somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শেষ নোটিশের শেষকৃত্য:

৩০ শে এপ্রিল, ২০০৬ রাত ১০:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(প্রায় সপ্তাহখানেক আগে বলেছিলাম, আড্ডায় একটি গল্প লেখার চেস্টা করছি। সেই প্রতিশ্রুতিতে উপহার দিলাম একটি গ্রামের ছোট গল্প। কোন রাজনীতির গন্ধ নেই এখানে। আজকাল সবাই বলে কোন প্রমাণ নেই, কোন কেস নেই। দেশের উন্নতির জন্য একযোগে কাজ করতে হবে। দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। এরকম এক সাথে কাজ করে দরিদ্রমুক্ত গ্রাম এই নাযানি গ্রাম। এখানকার একজন শেষ বিকেলে একটি নোটিশের শেষকৃত্য করছে- এটাই হচ্ছে এই গল্পের পটভূমি। ধন্যবাদ।)

দোকানের হিসাবের বইটা বন্ধ করে ইদ্রীসকে ডেকে আলতু মিয়া বের হয়ে যায়। কেনা-বেচা আজকাল ভাল যাচ্ছে না তার মুদি দোকানের। গ্রামের মানুষরা এখন আর দোকানে তেমন আসে না। সবাই গঞ্জের দিকে দৌড়ায়। ছোট এই নাযানি গ্রাম। বছর দশেক হলো এখানকার রাস্তাঘাট পাকা হয়ে গেছে। রিকশা-প্রাইভেট-টেম্পো-পিক আপ সবই এই গ্রামের এই মাথা থেকে শেষ মাথায় গিয়ে শেষ হয়। আগে মানুষ কতো কস্ট করে গরুর গাড়ী করে শষ্য-সব্জী-তরকারী গঞ্জে নিয়ে যেত, অথবা নৌকায় নিয়ে যেত। এখন সব গাড়ী। যদিও গাড়ী আর ভ্যান এদিকে তেমন আসে না, তারপরেও দিনে দু'চারটা গাড়ী ঢাকা চিটাগাং রোড থেকে এখানে চলে আসে।

দোকান থেকে বের হওয়ার সময় আলতু হাতে একটা সাদা চিঠি নিয়ে বের হয়। আজকেই থানার তহশিলদারের অফিস থেকে এসেছে। প্রতিদিন এই বিকেল বেলা দোকান খোলা রেখেই আলতু ওরফে আলতাফ মিয়া খাল পাড়ের দিকে হাঁটা দেয়। সূর্যাস্ত হওয়া পর্যন্তই সে খাল পাড়ে খেজুর গাছটার নীচে বসে থাকে। খালের পানিতে অজু করে আসরের নামায পড়ে। চুপচাপ বসে থাকে। এদিকটায় সাধারণত: তেমন লোকজনের আনাগোণা নেই। অথচ এই খালটাতে একসময় বড়ো বড়ো নৌকা আসতো। চাল-ডাল-লবণ-চিনি সবই এখান দিয়ে বাজারে আসতো। জিয়ার সময় এই খালটা কেটে চওড়া করে। তা এতো বছর ধরে খালের আর সংস্কার নেই। এখন তেমন নৌকাও চলে না। কিন্তু আলতুর স্মৃতিতে খালটা অনেক কথা মনে করিয়ে দেয়। এখানেই সে বাবার সাথে সাঁতার শেখে ছোটবেলায়। বেশ ক'বার ডিঙ্গী নৌকায় করে বন্দরের গিয়েছিল বাবার সাথে।

রাস্তায় যাওয়ার সময় মফিজ মাস্টার চীৎকার দিয়ে জিগ্যেস করে, "কি রে আলত,ু ওয়াজ মাহফিলে যাবি না? খাল পাড়ে গিয়া কিসু পাবি না"। কিছু না বলে আলতু জোরে হাঁটা দেয়। মফিজের সাথে দোকানে বসা ছোট হুযুরের কথা কানে বাজে, "বেকুবটা খাল পাড়ের কবরের সামনে গিয়া নামায ফড়ব। একটা হাঁডা ওইছে। বেকুব কোনহান্কার"। যদিও খাল পাড়ে কারও কোন কবর আছে কি-না এটা নিয়ে এই গ্রামে বেশ তর্ক-বিতর্ক। তবে জিয়ার সময় খাল কাটতে গিয়া মানুষের হাত-পায়ের হাড্ডি পাওয়া গিয়েছিল খালের পাড়ে। তখনকার চেয়ারম্যান বলেছিল বোধ হয় গরু-মহিষের হাঁড়। কিন্তু সবাই জানে, এখানে কোন কবর নেই। তারপরেও আলতুর খাল পাড়ে যাওয়াটা সবার চোখে পড়ে। সবার কাছে কেন জানি ব্যাপারটা খুব দৃস্টিকটু মনে হয়। আলতু হাঁটতে হাঁটতেই ভাবতে থাকে। খাল পাড় মিনিট দশেক'এর রাস্তা তার দোকান থেকে।

আলতু তাকিয়ে চারপাশে দেখে দেশের উন্নতি। প্রায় সব বাড়ীতে ডিশ লেগেছে। দাউদকান্দী ব্রিজ হয়ে যাওয়ার পর থেকে এখানের মানুষের দিনকাল অনেক বদলে গেছে। যারা আগে নদীর দিকে নৌকা বাইত, জাল মারত, তারা এখন পিক আপ ভ্যান চালায়, ক্যাব ভাঁড়া দেয়। ইসলামী ব্যাংক এখানকার মানুষের জন্য প্রচুর লোন দিয়েছে। কোল্ড স্টোরেজটাও কাছে। ব্যাংকের লোন নিয়ে অনেকেই পাকা বাড়ী তুলছে। এখন এদিকে আর বন্যা হয় না। ব্রীজের কারণে এদিকের বাঁধটা ভালই মজবুত। স্কুল ঘর পাকা হয়েছে। গ্রামের ছেলে-মেয়েরা স্কুল শেষ করে কলেজে যায়। অনেকে এখন চান্দিনা কলেজে যায়, হোস্টেলে বা লজিং-এ থাকে না। বিকেল বেলার মধ্যে ক্লাশ করে চলে আসে। ভালই লাগে তার এই সবুজ নাযানি গ্রাম।

আলতু মিয়া 12 বছর বয়সে একবার কুমিল্ল্লা গিয়েছিল তার মামাতো ভাই আনুর সাথে। সিনেমা দেখতে। কুমিল্লা সমবায় সমিতির পেট মোটা বাসগুলোতে চড়ে। বাসায় আন্ধারের পর ফিরে আসে। মামা যে একটা মাইর দিয়েছিল তাদের দু'জনরে তা এখনও মনে পড়লে গা শিউরে উঠে। হেডমাস্টার এসে মামারে বলে গিয়েছিল আলতু আর আনু আজকে স্কুলে আসেনি।

রাস্তার মধ্যে বের হয়ে হাঁটার উপায় নেই। মানুষ আজ গিজ গিজ করছে। তার মধ্যে ঈদগাহ মাঠে আজকে ওয়াজ মাহফিল। সকাল ধরে বিপ্ল্ল্লবী ইসলামী গণসংগীত বাজানো হচ্ছে। ঘন ঘন ঘোষণা। সাঈদী সাহেব আজকে আসবে। একটা উৎসব-উৎসব সাজ-সাজ ভাব। রাস্তার দু'পাশে আতর-টুপির দোকান বসেছে। ক্যাসেটে বিক্রি হচ্ছে ইসলামী গান, মলি্ল্ল্লক ভাইয়ের সুরে সাইমুমের গণসংগীত, সাঈদীর ক্যাসেট। হাঁটার জো নেই। এখানে সাঈদী সাহেবের মাহফিল প্রতি বছরই হয়। মানুষের উপর মানুষ হাঁটে। সম্মানিত মানুষের জন্য অনেক সম্মান। এখানকার চেয়ারম্যান সাহেব অত্যন্ত দ্বীনদার মানুষ। সফেদ দাঁড়ি, সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবী-বড়ো সাদা রুমাল মাথার উপর পেঁচানো থাকে সবসময়। হাজী মানুষ। তার সামনে কেউ সাইকেল-রিকশায় চড়ে না, নেমে যায়। বড়ই দিল দরিয়া মানুষ। আজকের ওয়াজ মাহফিলে সবার জন্য তাবাররুকের ব্যবস্থা তিনি করে রেখেছেন। পাঁচটা বড়ো গরু জবাই হয়েছে। আগে এখানে ওরশ হতো, এখন আর হয় না। এসব বেদাতী কাজ মতি চেয়ারম্যন বন্ধ করেছেন।

মাদ্রাসাটা বড়ো হয়েছে। এখানকার হেড মাওলানা বিশাল আলেম আবার মসজিদেরও ইমাম। বড়োই তাজবীদের সাথে সুরা তেলাওয়াত করেন। নামাযে বড়ো সুরা পড়েন না। ছোট ক্বেরাতে নামায শেষ করেন। নামাযের সালাম ফিরায়ে মুনাজাত করেন না। মুনাজাত তো নামাযের কোন অংশ না। ঝাঁড়-ফুকের জন্য কেউ আসলে তাদেরকে দাতব্য ক্লিনিকের দিকে পাঠান। বড়োই নরম ভাষায় কথা বলেন। সাত বছর মক্কা ইউনিভার্সিটি থেকে ডিগ্রী নিয়ে এসেছেন। সরাসরি সৌদী শেখ বা'আয সাহেবের ছাএ। খোতবা তিনি বাংলাতেই পড়েন। যখন আরবী বলেন মনে হয় তিনি আরবের লোক। চেয়ারম্যান সাহেবের বড্ডো পিয়ারা মানুষ। আমাদের চেয়ারম্যান সাহেব যখন সৌদীতে ছিলেন তখন এই হুযুরের সাথে পরিচয়। সেই পরিচয় থেকেই এখানে তার আসা। এখানকার মাদ্রাসা ভালই নাম করেছে। গত বছরও দাখিলের রেজাল্টে প্রথম কুড়িজনের মধ্যে তিনজনই এই মাদ্রাসা থেকে।

বড়ো লাইব্রেরী হয়েছে। লাইব্রেরীতে হাযার হাযার বই। বিশেষত: দ্বীনের খেদমতের জন্য অনেক ইসলামী বই হাজী সাহেব আনিয়েছেন। হাজী সাহেব একটা বড়ো ক্লিনিকও করেছেন। লোকজন চিকিৎসার জন্য এখন আর দূরে যায় না। সবাই ক্লিনিকে চলে আসে। বেশী জটিল সমস্যা হলে এখান থেকে ইবনে সিনা হাসপাতালের কুপন দিয়ে দেয়। গরীব মানুষ একটু চিকিৎসা পায়। সবই আমাদের এই চেয়ারম্যান হাজী সাহেবের বদৌলতে। গ্রামের সবাই একবাক্যে বলে বড়ই দিলদরিয়া মানুষ। গতবছর যখন আক্কাসের 70 বছরের দাদী হাঁপানীতে খুব কস্ট পাচ্ছিল, তাকে জোর করে নিয়ে গিয়েছিল এই ক্লিনিকে। ডাক্টার দেখে বলে, "হাঁপানীর অবস্থা বড্ডো খারাপ। সদর হাসপাতালে নিয়া যাও। আমি অষুদ দিলে পরে কিছু হইলে আবার দোষ দিবা। আর খাল পাড়ে নামায না পইড়া মাঝে মধ্যে একটু মসজিদে যাইও। আল্ল্লাহ বিপদ দেয়, আল্ল্লাহই আবার আহসানি দেয়"। আলতু মতি চেয়ারম্যানের তৈরী মসজিদে নামায পড়তে যায় না কেন এটা নিয়ে সবার একটা আক্ষেপ আছে। ঈদের সময়ও সে অন্য গ্রামে গিয়ে নামায পড়ে আসে। অবশ্য তার দাদীরে সদর হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা গেল। কোন ঔষধ ছাড়া। জানাযার নামায পড়ার জন্য মসজিদে নেয়নি। গ্রামের ছমির হুযুর জানাযা পড়ায়ে তাদের পাড়ার কবরস্থানে দাফন করে দেয়। এই ছমির হুযুর আগে এখানকার মসজিদের ইমাম ছিল। চেয়ারম্যান সাহেব নতুন মাদ্রাসা করার পর তার চাকরি নট্ হয়ে যায়। এখন এই গ্রাম-ওই গ্রামে দো'আর মাহফিল হলে যান। কারণ, এখনকার ইমাম সাহবে আবার দো'আর মাহফিল বলে কিছু মানেন না। তিনি বলেন, এগুলো বেদ'াতী কাজ।

আলতু খাল পাড়ে এসে পেঁৗছে। নীরবে নীচে নেমে খালের পানিতে অজু করে। মাইকে ঘোষণা শুনা যাচ্ছে, "সাঈদী সাহেবের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম"। কোন কারণেই আলতু আজ মন বসাতে পারছে না। পকেট থেকে চিঠিটা হাতে নিয়ে বসে থাকে। নিসপৃহ চোখে কিছু ভাবতে পারে না। একধরণের অন্যমনস্কতায় ভুগতে থাকে। জানে একটু পরেই সন্ধ্যা হওয়ার আগ মুহুতের্্ব ইদ্রীস এসে দাঁড়াবে তার পেছনে। বলবে, "কাকা, মসজিদে যাই"। দোকানের ঝাঁপি নামিয়ে সে নামায পড়তে যাবে মসজিদে। ইমাম সাহেবের এক সারি ঠিক পেছনে মাগরিবের নামায পড়ে। এই ইদ্রীস হচ্ছে আরেকটা ঝামেলা। কতোবার তাকে সে বলেছে তার এখান থেকে চলে যেতে, তারপরেও আঠার মতো সে লেগে আছে আলতুর সাথে। এই ইদ্রীসের ইহ দুনিয়াতে কেউ নেই। বছর পাঁচেক আগে তার দাদী মারা যাওয়ার পর সে এখন আলতুদের কাচারী ঘরেই থাকে। তার মা নিরুদ্দেশে গেছে। ছোট ইদ্রীস তখন 2 মাসের। নানান মানুষের কানাঘুষা চলতে থাকে। এই বুড়ী দাদী তাকে পেলেপুলে বড়ো করেছে। আর জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই সে আলতুর সাথে ছায়ার মতো থাকে। এখানকার চেয়ারম্যান অনেকবার টাকা পয়সা আর চোট-দাপট দেখিয়েছে এই ইদ্রীসের উপর। চলে যেতে বলেছে তাকে গ্রাম ছেড়ে। কিন্তু সে নিজেও হয়তো জেনেও জানে না তার অপরাধটা কি? কিন্তু মসজিদে সে যখন যায়, তার চেহারা-হাত পায়ের গঠন দেখে সবাই ইশারা করে, চেয়ারম্যান সাহেবের অবিকল একটা আদল। কানাঘুসা হয়, মুখ ফুটে কেউ কিছু বলার সাহস রাখে না। সমস্যাটা হলো এই বেকুব ইদ্রীস মতি চেয়ারম্যানের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে মাগরিবের নামায পড়বে। তার পেছনে দাঁড়াতে না পারলে যেন তার নামায হবে না। আর এই ইদ্রীসের ছায়াও দেখতে পারে না মতি চেয়ারম্যান। খালি রাগে গজ গজ করে এই হার্মাদ ইদ্রীস তার ঠিক পেছনে কেন দাঁড়িয়ে নামায পড়ে? কিন্তু তাই বলে মুখ ফুটে তিনিও কিছু বলতে পারেন না।

সূর্যটা অনেকটুকু নীচে নেমে এসেছে। এই নাযানি গ্রামে সবই আছে। শুধু সুখ নেই একমাএ আলতুর মনে। খাল পাড়ে আসলেই তার মনটা হু হু করে কেঁদে উঠে। বাইশ বছর আগে এখানেই এক পড়ন্ত সন্ধ্যায় তার বাবা শরাফত মাস্টারের শরীরের অর্ধেকটা পাওয়া গিয়েছিল। খুব নৃশংসভাবে তাকে মারা হয়েছিল। বারো বছরের আলতু শুধু রক্তে ভেজা আধা শরীর কাফন দিয়ে পেঁচানো দেখেছিল। তার বাবা মারা গেলেন মাতবর মতির হাতে। জমি-জিরাতের ঝামেলায়। থানায় কেইস গেল। মাতবর মতি হয়ে গেল ফেরারী। তার পর দুই চেয়ারম্যানের মারামারি আর ধরাধরিতে মামলা আর আগায়নি। সাক্ষী পাওয়া যায় না। যাদেরকে পাওয়া গিয়েছিল, পরে তারাও বলে, নাহ্, মতির সাথে শরাফতকে খাল পাড়ে যেতে তারা দেখেনি। বিনিময়ে তাদের বাড়ীতে বিল্ডিং হয়েছে। মতি মাতবর বছর দশেক আগে সৌদী থেকে এসে আবার জমি-জিরাত কিনে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাঁচ বছর আগে নিজেই চেয়ারম্যান হয়েছে। নাযানি গ্রামে কোন গরীর মানুষ নেই। সবাই এখানে ভাল আছে। খালি বাইদানী পাড়ার মধ্যে এখনও কিছু গরীব মানুষ আছে। আর গরীব হচ্ছে এই আলতু। তার দোকান চলে জোড়া-তালি দিয়ে। এই সুখী নাযানি গ্রামে সবার মুখে চেয়ারম্যানের বড়ো প্রশংসা। আজকের ওয়াজ মাহফিলেও তিনি সভাপতি হিসেবে কথা বলবেন। ইসলামের ঝান্ডা আগায়ে নিতে বলবেন। বড়ো নামী-দামী মানুষ। দেশের দশের জন্য তার মন বড়ই কাঁদে। ইসলামের বড়ো পা'বন্দ খেদমতগার। বছর দশেক আগে এস আই আকবর আলতুরে বলছিল, "ভাইরে থানায় যার নামে একটা কেস ফাইল নাই, কোন ভলিউমে তার নামও নাই। তার নামে মামলা খারিজ হয়ে গেছে যেহেতু কোন সাক্ষী নাই। কোন প্রমাণ নাই, তার বিরুদ্ধে আপনি খামাখা বাজে কথা কইয়া সময় নস্ট করেন কেন?" দূরে ঈদগাহ মাঠে শামিয়ানার উপর চাঁদ-তারা খচিত পতাকা পতপত করে উড়ছে। সাঈদী সাহেব চলে এসেছেন প্যান্ডেলে। সন্ধ্যার পর পরই ওয়াজ শুরু হবে। হাতের তহশীলদারের চিঠিটা আস্তে আস্তে ছেঁড়া শুরু করল আলতু। তার দোকানের দেয়ালে কাপড়ের জীর্ণ ব্যানারটার কথা মনে পড়ছে। "শরাফত মাস্টারের হত্যার বিচার চাই, মতি মিয়ার ফাঁসী চাই"। আর ক'দিন পর এই জীর্ণ ব্যানারের কোন অস্তিত্ব থাকবে না। তহশীলদারের চিঠিতে বলা আছে, "মাদ্রাসা বোর্ড এই জায়গায় নতুন বহুতলবিশিস্ট বিপনীবিতান খুলবে। সমস্তু স্থাপনা এই দাগ নাম্বার থেকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সরিয়ে ফেলতে হবে"। চিঠিটা ছিঁড়ে ছুঁেড় ফেলে আলতু। তার চিঠিটা বাতাসে খালের পাড়ে আর পানিতে ছড়িয়ে গেল।

মনে হলো সে একটি চিঠির শেষকৃত্য দিল কোন আগুন আর মাটি ছাড়া। না, আর কোন নিশানা থাকবে না। কারণ, কোন সাক্ষী নেই। কোন প্রমাণ নেই। আলতুর দোকানের উপর উঠবে নতুন বহুতল ভবন। তার নীচে চাপা পড়ে থাকবে একটি বিচারের দাবী, একটি ব্যানার- "মতি মিয়ার ফাঁসী চাই"। সূর্যটা আরও দূরে গিয়ে নীচে নেমে গেছে। খুব রক্তিম। সারা পৃথিবীর সমস্ত রক্তরং ধারণ করে আকাশটাকেও রক্তিম করে দিয়েছে। আলতুর মা এরকম আকাশ দেখলে বলতো, "বাবারে দেখ, আকাশ কেমুন কান্দে, আরও অনেক রক্ত ঝড়ব"। এরকম পড়ন্ত সূর্যের প্রতিবিম্ব খালের শান্ত পানির মধ্যে পড়েছে। দূর থেকে সবুজ মাঠের মধ্যে খালের উপর সূর্যের রক্তিম প্রতিবিম্ব মনে হয় তৈরী করেছে বাংলাদেশের পতাকা। সেই পতাকার জমিনের উপর দাঁড়িয়ে মতি চেয়ারম্যানের অপবিএ শরীর নোংরা করে দিচ্ছে পতাকার শরীরটাকে। একমাএ সাক্ষী ইদ্রীস হয়তো তার সামনেই এখন বসে আছে বাইশ বছরের একটি অবিকল ছবি নিয়ে যাকে মুছা যাবে না...কারণ, বাকী সব মিথ্যা।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে এপ্রিল, ২০০৬ রাত ১১:০৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সীমিত মগজ, লিলিপুটিয়ান, ডোডো পাখি (সৌজন্যে - চাঁদগাজী)...

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সকাল ১১:২৯



১. যেনা করব আমরা, ৫০১-এ যাব আমরা, পার্কে যাব আমরা। তুমি তো আলেম। তুমি কেন যাবে? তুমি তো ইসলামের সবক দাও সবাইকে। তুমি মাহফিলে কোরআন, হাদীস বয়ান কর। তুমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহাজন জিন্দা হ্যায়!!!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৭



মনে পড়ে, ঠিক এক বছর আগে গত বছর এই সময়ের দিকে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে যাচ্ছিল 'মহাজন স্যারকে আরও ৫ বছর বাংলাদেশের সরকার প্রধান হিসেবে দেখতে চাই' টাইপের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্ম অটুট, মৌলভিরা নন: সমালোচনা মানেই অশ্রদ্ধা নয়

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৬



নবী ইউসুফ (আ.)-এর সময় মিসরীয়রা 'আমুন' দেবতার পূজা করত। মিসরের শাসক আপোফিসকে তার পিতা তৎকালীন পুরোহিতদের কুচক্রী স্বভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। এই পুরোহিতরা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজ্যসভা থেকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৈশব- কৈশোর বেলার গল্প

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৭



আমাদের শৈশব ছিলো অতিশয় প্রাণপ্রাচুর্যময় যদিও শৃঙ্খলাপূর্ণ।
একালের মতো বিলম্বিত শয্যা ত্যাগ রীতিমতো গর্হিত অপরাধ! শয্যা ত্যাগ করেই বিশেষত অবকাশের দিন গুলোতে নিয়মিত গন্তব্য ছিলো কারো কারো খেলার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ পাখির জগত

লিখেছেন ইসিয়াক, ০৯ ই মে, ২০২৬ সকাল ৭:০০



টোনাপাখি লেজ নাচিয়ে গাইছে মধুর গান।
গান শুনে টুনিপাখি আহ্লাদে আটখান।

টোনা যখন উড়ে ঘুরে অন্য ডালে বসে।
টুনি এসে ঠিক তখনই বসে তারই পাশে।

বুলবুলিদের পাড়ায় আজ দারুণ শোরগোল।
নানা শব্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×