somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নতুন নকিব
নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দিতে সংকোচ হয়; লেখালেখি ইবাদতসদৃশ সাধনা বলেই লিখি। নিজেকে জানা, বিশ্বকে অনুধাবন করা এবং সর্বোপরি মহান স্রষ্টার পরিচয় অন্বেষণই আমার নীরব যাত্রার পাথেয়। দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়-সৃষ্টিকূলকে ভালোবাসায় আগলে রাখার শিক্ষাই ইসলামের মূল বাণী।

ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
ব্যালটের চিঠি: মাননীয় ট্রাম্প, আপনার বাকি বন্ধ

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

"আমেরিকাকে আবার মহান করব" বলে এসে যিনি দুনিয়ার সবাইকে বিরক্ত করলেন, ভোটাররা তাঁকে জানিয়ে দিলেন: হুমকি ধমকি আর উম্মাতাল আঁতলামির দিন শেষ, এবার দায়দেনা আর হিসাব কিতাব মেটানোর পালা।

আমাদের পাড়ার চায়ের দোকানের নিয়মিত খদ্দের এক চাচা ছিলেন। বেজায় আডডা দিতেন। রোজ বিকেলে বসে ঘোষণা দিতেন, "আমি না থাকলে এই মহল্লা অচল।" চা খেতেন বাকিতে, উপদেশ দিতেন বিনা পয়সায়। একদিন দোকানদার খাতাটা বন্ধ করে বলল, "চাচা, আজ থেকে নগদ।" সেদিন চাচার মুখের ভাবটা যাঁরা দেখেছেন, ৩ নভেম্বরের রাতে হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখটা কল্পনা করতে তাঁদের কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাচ্ছে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সিএনএন ও এবিসি নিউজ। সিনেটেও বিরোধীরা এগিয়ে, যদিও সেখানে সব গণমাধ্যমের হিসাব এখনো এক নয়। জর্জিয়ায় ট্রাম্পঘনিষ্ঠ মাইক কলিন্সকে হারিয়ে জিতেছেন জন অসফ। মেইনে হার মেনেছেন সুজান কলিন্স। সাউথ ক্যারোলাইনায় লিন্ডসে গ্রাহামের পরাজয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে সিএনএন। রিপাবলিকানদের জন্য এটা শুধু ভোটের ফল নয়, বাড়িওয়ালার নোটিশ: "ঘর গুছিয়ে রাখুন।"

এক. বিশ্বজুড়ে ঝামেলা কেনার কারবার

কিছু মানুষ বাজারে গিয়ে দাম না দেখে ঝুড়ি ভরে ফেলেন। ট্রাম্প তেমনি দেশে দেশে গিয়ে ঝামেলা কিনেছেন, বিলের কথা ভাবেননি।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা দেখে আন্তর্জাতিক আইনের শিক্ষকেরা ক্লাসে নিশ্চয়ই কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। পাড়ার মোড়ল যখন প্রতিবেশীর তালা ভেঙে বলে "এটা আমার জিনিস, নিয়ে গেলাম", তখন তাকে নিয়ে মহল্লায় যা আলোচনা হয়, এখানেও তা-ই হয়েছে, শুধু মহল্লাটা একটু বড়। ইরানে দফায় দফায় হামলা হলো, আর সমালোচকরা বেসামরিক প্রাণহানির অভিযোগ তুললেন। এসবের জবাব মার্কিন ভোটাররা চেয়েছেন কি না, এবার তাঁদের রায়ে তার একটা আভাস পাওয়া গেল।

গ্রিনল্যান্ডের গল্পটা তো পুরোদস্তুর কমেডি। বিশাল এক বরফের দ্বীপ, যেখানে মানুষের চেয়ে সিলের সংখ্যাই হয়তো বেশি, সেটা কিনতে চাওয়া হলো। দ্বীপবাসী বললেন, "আমরা বিক্রির জিনিস নই।" তখন শুরু হলো চোখ রাঙানি। ব্যাপারটা দাঁড়াল এরকম: দোকানি আম বেচবে না বলায় ক্রেতা হুমকি দিচ্ছেন, "তাহলে দোকানটাই কিনে নেব।"

কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর কথা শুনে কানাডিয়ানরা প্রথমে হেসেছিলেন। কিন্তু প্রতিবেশী যদি রোজ জানালায় উঁকি দিয়ে বলে, "তোমার ঘরটা আমার ঘরের সঙ্গে জুড়ে দিলেই তো হয়", তাহলে হাসি কতক্ষণ টেকে? মেক্সিকোকে "ধুলিস্যাৎ" করার হুমকিও দেওয়া হলো। মেক্সিকো ধুলো হয়নি, ধুলো হয়েছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা।

দুই. শুল্কের হিসাব: চালান বিদেশির নামে, বিল ঘরের ঠিকানায়

শুল্ক নিয়ে ট্রাম্পের তত্ত্বটা ছিল শুনতে মধুর: দাম দেবে চীন, দেবে মেক্সিকো, দেবে গোটা দুনিয়া। কিন্তু মুদি দোকানের রসিদ হাতে নিয়ে যখন মার্কিন গৃহিণী দাঁড়ালেন, দেখা গেল চীনা বা মেক্সিকান কেউ বিল মেটাননি। মিটিয়েছেন তিনি নিজেই। আমাদের দেশের সেই পুরনো ঠিকাদারি গল্প, যেখানে প্রতিশ্রুতি থাকে "খরচ অন্য কেউ দেবে", আর কাজ শেষে বিল চলে আসে বাড়ির মালিকের কাছে।

গোটা বিশ্বের বাণিজ্য এলোমেলো হলো, বাজার অস্থির হলো, দামের মিটার চড়ল। জন অসফ ভোটের মাঠে বললেন ঠিক সেই কথা, যা সাধারণ মানুষ রোজ চায়ের কাপে বলে: জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারের জবাবদিহি। এসব কথায় রাজনীতির পণ্ডিত লাগে না। মাস শেষে ব্যাগের ওজনই ভোটারকে বুঝিয়ে দেয় কাকে ভোট দিতে হবে।

তিন. আদালতের করিডোরে নিত্য আনাগোনা

মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঠিকানা সাধারণত হোয়াইট হাউস। ট্রাম্পের বেলায় তাতে যোগ হয়েছে আদালতের বারান্দা। ই. জিন ক্যারল মামলায় দেওয়ানি আদালত তাঁকে যৌন নিগ্রহ ও মানহানির দায়ে দায়ী করেছে। নিউ ইয়র্কে ব্যবসায়িক নথি জালিয়াতির ৩৪ অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, যা কোনো প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে এর আগে ঘটেনি। ট্রাম্প এসব রায়ের বিরুদ্ধে আপিলে আছেন এবং বলেন, সবই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। এই পক্ষের কথাও লিখে রাখা ভালো। তবে একজন মানুষ যখন এতগুলো মামলায় বারবার জড়ান আর প্রতিবারই বলেন "আমি শুধু ভুক্তভোগী", তখন ভোটারের কান কিছুটা পেকে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।

চার. নেতা না ফুটবল কোচ?

ট্রাম্পের স্টাইল পাড়ার সেই ফুটবল কোচের মতো। ম্যাচ হারলে তিনি বলেন, রেফারি পক্ষপাত করেছে, মাঠ ভিজে ছিল, বলের সাইজও ঠিক ছিল না। জিতলে বলেন, "দেখলে, আমার কৌশলের জোরেই।" এবার ম্যাচ হারলেন, আর রেফারি ছিলেন কোটি কোটি ভোটার। তাঁদের "ফেক নিউজ" বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ নয়।

পাঁচ. এরপর কী?

ট্রাম্প এখনো ২০২৯ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট। কিন্তু প্রেসিডেন্ট থাকা আর সরকার চালাতে পারা এক জিনিস নয়। প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে বাজেট আটকে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁদের হাতে, তদন্ত কমিটি বসানোর ক্ষমতা তাঁদের হাতে, আর সরকারের নথিপত্র তলব করার সুযোগও তাঁদের হাতে। এতদিন যা ইচ্ছা তাই করার যে সুবিধা ছিল, তা শেষ। এখন প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের আগে কংগ্রেসের দরজায় কড়া নাড়তে হবে। যিনি দুনিয়াকে বলতেন "আমার কথা শোনো", তাঁকে এবার শিখতে হবে নিজের দেশের কংগ্রেসের কথা শোনা।

মজার কথা হলো, আমেরিকার ভোটাররা চিৎকার করেননি, ভাঙচুরও করেননি। শুধু একটা ছোট কাগজে দাগ দিয়েছেন। আর সেই দাগেই "আবার মহান করো" স্লোগানের নিচে লেখা হয়ে গেছে একটা ছোট্ট নোট: "দোকানদার বলেছে, আজ থেকে নগদ।"

টীকা: এটি রম্য ও সমালোচনামূলক কলাম, তাই এখানে সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে। ট্রাম্পের সমর্থকরা বলবেন, শুল্ক ও বিদেশনীতি আমেরিকার স্বার্থরক্ষার জন্য, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের আসন হারানো ইতিহাসে স্বাভাবিক ঘটনা, আর মামলাগুলো রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত। ট্রাম্প ভক্তরা যত কথাই বলুন, যত যুক্তিই দিন, ট্রাম্পের দিন ইতোমধ্যেই পাল্টে গেছে। বিশ্ব মোড়লের এখন থেকে ভেজা বেড়াল হয়ে ডেমোক্র্যাটদের হাতে পায়ে ধরেই চলতে হতে পারে বাকিটা সময়।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×