
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
◆ ভূমিকা: এক ভীত ও কম্পিত হৃদয়ের প্রশ্ন
কল্পনা করুন, গভীর রাত। চারদিক নিস্তব্ধ। একজন মানুষ জায়নামাযের পাশে বসে আছে। অতীতের কোনো এক ভুল, কোনো এক পদস্খলন আজ তার বুকের ভেতর পাথরের মতো চেপে বসেছে। ঈমান আছে, আল্লাহকে সে ভালোবাসে, তবু মনে পড়ে যায় বহুদিন আগে শোনা একটি কথা: যে ব্যক্তি কবীরা গুনাহ করে সে নাকি চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। তার চোখ ভিজে ওঠে। সে নিজেকে প্রশ্ন করে, তবে কি আমার জন্য আর কোনো আশা নেই?
এই লেখা সেই ভীত হৃদয়ের জন্য। শুধু তার একার জন্য নয়, প্রতিটি মুমিনের জন্য, যে আল্লাহকে ভয় করে আবার তাঁর রহমতের আশাও করে। কারণ কথাটি সঠিক নয়। এটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদা নয়, বরং খারেজী ও মুতাযিলা নামের বিচ্যুত দলের মত। কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে আমরা দেখব, আল্লাহর রহমত কত বিশাল এবং তাওহীদের উপর মৃত্যুবরণকারী মুমিনের জন্য ক্ষমার দরজা কত প্রশস্ত। একই সঙ্গে দেখব, কবীরা গুনাহ কত ভয়াবহ, যাতে ক্ষমার আশা আমাদের গাফিল না করে দেয়।
◆ আশা ও ভয়ের মাঝখানের পথ
মুমিনের জীবন দুটি ডানায় ভর করে ওড়া পাখির মতো। একটি ডানা ভয়, অন্যটি আশা। একটি ভেঙে গেলে পাখি আর আকাশে থাকতে পারে না। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের এই দুই ডানার কথাই একই নিঃশ্বাসে শুনিয়েছেন:
আশা ও ভয়ের একই ঘোষণা
نَبِّئْ عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ وَأَنَّ عَذَابِي هُوَ الْعَذَابُ الْأَلِيمُ
অনুবাদ: আমার বান্দাদের জানিয়ে দিন, আমি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর আমার শাস্তিই যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। -সূরা আল-হিজর ১৫:৪৯-৫০
লক্ষ করুন, আল্লাহ আগে নিজের ক্ষমা ও দয়ার কথা বলেছেন, তারপর শাস্তির কথা। রহমতের এই অগ্রগামিতা আমাদের শেখায়, বান্দার দিকে আল্লাহর প্রথম দৃষ্টি দয়ার। তাই কবীরা গুনাহের প্রশ্নে আমরা যেমন নিরাশ হব না, তেমনি নির্ভয়ও হব না।
◆ রহমতের সেই একশ ভাগ
আল্লাহর দয়া কতটা বিশাল, তা মানুষের ভাষায় পরিমাপ করা যায় না। তবু রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের একটি ছবি এঁকে দিয়েছেন। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
একশ রহমতের হাদীস
إِنَّ لِلَّهِ مِائَةَ رَحْمَةٍ، أَنْزَلَ مِنْهَا رَحْمَةً وَاحِدَةً بَيْنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ وَالْبَهَائِمِ وَالْهَوَامِّ، فَبِهَا يَتَعَاطَفُونَ، وَبِهَا يَتَرَاحَمُونَ، وَبِهَا تَعْطِفُ الْوَحْشُ عَلَى وَلَدِهَا، وَأَخَّرَ اللَّهُ تِسْعًا وَتِسْعِينَ رَحْمَةً يَرْحَمُ بِهَا عِبَادَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
অনুবাদ: আল্লাহর একশটি রহমত আছে। তার একটি মাত্র তিনি জিন, মানুষ, চতুষ্পদ জন্তু ও কীটপতঙ্গের মাঝে নাযিল করেছেন। এর কারণেই তারা একে অপরের প্রতি স্নেহ করে, দয়া করে, এমনকি বন্যপ্রাণীও নিজের সন্তানের প্রতি মমতা দেখায়। আর নিরানব্বইটি রহমত আল্লাহ রেখে দিয়েছেন কিয়ামতের দিন তাঁর বান্দাদের প্রতি দয়া করার জন্য। -সহীহ মুসলিম ২৭৫২; সহীহ বুখারী ৬০০০ | মান: সহীহ
একবার ভাবুন। মায়ের বুকে সন্তানের জন্য যে অতল মমতা, পিতার চোখে যে নীরব উদ্বেগ, প্রিয়জনের বিচ্ছেদে যে কান্না, সবই সেই একশ ভাগের মাত্র এক ভাগ। বাকি নিরানব্বই ভাগ আল্লাহ জমা রেখেছেন সেই দিনের জন্য, যেদিন একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি দয়ার দরকার হবে।
একবার কিছু যুদ্ধবন্দীকে রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে আনা হলো। সেদিনের দৃশ্যটি উমর ইবনুল খাত্তাব রা. আমাদের জন্য ধরে রেখেছেন:
মায়ের চেয়েও দয়ালু আল্লাহ
قَدِمَ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم سَبْيٌ، فَإِذَا امْرَأَةٌ مِنَ السَّبْيِ قَدْ تَحْلُبُ ثَدْيَهَا تَسْقِي، إِذَا وَجَدَتْ صَبِيًّا فِي السَّبْيِ أَخَذَتْهُ فَأَلْصَقَتْهُ بِبَطْنِهَا وَأَرْضَعَتْهُ، فَقَالَ لَنَا النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم: أَتَرَوْنَ هَذِهِ طَارِحَةً وَلَدَهَا فِي النَّارِ؟ قُلْنَا: لَا، وَهِيَ تَقْدِرُ عَلَى أَنْ لَا تَطْرَحَهُ. فَقَالَ: لَلَّهُ أَرْحَمُ بِعِبَادِهِ مِنْ هَذِهِ بِوَلَدِهَا
অনুবাদ: নবী সা.-এর কাছে কিছু যুদ্ধবন্দী আনা হলো। বন্দীদের মধ্যে এক নারীর স্তন থেকে দুধ ঝরছিল, সে (হারানো সন্তানকে খুঁজে) ছুটছিল। বন্দীদের মধ্যে কোনো শিশুকে পেলেই সে তাকে তুলে নিয়ে পেটের সাথে জড়িয়ে ধরে দুধ পান করাচ্ছিল। তখন নবী সা. আমাদের বললেন, তোমরা কি মনে করো এই নারী তার সন্তানকে আগুনে ছুঁড়ে ফেলতে পারে? আমরা বললাম, না, আর সে তো না ফেলার ক্ষমতা রাখে। তিনি বললেন, এই নারী তার সন্তানের প্রতি যতটা দয়ালু, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি তার চেয়েও অধিক দয়ালু। বর্ণনাকারী: উমর ইবনুল খাত্তাব রা. -সহীহ বুখারী ৫৯৯৯; সহীহ মুসলিম ২৭৫৪ | মান: সহীহ
যে প্রভু বান্দার প্রতি মায়ের চেয়েও দয়ালু, তিনি কি তাঁর একত্বে বিশ্বাসী একজন দুর্বল বান্দাকে একটি পদস্খলনের কারণে অনন্তকালের জন্য আগুনে ফেলে রাখবেন? কখনোই নয়। এ ধারণা আল্লাহর রহমতের শানের সাথে মানানসই নয়।
◆ শিরকের নিচে যা কিছু, সবই তাঁর ইচ্ছার অধীন
কুরআনুল কারীম গুনাহের জগতে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিয়েছে। একদিকে শিরক, অন্যদিকে শিরকের চেয়ে নিচের সব গুনাহ:
ক্ষমার সীমারেখা
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَىٰ إِثْمًا عَظِيمًا
অনুবাদ: নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার গুনাহ ক্ষমা করেন না। এর চেয়ে নিচের যেকোনো গুনাহ তিনি যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে এক মহাপাপ রচনা করে। -সূরা আন-নিসা ৪:৪৮ (অনুরূপ ৪:১১৬)
এই আয়াতটি আমাদের প্রশ্নের মূল উত্তর। যদি কবীরা গুনাহকারী মুমিনও কাফিরের মতো চিরস্থায়ী জাহান্নামী হতো, তাহলে শিরক ও অন্যান্য গুনাহের মধ্যে এই পার্থক্য করার কোনো অর্থ থাকত না। আল্লাহ বলেছেন, শিরক ছাড়া বাকি সব তাঁর ইচ্ছার অধীন। তিনি চাইলে ক্ষমা করবেন, চাইলে গুনাহ অনুযায়ী শাস্তি দেবেন। আর চিরস্থায়ী জাহান্নামের ঘোষণা এসেছে মুশরিকদের জন্য। সূরা মায়েদার ৭২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা জাহান্নাম।
আল্লাহ আরও জানিয়েছেন, বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকলে ছোট গুনাহগুলো তিনি নিজেই মুছে দেন:
কবীরা থেকে বাঁচলে সগীরা মাফ
إِن تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُم مُّدْخَلًا كَرِيمًا
অনুবাদ: তোমাদের যা নিষেধ করা হয়েছে, তার মধ্যে কবীরা গুনাহগুলো থেকে বিরত থাকলে আমি তোমাদের ছোট গুনাহ মাফ করে দেব এবং তোমাদের সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব। -সূরা আন-নিসা ৪:৩১
◆ কবীরা গুনাহকে হালকা ভাবার সুযোগ নেই
এতক্ষণ আমরা রহমতের কথা বলেছি। কিন্তু এখানেই থেমে গেলে আমরা অর্ধেক সত্য বলব। কবীরা গুনাহ অত্যন্ত ভয়াবহ। রাসূলুল্লাহ সা. উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন:
ধ্বংসাত্মক সাতটি গুনাহ
اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ؟ قَالَ: الشِّرْكُ بِاللَّهِ، وَالسِّحْرُ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ، وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْغَافِلَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ
অনুবাদ: তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক বিষয় থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, সেগুলো কী? তিনি বললেন: আল্লাহর সাথে শরীক করা, জাদু করা, আল্লাহ যে প্রাণ হরণ নিষিদ্ধ করেছেন তা অন্যায়ভাবে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের সম্পদ খাওয়া, যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানো এবং সতী-সাধ্বী, সরলমনা ঈমানদার নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়া। বর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা রা. -সহীহ বুখারী ২৭৬৬; সহীহ মুসলিম ৮৯ | মান: সহীহ
কুরআনে ইচ্ছাকৃতভাবে মুমিনকে হত্যার শাস্তি বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেছেন:
ইচ্ছাকৃত হত্যার ভয়াবহতা
وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا
অনুবাদ: যে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে দীর্ঘকাল থাকবে। আল্লাহ তার উপর ক্রুদ্ধ হবেন, তাকে লানত করবেন এবং তার জন্য ভয়াবহ শাস্তি প্রস্তুত রাখবেন। -সূরা আন-নিসা ৪:৯৩
যারা কবীরা গুনাহকারীকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী বলেন, তারা এই আয়াতকেই বড় দলিল হিসেবে পেশ করেন। কিন্তু আহলুস সুন্নাহর আলেমগণ কুরআন ও সহীহ হাদীসের সব দলিল একত্র করে এর ব্যাখ্যা করেছেন। প্রথমত, আরবি “খুলুদ” শব্দটি দীর্ঘ অবস্থান অর্থেও ব্যবহৃত হয়, যা সবসময় অনন্তকাল বোঝায় না। দ্বিতীয়ত, কেউ মুমিনের রক্তকে হালাল মনে করে হত্যা করলে সে ঈমানের গণ্ডি থেকেই বেরিয়ে যায়, তাই তার জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নাম প্রযোজ্য। তৃতীয়ত, আয়াতটি অপরাধের প্রাপ্য শাস্তি জানিয়ে দিয়েছে, কিন্তু এর পাশাপাশি ৪:৪৮ আয়াত ও সহীহ হাদীসসমূহ বলছে, তাওহীদের উপর মৃত্যুবরণকারীকে আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন অথবা শাস্তির পর মুক্তি দিতে পারেন।
এখানে একটি কথা মনে রাখা জরুরি। এই সুসংবাদ কাউকে গুনাহে সাহস জোগানোর জন্য নয়। রহমতের ঘোষণা এসেছে সেই বান্দার সান্ত্বনার জন্য, যে অনুতপ্ত, যে কাঁদছে, যে ফিরে আসতে চায়।
◆ জাহান্নামের অন্ধকার থেকে ফিরে আসার দৃশ্য
এবার সহীহ হাদীসের সেই হৃদয়স্পর্শী বর্ণনার দিকে তাকাই, যেখানে রাসূলুল্লাহ সা. কিয়ামতের দিনের একটি দৃশ্য আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। আবু সাঈদ খুদরী রা. বর্ণনা করেন:
জীবন-নদে অবগাহন
يَدْخُلُ أَهْلُ الْجَنَّةِ الْجَنَّةَ، وَأَهْلُ النَّارِ النَّارَ، ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُ تَعَالَى: أَخْرِجُوا مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةٍ مِنْ خَرْدَلٍ مِنْ إِيمَانٍ، فَيُخْرَجُونَ مِنْهَا قَدِ امْتَحَشُوا وَعَادُوا حُمَمًا، فَيُلْقَوْنَ فِي نَهَرِ الْحَيَاةِ، فَيَنْبُتُونَ كَمَا تَنْبُتُ الْحِبَّةُ فِي حَمِيلِ السَّيْلِ، أَلَمْ تَرَ أَنَّهَا تَخْرُجُ صَفْرَاءَ مُلْتَوِيَةً
অনুবাদ: জান্নাতীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করলে আল্লাহ বলবেন, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে তাকে বের করো। তখন তাদের এমন অবস্থায় বের করা হবে যে তারা পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। তাদের জীবন-নদে নামানো হবে। ফলে তারা সতেজ হয়ে উঠবে, যেমন প্লাবনের স্রোতে বয়ে আসা পলিমাটিতে বীজ অঙ্কুরিত হয়। তোমরা কি দেখোনি, তা হলুদ বর্ণের ও বাঁকানো অবস্থায় বের হয়? বর্ণনাকারী: আবু সাঈদ খুদরী রা. -সহীহ বুখারী ২২, ৬৫৬০; সহীহ মুসলিম ১৮৪ | মান: সহীহ, মুত্তাফাক আলাইহি
এই বর্ণনা পড়তে গিয়ে বুকের ভেতর কেমন যেন করে ওঠে। পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া দেহ, যাদের ঈমান ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, আল্লাহর নির্দেশে তাদের তুলে আনা হচ্ছে। যে নদীতে তাদের নামানো হচ্ছে, তার নাম “জীবন”। সেখানে ডুব দিতেই মৃতপ্রায় দেহ নতুন প্রাণ ফিরে পাচ্ছে, যেমন বন্যার পর পলিমাটিতে সবুজ অঙ্কুর মাথা তোলে। এ কেবল শাস্তির গল্প নয়, এ এক নতুন জীবনের সুসংবাদ।
আনাস রা. বর্ণিত হাদীসে সেই ঈমানের ওজন আরও সূক্ষ্মভাবে বলা হয়েছে, যা আল্লাহর কাছে কখনো মূল্যহীন হয় না:
যব, গম ও অণু পরিমাণ কল্যাণ
يَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَكَانَ فِي قَلْبِهِ وَزْنُ شَعِيرَةٍ مِنْ خَيْرٍ، وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَكَانَ فِي قَلْبِهِ وَزْنُ بُرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ، وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَكَانَ فِي قَلْبِهِ وَزْنُ ذَرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ
অনুবাদ: জাহান্নাম থেকে বের হবে সেই ব্যক্তি, যে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছে এবং যার অন্তরে যব পরিমাণ কল্যাণ ছিল। বের হবে সেই ব্যক্তি, যে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছে এবং যার অন্তরে গম পরিমাণ কল্যাণ ছিল। আর বের হবে সেই ব্যক্তি, যে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছে এবং যার অন্তরে অণু পরিমাণ কল্যাণ ছিল। বর্ণনাকারী: আনাস রা. -সহীহ বুখারী ৪৪; সহীহ মুসলিম ১৯৩ | মান: সহীহ
এই হাদীসগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, জাহান্নামে প্রবেশ করেও যার অন্তরে ঈমানের সামান্যতম অংশ রয়ে গেছে, সে সেখানে চিরকাল থাকবে না। ঈমান হলো সেই বীজ, যা আগুনেও নষ্ট হয় না। আল্লাহর রহমতের ছোঁয়ায় সেই বীজ আবার সবুজ হয়ে ওঠে।
এই উম্মতের জন্য রাসূলুল্লাহ সা.-এর শাফায়াতের ঘোষণাও আমাদের হৃদয়ে ভরসা জাগায়:
কবীরা গুনাহকারীদের জন্য শাফায়াত
شَفَاعَتِي لِأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي
অনুবাদ: আমার শাফায়াত আমার উম্মতের কবীরা গুনাহকারীদের জন্য। -আবু দাউদ ৪৭৩৯; তিরমিযী ২৪৩৫; ইবনে মাজাহ ৪৩১০ | মান: সহীহ (আলবানী)
ভাবুন, যিনি সারা জীবন উম্মতের চিন্তায় রাত জেগে কেঁদেছেন, তিনি কিয়ামতের কঠিন দিনেও উম্মতের গুনাহগারদের ভুলে যাবেন না। এই সৌভাগ্য শুধু তাওহীদের উপর মৃত্যুবরণকারীদের জন্য।
◆ যিনা ও চুরির পরও জান্নাতের সুসংবাদ
আবু যর গিফারী রা. বিস্ময়ে বারবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, আর নবী সা. প্রতিবারই একই সুসংবাদ দিয়েছিলেন। বুখারীর বর্ণনায় পুরো ঘটনাটি এসেছে এভাবে:
আবু যর রা.-এর প্রশ্ন ও নবীজির উত্তর
أَتَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَعَلَيْهِ ثَوْبٌ أَبْيَضُ وَهُوَ نَائِمٌ، ثُمَّ أَتَيْتُهُ وَقَدِ اسْتَيْقَظَ، فَقَالَ: مَا مِنْ عَبْدٍ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ثُمَّ مَاتَ عَلَى ذَلِكَ إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ. قُلْتُ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ؟ قَالَ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ. قُلْتُ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ؟ قَالَ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ. قُلْتُ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ؟ قَالَ: وَإِنْ زَنَى وَإِنْ سَرَقَ، عَلَى رَغْمِ أَنْفِ أَبِي ذَرٍّ
অনুবাদ: আমি নবী সা.-এর কাছে এলাম। তাঁর গায়ে ছিল সাদা কাপড়, তিনি তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। পরে আবার এলাম, তিনি জেগে উঠেছেন। তিনি বললেন, যে বান্দা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলে এবং এর উপর মারা যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আমি বললাম, সে যদি যিনা করে এবং চুরি করে, তবুও? তিনি বললেন, যিনা করলেও এবং চুরি করলেও। আমি আবার বললাম, যিনা করলেও এবং চুরি করলেও? তিনি বললেন, যিনা করলেও এবং চুরি করলেও। আমি তৃতীয়বার বললাম, যিনা করলেও এবং চুরি করলেও? তিনি বললেন, যিনা করলেও এবং চুরি করলেও, আবু যরের নাক ধুলোয় মলিন হলেও। -সহীহ বুখারী ৫৮২৭; সহীহ মুসলিম ৯৪ | মান: সহীহ
আলেমগণ এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে এসব গুনাহের কোনো শাস্তি নেই। বরং এর অর্থ হলো, তাওহীদের উপর মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি পরিণামে জান্নাতেই যাবে, হয় আল্লাহর ক্ষমায় সরাসরি, নয়তো গুনাহ অনুযায়ী শাস্তি ভোগের পর। শেষ ঠিকানা জাহান্নাম নয়।
আকাবার রাতে যাঁরা রাসূলুল্লাহ সা.-এর হাতে বাইয়াত করেছিলেন, উবাদা ইবনুস সামিত রা. ছিলেন তাঁদের একজন। সেই বাইয়াতের কথা ও তার পরের সুসংবাদ তিনি এভাবে বর্ণনা করেন:
গুনাহ আল্লাহর ইচ্ছাধীন
بَايِعُونِي عَلَى أَنْ لَا تُشْرِكُوا بِاللَّهِ شَيْئًا، وَلَا تَسْرِقُوا، وَلَا تَزْنُوا، وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ، وَلَا تَأْتُوا بِبُهْتَانٍ تَفْتَرُونَهُ بَيْنَ أَيْدِيكُمْ وَأَرْجُلِكُمْ، وَلَا تَعْصُوا فِي مَعْرُوفٍ، فَمَنْ وَفَى مِنْكُمْ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا فَعُوقِبَ فِي الدُّنْيَا فَهُوَ كَفَّارَةٌ لَهُ، وَمَنْ أَصَابَ مِنْ ذَلِكَ شَيْئًا ثُمَّ سَتَرَهُ اللَّهُ فَهُوَ إِلَى اللَّهِ، إِنْ شَاءَ عَفَا عَنْهُ وَإِنْ شَاءَ عَاقَبَهُ
অনুবাদ: তোমরা আমার হাতে এই মর্মে বাইয়াত করো যে, আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, যিনা করবে না, নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবে না, নিজেদের হাত-পায়ের সামনে কোনো মিথ্যা অপবাদ রচনা করবে না এবং ন্যায়সংগত কাজে অবাধ্য হবে না। তোমাদের যে এই অঙ্গীকার পূর্ণ করবে, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে। আর যে এসবের কোনোটিতে লিপ্ত হয়ে দুনিয়াতে শাস্তি পাবে, তা তার জন্য কাফফারা। আর যে এসবের কোনোটিতে লিপ্ত হলো, তারপর আল্লাহ তা গোপন রাখলেন, তার বিষয় আল্লাহর হাতে। তিনি চাইলে ক্ষমা করবেন, চাইলে শাস্তি দেবেন। বর্ণনাকারী: উবাদা ইবনুস সামিত রা. -সহীহ বুখারী ১৮; সহীহ মুসলিম ১৭০৯ | মান: সহীহ
◆ আহলুস সুন্নাহর আকীদা ও বিভ্রান্ত মত
সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং পরবর্তী যুগের আহলুস সুন্নাহর আলেমগণ এই বিষয়ে একমত। ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবী রহ. উম্মতের এই আকীদাকে সংক্ষেপে এভাবে লিখেছেন:
وَأَهْلُ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم فِي النَّارِ لَا يَخْلُدُونَ، إِذَا مَاتُوا وَهُمْ مُوَحِّدُونَ، وَإِنْ لَمْ يَكُونُوا تَائِبِينَ، بَعْدَ أَنْ لَقُوا اللَّهَ عَارِفِينَ مُؤْمِنِينَ، وَهُمْ فِي مَشِيئَتِهِ وَحُكْمِهِ، إِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُمْ وَعَفَا عَنْهُمْ بِفَضْلِهِ، كَمَا ذَكَرَ عَزَّ وَجَلَّ فِي كِتَابِهِ: وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ، وَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُمْ فِي النَّارِ بِعَدْلِهِ، ثُمَّ يُخْرِجُهُمْ مِنْهَا بِرَحْمَتِهِ وَشَفَاعَةِ الشَّافِعِينَ مِنْ أَهْلِ طَاعَتِهِ، ثُمَّ يَبْعَثُهُمْ إِلَى جَنَّتِهِ
অর্থাৎ মুহাম্মাদ সা.-এর উম্মতের কবীরা গুনাহকারীরা তাওহীদের উপর মারা গেলে জাহান্নামে প্রবেশ করলেও চিরস্থায়ী হবে না, এমনকি তারা তাওবা না করে থাকলেও, যদি আল্লাহকে চিনে ও ঈমান নিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে। তারা আল্লাহর ইচ্ছা ও ফয়সালার অধীন। তিনি চাইলে নিজ অনুগ্রহে তাদের ক্ষমা করবেন, যেমন তিনি কিতাবে বলেছেন, “এর চেয়ে নিচের গুনাহ তিনি যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করেন”। আর চাইলে নিজ ন্যায়বিচারে তাদের জাহান্নামে শাস্তি দেবেন, তারপর নিজ রহমতে এবং তাঁর অনুগত শাফায়াতকারীদের সুপারিশে তাদের সেখান থেকে বের করবেন, অতঃপর তাদের জান্নাতে পাঠাবেন। -আল-আকীদাতুত তাহাবিয়্যাহ
এর বিপরীতে যারা বলে কবীরা গুনাহকারী চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, তারা প্রাচীন খারেজী ও মুতাযিলা সম্প্রদায়ের পথে হাঁটছে। খারেজীরা কবীরা গুনাহকারীকে কাফির বলত এবং তাদের রক্ত হালাল মনে করত। মুতাযিলারা তাকে ঈমান ও কুফরের মাঝামাঝি এক অবস্থানে রাখত, কিন্তু পরকালে তার জন্য চিরস্থায়ী জাহান্নাম সাব্যস্ত করত। কুরআন ও সুন্নাহর অসংখ্য দলিল এই উভয় মতের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেয়। এ কারণেই উম্মতের সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম একে ভ্রান্ত মত বলে সাব্যস্ত করেছেন।
◆ তাওবার দরজা এখনো খোলা
এতক্ষণ আমরা পরকালের বিচারের কথা বললাম। কিন্তু একজন মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সুসংবাদ হলো, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাওবার দরজা খোলা। আল্লাহ তাআলা এমন বান্দাদের ডেকে বলছেন, যারা নিজেদের উপর সীমালঙ্ঘন করেছে:
নিরাশ হয়ো না
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
অনুবাদ: বলুন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের উপর সীমালঙ্ঘন করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। -সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩
লক্ষ করুন, আল্লাহ এখানে “হে আমার বান্দারা” বলে ডেকেছেন। গুনাহগার হয়ে যাওয়ার পরও তিনি তাদের নিজের বান্দা বলে সম্বোধন করছেন। এই ডাকের মধ্যে যে আদর, যে টান, তা কোনো গুনাহগারের হৃদয়কে না ছুঁয়ে পারে না। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, যারা অনেক হত্যা ও ব্যভিচার করেছিল, তারা এসে নবী সা.-কে বলল, আপনি যা বলেন তা তো উত্তম, কিন্তু আমাদের কি কোনো কাফফারা আছে? তখন সূরা ফুরকানের আয়াত নাযিল হয়, যা এই পথের ঠিকানা বলে দেয় (সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর, সূরা ফুরকান; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান)।
গুনাহ নেকীতে বদলে যায়
وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ يَلْقَ أَثَامًا يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيهِ مُهَانًا إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا
অনুবাদ: আর যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহকে ডাকে না, আল্লাহ যে প্রাণ হরণ নিষিদ্ধ করেছেন তা ন্যায়সংগত কারণ ছাড়া হত্যা করে না এবং যিনা করে না। যে এসব করবে সে শাস্তির সম্মুখীন হবে। কিয়ামতের দিন তার শাস্তি দ্বিগুণ করা হবে এবং সে লাঞ্ছিত অবস্থায় সেখানে স্থায়ী হবে। তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। -সূরা আল-ফুরকান ২৫:৬৮-৭০
লক্ষ করুন, এই আয়াতে শিরক, হত্যা ও যিনা একসাথে বলা হয়েছে, আর তার ঠিক পরেই তাওবার দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ যে ঘোর অপরাধী, তার জন্যও আল্লাহর ডাক ফুরিয়ে যায়নি।
একটু থামুন। আল্লাহ শুধু গুনাহ মাফ করেই ক্ষান্ত নন, তিনি তাওবাকারীর গুনাহের জায়গায় নেকী লিখে দেন। যে কাগজে একদিন কালো দাগ ছিল, সেখানে আজ সোনালি অক্ষরে নেকী লেখা হচ্ছে। এর চেয়ে বড় দয়ার কথা আর কী হতে পারে?
আল্লাহ তাঁর খাঁটি বান্দাদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে, যারা ভুল করার পর ফিরে আসে:
ভুলের পর ফিরে আসা বান্দা
وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَن يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَىٰ مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ أُولَٰئِكَ جَزَاؤُهُم مَّغْفِرَةٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَجَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا وَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ
অনুবাদ: তারা এমন যে, কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা নিজেদের উপর জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা চায়। আল্লাহ ছাড়া আর কে গুনাহ ক্ষমা করতে পারে? আর তারা জেনেশুনে নিজেদের কৃতকর্মে অটল থাকে না। তাদের প্রতিদান তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং জান্নাত, যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আমলকারীদের প্রতিদান কতই না উত্তম! -সূরা আলে ইমরান ৩:১৩৫-১৩৬
রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের শুনিয়েছেন এমন এক ব্যক্তির কাহিনী, যার হাত একশ মানুষের রক্তে রাঙানো, তবু যার ভেতরের অনুতাপ মরে যায়নি। পুরো ঘটনাটি এই:
একশ হত্যাকারীর তাওবা
كَانَ فِيمَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ رَجُلٌ قَتَلَ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ نَفْسًا، فَسَأَلَ عَنْ أَعْلَمِ أَهْلِ الْأَرْضِ، فَدُلَّ عَلَى رَاهِبٍ، فَأَتَاهُ فَقَالَ: إِنَّهُ قَتَلَ تِسْعَةً وَتِسْعِينَ نَفْسًا فَهَلْ لَهُ مِنْ تَوْبَةٍ؟ فَقَالَ: لَا. فَقَتَلَهُ فَكَمَّلَ بِهِ مِائَةً. ثُمَّ سَأَلَ عَنْ أَعْلَمِ أَهْلِ الْأَرْضِ، فَدُلَّ عَلَى رَجُلٍ عَالِمٍ، فَقَالَ: إِنَّهُ قَتَلَ مِائَةَ نَفْسٍ فَهَلْ لَهُ مِنْ تَوْبَةٍ؟ فَقَالَ: نَعَمْ، وَمَنْ يَحُولُ بَيْنَهُ وَبَيْنَ التَّوْبَةِ؟ انْطَلِقْ إِلَى أَرْضِ كَذَا وَكَذَا، فَإِنَّ بِهَا أُنَاسًا يَعْبُدُونَ اللَّهَ فَاعْبُدِ اللَّهَ مَعَهُمْ، وَلَا تَرْجِعْ إِلَى أَرْضِكَ فَإِنَّهَا أَرْضُ سَوْءٍ. فَانْطَلَقَ حَتَّى إِذَا نَصَفَ الطَّرِيقَ أَتَاهُ الْمَوْتُ، فَاخْتَصَمَتْ فِيهِ مَلَائِكَةُ الرَّحْمَةِ وَمَلَائِكَةُ الْعَذَابِ، فَقَالَتْ مَلَائِكَةُ الرَّحْمَةِ: جَاءَ تَائِبًا مُقْبِلًا بِقَلْبِهِ إِلَى اللَّهِ. وَقَالَتْ مَلَائِكَةُ الْعَذَابِ: إِنَّهُ لَمْ يَعْمَلْ خَيْرًا قَطُّ. فَأَتَاهُمْ مَلَكٌ فِي صُورَةِ آدَمِيٍّ فَجَعَلُوهُ بَيْنَهُمْ، فَقَالَ: قِيسُوا مَا بَيْنَ الْأَرْضَيْنِ فَإِلَى أَيَّتِهِمَا كَانَ أَدْنَى فَهُوَ لَهُ. فَقَاسُوهُ فَوَجَدُوهُ أَدْنَى إِلَى الْأَرْضِ الَّتِي أَرَادَ، فَقَبَضَتْهُ مَلَائِكَةُ الرَّحْمَةِ
অনুবাদ: তোমাদের পূর্বের যুগে এক লোক ছিল, যে নিরানব্বইটি প্রাণ হত্যা করেছিল। সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেমের খোঁজ করল। তাকে এক আবেদের কাছে পাঠানো হলো। সে তাকে বলল, আমি নিরানব্বইটি প্রাণ হত্যা করেছি, আমার কি তাওবা আছে? আবেদ বলল, না। তখন সে তাকে হত্যা করে একশ পূর্ণ করল। তারপর আবার পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেমের খোঁজ করল। তাকে একজন আলেমের কাছে পাঠানো হলো। সে বলল, আমি একশ প্রাণ হত্যা করেছি, আমার কি তাওবা আছে? আলেম বললেন, হ্যাঁ, তার ও তাওবার মাঝে কে বাধা হতে পারে? তুমি অমুক অমুক জনপদে যাও। সেখানে কিছু মানুষ আল্লাহর ইবাদত করে, তুমিও তাদের সাথে ইবাদত করো। আর নিজের এলাকায় ফিরে যেয়ো না, কারণ তা মন্দ জায়গা। লোকটি রওনা হলো। অর্ধেক পথ যেতেই তার মৃত্যু এসে গেল। তখন রহমতের ফেরেশতা ও আযাবের ফেরেশতা তাকে নিয়ে বিতর্ক করল। রহমতের ফেরেশতারা বলল, সে তাওবা করে অন্তর নিয়ে আল্লাহর দিকে এগিয়ে এসেছে। আযাবের ফেরেশতারা বলল, সে কখনো কোনো ভালো কাজ করেনি। তখন মানুষের আকৃতিতে একজন ফেরেশতা এলেন এবং তাঁকে তাদের মধ্যে বিচারক মানা হলো। তিনি বললেন, দুই জনপদের দূরত্ব মেপে দেখো, সে যেটির কাছে, সে তারই। তারা মেপে দেখল, সে যেখানে যেতে চেয়েছিল সেই জনপদের কাছেই। তখন রহমতের ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে গেলেন। বর্ণনাকারী: আবু সাঈদ খুদরী রা. -সহীহ মুসলিম ২৭৬৬; সহীহ বুখারী ৩৪৭০ (অনুরূপ) | মান: সহীহ
একশ মানুষের রক্তে হাত রাঙানো এক ব্যক্তি, তবু তাওবার পথে হাঁটা শুরু করতেই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করলেন। এখান থেকে আমরা শিখি, গুনাহ যত বড়ই হোক, আল্লাহর ক্ষমার তুলনায় তা সামান্য। শুধু ফিরে আসার সদিচ্ছা থাকতে হবে।
আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার তাওবার জন্য কতটা অপেক্ষা করেন, তা রাসূলুল্লাহ সা. এভাবে বলেছেন:
আল্লাহ হাত প্রসারিত করে রাখেন
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَبْسُطُ يَدَهُ بِاللَّيْلِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ النَّهَارِ، وَيَبْسُطُ يَدَهُ بِالنَّهَارِ لِيَتُوبَ مُسِيءُ اللَّيْلِ، حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا
অনুবাদ: আল্লাহ তাআলা রাতে নিজের হাত প্রসারিত করেন, যাতে দিনের অপরাধী তাওবা করে। আর দিনে নিজের হাত প্রসারিত করেন, যাতে রাতের অপরাধী তাওবা করে। এ ধারা চলতে থাকবে সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়া পর্যন্ত। বর্ণনাকারী: আবু মূসা আশআরী রা. -সহীহ মুসলিম ২৭৫৯ | মান: সহীহ
সবশেষে সেই হাদীসে কুদসী, যা পড়ে কোনো গুনাহগার আর নিরাশ থাকতে পারে না। আনাস রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন:
পৃথিবীভরা গুনাহের বিনিময়ে পৃথিবীভরা ক্ষমা
قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: يَا ابْنَ آدَمَ، إِنَّكَ مَا دَعَوْتَنِي وَرَجَوْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ عَلَى مَا كَانَ مِنْكَ وَلَا أُبَالِي. يَا ابْنَ آدَمَ، لَوْ بَلَغَتْ ذُنُوبُكَ عَنَانَ السَّمَاءِ ثُمَّ اسْتَغْفَرْتَنِي غَفَرْتُ لَكَ وَلَا أُبَالِي. يَا ابْنَ آدَمَ، إِنَّكَ لَوْ أَتَيْتَنِي بِقُرَابِ الْأَرْضِ خَطَايَا ثُمَّ لَقِيتَنِي لَا تُشْرِكُ بِي شَيْئًا لَأَتَيْتُكَ بِقُرَابِهَا مَغْفِرَةً
অনুবাদ: আল্লাহ তাআলা বলেন, হে আদমসন্তান, তুমি যতক্ষণ আমাকে ডাকবে এবং আমার কাছে আশা রাখবে, তোমার যা কিছুই ঘটে থাকুক, আমি তোমাকে ক্ষমা করব, আর আমি পরোয়া করি না। হে আদমসন্তান, তোমার গুনাহ যদি আকাশের মেঘমালা পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তারপর তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করব, আর আমি পরোয়া করি না। হে আদমসন্তান, তুমি যদি পৃথিবীভরা গুনাহ নিয়েও আমার সামনে আস, তবে শর্ত হলো আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না, আমি তোমার কাছে আসব সেই পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে। বর্ণনাকারী: আনাস রা. -জামে তিরমিযী ৩৫৪০ | মান: হাসান
পৃথিবীভরা গুনাহের বিপরীতে পৃথিবীভরা ক্ষমা। শর্ত শুধু একটি: আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করা। এই একটি শর্তই প্রমাণ করে, তাওহীদই মুক্তির ভিত্তি।
◆ গুনাহের বোঝা নিয়ে আল্লাহর দিকে ফেরা
রহমতের এই সুসংবাদ শুনে কেউ যেন গুনাহকে হালকা না ভাবে। প্রকৃত মুমিনের অবস্থা কেমন হয়, তা বর্ণনা করেছেন সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.:
পাহাড়ের নিচে বসা মানুষের ভয়
إِنَّ الْمُؤْمِنَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَأَنَّهُ قَاعِدٌ تَحْتَ جَبَلٍ يَخَافُ أَنْ يَقَعَ عَلَيْهِ، وَإِنَّ الْفَاجِرَ يَرَى ذُنُوبَهُ كَذُبَابٍ مَرَّ عَلَى أَنْفِهِ فَقَالَ بِهِ هَكَذَا
অনুবাদ: মুমিন তার গুনাহকে এমনভাবে দেখে, যেন সে একটি পাহাড়ের নিচে বসে আছে এবং ভয় পাচ্ছে পাহাড়টি তার উপর ভেঙে পড়বে। আর পাপাচারী তার গুনাহকে দেখে একটি মাছির মতো, যা তার নাকের উপর দিয়ে উড়ে গেল, সে হাত দিয়ে এভাবে তাড়িয়ে দিল। -সহীহ বুখারী ৬৩০৮ (ইবনে মাসউদ রা.-এর বাণী) | মান: সহীহ
এই ভয়ই মুমিনকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং ভুল হয়ে গেলে আল্লাহর দিকে ছুটিয়ে নিয়ে যায়। আলেমগণ তাওবা কবুলের শর্ত হিসেবে বলেছেন, প্রথমে গুনাহ ছেড়ে দিতে হবে, কৃতকর্মের জন্য অন্তরে অনুতপ্ত হতে হবে এবং ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। গুনাহটি কোনো মানুষের হকের সাথে জড়িত হলে তার হক ফিরিয়ে দিতে হবে বা ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে (ইমাম নববী, রিয়াযুস সালিহীন, তাওবা অধ্যায়)।
সতর্কবার্তা
ক্ষমার আশা নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করে যাওয়া আল্লাহর পাকড়াও থেকে নির্ভয় হওয়ার শামিল। কবীরা গুনাহের জন্য জাহান্নামের শাস্তি সত্য। জাহান্নামের এক মুহূর্তের আযাবও সহ্য করার নয়। আল্লাহ ক্ষমা করবেন কি না, সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। তাই মুমিনের কাজ হলো ভয় ও আশার মাঝখানে থেকে দ্রুত তাওবা করা এবং নেক আমলে নিজেকে ব্যস্ত রাখা।
◆ যাঁরা এই মত প্রচার করেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে দরদভরা কিছু কথা
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, যাঁরা কবীরা গুনাহকারীকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী বলে প্রচার করেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে এই কথাগুলো লিখছি কোনো তর্কের জন্য নয়, ভালোবাসা ও শুভকামনা থেকে। আমরা ধরে নিই, আপনাদের নিয়ত ভালো। আপনারা গুনাহের ভয়াবহতা মানুষকে জানাতে চান, মানুষ যেন আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে ফিরে আসে, এই আকুলতা থেকেই আপনাদের কথা বলা। এই দরদ ও আল্লাহভীতি অবশ্যই মূল্যবান। আমরা সবাই গুনাহগার, আমাদের কেউই নিজেকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করতে পারি না। তাই আসুন, দুজন ভাই পাশাপাশি বসে যেভাবে আলাপ করে, সেভাবে কয়েকটি বিষয় ভেবে দেখি।
এক. ভয়ের সাথে আশা না থাকলে মানুষ ভেঙে পড়ে
গুনাহের ভয় দেখানো দীনের অংশ। কিন্তু ভয়ের সাথে আশা না থাকলে তা মানুষকে সংশোধন করে না, ভেঙে দেয়। যে বান্দাকে বলা হয়, তোমার তাওবাতেও লাভ নেই, তুমি চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, সে ভাবে, তাহলে আর চেষ্টা করে কী হবে? এভাবে আমাদের অজান্তেই আমরা একজন দুর্বল মুমিনকে গুনাহের আরও গভীরে ঠেলে দিই। অথচ আল্লাহ নবী ইয়াকুব আ.-এর মুখে আমাদের শিখিয়েছেন:
নিরাশা কাফিরদের স্বভাব
يَا بَنِيَّ اذْهَبُوا فَتَحَسَّسُوا مِن يُوسُفَ وَأَخِيهِ وَلَا تَيْأَسُوا مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ
অনুবাদ: হে আমার পুত্ররা, তোমরা যাও, ইউসুফ ও তার ভাইয়ের খোঁজ নাও এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। কাফির সম্প্রদায় ছাড়া কেউ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না। -সূরা ইউসুফ ১২:৮৭
দুই. দলিলগুলো একসাথে পড়লে সুন্দর সামঞ্জস্য ফুটে ওঠে
আপনারা যেসব আয়াতকে দলিল হিসেবে পেশ করেন, যেমন সূরা নিসার ৯৩ নম্বর আয়াত, সেগুলোর মর্যাদা আমরা অস্বীকার করি না। প্রশ্ন শুধু বোঝার পদ্ধতির। কুরআনের এক অংশ অন্য অংশের ব্যাখ্যা করে, আর সুন্নাহ কুরআনের ব্যাখ্যা দেয়। একদিকে আছে “খালিদীনা ফীহা”-র আয়াত, অন্যদিকে আছে সূরা নিসার ৪৮ নম্বর আয়াত এবং সেই সহীহ হাদীসসমূহ, যেখানে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমানওয়ালাকেও জাহান্নাম থেকে বের করে আনার কথা আছে। এই দুই শ্রেণির দলিল একসাথে রাখলে সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তী আলেমগণের বোঝা পথেই সামঞ্জস্য হয়, যা আমরা আগে আলোচনা করেছি। এক শ্রেণির দলিল নিয়ে অন্য শ্রেণিকে বাদ দিলে কুরআন-সুন্নাহর সুসমন্বিত রূপ হারিয়ে যায়।
আমরা বিনীতভাবে অনুরোধ করব, ইমাম তাহাবীর আকীদা, ইমাম নববীর সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যা এবং ইবনে কাসীরের তাফসীরে এই আয়াত ও হাদীসগুলোর আলোচনা একবার মনোযোগ দিয়ে পড়ে দেখুন। আর নির্ভরযোগ্য আলেমদের সাথে খোলা মনে বসুন। সত্যের সামনে মাথা নত করার মধ্যেই আলেমের প্রকৃত সৌন্দর্য।
তিন. তাকফীরের ভয়াবহ পরিণতি
এই মতের সবচেয়ে গুরুতর পরিণতি হলো, কবীরা গুনাহকারীকে ঈমানহীন বা কাফির বলার দিকে এগিয়ে যাওয়া। রাসূলুল্লাহ সা. এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন:
ভাইকে কাফির বলার পরিণতি
أَيُّمَا رَجُلٍ قَالَ لِأَخِيهِ: يَا كَافِرُ، فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا، إِنْ كَانَ كَمَا قَالَ وَإِلَّا رَجَعَتْ عَلَيْهِ
অনুবাদ: কোনো ব্যক্তি যদি তার ভাইকে বলে, হে কাফির, তবে তাদের দুজনের একজনের উপর তা বর্তায়। সে যদি তা-ই হয় যা সে বলেছে (তাহলে ঠিক), অন্যথায় কথাটি বক্তার দিকেই ফিরে আসে। বর্ণনাকারী: আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. -সহীহ বুখারী ৬১০৪; সহীহ মুসলিম ৬০ | মান: সহীহ
তাই যে ধারণা মানুষকে মুসলিম ভাইয়ের ঈমান নিয়ে সন্দেহের দিকে নিয়ে যায়, তা থেকে অত্যন্ত সতর্ক থাকা দরকার।
চার. নববী দাওয়াতের কোমলতা
রাসূলুল্লাহ সা. গুনাহগারদের সাথে কেমন আচরণ করেছেন, একটু ভাবুন। এক সাহাবী বারবার মদ পান করে ধরা পড়তেন এবং শাস্তি পেতেন। একদিন এক লোক তাকে লানত করল। তখন নবী সা. যা বললেন:
গুনাহগার সাহাবীর প্রতি নবীজির আচরণ
أَنَّ رَجُلًا كَانَ يُدْعَى عَبْدَ اللَّهِ، وَكَانَ يُلَقَّبُ حِمَارًا، وَكَانَ يُضْحِكُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم، وَكَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم قَدْ جَلَدَهُ فِي الشَّرَابِ، فَأُتِيَ بِهِ يَوْمًا فَأَمَرَ بِهِ فَجُلِدَ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ: اللَّهُمَّ الْعَنْهُ، مَا أَكْثَرَ مَا يُؤْتَى بِهِ. فَقَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم: لَا تَلْعَنُوهُ، فَوَاللَّهِ مَا عَلِمْتُ إِنَّهُ يُحِبُّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ
অনুবাদ: আব্দুল্লাহ নামের এক ব্যক্তি, যাকে “হিমার” উপাধি দেওয়া হতো, সে রাসূলুল্লাহ সা.-কে হাসাত। নবী সা. মদ পানের অপরাধে তাকে বেত্রাঘাত করেছিলেন। একদিন তাকে আবার আনা হলো এবং নির্দেশ দেওয়া হলো, ফলে তাকে বেত্রাঘাত করা হলো। উপস্থিত লোকদের একজন বলল, হে আল্লাহ, তার উপর লানত করুন, তাকে কতবার আনা হচ্ছে! তখন নবী সা. বললেন, তাকে লানত করো না। আল্লাহর কসম, আমি তো জানি সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে। বর্ণনাকারী: উমর ইবনুল খাত্তাব রা. -সহীহ বুখারী ৬৭৮০ | মান: সহীহ
বারবার কবীরা গুনাহে ধরা পড়া মানুষটি সম্পর্কেও নবীজির ঘোষণা ছিল ভালোবাসার। তিনি তাকে ঈমানের বৃত্ত থেকে বের করে দেননি, বরং তার অন্তরে আল্লাহ ও রাসূলের ভালোবাসার সাক্ষ্য দিয়েছেন। এই কোমলতাই আল্লাহ আমাদের দাওয়াতের পদ্ধতি হিসেবে শিখিয়েছেন:
হিকমত ও উত্তম উপদেশের পথ
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
অনুবাদ: আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন উত্তম পদ্ধতিতে। নিশ্চয়ই আপনার রবই ভালো জানেন কে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, আর তিনিই ভালো জানেন কারা হেদায়াতপ্রাপ্ত। -সূরা আন-নাহল ১৬:১২৫
সহজ করো, সুসংবাদ দাও
يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا، وَبَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا
অনুবাদ: তোমরা সহজ করো, কঠিন করো না। সুসংবাদ দাও, মানুষকে বিতাড়িত করো না। বর্ণনাকারী: আনাস রা. -সহীহ বুখারী ৬৯; সহীহ মুসলিম ১৭৩৪ | মান: সহীহ
শেষ আবেদন
আমরা আপনাদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ রাখি না। আমরা চাই, আপনাদের সেই আন্তরিকতা ও আল্লাহভীতি সঠিক জ্ঞানের আলোয় আরও সুন্দর ফল দিক। আপনাদের বক্তব্যে গুনাহের ভয়াবহতা থাকুক, আর সেই সাথে থাকুক রহমতের সুসংবাদ ও তাওবার আহ্বান। তাহলে যে ভাঙা মানুষটি আজ আপনাদের কথা শুনছে, সে নিরাশ হয়ে ফিরে যাবে না, বরং অশ্রুভেজা চোখে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসবে। আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, সঠিক পথ বুঝে চলার তাওফীক দিন এবং আমাদের সবাইকে সিরাতে মুস্তাকীমের উপর অটল রাখুন। আমীন।
◆ উপসংহার: ফিরে আসার ডাক
কবীরা গুনাহকারী মুমিন চিরকাল জাহান্নামে থাকবে, এ কথা সঠিক নয়। তাওহীদের উপর মৃত্যুবরণকারী মুমিনের পরিণাম জান্নাত। আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করবেন, চাইলে গুনাহ অনুযায়ী শাস্তি দিয়ে পরে জাহান্নাম থেকে বের করে আনবেন। চিরস্থায়ী জাহান্নাম কেবল কাফির ও মুশরিকদের জন্য।
তাই যে ভাই বা বোন আজ অতীতের কোনো ভুলে ভেঙে পড়েছেন, তাকে বলি, নিরাশ হবেন না। শয়তান চায় আপনি ভাবুন, আপনার জন্য আর কোনো দরজা খোলা নেই। অথচ আপনার প্রভুর দরজা এখনো খোলা। তিনি রাতে হাত বাড়িয়ে আপনার অপেক্ষায় আছেন। উঠুন, অযু করুন, দুই রাকআত নামায পড়ুন এবং সেই প্রথম মানুষ আদম আ.-এর ভাষায় আল্লাহকে ডাকুন:
আদম আ.-এর দুআ
قَالَا رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
অনুবাদ: তাঁরা দুজন (আদম ও হাওয়া আ.) বললেন, হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের উপর জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব। -সূরা আল-আরাফ ৭:২৩
আর ক্ষমার সবচেয়ে সুন্দর আবেদনটি রাসূলুল্লাহ সা. আম্মাজান আয়েশা রা.-কে শিখিয়েছিলেন, যা ছোট্ট অথচ বিশাল:
ক্ষমার সবচেয়ে সুন্দর দুআ
قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَرَأَيْتَ إِنْ عَلِمْتُ أَيُّ لَيْلَةٍ لَيْلَةُ الْقَدْرِ مَا أَقُولُ فِيهَا؟ قَالَ: قُولِي: اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
অনুবাদ: আয়েশা রা. বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি যদি জানতে পারি কোন রাতটি লাইলাতুল কদর, তাহলে সেই রাতে কী বলব? তিনি বললেন, তুমি বলো: হে আল্লাহ, আপনি অতি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। -জামে তিরমিযী ৩৫১৩; সুনানে ইবনে মাজাহ ৩৮৫০ | মান: সহীহ
আল্লাহ আমাদের সবাইকে গুনাহ থেকে বাঁচার তাওফীক দিন, ভুল হয়ে গেলে খাঁটি তাওবার সাথে তাঁর দিকে ফিরে আসার সৌভাগ্য দিন এবং তাওহীদ ও ঈমানের উপর মৃত্যু দান করুন। আমীন।
◆ সূত্রসমূহ
১. আল-কুরআনুল কারীম: সূরা আলে ইমরান ৩:১৩৫-১৩৬; সূরা নিসা ৪:৩১, ৪:৪৮, ৪:৯৩, ৪:১১৬; সূরা মায়েদা ৫:৭২; সূরা আরাফ ৭:২৩; সূরা ইউসুফ ১২:৮৭; সূরা হিজর ১৫:৪৯-৫০; সূরা নাহল ১৬:১২৫; সূরা ফুরকান ২৫:৬৮-৭০; সূরা যুমার ৩৯:৫৩
২. সহীহ বুখারী: হাদীস ১৮, ২২, ৪৪, ৬৯, ২৭৬৬, ৩৪৭০, ৫৮২৭, ৫৯৯৯, ৬০০০, ৬১০৪, ৬৩০৮, ৬৫৬০, ৬৭৮০; কিতাবুত তাফসীর (সূরা ফুরকান)
৩. সহীহ মুসলিম: হাদীস ৬০, ৮৯, ৯৪, ১৮৪, ১৯৩, ১৭০৯, ২৭৫২, ২৭৫৪, ২৭৫৯, ২৭৬৬, ১৭৩৪; কিতাবুল ঈমান
৪. সুনানে আবু দাউদ: হাদীস ৪৭৩৯
৫. জামে তিরমিযী: হাদীস ২৪৩৫, ৩৫১৩, ৩৫৪০
৬. সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস ৩৮৫০, ৪৩১০
৭. আল-আকীদাতুত তাহাবিয়্যাহ, ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবী রহ.
৮. রিয়াযুস সালিহীন, ইমাম নববী রহ.: তাওবা অধ্যায়
৯. তাফসীরে ইবনে কাসীর: সূরা নিসা ৪:৪৮, ৪:৯৩; সূরা ফুরকান ২৫:৭০; সূরা যুমার ৩৯:৫৩
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



