somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পারিবারিক নির্যাতন : একটি বিশ্বসমস্যা

১৮ ই অক্টোবর, ২০১৫ বিকাল ৩:১৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পারিবারিক নির্যাতন : একটি বিশ্বসমস্যা

নারীর মর্যাদা রক্ষায় আগ্রহী আমার এক ভাতিজি যে আমেরিকায় পিএইচডি করার পর অধ্যাপনা করছে, আমাকে এক চিঠিতে লেখে- আপনি কি জানেন যে বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরের ইমামেরা কি যৌতুক, স্ত্রীকে প্রহার, এসিড নিক্ষেপের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখার জন্য ট্রেনিং পেয়েছেন বা তাদের উদ্বুদ্ধ করা হয়? এসবের ফলে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত নারীরা কষ্ট পাচ্ছেন। আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি, বাংলাদেশের ওয়াজ-মাহফিল ও খুতবায় সাধারণত নারীদের স্বামীদের মানতে, খেদমত করতে এবং সম্মান করতে বলা হয়। কিন্তু পুরুষদের তাদের স্ত্রীদের সম্মান করতে কদাচিৎ বলা হয়। কোনো কোনো সময় আমি নিজে শুনেছি, এ ওয়াজকারীগণ পুরুষদের স্ত্রীর প্রতি ভালো ব্যবহার করতে বলেন। নিশ্চয়ই এটা ভালো কথা। কিন্তু ভালো ব্যবহার করা, দয়ালু হওয়া ‘সম্মান করা’ থেকে আলাদা। আমার কাছে মনে হয়, যতক্ষণ না স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক সম্মানবোধ হবে, তত দিন স্বামীর রাগের মাথায় স্ত্রীদের আঘাত করার প্রবণতা থেকে যাবে। কেননা, স্বামী সাধারণত শারীরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে থাকে এবং কোনো কোনোভাবে নিজেকে উৎকৃষ্ট মনে করে। সুতরাং পুরুষেরা বাড়ির কর্তা হিসেবে যেমন ছেলেমেয়েদের শারীরিকভাবে শাস্তি দিতে পারে, তেমনি স্ত্রীকেও শারীরিকভাবে শাসন করতে পারে বলে মনে করে।
যদিও বেশির ভাগ, বিশেষ করে মুসলিম সমাজে নারী ও শিশুদের তাদের শারীরিক দুর্বলতার কারণে এক করে দেখার প্রবণতা রয়েছে, তথাপি আমি মনে করি, নারীকে শিশুর সাথে এক করে দেখা সঙ্গত নয়। তাকে পূর্ণবয়স্ক পুরুষের মতোই মনে করতে হবে যে তারও পূর্ণগঠিত মগজ ও অনুভূতি রয়েছে। তারও একই ধরনের সম্মান পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আমি এসব উল্লেখ করছি, কেননা ঐসব এখানে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে আলোচনায় এসেছে।”
আমি এর উত্তরে অত্যন্ত সংক্ষেপে লিখি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মসজিদ মিশন- এসব সংগঠন ইমামদের ট্রেনিং দিয়ে থাকে। কিন্তু তাদের ট্রেনিং প্রোগ্রামে এমন কিছু আছে বলে জানি না যে স্ত্রীকে মারা একটি নিন্দনীয় কাজ এবং একটি অপরাধ। তবে ইমামেরা এসিড নিক্ষেপ ও যৌতুকের বিরুদ্ধে কখনো কখনো কথা বলে থাকেন। তোমার এ কথা সঠিক যে, এরা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মান অথবা নারীর প্রতি সম্মান করার কথা কদাচিৎ বলে থাকেন। এরা প্রকৃতপক্ষে এসব শব্দের পার্থক্যের তাৎপর্য বুঝে বলেন বলে আমার মনে হয় না। যারা নিয়মিত আলোচনা করেন, তাদের কেউ কেউ নারীর প্রতি অত্যন্ত সম্মানসূচক আলোচনা করে থাকেন। আমার কোনো সন্দেহ নেই, অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। সামনে মুসলিম নারীর অবস্থা আরো দ্রুত পরিবর্তন হবে।
এর উত্তরে আমার ভাতিজি একটি লম্বা পত্র দেয়। এর সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ : আমার মনে পড়ে অল্প বয়সে আমি পত্রিকা পড়ার সময় দেখতাম প্রত্যেক দিন স্ত্রীকে প্রহার করার ঘটনা। আমাদের প্রতিবেশী এবং আত্মীয়দের মধ্যেও আমি এসব গৃহবিবাদের কথা শুনতাম। পাশ্চাত্যে এর মূল কারণ মদ এবং মাদকজাতীয় দ্রব্য। কিন্তু ইসলামে এসব হারাম। সুতরাং মুসলমানদের মধ্যে এগুলো হবে কেন? আমার মনে হয়, ইমামদের খুব ভালো করে শিক্ষা দিতে হবে। তাহলে হয়তো ফল হতে পারে।
আমি কোনো মাওলানাকে বলতে শুনি না যে, যেসব নারীর শিক্ষার জন্য তাদের পিতা-মাতা অনেক অর্থ ব্যয় করেছেন, ওইসব নারীও যুগের প্রেক্ষাপটে বেশি সময় ধরে অনেক বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং এখন যদি তাদের শিক্ষা অনুযায়ী কাজ করতে চান তাহলে তাদের স্বামীদের উচিত ঘরের কাজে সাহায্য করা এবং স্ত্রীদের তাদের শিক্ষা অনুযায়ী কাজ করতে সুযোগ করে দেয়া। আমার মনে হয়, মাওলানাদের যদি সুযোগ থাকত তাহলে বেশির ভাগ বিষয়ে নারীরা হয়তো পড়াশোনারই সুযোগ পেত না। কেননা, মাওলানাদের বেশির ভাগই মনে করেন, মেয়েদের কাজ হচ্ছে ঘরসংসার করা। যদি একজন মহিলা পদার্থবিদ্যা পড়ে পদার্থবিদ হন যে কাজে হয়তো তাকে ল্যাবরেটরিতে অনেক সময় দিতে হয়, তাহলে তার স্বামীর চা কে বানাবে?
চাচা, আমি আপনাদের কাছে স্বীকার করছি, যদিও অন্য কোথাও বলব না যে নারী হিসেবে আমি আমেরিকায় আমার নিজের দেশ থেকে অনেক বেশি সম্মান পাই। চাচা, আমি আপনার কাছে আমার কিছু দুঃখ প্রকাশ করছি।
এর উত্তরে আমি বিস্তারিত লিখেছি। তাতে নারী সমস্যার অনেক দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমি লিখেছি- ‘স্নেহের ভাতিজি, আমি তোমার সঙ্গে একমত যে, পাশ্চাত্যের তুলনায় মুসলিম বিশ্বে মদ ও মাদকদ্রব্যের সমস্যা কম হওয়ার কারণে এখানে স্ত্রীর ওপর শারীরিক নির্যাতন হওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই, কুরআনেও এর কোনো সত্যিকার ভিত্তি নেই। কিছু লোক অবশ্য তাদের আচরণকে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ করার জন্য কোনো কোনো আয়াতের অপব্যাখ্যা করে। এটি অবশ্য একটি ভিন্ন বিষয়, যার ওপর তুমি ড. আব্দুল হামিদ আবু সুলেমানের বই 'Marital Discord' পড়ে দেখতে পারো।
আগেও আমি বলেছি, মনে হয় নারীদের অন্তত প্রকাশ্যে পাশ্চাত্যে অধিক সম্মান করা হয়। কিন্তু আম্মু! নিশ্চিত নই, এ সম্মানদানে এরা কতটুকু আন্তরিক। আমি পড়ে থাকি এবং শুনে থাকি, সেসব দেশের নারীরা ধর্ষণের ভয়ে সব সময় আতঙ্কিত থাকে। এ ব্যাপারে আমি তোমার কাছে সত্য জানতে চাই।
মনে হয়, মুসলিম বিশ্বে মানবাধিকার ও সহনশীলতার ব্যাপারে গভীর সমস্যা আছে। কেননা, এখানে নানা কারণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শিকড় গাড়তে পারেনি। এমনকি পাশ্চাত্যেও, কিছু ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের ওপর একনায়কত্বকে পছন্দ করেছে। আমি বিশ্বাস করি, মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের অগ্রগতি হবে। তাহলে সব সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিতরা সুবিধা পাবে।
আম্মু! আমি মনে করি, পুরুষরা আরো বহু দিন এ রকমই থাকবে। এরা এদের স্ত্রীদের কাছে চা ও খাবার চাইবে। জানি না, কিভাবে এর পরিবর্তন হবে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, এটা চিরদিন চলতে পারে না। আমি বুঝি না, যেখানে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব রাষ্ট্রীয় এবং নবীজীবনের দায়িত্বের ব্যস্ততা সত্ত্বেও ঘরের কাজ করতেন, সেখানে আমরা পুরুরুষেরা কেন ঘরের কাজে সহায়তা করব না।
পারিবারিক নির্যাতন বা স্ত্রী নির্যাতনের সমস্যাটি একটি বিশ্বজনীন সমস্যা। আমাদের এ বিষয়ে গভীর নজর দিতে হবে এবং এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।
আমাদের বুঝতে হবে, আল্লাহ পাক সবাইকে সম্মানিত করেছেন এবং বলেছেন, ওয়া লাকাদ কাররামনা বানি আদাম। অর্থাৎ আমি আদমের সন্তানদের সম্মানিত করেছি (বনি ইসরাইল : ৭০)।
আল্লাহ আরো বলেছেন, সব মানুষকে আমি সর্বোত্তম মডেলে সৃষ্টি করেছি। (লাকাদ খালাকনান ইনসানা ফি আহসানি তাকবীম- সূরা তীন)। এসব বিশ্বব্যাপী আমাদের ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। কুরআনের ৯৯ শতাংশ আয়াতে নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য করা হয়নি। কেবল কয়েকটি আয়াতে পার্থক্য করা হয়েছে, যার মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীকে সুবিধা দেয়া হয়েছে এবং দু-একটি ক্ষেত্রে পুরুষকে সুবিধা দেয়া হয়েছে। সার্বিক বিচারে এতে সমতাই বুঝায়।
নারীর অধিকার নিয়ে সবাইকে কাজ করতে বলি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট (বিআইআইটি) প্রকাশিত আব্দুল হামিদ আবু শুক্কাহ লিখিত ‘বহু যুগে নারী স্বাধীনতা পড়তে অনুরোধ করছি (চার খণ্ড)।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই অক্টোবর, ২০১৫ বিকাল ৩:১৫
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এগারটি বছর পার হয়ে গেল…. কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে একাদশতম বর্ষপূর্তি পোস্ট

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪১



পূর্বের বর্ষপূর্তি পোস্টের লিঙ্কঃ দশম বর্ষপূর্তি পোস্ট

সামহোয়্যরইনব্লগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখ রাত ১১টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কবিতা, বক্ষমাঝে থাকবে তুমি। বলা যায় খুব দ্রুতই, মাত্র তৃতীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্যায়া হুয়া ? হুক্কা হুয়া; হুক্কা হুক্কা হুক্কা হুয়া

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২৫


২৪ বছর ধরে ঢাবিতে অনার্স পড়ছে; তা-ও নাকি ভাষা শিক্ষা বিভাগে উর্দূ নিয়ে !!! আজতক তার পড়া শেষ হয় নাই !!! এ ভার্সিটিতে নাম লিখালে পন্ডিত মশাই'রা কি কোনও... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃখ খচিত পতাকা আমার

লিখেছেন এম ডি মুসা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে
আজ হঠাৎ কার ছায়া নামে?
কার দুঃসাহসী কালো হাত
ইতিহাসের বুকের ওপর আঁকে পরাধীনতার নাম?

যে নাম একদিন ভাষার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল,
যে শাসন একাত্তরে ছড়িয়েছিল মৃত্যুর অন্ধকার
আজ কেন তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ হতো হায়দ্রাবাদ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫

।।হায়দারাবাদের নিজাম।।


১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার অনেকগুলো গণহত্যা হয়েছিল দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে বা তারও আগে এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তিনি কংগ্রেসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মারা গেলো

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩



বাংলাদেশে ডাক্তারদের অবহেলায় কি পরিমাণ প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে তা কল্পনাতীত। এবং আমাদের দেশের ডাক্তার এই অপরাধে নূন্যতম অনুশোচনা বোধ করে না।

ডাক্তারদের অবহেলার কারণে দেশের পাঠ্য বই ইংরেজি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×