somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নষ্টালজিয়া

২৬ শে জুন, ২০১৪ সকাল ১১:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছোটবেলা থেকেই গ্রামের প্রতি আমার প্রবল আকর্ষণ ছিল। সুযোগ হলেই গ্রামের নদী-নালা, খাল-বিল চষে বেড়াতাম । বাবার চাকরির সুবাদে শহরের এক জেলা থেকে অন্য জেলা পর্যন্ত ছুটে বেড়াতে হয়েছে। গ্রামের মাটিতে, ধূলোবালিতে মাখামাখি করার তেমন সুযোগ আমার খুব বেশি হয়নি। তবে গ্রাম আমাকে হাতছানি দিয়ে সব সময় ডাকতো। ডাকের আবেদন মমতাময়ী মায়ের চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না।

সেই গ্রামে আমার আবার দাদা বাড়ির চেয়ে নানা বাড়ি অনেক বেশি আপন করে জড়িয়ে নিত। কারণ, দাদা বাড়িতে একমাত্র দাদী ছাড়া আর তেমন কেউ ছিলনা। দাদা বাড়িকে ঠিক গ্রাম বলা যাবে না। পদ্মার তীরবর্তী রূপপুর গ্রামের পাশেই দিয়াড় বাঘইল গ্রাম, অনেকটা উপশহরের মত। চাচাতো ভায়েরা থাকলেও তাদের সাথে আমার সখ্যতা বেশি গড়ে ওঠেনি। স্কুলে গ্রীষ্মকালীন ছুটি হলেই দে ছুট। রকেট মেইল ট্রেনে চেপে সোজা নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে পাবনার ঈশ্বরদী। বাবা, দাদীর জন্য খাবার এবং টাকা পাঠাতেন। সেগুলো দাদীকে পৌঁছে দিয়ে কোন মতে খাবার সেরেই একই উপজেলার আট কিলো দূরে খড়ের দাঁইড় গ্রামে নানাবাড়িতে ছুটতাম। বলে রাখি, নানা বাড়িতে আমিই তাদের সব’চে বড় নাতি। কাজেই নানা-নানি, খালা-মামারা সবাই আমাকে কেন যেন খানিক বেশিই ¯েœহ করতেন। যা এখনো উপলব্ধি করি।

নানাবাড়ি গ্রাম, নদী, নৌকা, গোয়াল, গরুগাড়ি, লাঙল-জোয়াল আমাকে ভীষণভাবে কাছে টানতো। সেখানে একটা নদী ছিল। নদীটির নাম সুতি গাঙ। নদীটির প্রশস্থ কম ছিল বলে এলাকাবাসী তাকে নাম দিয়েছিল সুতি গাঙ। হয়তো সুতা থেকে আঞ্চলিকতায় দুষ্ট হয়ে সুতি নাম ধারণ করেছিল। একটা জলা ছিল। জলাটির নাম ছিল দশ ভাগার বিল। অর্থাৎ, দশভাগা বলতে কারোরই মালিকানা সেভাবে ছিল না। আশপাশের লোকজন এমন কি দূর গ্রামের লোকজনও সবাই বর্ষার শেষে একযোগে মাছ মারতো বলে বিলটাকে দশ ভাগার বিল বলা হতো। সেই দশভাগার বিলে মাছ ধরতে দল বেধে শত শত মানুষ মাছ ধরতে যেত। আমিও আমার বড় মামার সাথে মাছ ধরায় নেমে পড়তাম। কী যে মজা হতো তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

সেই সুতি গাঙে, আমি বঁড়শি দিয়ে মাছ ধরেছি। পলো দিয়ে মাছ ধরেছি, এমন কি নদী শুকিয়ে গেলে কাদা-পাক মাটি নিয়ে বাঁধ দিয়ে পানি সেচে ছোট ছোট মাছ ধরেছি। একদিন এক ঢাউস আকৃতির আঁইড় মাছ নদীতে ফেলে রাখা এক বড় চারোর মধ্যে ধরা পড়েছিল। যা আমি আর ছোট মামা মিলে সবাইকে ডেকে এনে নৌকায় তুলে কিনারে আনা হয়েছিল। সেদিন সবাই আমাকে সাবাস দিয়েছিল। আর একদিন নানাদের নৌকা নিয়ে আওতাপাড়া হাটে যেতে নৌকার গলুইয়ের কাছে বসে বসে নৌকার হাল ধরা পরখ করতে করতে এমসময় মাঝিকে সরিয়ে যেই আমি হাল ধরেছি অমনি নৌকা আমার শাসন না মেনে বাঁকা হয়ে মাছ ধরার জন্য নদীতে আড়াঅড়ি বাঁধ দেয়া বাঁশের খাঁচা (বানা) ভেঙে একাকার করে দিল। সামনে বসে থাকা বড় মামা ততক্ষণে বুঝতে পারলো যে, আমি কী সর্বনাশ করে ফেলেছি। সেদিন খেলাম বকা। কী আর করা, হজম করতে হলো। তবে আমিও দমবার পাত্র না। নৌকার গলুই আমাকে পেয়ে বসলো। যখনই দেখি ঘাটে নৌকা বাধা। তখনই ছোট মামাকে সাথে নিয়ে নৌকা ভাসাতাম মাঝ গাঙে যেয়ে পদ্ম ফুল আর শালুক সংগ্রহ করতাম। একবার কচুরি পানার মাঝে ডাহুক পাখির ছানা দেখে তা ধরে এনেছিলাম।

নানাবাড়ির রাখাল ছেলে জান্টু মামা বৃষ্টির মধ্যে আমার জন্য পাখির ছানা ধরে এনে উপহার দিত। তার উপহার দেবার কৌশল ছিল ভিন্ন। ঝড়ো বৃষ্টি হচ্ছে, আমি আর ছোট মামা বৈঠক খানায় ঘরে বসে আছি। বৃষ্টির ঝাপটা আমাদের চোখে-মুখে পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। আমরা পুলকিত হচ্ছি। হঠাৎ করে কাক ভেজা হয়ে জান্টু মামার উদয় হলো। মাথায় ছাতা, তবে তাতে বৃষ্টির কোন বাধা মানতে চাইছে না। ঠিক ছাতার উপর জড় সড়ো হয়ে ভয়ে কুঁকড়ে আছে একটি শালিক পাখির ছানা। জান্টু মামা কাছে আসতেই বললেন, মুকুল এটা তোর জন্য। বলে রাখি, নানা শখ করে আমার নাম রেখেছিল মুকুল। হয়তো কোন এক মুকুলের ঋতুতে জন্মেছিলাম বলে সেই নাম। এখনো নানা বাড়ি আর খালারা ছাড়া এ নামে আর কেউ আমাকে ডাকে না। আমি মুকুল তাদের কাছে মুকুলই রয়ে গেছি। আজও ফুটতে পারিনি। আমি ভেজা পাখিটিকে নিয়ে তুলার মধ্যে বসিয়ে দিলাম আর তার খাদ্য হিসাবে ঘাস ফড়িং ধরতে মহা ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। জান্টু মামা আমাকে আরো পাখি ধরে এনে দিয়েছিল। মাঠে লাঙল রেখে খেতে বসলে আমি সেই লাঙল আর গরু দু’টোকে শাসন করার চেষ্টা করতাম। লাঙলের মুঠ ধরে, হাতে গরু চরানো লাঠি নিয়ে ডা-ডা, ভোড়-ভোড় করে গরুকে হালকা মার দিতাম। এ কাজে কতবার যে গরুর পায়ে লাঙলের ফলা সেঁদিয়ে দিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। সেই জান্টু মামা বেঁচে আছেন কীনা এতকাল পরে তাও জানতে পারিনি।

একবার নানা বাড়িতে যেয়ে রাতে ডাকাতের কবলে পড়েছিলাম। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে আছি। রাতে হঠাৎ করে বন্ধুকের গুলির আওয়াজ। ঘুম ভাঙতেই দেখি জমদূতের মত বন্দুক হাতে ডাকাতদল। সবার চোখ-মুখ কালো কাপড়ে ডাকা। তারা সব চোখের নিমিষে লুট করে নিয়ে গেল। আমি তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র। খালাদের কোলের মধ্যে লুকিয়ে সব দেখলাম। নানা খুব ভীতু প্রকৃতির লোক ছিল। দৌঁড়ে সে সবার আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গ্রামের লোক জড়ো করে। এরপর ডাকাতরা চলে যায়। তবে বড় মামা ডাকাতদের নাকি চিনতে পেরেছিল। কীভাবে যেন তাদের সাথে যোগাযোগ করে পরে অবশ্য নানীর সেলাই মেশিনটা ফেরত পেয়েছিল। এখন পর্যন্ত এটাই আমার ডাকাত দলের ডাকাতি কাজের চাক্ষুষ দর্শন।

আমার সাঁতার শেখা প্রথমে পুকুরে বদ্ধ পানিতে। বাবার চাকরী সূত্রে তখন আমরা চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। সীতাকুন্ড স্টেশনের সংগে আমাদের রেলের সরকারি বাসা। বাসা লাগোয়া ইয়া বড় এক পুকুর। আব্বা আমাকে পুকুরে নামিয়ে বুকের উপর হাত রেখে সাঁতার শেখাতেন। সাঁতারে আমার সীতাকুন্ডেই হাতে খড়ি। পরে সুতি গাঙে, টেপাগাড়ির বিলে আর ভাড়ইমারীর জলায়। আর আমার সাঁতার কাটার এক সহযাত্রী ছিল খালাতো বোন রাঙা। রাঙা আমার চেয়ে বছর তিনেকের ছোট ছিল। রাঙা আর আমি একসাথে সুতি গাঙে সাঁতার কাটতাম। তবে সেটা কালে ভদ্রে। কারণ, রাঙা থাকতো পাবনায় আর আমি থাকতাম রংপুরে। কাকতালীয়ভাবে উভয়ের নানা বাড়িতে আসা হলে ছোট মামাকে নিয়ে সাঁতারে নেমে পড়তাম। আমার দুই মেয়ের কেউ সাঁতার জানেনা। কারণ, তাদের শহরে বেড়ে ওঠা, আর সাঁতার শেখার আগ্রহের অভাবের কারনে শেখা হয়নি।

গ্রীষ্মকালে স্কুল ছুটি হলে নানাবাড়ি যেতাম। ছোট মামা আমার দু’বছরের ছোট হলেও আমরা ছিলাম দু’জনে যেন বন্ধু। নানাদের তখন অনেক আম বাগান ছিল। আজ তা আর আগের মত নেই। সেই আমের মধ্যে কোন গাছের আম টক, আর কোন গাছের আম মিষ্টি, তা কাঁচা অবস্থাতেই আমাদের মুখস্ত ছিল। কারণ, গাছের কাঁচা আম যে আমি আর আমার ছোট মামা মতি সবার আগে পরখ করে দেখে রাখতাম। আমি নারিকেল গাছেও একবার উঠেছিলাম। গাছে উঠে দেখি আমার বুকের অধিকাংশ যায়গা ছিলে গেছে। লাল টকটকে রং ধারণ করেছে। যেন রক্ত বের হয় হয়। কী আর করা গাছে উঠে কচি ডাব নিচে ফেলে দিতাম। ছোট মামা তা টপাটপ কুড়িয়ে জমা করতো। নানাবাড়ির অদূরে একটা ঝোপ ছিল। কথিত আছে জনৈক আয়েজ উদ্দিন একদিন অতি প্রত্যুশে প্রকৃতির ডাকে ঝোপের মাঝে গেলে বাঘ তাকে আক্রমন করে। আইজ উদ্দিন সেই বাঘের সাথে মল্লযুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলেন। বাঘকে মেরে পুরো গ্রাম ঘোরানো হয়েছিল। সেই থেকে তার নাম হয়ে গেল আইজদ্দি বাঘা। কী সাহসিকতা! সুদূর পাবনা জেলায় তার নামডাক ছড়িয়ে পড়লো। সেই ঝোপে ছিল বঁইচি ফলের গাছ। আমি আর ছোট মামা সাহস করে ঐ ঝোপে ঢুকে পড়তাম আর বঁইচি ফল ছিড়ে এনে সুতি গাঙের পাড়ে বাতাসে গা এলিয়ে দিয়ে সাবাড় করতাম। আজ সেই সুতি গাঙ নেই, নেই দশভাগার বিল, টেপাগাড়ির বিল। সব শুকিয়ে আবাদী জমিনে পরিণত হয়েছে। সেই ঝোপ-ঝাড় কেটে সাবাড় করা হয়েছে। সেখানে ঘর বাড়ি তৈরি করে বসতি গড়ে উঠেছে। চলছে চাষাবাদ, ফলছে ধান, আর হারিয়ে গেছে আমার সেই মধূময় স্মৃতির ফেলে আসা হিরন্ময় দিনগুলো। আমার সেসব মধুর স্মৃতি কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না।

৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে ট্রাম্প চাচা ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৫


সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ভোট দিয়ে এসে অনেকক্ষণ ধরেই অপক্ষো করছিলাম কখন সন্ধ্যা হবে সে প্রত্যাশায়। সন্ধ্যার পর মোটামুটি বসে গিয়েছিলাম ফলাফলের উপর টেলিভিশনে বিশেষ আলোচনা দেখার জন্য।... ...বাকিটুকু পড়ুন

"বন্ধ দুয়ার"

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৪


"বন্ধ দুয়ার"

ক্লান্ত এ সপ্তাহে শুনি, আজ কারো কাজ নাই,
বন্ধ কারখানায় তালা, কোথা যাব তবে ভাই?
ছুটা বুয়া হয়ে খাটা, সে সুযোগও মেলা ভার,
তরুণী দেখিয়া মোরে, কেহ খোলে না যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

লিখেছেন নতুন নকিব, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

"আমেরিকাকে আবার মহান করব" বলে এসে যিনি দুনিয়ার সবাইকে বিরক্ত করলেন, ভোটাররা তাঁকে জানিয়ে দিলেন: হুমকি ধমকি আর উম্মাতাল আঁতলামির... ...বাকিটুকু পড়ুন

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×