
এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের সামনে পাশবিক শক্তি ও গণহত্যাকারী চরম দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এটা এমন এক দেশ যারা কোন ধরনের আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করে না, এবং সকল প্রকার মানবাধিকারের ধারণাকে পদদলিত করে "জোর যার, মুল্লুক তার" - এই জঙ্গলের নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে। আমরা দেখেছি, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী মনোবিকৃতির সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে কিভাবে গাজার শিশু-কিশোরদের কখনো চোখ, কখনো মাথার খুলি, কখনো জননাঙ্গ নিশানা করে গুলি চালিয়ে তাদের এআই চালিত প্রাণঘাতী অস্ত্রের কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছে। আর এসবই ইসরায়েল করেছে ট্রাম্প ও তাঁর উগ্র ডানপন্থী জায়নবাদী গোষ্ঠীর নিরঙ্কুশ সমর্থন কাজে লাগিয়ে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন হয়তো ট্রাম্পকে ক্ষমতাচ্যুত করবে না, তবে আমরা যে সীমাহীন উগ্র ডানপন্থি, জায়নবাদী ও ঔপনিবেশিক শক্তির অপকর্মের ভয়াবহ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, সেখান থেকে হয়তো সাময়িকভাবে হলেও কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেতে পারি। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ হবে। বিরোধী দলের হাতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ গেলে সামরিক ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ আসতে পারে এবং ইরান যুদ্ধের বিপক্ষে কংগ্রেসের ভূমিকা বাড়তে পারে।
তবে এই নির্বাচনে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলালেও আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি বদলাবে না বলেই মনে হয়। কংগ্রেসের বিরোধিতা সত্ত্বেও ট্রাম্প ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করতে পারে। ট্রাম্পের ক্ষমতার ওপর লাগাম টানার সুযোগ তৈরি হলেও এটা দিয়ে তাঁর সব সিদ্ধান্ত ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। কেননা, বিশ্বজুড়ে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির ক্রমবর্ধমান উত্থানের শিকড় আরও গভীরে।
পৃথিবী দিনের পর দিন উগ্র ডানপন্থি ও জায়নবাদী রাজনীতির প্রভাবে আরও বর্ণবাদী ও আরও বিপদসঙ্কুল হয়ে উঠছে। আর এটা হয়তো কেবল শুরু। গাজার শিশুদের ওপর যে যুদ্ধের ভয়াবহতা নেমে এসেছে, সেটা পৃথিবীর আরও অনেক দেশেও ঘটতে পারে। আজকের উগ্র ডানপন্থী রাজনীতি কেবল অতীতের স্বৈরশাসনের পুনরাবৃত্তি নয়, সেই রাজনীতিকে তারা নতুন করে কাজে লাগাচ্ছে যেগুলো একসময় মুসোলিনি বা হিটলারের ক্ষমতার পথ তৈরি করেছিল।
এর একটা কারণ এই যে, বিশ্ব যখনই গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়, তখনই মানুষ সরল রাজনৈতিক ধারণার প্রতি আকৃষ্ট হয়। সেখানে জটিলতার জায়গা নেই - সবকিছু হয় সাদা নয় কালো। সেখানে শত্রু-মিত্রের ধারণাই একমাত্র বিবেচ্য, আর তা নির্ধারিত হয় - "সে কি অভিবাসী নাকি স্থানীয়; মুসলিম নাকি জুডিও-খ্রিষ্টান; শ্বেতাঙ্গ নাকি আরব" - এই ধরনের সরল প্রশ্নের উপর। একশ বছর আগে পৃথিবী যে সংকটের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল, আমরা তেমনই সময়ে দাঁড়িয়ে আছি। মানুষ এখন উদারপন্থী ও যুক্তিনির্ভর রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আশাবাদ ও শান্তির চেয়ে যুদ্ধ, সংঘাত, ঘৃণা ও ভয়ের রাজনীতি এখন মানুষকে আকৃষ্ট করছে।
রাজনৈতিকভাবে ভয় ও ঘৃণা আশা ও মানবতার চেয়ে বেশি শক্তিশালী। আর উগ্র ডানপন্থী ও জায়নবাদীরা এটা ভালো বোঝে। তাদের রাজনৈতিক কৌশলের মধ্যে থাকে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও ভয়। এটাই তাঁদের রাজনৈতিক কৌশল - সমাজের বহুমাত্রিক ও জটিল সমস্যাগুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে একটি মাত্র বিষয়ের ওপর মানুষের মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা। এক শতাব্দী আগে ইউরোপে এটাই ঘটেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ এবং মহামন্দার পর ইউরোপের স্বৈরাচারীরা কমিউনিস্ট ও ইহুদিদের যাবতীয় সমস্যার জন্য বলির পাঁঠা বানিয়েছিল।
আজকের সময়েও সেই রাজনৈতিক কৌশল ফিরে এসেছে।
একের পর এক বৈশ্বিক সংকটের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান এবং দায়ীদের জবাবদিহি করার পরিবর্তে মানুষের ক্ষোভকে অন্যদিকে পরিচালিত করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, জলবায়ুর পরিবর্তন, এআই এর কারণে বেকারত্ব এবং যুদ্ধের জন্য মূল্যস্ফীতি - এই সব সংকটের জন্য শাসক, ধনকুবের ও ক্ষমতাধরদের দায়ি করার পরিবর্তে মানুষের ক্ষোভ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আর এটাই ট্রাম্প বিগত মাসগুলোতে করেছে। রিপাবলিকান নেতাদের কাছে এখন কোনো ইতিবাচক রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই; ফলে নিজেদের ক্ষমতার বৈধতা দিতে তাঁরা বর্ণবাদ, বিভাজন ও নিষ্ঠুরতার রাজনীতিকে ব্যবহার করছে। আবার, জায়নবাদ এবং আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরায়েলের প্রভাব নিয়ে আমেরিকার জনগণের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। এসব প্রশ্নের সমাধানের পরিবর্তে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে অভিবাসী, মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দিকে।
বিগত নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া বহু মানুষ ট্রাম্পের প্রতি পুরোপুরি আস্থা হারিয়েছে। এই অসন্তোষের পেছনে আছে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, ইরান যুদ্ধ, গাজায় গণহত্যা এবং এআই ও ডাটা সেন্টারের ফলে মানুষের বেকারত্বের আশঙ্কা।
এই ব্যর্থতাগুলো ডেমোক্র্যাটদের জন্য রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করছে। তবে বিরোধী দলের ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে নির্বাচনে জেতা বড় রাজনৈতিক অর্জন বলা যায় না। এই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা যদি জেতেও, তার অর্থ এই নয় যে, মানুষ তাদের রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে।
বামপন্থী ধারার কিছু নতুন প্রার্থীরা নতুন ধরনের কর্মসূচি নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন, যার মধ্যে রয়েছে বিলিয়নিয়ারদের ওপর কর আরোপ, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, এআইয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং ইরান যুদ্ধ বন্ধ করা। মিশিগানে আবদুল এল-সায়েদ, টেক্সাসে জেমস টালারিকো এবং ফ্লোরিডায় অ্যাঞ্জি নিক্সনের মতো প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে, ভোটারদের একটি অংশ এসব সাহসী পদক্ষেপ ও কার্যক্রম দেখতে আগ্রহী। তবে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতৃত্বের বড় অংশের ধারণা, তাদের দলের ইসরাইলপন্থি নীতি বজায় রেখেই নির্বাচনে জেতা সম্ভব।
এতে করে ডেমোক্র্যাটরা সাময়িকভাবে ভোটে সাফল্য পেতে পারে, কিন্তু এভাবে উগ্র ডানপন্থি, জায়নবাদি ও বর্ণবাদীদের পরাজিত করা সম্ভব হবে না। উগ্র ডানপন্থার হুমকি ট্রাম্পের চেয়েও অনেক বড় ও ভয়াবহ। ট্রাম্পের রাজনীতি শেষ হলেও যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আদর্শিক পরিস্থিতি এই রাজনীতির জন্ম দিয়েছে, সেটার অবসান হবে না।
তবুও, আপাতত এই মুহূর্তে, আমেরিকাসহ সারা বিশ্বের অসংখ্য মানুষের মতো আশা করি, আজকের মধ্যবর্তী নির্বাচন মাগা জোটের জন্য বড় পরাজয় নিয়ে আসুক।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



