somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

১৯৭১ : বীরের কথা-০১

২৭ শে জুলাই, ২০১২ রাত ১০:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯৭১ সালে এদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের মরণপণ লড়াইয়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেন। দেবেশচন্দ্র সান্যাল স্বাধীনতাযুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। কিশোর বয়সে তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেন।

তার বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলার হাবিবুলস্নাহ নগর ইউনিয়নাধীন রতনকান্দি গ্রামে। তিনি রতনকান্দি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীতে অধ্যয়নরত অবস্থায় মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে তিনি ছিলেন অকুতোভয়। তাঁর দুঃসাহসিক গেরিলা আক্রমণে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরা তটস্থ থাকতো। তাঁর সাহসিকতার জন্য এলাকাবাসী তাঁর গ্রুপের নাম রেখেছিল 'বিচ্ছুবাহিনী'। তাঁর কাছ থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন:

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর হতে ১৭ জানুয়ারি '৭১ পর্যন্ত অবাধ সাধারণ নির্বাচনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছিল। তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বিজয়ী দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ষড়যন্ত্র করলো। ২৫ মার্চ '৭১ রাতে নির্বিচারে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে হত্যাকাণ্ড চালালো রাজারবাগ পুলিশ লাইন, জগন্নাথ হলসহ বিভিন্ন স্থানে। পাকিস্তানী হানাদারদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড দেখে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং যার কাছে যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার আহ্বান জানান। ঢাকাতে আমাদের গ্রামের যারা চাকরি করতেন তারা সবাই ২৭ ও ২৮ মার্চ গ্রামে ফিরে এলেন। শাহজাদপুর সদরসহ অন্যান্য শহরের সবাই চাকরি রেখে গ্রামে এলেন। তাদের কাছ থেকে পাকিস্তানী হানাদারদের হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসলীলার কথা জানতে পেরে এবং জাতির জনকের আহবানের কথা জানতে পেরে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। প্রশিক্ষণহীনভাবে পাক-হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়, তাই ভারতে গেলাম। ভারতের কামারপাড়া, মালঞ্চ, পতিরাম, শিলিগুড়ির পানিঘাটা নামকস্থানে প্রশিক্ষণ নিয়ে ৭ নম্বর সেক্টরের হেড কোয়ার্টার তরঙ্গপুর থেকে অস্ত্র নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে এসেছিলাম। দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সম্মুখ ও গেরিলাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। রণাঙ্গনে যুদ্ধকালীন সময়ে আমার সহযোদ্ধা শহীদ জয়গুরা বিশ্বাস পাকিস্তানী হানাদারদের গুলিতে 'জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু' বলতে বলতে আমার হাতের উপর প্রাণহীন হয়ে পড়েছিল।

আমাদের শেষ যুদ্ধটি ছিল শাহজাদপুর উপজেলার ধীতপুর নামক স্থানে। এটা ছিল ২৫ নভেম্বর '৭১। টাঙ্গাইলের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ৩০/৩৫ জন পাকিস্তানী হানাদার যমুনা পার হয়ে সিরাজগঞ্জ ওয়াপদা বাঁধ দিয়ে মালিপাড়া ও কৈজুরী হয়ে বেড়ানদী পার হয়ে পালানোর চেষ্টা করছিল। আমরা তাদের পিছু ধাওয়া করলাম। ধীতপুর নামক স্থানে গিয়ে ওরা পজিশন নিয়ে গুলি চালালো। আমরাও পজিশন নিলাম ওয়াপদা বাঁধের পশ্চিম পাশ্বর্ে। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী থেকে থেকে গুলি চালাতে থাকলো। আমরাও গুলি চালাতে থাকলাম। সূর্য অস্তমিত হলো। অন্ধকারে গুলি চালালে পাকিস্তানী হানাদারদের গায়ে না লেগে সাধারণ গ্রামবাসীর গায়ে লাগতে পারে ভেবে আমরা মাঝে মাঝে দু' একটা আকাশমুখী গুলি ছুঁড়তে থাকলাম। পাকিস্তানী হানাদারদের পক্ষ থেকেও মাঝে মাঝে ২/১ টা গুলি আসছিল। এভাবে সারা রাত পজিশন অবস্থায় থাকলাম। ভোর হলে ক্রোলিং করে দুঃসাহসিকভাবে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সেন্টারের কাছে গেলাম। আমার হাতে এল.এম.জি। আমি সামনে আর আমার পেছনে আমার ভাই সমরেন্দ্রনাথ সান্যালসহ ১৭ জন সহযোদ্ধা পাকিস্তানী হানাদার সেন্টারে গিয়ে দেখি দু'জন রাজাকার গুলি চালাচ্ছে। তাদেরকে স্যারেন্ডার করতে কমান্ড করলাম। তারা কোন উপায় না দেখে স্যারেন্ডার করলো। এই রাজাকার দু'জনের নাম ছিল লতিফ আর কালাম। ওদের কাছ থেকে জানতে পারলাম ওদেরকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়ে পাকিস্তানী হানাদাররা ভেড়াকোলা খেয়াঘাট পার হয়ে বেড়ানগর বাড়ি হয়ে পালিয়ে গেছে। এই যুদ্ধে আমাদের সহযোদ্ধা বৃশালিখা গ্রামের মোঃ আব্দুল খালেক শহীদ হলেন। দু'জন সাধারণ মানুষও শহীদ হলেন।

একান্তরের এসব স্মৃতি নিয়ে আজো বেঁচে আছি। যুদ্ধের সময় আমার কৈশোর পেরোয়নি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস-এদেশের মানুষ আমাদের যুদ্ধজয়ের কাহিনী চিরকাল স্মরণ করবেন।



(কৃতজ্ঞতাঃ বন্দনা সান্যাল)
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×