সতীর্থ ব্ল্লগার দীক্ষক দ্রাবীড় "ইসলাম ও নারী: একটি মোহমুক্ত বিশ্লেষণ" ধারাবাহিকভাবে লিখছেন, তার লেখার পটভূমিতে আমি ধর্মের কোন তত্ত্গত বিশ্ল্লেষণ করব না। আমি একজন সাধারণ মানুষ, তাই সাদামাটা ভাষায় তুলে ধরব নারীবিষয়ক ধমর্ীয় মোহমুক্তির বিপরীতে একটি মোহযুক্ত বিশ্ল্লেষণ-সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব দৃস্টিকোণ থেকে। ধর্ম নিয়ে আমাদের মাএার বাইরে বাড়াবাড়ি আর মাএাহীন নির্বিকারতার বিরামহীন দ্বন্দ্বে আমরা সত্যি পযর্ুদস্ত। তার সাথে নারী বিষয়টি যোগ করলে ব্যাপারটি আরও ভয়াবহ জটিলভাবে বিতর্কিত হয়ে পড়ে। নারীর নির্মোহ বিশ্লেষণ কোনদিনও সম্ভব নয়, যেখানে নারীর অস্তিত্বের বাণিজ্যিকীকরণের ধারাটি অতি প্রবল অনাদিকাল ধরে। নারীর বাণিজ্যিকীকরণ যুগপৎভাবে হয়েছে ধমর্ীয় বোধের অপব্যবহার থেকে আর ইদানীং পশ্চিমা পুঁজিবাদী ধারায় নারী বিপণন থেকে।
তাই আমাদের ধমর্ীয় পরিসরে পারলৌকিক হুরের অপার্থিব সৌন্দর্যের চিএ দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করে ধমর্ীয় জোশ উজ্জীবিত করার চেস্টা, নারীকে অন্তরীণ করে রাখার চেস্টা ও নারীর প্রতি অবহেলার সমান্তরালে পাশ্চাত্ব্যের নারী মুক্তির অপচ্ছায়া দিয়ে নারীকে নিছক পণ্য দ্রব্যের বিজ্ঞাপন সামগ্রী হিসেবে তুলে ধরা, নারী-পুরুষের অদৃশ্য গ্ল্ল্লাস-সিলিং দিয়ে তার প্রতি বৈষম্য করা, নারীকে নির্যাতন করা-এ সবই আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজধারার ফসল। এই প্রকৃত সমস্যাটা মোদ্দাকথায় ধর্মান্ধতা আর ধর্মহীনতায় একাকার হয়ে আছে। কারণ, প্রকৃত ধর্মভীরু বিশ্বাসী পুরুষ নারীকে নির্যাতন করতে পারে না, অমর্যাদা ও উপেক্ষা করতে পারে না।
কিন্তু আমাদের সমাজে বিশ্বাস ও অনুশীলনের অগভীরতার প্রেক্ষাপটে, দিনের শেষে কেবল নারীকেই টানতে হয় জীবণের দায়গ্রস্থতা, তাকে হতে হয় অপবিএ, তাকে বিক্রি করতে হয় নিজ সওা সন্তান বাঁচিয়ে রাখার জন্য, তাকে নিরুদ্দিস্ট হতে হয় অপবাদগ্রস্থতায়। তাকে হতে হয় মডেল পণ্য। গাড়ীর শো রুমে সজ্জিত শো-পিস। সুললনার লাস্যময়ী হাসি পণ্যের বাজার বাড়ায়। হুরের গল্প ধর্মভক্তি বাড়ায়। তাই, আড্ডাবাজের ভাবনায়, নারীর প্রতি উপেক্ষা কেবল ধর্ম প্রসূত নয়, তার প্রতি উপেক্ষা বরং লিঙ্গভিওিক। ধর্ম, সভ্যতা ও সময় অতিক্রম করে এই লিঙ্গভিওিক বৈষম্য ফুটে উঠে সমাজ থেকে সমাজে। ঝিনাইদহের জমিরন, লন্ডনের সিন্ডি, আর নিউইয়র্কের জুডী- এরা সবাই এক অভিন্ন দু:খ-বেদনা-যন্ত্রণা সমান্তরালভাবে অনুভব করে ভিন্ন ভিন্ন পরিসরে। কিন্তু তার সূএপাত একই পটভূমি থেকে। পটভূমিটি হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী মর্যাদার হনন।
তাই, ধর্ম নারীকে কতোটা মুক্তি দিয়েছে এবং দিতে পারে তার একটি আপেক্ষিক বিশ্ল্লেষণ করার দায়িত্ব আমি ধর্মভীরুদের হাতে ছেড়ে দিলাম। আশা করি, তারা লিখবেন ইসলাম নারী মর্যাদা কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। "উওম লোক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার সনদ যে স্ত্রীর কাছ থেকেই আসবে"-এই হাদীসের অবশ্য তেমন প্রচার নেই। কিন্তু, ধর্মের দৃস্টিতে স্ত্রীর কর্তব্য ও দায়িত্ব নিয়ে বইয়ের কোন কমতি মুসলিম সমাজে হবে বলেও আমি আশা করি না। তাই, বাংলাদেশের পটভূমিতে নারীর অবস্থান নিয়ে একটি মোহযুক্ত বিশ্ল্ল্লেষণ পড়তে হলে আমি আমার পড়া প্রিয় নৃতাতি্বক গবেষণার বই "ঝগড়াপুর" পড়তে বলব। ঝগড়াপুরের গবেষক ওলন্দাজ দম্পতি আরেন্স ও বু্যরদেনের ভাষায়, "পুরুষরা যখন সমাজের সর্বময় ক্ষমতা দখল করল তখন থেকেই তারা 'মেয়েরা যে প্রকৃতির নিয়ম অনুসারেই নিম্নমর্যাদাসম্পন' এই বিশ্বাসটিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সাংস্কৃতিক, পৌরাণিক ও ধমর্ীয় ধ্যান-ধারণার অবতারণা করতে থাকে। প্রচার করা হয় যে, মাতৃত্ব ও পরিবারের গৃহস্থালীর দায়িত্ব পালন করাই মেয়েদের যোগ্য কাজ" (ঝগড়াপুর, 1977)। তাই নারী মুক্তি অলীক যেখানে নারীর অবস্থানগত মুক্তি সংস্কারবোধের বেড়াজালে আবদ্ধ ও সেই বন্দীদশা থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা অদূর ভবিষ্যতে অতি ক্ষীণ।
"...সে যুগ হয়েছে বাসি,
যে যুগে পুরুষ দাস ছিল না ক', নারীরা অছিল দাসী!
বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি,
কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও, উঠিছে ডঙ্কা বাজি..."
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




