কেউ কি কখনো বাংলায় 'মা' শব্দটি লিখে গুগল করে দেখেছেন?
যদি দেখে না থাকেন-দয়া করে দেখবেন না। খুব কষ্ট লাগবে। বাংলা ভাষার সবচেয়ে সুন্দর শব্দটি লেখা মাত্রই গুগল এমন সব কদর্য বিষয় চোখের সামনে তুলে ধরে যেগুলো দেখলে ঘেন্নায় মাথা মাটিতে মিশে যায়। দোষটা গুগলের নয়-কারণ গুগল সেইসব পাতাই প্রথমে দেখায় যেইসব মানুষ সবচেয়ে বেশি দেখে।অতএব বুঝতেই পারছেন বাঙ্গালিরা মা শব্দের উত্তর হিসেবে গুগল থেকে কি খুঁজে নেয়!
আমার কিছু ফেসবুক বন্ধু আছে যারা ক্লাস সিক্স-সেভেনে পড়ে। আমি মাঝেমাঝে ভাবি-তারা এক ট্যাবে ফেসবুক ঘাটতে ঘাটতে হঠাৎ কোন নিছক কৌতূহলে যদি অন্য ট্যাবে 'মা' শব্দটি লিখে গুগল করে তাহলে কি ভয়াবহ নোংরা জিনিসপত্র দেখতে পাবে!
তারা হয়তো এখনো পর্যন্ত এই কদর্য কথাগুলোর পেছনের সহজ স্বাভাবিক জৈবিক ব্যাপারটুকুনই জানে না। অথচ তার আগেই তার চোখে ভয়াবহভাবে বিকৃত আর কদর্য ব্যাপারগুলো পড়ছে। যদি সে নিজে চোখের সামনে আনতে নাও চায়,তার চোখের সামনে এনে দেবার মতন লোকজনের অভাব নেই। এখানে শুধু অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগকে গাল পেড়ে লাভ নেই-যখন ইন্টারনেট ছিলোনা,তখন পর্যন্ত আমাদের কিশোরদের কাছে এমন কদর্য ব্যাপারগুলো সহজলভ্য ছিলো।
একটা শিশুর সাথে প্রথমবারের মতন একটা সুস্থ স্বাভাবিক জৈবিক কর্মকান্ডের পরিচয় এমন ভয়াবহ নোংরাভাবে হচ্ছে যে এই সংক্রান্ত মারাত্মক কদর্যতা তার মনের মাঝে ঢুকে যেতে বাধ্য।
এবারে এই কদর্য গল্পগুলো পড়ে কোন ছেলে যদি তার সামনের কোন মেয়ের দিকে কদর্য ভাবে তাকায়-তাকে কতটুকুই বা দোষ দেয়া যায়?
আমরা যারা নারীর শ্লীলতাহানী করা ছেলেগুলোর মানসিকতার তুলোধুনো করে ছাড়ি-তাদের কি আরেকটু গোড়ার দিকে তাকানোর মতন বুদ্ধি নেই?
বয়ঃসন্ধিতে যে কিশোরের কাছে স্বাভাবিক জৈবিক ব্যাপারগুলোর অধ্যাপক ছিলো মস্তিষ্কবিকৃত চটিলেখকেরা-সে যে কদর্য মানসিকতার হবে এই কি স্বাভাবিক নয়? আমরা মায়ের মুখের ভাষা থেকে যেমন সহজাত উপায়ে বাংলা শিখেছি-কিশোরেরা তাদের একমাত্র জৈবিকতার শিক্ষকদের মস্তিষ্কবিকৃত চটিলেখক আর পর্নোব্যবসায়ীদের কাছে থেকে তেমনি করে সহজাত উপায়ে নোংরামি শেখে।
এ পর্যায়ে এসে প্রশ্নটা আর এমন থাকেনা যে কেন আমাদের ছেলেপুলেরা বিকৃত মানসিকতার অধিকারী হবে-বরং প্রশ্নটি দাঁড়ায়-কেনো তারা বিকৃত মানসিকতার অধিকারী হবে না?যা তারা শিখছে-তাই তো তারা করছে। চটিলেখকেরা তাদের কদর্যতা শিখিয়েছে-আর কেউ তো কদর্যতাকে কদর্যতা বলে চিনতে শেখায়নি। সবাই এটাকে লজ্জার বিষয় বলে বিব্রত হয়ে মুখ ঢেকেছে।
এই যে ছেলেটার আড়চোখে অন্যের শরীরের দিকে তাকানোর অভ্যেস শুরু হলো-এই শুরুর কোন শেষ নেই। তার চুল পেকে সাদা হয়ে যাবে-তবু এই নোংরা লেখাগুলোর থেকে শেখা নোংরা কথাগুলো তার মগজে গেঁথেই থাকবে।সুযোগ পেলেই সে এইদিকে ওইদিকে হাত বাড়ানোর ধান্দা খুজবে-এবং কোন কারণে তার কাছে বিষয়টিকে দোষ বলেও মনে হবেনা।
আমাদের সমাজের বড়রা একটা নির্দিষ্ট সময় পরে ধরেই নেয় যে ছেলেমেয়েরা এই বিষয়গুলো জেনে ফেলেছে। তাদের এই বিষয়ে সত্যিকারে সুন্দর করে সহজ করে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন অনুভব করে না। মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালে ঋতুস্রাবের ঘটনাটিতে রক্তের ছড়াছড়ির মতন ব্যাপারগুলো সেই কিশোরীর কাছে খুব ভয়ংকর বলে সেই সময়ে মায়েরা কিছু আবোল আর কিছু তাবোল মিশিয়ে মেয়েটিকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করে। ছেলেদের ক্ষেত্রে এতোটুকুর বালাইও নেই। সবাই কেন যেন ক্লাস নাইন-টেনের একটা ছেলেকে দেখেই ধরে নেয়-আরেহ! ছেলে বড় হয়ে গেছে! ও তো সব জানে।
হ্যাঁ-আসলেই সে সব জানে। তবে কোনখান থেকে কেমন করে সে কি জানে সেটা শুনলে বাবা আর মায়েরা অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন।
আমাদের সমাজে যৌনতার ব্যাপারটিকে পর্দা দিয়ে ঢাকতে ঢাকতে এমন অবস্থা করা হয়েছে যে এই বিষয়ে মানসিক অসুস্থতা আর কদর্যতার শিক্ষাটাই এখন স্বাভাবিক।তাই বাড়ন্ত কিশোরেরা আজ নোংরা লেখাঝোকা পড়ে মেয়েদের একটা ভোগ্যপণ্য হিসেবেই দেখতে শেখে আর সেইসব কল্পকাহিনীর অবাস্তব নারীরা যেমন অসম্ভব আচরণ করে-সত্যিকারের মেয়েদের স্বাভাবিক আচরণকেও সেই নিরীখে দেখার চেষ্টা করে।
তাই মেয়েদের অতি স্বাভাবিক চালচলনকে তাদের আহ্ববান বানিয়ে তুলে তাদের প্রতি হুটহাট কুইঙ্গিত করে ফেলতে তাদের বাধেনা কারণ নোংরা গল্পের লেখক ওরফে অধ্যাপকেরা তাদের এমন পদক্ষেপ নিতেই শিখিয়েছেন! রাস্তায় একটা মেয়ের আবৃত শরীরের দিকে আড়চোখে তাকাতেও তার বাধেনা-কেননা সরাসরি তাকে কেউ কখনো বলেনি কেন এটা করা ঠিক না আর যে তাকে ই ব্যপারে কিছু বলেছে সেই চটিলেখক অধ্যাপক সাহেব তাকে শিখিয়েছে-মেয়েরা তো এমনটাই চায়!
আপনি সমাজের অসুস্থতা কমাতে চান? নারীর উপর আক্রমণ থামাতে চান?উত্তরটা তামান্না সেতু আপু দিয়ে দিয়েছেন-যুদ্ধটা তো ঘরেই শুরু করতে হবে-নাকি?
আপনার আশেপাশে এমন কোন না কোন ছোট ভাইবোন আছে যারা এখন ব্যাপক শারিরীক আর মানসিক পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে-যার এখন এই ব্যাপারগুলো নিয়ে অসীম কৌতূহল আর হাজার প্রশ্ন। তার এখন আপনাকে প্রয়োজন। আপনার মতন একজন কেউ যদি ভালোবাসা আর ধৈর্য নিয়ে তাকে আস্তে আস্তে বুঝিয়ে বলেন যে এই ব্যাপারটি অস্বাভাবিক কিছু নয়-এটি অত্যন্ত প্রাকৃতিক একটা জৈবিক ব্যাপার-তাহলেই হয়তো সেই কিশোরটি একটা ভয়ানক কদর্য মানসিক বিকৃতির হাত থেকে বেঁচে যাবে।তাকে বোঝান যে মেয়েদের শরীরটিও ছেলেদের মতন স্বাভাবিক-তার দিকে হায়েনার মতন তাকিয়ে থাকার কিছু নেই আর জৈবিক এই সুখটুকু নিয়ে এতো লাফালাফি করার কিছু নেই কারণ এই দুই মুহুর্তের শারিরীক সুখের চেয়ে অনেক বড় বড় মানসিক সুখ জীবনে রয়েছে।
আমরা আমাদের সমাজে আমরা যৌনশিক্ষার ব্যাপারটি কিছু মস্তিষ্কবিকৃত অসুস্থ মানসিকতার চটিলেখকদের হাতে তুলে দিয়েছি। আমাদের নিজেদের অস্বস্তি লাগবে বলে আমরা এই ব্যাপার থেকে হাত তুলে নিয়েছি আর চোখের সামনে আমাদের কোমলমতি শিশুদের মস্তিষ্কবিকৃতির উপায় করে দিচ্ছি।
আপনি কারো বড়ভাই-বা বড়বোন?
তাহলে এটি অবশ্যই আপনার দায়িত্ব।
আমি মানছি এই বিষয়ে একটা ছোটমানুষের সাথে কথা বলা সহজ ব্যাপার নয়-কিন্তু আপনাকে কে কবে বলেছে যে বড়ভাই-বড়বোন হওয়া সহজ কাজ? যখন হয়েই গেছেন-তখন বড় ভাইবোনের দায়িত্বটি পালন করুন। সুস্থ-সহজ-স্বাভাবিক ভাষায় আপনার ছোট ভাইটিকে বা বোনটিকে জৈবিক বিষয়গুলো বুঝিয়ে বলুন-তার প্রশ্নের জবাব দিন। যাতে করে সে ব্যাপারগুলোকে স্বাভাবিকভাবে দেখতে পারে-কদর্যতাকে কদর্যতা বলে দূরে ঠেলে দিতে পারে। তার সাথে যদি কেউ কদর্যতা করবার চেষ্টা করে-সে যেন সেটি ভালোমতন বুঝে তাকে প্রতিরোধ করতে পারে। না বোঝা বা আধাবোঝার সুযোগ নিয়ে কোন কদর্যতা যেন আমার কোমলমতি ভাইবোনগুলোকে টেনে নিতে না পারে!
সবাই মিলে আমরা এই ব্যাপারগুলোতে ওদের সাথে ঠান্ডা মাথায় একটু কথা বলার চেষ্টা করি-দেখবেন,কালকের পৃথিবীটা অনেক সুন্দর হবে।
আমি যখন ক্লাস সেভেনে পড়তাম তখন আমার বড়বোন আমাকে বিষয়গুলো বুঝিয়ে বলেছিলো। সেইদিন থেকে আমার ব্যাপারগুলোকে কোনদিন অস্বাভাবিক বা কদর্য বলে মনে হয়নি-বরং স্বাভাবিক অপরাপর জৈবিক ব্যাপারগুলোর মতন করেই আমি এটি দেখেছি। আমি যে বড় হয়ে মেয়েদেরকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতে পেরেছি-তার পেছনে অন্যতম কারণ দোলাদিদির সাথে আমার সেইদিনকার দেড়ঘন্টার কথোপকথন।ওই দেড়ঘন্টার জ্ঞানটুকুন আমি কোন বদ উৎস থেকে পেলে আমার চরিত্র হয়তো অনেকটুকুই কদর্য হয়ে যাবার সুযোগ ছিলো।
এই ভেবে আমি এখন মাঝেমাঝেই আমার জুনিয়র কিশোর ভাইবোনদের সাথে এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করি-তাদের প্রশ্নের উত্তর দেই।
শুরুতে আমার অস্বস্তি লাগতো-এখন আর লাগেনা।
কারণ এই সামান্য কথা বলার অস্বস্তির চেয়ে নারী নির্যাতনের ঘটনার নিউজ রিপোর্ট পড়ার পরেরকার মারাত্মক অস্বস্তি অনেক অনেক বেশি।
সেই অস্বস্তির জন্যে হলেও আমাদের এইটুকুন অস্বস্তি মেনে নেয়া উচিত।
তারচেয়ে বড় কথা,জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটির শিক্ষার ভার যদি কিছু মস্তিষ্কবিকৃত পারভার্ট নিয়ে ফেলে-তাহলে তার চেয়ে বড় অস্বস্তির আর কিছু থাকবে না।
কাজেই যৌনশিক্ষার দায়টি আমাদের নিতে হবে এবং আজকেই নিতে হবে-কারণ কালকের সূর্য ওঠার আগেই হয়তো আপনার ছোটভাইটি গুগলে মা লিখে সার্চ দিয়ে দিতে পারে।ততক্ষণে বড্ড দেরী হয়ে যাবে।
কাজেই,এখনই সময়...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


