বলে এখন তারা মমতার ওপর খড়গহস্ত। আওয়ামী লীগ এখন ঘোর 'গেরুয়া' প্রেমে মত্ত। আমাদের কলিম দফাদার সাহেবও ব্লগে মমতাদির পতন নিয়ে বেশ ভালো লিখেছেন।
গত কয়েক বছর যারা পশ্চিমবঙ্গের খবর রেখেছেন, তারা জানেন তৃণমূলের পতনের কারণটা আসলে একেবারেই ঘরোয়া। আর জি কর কাণ্ডের আসামিদের আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে প্রাথমিক শিক্ষক পদে নিয়োগ দুর্নীতি দেখে মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল। মমতাদি 'যুবশ্রী' বা ভাতার রাজনীতি দিয়ে মানুষের মুখ বন্ধ রাখতে চেয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু ভাতার রাজনীতি দিয়ে পেট চললেও ভবিষ্যৎ গড়া যায় না। এমনকি নারীদের ভাতার টাকা থেকেও তৃণমূলের ক্যাডারদের কাটমানি দিতে হতো। রাজ্যে কোনো বড় কারখানা নেই, এফডিআই আসে না, তরুণরা সব কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে চলে যাচ্ছে। গত বিশ মাস ধরে বাংলাদেশিদের ইন্ডিয়া যাওয়া কমে যাওয়ায় ওপার বাংলার মাইক্রো-ইকোনমিতে যে ধস নেমেছে, সেটা তারা স্বীকার না করলেও ব্যবসায়ীরা ঠিকই টের পেয়েছেন।
মমতার এই পতন কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র নয়, কোনো সীমান্তপার রাজনীতির প্রভাবও নয়। এটি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের প্রকাশ যারা কয়েক বছর ধরে দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক অচলায়তন সহ্য করে এসেছেন। রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য অফিসিয়াল ভিজিট বা দলীয় ক্যাডারদের আনুগত্য যথেষ্ট নয় দরকার সাধারণ মানুষের আস্থা এবং অর্থনৈতিক উন্নতির প্রকৃত কর্মসূচি। এটাই মমতা দির পতনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মে, ২০২৬ রাত ২:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


