somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

আলী নওয়াজ খান
আমি ভবঘুরে মানুষ । ভবের ঘরে প্রবেশের নেশায় ঘুরে ফিরি দিবানিশি।

ইসলামী দর্শনের সাথে পাশ্চাত্য দর্শনের পদ্ধতিগত তুলনামূলক আলোচনা [দ্বিতীয় পর্ব]

১৩ ই মার্চ, ২০১৮ বিকাল ৪:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



অবশেষে দর্শনের বিষয়বস্তু খোদাকেন্দ্রিকতা থেকে মানবকেন্দ্রিকতায় (anthropo centrism) পরিবর্তিত হয়ে পাশ্চাত্যে দর্শনের আধুনিক যুগের (১৫০০ সাল থেকে শুরু) সূচনা হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানে দর্শনকে মানুষের পার্থিব কল্যাণে লাগানো হয়েছে।
পক্ষান্তরে ইসলামী দর্শনে সর্বমোট তিনটি ধারা আমরা দেখতে পাই। অর্থাৎ মুসলিম দার্শনিকগণ সত্য বা বাস্তবকে আবিষ্কারের লক্ষ্যে এ পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁরা বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করলেও ইসলামী দর্শনের স্বকীয় সত্তা সম্পূর্ণভাবে বজায় রয়েছে।
আমরা আগেই ইসলামী দর্শনকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছিলাম। যথাক্রমে :
১। মাশশাই দর্শন ( حکمت مشاء ) : এ দর্শনের প্রথম গুরু হিসাবে অ্যারিস্টটলকে ধরা হয়ে থাকে । আর তাঁরই দর্শন চর্চার পদ্ধতি হলো Aristotlelic method । যেহেতু অ্যারিস্টটল পথ চলতে চলতে কথোপকথোনের মাধ্যমে দর্শন আলোচনা করতেন তাই আরবী ভাষায় একে ‘মাশশাই দর্শন’ (মাশশাই অর্থ পায়ে হেঁটে পথ চলা) নামকরণ করা হয়েছে। এ দর্শনের পদ্ধতি হলো intellectualism অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তি সবকিছু উপলব্ধি করতে সক্ষম বা সত্য যাচাইয়ের মানদন্ড হলো বুদ্ধিবৃত্তি।
ইসলামী বিশ্বে মাশশাই দর্শনের প্রথম ব্যক্তি হলেন আল কিন্দি (৭৬৯-৮৭৩ খ্রি./১৮৫-২৬০হি.) এবং এ ধারার প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের অন্যতম হলেন আবু নাসের আল ফারাবী (৮৭২-৯৫০ খ্রি./২৫৯-৩৩৯ হি.)। অতঃপর মাশশাই দর্শনের শিরোমণি ও চূড়ান্ত রূপদানকারী হলেন আবু আলী সীনা (৯৮০-১০৩৭ খ্রি./৩৭০-৪২৮ হি.)। তিনি ‘শেখ’ এবং ‘রাইস’ উপাধিতে ভূষিত হন।
তবে এই বুদ্ধিবৃত্তিকে আবার দু’ভাগে ভাগ করা যায়। যথা :
১। চরম বুদ্ধিবৃত্তিক পন্থা (strong rationalism);
২। নিয়ন্ত্রিত বুদ্ধিবৃত্তিক পন্থা (equilibrium rationalism)।
ইবনে সীনা নিয়ন্ত্রিত বুদ্ধিবৃত্তিক পন্থা অবলম্বন করেছেন। আমাদের স্মরণে রাখা উচিত যে, বর্তমান পাশ্চাত্যজগতে ডেকার্ট- এর পর থেকে বুদ্ধিবৃত্তিকে ‍'Ration’ শব্দ দ্বারা বোঝানো হয়ে থাকে অথচ প্রাচীন দর্শনে Intellect শব্দ ব্যবহার করা হতো। এ শব্দদ্বয়ের মধ্যে অর্থগত বিশাল ব্যবধান রয়েছে। কেননা এক সময় চিন্তার জগতে মানব ছিল ‘ভূ-পৃষ্ঠে প্রভুর সন্তান’ এবং সেই মানুষের পরিচিতি ছিল ‘ঐশী পরিচিতি’। সেই ঐশী পরিচিতিকে মুছে দিয়ে তাকে কেবল একটি জাগতিক প্রাণী হিসাবে পরিচিতি প্রদান করে তার অবস্থান থেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে অঙ্কিত মানুষের সেবায় নিয়োজিত করা হলো দর্শনকে। তাই দর্শন (তাদের দৃষ্টিতে অনর্থক পরিদৃষ্ট হচ্ছে) সেখানে সম্পূর্ণ জাগতিক রূপ লাভ করেছে। ফলে বস্তুজগতের বাইরের কোন কিছু অনুসন্ধান করা যুক্তি বা Intellect -এর দ্বারা সম্ভব নয়। আর এজন্যই 'Intellect' শব্দটির মাত্রা কমিয়ে 'Ration’’ শব্দ দ্বারা বুদ্ধিবৃত্তিকে বস্তুর সীমায় সীমিত করা হয়েছে। অথচ ইসলাম ধর্মে মানুষ হলো ভূ-পৃষ্ঠে প্রভূর প্রতিনিধি অর্থাৎ মানুষের দু’টি দিক রয়েছে, যার একটি হলো ঐশী, আরেকটি হলো পার্থিব। ফলে সে এই বস্তুজগতের মধ্য থেকে ঐশী জগতে যাত্রা করতে পারে। শুধু তাই নয়, বরং এ যাত্রার জন্য তাকে এভাবেই সৃষ্টি করা হয়েছে। আর এ পথে যাত্রার জন্য মহান আল্লাহ্ তাকে ‘আকল’ অর্থাৎ ঐশী পথনির্দেশক দান করেছেন । এই আকল যেভাবে পার্থিব জগতে আমাদেরকে পথ দেখিয়ে থাকে ঠিক তেমনীভাবে অবস্তুগত জগতেও পথনির্দেশনা দিতে সক্ষম । তাই ইসলামী দর্শনের বুদ্ধবৃত্তি বা 'আকল’ শব্দটি অর্থগত দিক থেকে প্রাচীন পাশ্চাত্য দর্শনে প্রচালিত 'Intellect' শব্দের সাথে মিল রয়েছে ।
ইশরাকী দর্শন : [ حکمت اشراق] ইশরাকী দর্শনে পূর্ব ( شرق ) এবং পাশ্চিম ( غرب ) বিশেষ অর্থ ধরা হয়েছে । পূর্ব হলো সূর্যোদয়ের স্থান আর সূর্য হলো আলোর কেন্দ্র। এই শারক্ শব্দ থেকেই ইশরাক শব্দটি গ্রহণ করা হয়েছে । তাই ইশরাকী দর্শনে ইশরাক শব্দটি দিয়ে আলোর ভূবনকে বোঝানো হয়েছে। এভূবনে অবস্থান করছে নূর আর ফেরেশতাগণ । অন্যদিকে পশ্চিম হলো সূর্যাস্তের স্থান যা আঁধারে পরিপূর্ণ । ইশরাকী দর্শনের আলোকে এই আঁধার হলো বস্তুজগত। এই চিন্তার উপর ভিত্তি করেই এ দর্শনের নামকরণ করা হয়েছে ইশরাক ।
যাহোক ইশরাকী দর্শনে সত্য বা বাস্তবতা উপলব্ধির ক্ষেত্রে কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক মাধ্যমই যথেষ্ট নয় । বরং ইশরাকী দর্শনে বাস্তবতা উদ্ঘাটনের ক্ষেত্রে বুদ্ধি এককভাবে পঙ্গু । তবে বিশুদ্ধ অতিন্দ্রিয় [ প্রত্যক্ষণের [] সহযোগিতায় তা কার্যকরী ভুমিকা পালন করতে পারে । ইশরাকী দর্শনে [] সমন্বয়ে পূর্ণরূপে সত্য বা বাস্তবতার পরিচিতি লাভ করা সম্ভব । ইশরাকী দর্শনে কখনো বুদ্ধির সাথে অতিন্দ্রিয় প্রত্যক্ষজ্ঞানের দ্বন্দ্ব দেখা দিলে তারা ইশরাকীগণ প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।
ইশরাকী হিকমতের প্রধান ব্যক্তি হলেন শাহাবুদ্দীন ইয়াহিয়া বিন হাবাশ বিন আমির সোহরাওর্য়াদী [ ১১৫৫ খৃষ্টাব্দ- ১১৯১ খৃ ] যিনি শেইখ ইশরাক নামে প্রশিদ্ধ ।
হিকমাতে মুতাআলীয়া (حکمت متالیه ) : এ দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ইব্রাহীম বিন ইয়াহিয়া কাওয়ামী শিরাজী [৯৭৯ হি:-১০৩০ হি;] হিকমাতে মুতাআলীয়াতে তিনটি মাধ্যমের সমন্নয়ে গঠিত একটি পদ্ধতিকে বাস্তবতা বা সত্য আবিষ্কারের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে । মাধ্যম তিনটি হলো :
(১) বুদ্ধিবৃত্তি [Intellect ]
(২) অতিন্দ্রিয় প্রত্যক্ষ জ্ঞান [ intuition]
(৩) ঐশী প্রত্যাদেশ বা ওহী
হিকমাতে মুতাআলীয়ার দৃষ্টিতে উল্লেখিত তিনটি মধ্যমের কোন একটি বাস্তবতা আবিষ্কারে এককভাবে যথেষ্ট নয়। ওহীর অর্থ যথার্থভাবে বুঝতে বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োজন আবার বুদ্ধিবৃত্তিকে দিকনির্দেশনা দিতে ওহীর প্রয়োজন। আবার ওহী অনুধাবনের ক্ষেত্রে এ বুদ্ধির উৎকর্ষের জন্য চরম আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন । তাই আত্মশুদ্ধি ব্যতীত ওহী ও বুদ্ধি বাস্তবতা নিরুপণের ক্ষেত্রে যর্থাথ ভুমিকা রাখতে সক্ষম নয় । আর এই আত্মশুদ্ধির একটি পর্যায় হলো কাশফ বা শুহুদ । প্রকৃতপক্ষে মোল্লা সদরা তার এ উচ্চতর দর্শনে ইসলামী ইরফান শাস্ত্র [ আধ্যাত্মিকতা বা শুহুদ ] , ইসলামী শরীয়ত [ কুরআন ও সুন্নাহ], এবং বিশুদ্ধ দর্শন [ বৃদ্ধিবৃত্তি বা যুক্তি-প্রমাণ] –এর একটি অভুতপূর্ব সমন্নয় সৃষ্টি করেছেন।
অতএব ইসলামী দর্শন হলো হিকমাত । আর হাকিম বিশেষণ হলো মহান আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম । তাই হিকমাতের উৎস হলেন মহান প্রতিপালক আর তিনিই সর্বপ্রথম তাঁর প্রিয় বান্দাগণ নবী-রাসুলদের হিকমাত শিক্ষা দান করেছেন। আর ঐশীদূত বা নবী-রাসুলগণ মানবজাতিকে হিকমাত শিক্ষা দেয়ার জন্য পৃথিবীতে আগমন করেছেন। আর এজন্যই পবিত্র কুরআন ঐশী হিকমাত শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম । যে মাধ্যম থেকে মুসলিম দার্শনিকগণ হিকমাত শিক্ষা লাভ করেছেন। তাই মুসলিম দার্শনিকগণের হিকমাত শিক্ষার প্রধান শিক্ষক হলেন রাসুলুল্লাহ্ (স) । আর দ্বিতীয় শিক্ষক হলেন তাঁরই সুযোগ্য প্রতিনিধি ইমাম আলী (আ.) । কেননা প্রশিদ্ধ সহি হাদিসে বলা বলা হয়েছে : ‘ আমি জ্ঞানের শহর আর আলী তার দরজা’ এছাড়াও ‘নাহজুল বালাগা গ্রন্থ’ বুদ্ধিবৃত্তিক ও হিকমাতমুলক জ্ঞানের এক অনন্ত ভান্ডার যা আজও আমাদের মাঝে বিদ্যমান আছে।
প্রথম পর্ব
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই মে, ২০২০ দুপুর ১:১৭
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দক্ষিণ কোরিয়ার 'নতুন গ্রাম আন্দোলন'

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:২৭



বাংলাদেশের উন্নতি হতে হলে, গ্রামগুলোর উন্নয়ন ছাড়া উপায় নাই। গত ৫৬ বছরে আমাদের দেশের গ্রামবাসীদের উন্নয়ন খুবই কম হয়েছে। সেখানকার মানুষ অবহেলার সম্মুখীন হয়ে নিম্ন সেলারির জব... ...বাকিটুকু পড়ুন

আবার সমস্যা, ব্লগ আমাকে কেন ভোগাচ্ছে?

লিখেছেন মেহবুবা, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩

আবার সমস্যা ব্লগ ঠিকমত দেখা যায় না। কিছুদিন আগে এমনটি হয়েছিল। ব্লগার সুলাইমান সহজ করে সমাধান বের করে দিয়েছিল। এবার একই সমস্যা হচ্ছে তবে সেই একই উপায়ে কাজ হচ্ছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি ইরানের নতুন শত্রু হতে চলেছে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৬


মরুভূমির গরম বাতাস আর লোহিত সাগরের নোনা জলীয় বাষ্প যেখানে এসে মেশে, বাব এল মানদেব প্রণালীর সেই জায়গাটায় রাতের অন্ধকার নামলেই একটা অদ্ভুত নীরবতা ছেয়ে যায়। কিন্তু সেই নীরবতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কল্প-গল্প : প্রমিথিউসের শেষ রাত

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:১১



“স্যার, কিছু কয়েন দেন!” মোলায়েম স্বরে বলেই হাত কচলায়।

কয়েনটি যিনি চাইলেন, তিনি একজন ভিক্ষুক। ব্যস্ত শহরের এই চৌরাস্তায় বসে নিয়মিত কয়েন আবদার করাই তার একমাত্র কাজ। মালদার পার্টি... ...বাকিটুকু পড়ুন

শামারুহ মির্জারাও সত্য মেনে নেয় যখন/ যদিও এর কোনো প্রয়োজনিয়তা আমাদের নেই॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১০:৩৮


বিএনপি ঘরানার মুখ থেকেও যখন সত্য বেরিয়ে আসে, তখন তা ইতিহাস হয়ে থাকে!

বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কন্যা ড. শামারুহ মির্জার একটি সত্য স্বীকারোক্তি......
“বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ছাড়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

×