somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

|| যেকারণে মা দিবস আর এইডস দিবস আসলে একই ব্যাপার ||

১০ ই মে, ২০১৫ দুপুর ২:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার কাছের মানুষরা অনেকেই জানেন যে আমি হিলারী ক্লিনটনের প্রেসিডেন্সিয়াল ক্যাম্পেইনের একজন সমর্থক সদস্য। কালকে আমাকে(এবং সম্ভবত সব সমর্থককে) হিলারী ক্লিনটন মেইল পাঠিয়েছেন যে আমরা যদি চাই তাহলে তিনি আমাদের পক্ষ থেকে আমাদের মা কে ফোন করে মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাবেন।
শুধু হিলারী ক্লিনটন ক্যাম্পেইন নয়-আমেরিকার যে সমস্ত করপোরেশন,কম্পানি,ব্রান্ড নিজেদের মানবিক বলে দেখাতে চায় তারাই একটা নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপনে লাখ লাখ ডলার খরচ করে। বিজ্ঞাপনটা হলো-Call her.
তিন চার মিনিটের মর্মস্পর্শী বিজ্ঞাপন-তার শেষে লেখা উঠবে মা আমাদের জন্য হেনো-মা আমাদের জন্য তেনো। মা ছাড়া আমরা কিছুনা-কাজেই কল হার। একটা দিনের জন্য মাকে ফোন করো। সারাজীবন তো মায়ের ফোনে বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে দিয়েছো। আজ একবার নিজের থেকে তাকে ফোন করো।
আমেরিকান মা রা তাতেই আনন্দে আত্মহারা।
মাদারস ডে তাই আমেরিকান মায়েদের জন্য বিশেষ একটা দিন। তারা ফোনের পাশে ওৎ পেতে বসে থাকেন-কখন ফোন আসে,কখন ফোন আসে।
কিন্তু আমাদের কাছে? আমাদের কাছে মাদরস ডে-এর মানে কি?
অনেকের কাছে মাদারস ডে একটা শুধুই প্রহসন। বছরের একটা দিন মাকে ভালোবাসার কি আছে? মায়ের জন্য সারা বছর। মাদারস ডে শুধুই একটা গিফট কার্ড বিক্রি করার পুঁজিবাদী ফন্দি।
আমরা তো সারাদিন মায়ের সাথেই থাকি। মা আমাদের গোসল কর গোসল কর-ভাত খা ভাত খা বলে কান ঝালাপালা করেই দিচ্ছে। মাঝেমাঝে আমরাও তো মার পানির বালতিটা একটু উঁচু করে দিয়ে সাহয্য করার চেষ্টা করছি। মাকে আবার আলাদা করে ভালোবাসি বলতে হয় নাকি? আমরা যেমন করে 'মা' বলে ডাকি-তার মাঝেই তো দুনিয়ার ভালোবাসা। আমাদের আবার আলাদা করে মা দিবসের দরকার আছে নাকি?
কথা সত্য।
তবে আশংকার কথা হলো বাংলাদেশ একটা দ্রুতগতিতে উন্নয়নশীল দেশ। আর উন্নয়নের মাপকাঠিই হলো পশ্চিমা সমাজ। তার মানে দিনকে দিন আমরা পশ্চিমের মতই পাথুরে হৃদয়ের হয়ে যাচ্ছি আর দিনকে দিন আমরা মা বাবার ভালোবাসার থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।
এক মুহুর্তের জন্য একটু চোখ বুজে হিসেব করে দেখুন যে গত পাচ বছরে আপনি বাবা মায়ের থেকে ঠিক কতটা দূরে সরে এসেছেন। নিশ্চয়ই এখন তাদের যথাসম্ভব এড়িয়ে চলেন। নিশ্চয়ই এখন আর তাদেরকে নিজের সারাদিনের সব গল্প আগের মতন নিঃসংকোচে বলতে পারেন না। কারণটা খুব স্বাভাবিক-আমরাও বড় হচ্ছি-আমরাও 'উন্নত' হচ্ছি। অর্থাৎ পশ্চিমাদের মতন হয়ে যাচ্ছি।
আস্তে আস্তে এই যে বাবা মায়ের সাথে দূরত্ব,সেটা বাড়তে বাড়তে এমন যায়গায় যাবে যে সুযোগ পেলেই আমরা বাবা মা-কে এডিয়ে যাবো। চেষ্টা করতবো চোখাচুখি না করতে। আর বাসা থেকে বেরিয়ে নিজের ঘাটি গড়তে পারলে তো হলোই। আরো দূরত্ব বাড়ানো গেলো।
সত্য হচ্ছে যে গত পাঁচ বছরে আমাদের দেশে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে আর বাবা মায়ের প্রতি আমাদের ভালোবাসাও ক্রমাগত একটা নিছক আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিচ্ছে। পরীক্ষার আগে আমরা বাবা মাকে সালাম করছি-কিন্তু আসলে দিন দিন আমাদের মনে তাদের দোয়ার শক্তি কমে যাচ্ছে। কোন বড় সিদ্ধান্ত নেবার আগে আমরা একবার মাকে জানিয়ে নিচ্ছি ঠিক-কিন্তু তার উপদেশ কানে তুলছি না। ধুর! মা কি বোঝে?
এই 'মা কি বোঝে'র শক্তি অনেক। সেই শক্তির থেকেই আমরা আস্তে আস্তে প্লাস্টিক জাতি হয়ে যাচ্ছি।
ডিসেম্বরের এক তারিখ সারা বিশ্বে এইডস দিবস পালন করা হয়। এই দিনটির উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের মানুষকে শিখানো যে কি কি করলে এইডস ছড়ায়। কেমন করে চললে এই মারণব্যাধির থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এইডস রোগটিকে উদযাপন করা এই দিনটির উদ্দেশ্য নয়। এইডস রোগটিকে প্রতিরোধ করা এই দিনটির উদ্দেশ্য।
কাজেই জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী আর মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশতে বিশ্বাস করা বাঙ্গালির জন্যে মা দিবসও ঠিক এইডস দিবসের মতই। এই দিনটি আসলে মায়ের প্রতি প্লাস্টিক ভালোবাসা প্রদর্শনের দিন নয়-বরং এই দিনটি হলো আমাদের জন্য একটি সতর্কবাণীর মতন। এই দিনটা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে দিনে দিনে আমাদের বাঙ্গালিদের আবেগ কেমন করে পশ্চিমা প্লাস্টিক আবেগ হয়ে যাচ্ছে আর আমাদের এই প্লাস্টিকত্বের বিরুদ্ধে দাড়ায়ে সত্যিকারের কোমল নরম বাঙালি আবেগটাকে কর্পোরেট একুশ শতকের হাত থেকে বাচায়ে রাখার প্রণোদনা দেয়।
আমি জানি এখন অনেক বাঙ্গালির কাছেই মা দিবসের গুরুত্বটি পশ্চিমাদের মা দিবসের মতন হয়ে গেছে। আমাদের সমাজের একটি অংশকেই আজ পশ্চিমা প্লাস্টিকত্ব জাপটে ধরেছে। আমাদের অনেকেই এখন শুধু মা দিবসেই মা কে জড়িয়ে ধরে-মা কে ফোন করে। কি ভয়াবহ ব্যাপার!
এখানেই আমার আশংকা-আর এখানেই আমাদের কর্তব্য।
এইডস দিবসে আমরা যেমন সবাইকে বলি। ভাই এই কাজগুলো করবা না-করলে এইডস হবে।
মা দিবসে আমাদের সবাইকে বলতে হবে-এই কাজগুলা করবা না-নাইলে মায়ের প্রতি ভালোবাসার মতন পবিত্রতম আবেগটাও একটা প্লাস্টিক আবেগ হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ নামক মানবিক বদ্বীপটি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের অন্তরের সত্যিকারের আবেগগুলোকে সযত্নে লালন করে এসেছে। সারা দুনিয়ায় প্রত্যেকটি আবেগ যখন আজ রঞ্জিন বাক্সে মুড়ে বেঁচে দেয়া যাচ্ছে আর রঙ্গিন কার্ডে ছেপে গিফট করে দেয়া যাচ্ছে-তখন এই প্লাস্টিক কালচার থেকে সত্যিকারের আবেগগুলোকে বাচায়ে রাখার ভার আমাদেরই নিতে হবে। এই বাংলার বুকে দরকার হলে সৃষ্টি হবে অদৃশ্য সব মানবিক আবেগের সুদৃশ্য মিউজিয়াম।
মা-কে বাচিয়ে রাখতে হবে আমাদের যে-করেই হোক।
'মা' আমাদের সুন্দরতম শব্দ-সুন্দরতম আবেগ...
এই আবেগটা যেন প্লাস্টিক হয়ে না যায়...
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মে, ২০১৫ দুপুর ২:২৮
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×