somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গাধা উন্নয়ন প্রকল্প এবং একটি ভালো কলেজের গল্প

০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নটর ডেম কলেজে আমাদের সময় একটা প্রকল্প ছিল। নাম ‘অ্যাস ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’, সংক্ষেপে এডিপি। বাংলায় বললে ‘গাধা উন্নয়ন প্রকল্প’। নাম শুনে মনে হতে পারে, কোনো প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচি। বাস্তবে এটি ছিল কলেজের পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের গণিতে উন্নতি করার ব্যবস্থা।

নামটা কলেজ কর্তৃপক্ষের দেওয়া ছিল, নাকি ছাত্রদের নিজেদের উদ্ভাবন, সাতাশ বছর পর আর নিশ্চিত করে বলতে পারব না। তবে নামটা যে আমাদের মধ্যে বেশ চালু ছিল, তা মনে আছে। আর সেই ক্লাসগুলোর কথা তো আরও ভালোভাবেই মনে আছে।

১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত নটর ডেম কলেজে পড়েছি। আমরা ১৯৯৯ ব্যাচ। বিজ্ঞান বিভাগের গ্রুপ টু-তে ছিলাম। প্রথম বর্ষ থেকে দ্বিতীয় বর্ষে ওঠার সময় গণিত পরীক্ষায় আমাদের বড় একটি অংশ ফেল করল। নটর ডেমের মতো কলেজে এত ছাত্র গণিতে ফেল করছে, ব্যাপারটা নিশ্চয়ই খুব সুখকর ছিল না।

কলেজ কর্তৃপক্ষ তখন এডিপি চালু করল। নিয়মিত ক্লাস শেষ হওয়ার পর আমাদের অতিরিক্ত গণিত ক্লাস করতে হতো।

আমাদের গণিতের শিক্ষক ছিলেন বিদ্যুৎ কুমার ভদ্র, যাঁকে আমরা বি সি ভদ্র নামে চিনতাম। তাঁর রসবোধ ছিল বেশ ধারালো। ছাত্রদের বিব্রত করতে তিনি বিশেষ কার্পণ্য করতেন না।

একদিন বললেন, ‘তোমরা যারা শূন্য পেয়েছ, তোমাদের নিয়ে আমার আশা বেশি। কারণ তোমরা মূলবিন্দুগামী। সবকিছুর শুরু তো মূলবিন্দু থেকেই। সমস্যা হচ্ছে যারা দশ-পনেরো পেয়েছ, তাদের নিয়ে। তোমরা জানোও, আবার জানোও না। তোমাদের নিয়ে এগোনো কঠিন।’

এত বছর পরও কথাগুলো মনে আছে। তখন নিশ্চয়ই খুব আনন্দ পাইনি। আজ ভাবলে হাসি পায়।

তবে এই গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ শিক্ষকের ব্যঙ্গ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, একটি কলেজ তার ফেল করা ছাত্রদের নিয়ে কী করেছিল।

তাদের বাদ দেয়নি। তাদের ব্যর্থতাকে কেবল ব্যক্তিগত অযোগ্যতা হিসেবে দেখেনি। বরং নিয়মিত পাঠদানের বাইরে অতিরিক্ত সময় ও শিক্ষক নিয়োগ করে তাদের উন্নতির ব্যবস্থা করেছিল।

এডিপির নামটি আজকের শিক্ষাদর্শের বিচারে আপত্তিকর মনে হতে পারে। দুর্বল শিক্ষার্থীকে ‘গাধা’ বলা কোনো আদর্শ পদ্ধতি নয়। শিক্ষকের ব্যঙ্গও সব ছাত্রের জন্য সমান কার্যকর বা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু নাম ও পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা সরিয়ে রাখলে এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত দেখা যায়—পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের জন্যও কলেজের দায়িত্ব আছে।

এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। এবারও নটর ডেম কলেজ ভালো করেছে। ২০২৬ সালে কলেজটির ৩ হাজার ২৫৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩ হাজার ২১৮ জন পাস করেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ২২৯ জন। পাসের হার ৯৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অন্যদিকে সারা দেশে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।

এমন ফলাফলে প্রশংসা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার আগ্রহ অন্য জায়গায়।

একটি কলেজ ধারাবাহিকভাবে ভালো করে কেন?

নটর ডেমের শিক্ষকরা কি দেশের সব শিক্ষকের চেয়ে বেশি মেধাবী? এমন দাবি করার ভিত্তি নেই। নটর ডেমের ছাত্ররাই কি বাংলাদেশের সবচেয়ে মেধাবী? সেটিও বলা যায় না।

অবশ্যই কলেজটি ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে ভালো প্রস্তুতি নিয়ে আসা শিক্ষার্থীদের বেছে নেওয়ার সুযোগ পায়। এই সুবিধাকে অস্বীকার করলে নটর ডেমের ফলাফল নিয়ে আলোচনা অসম্পূর্ণ থাকবে। সব কলেজ একই মানের শিক্ষার্থী পায় না, একই সম্পদও পায় না।

কিন্তু ভালো ছাত্র ভর্তি করানো আর দুই বছর পর ভালো ফলাফল নিশ্চিত করা এক কথা নয়।

মাধ্যমিকের দীর্ঘ শিক্ষাজীবন শেষে উচ্চমাধ্যমিকে এসে ছাত্রদের সামনে হাজির হয় তুলনামূলকভাবে কঠিন ও বিস্তৃত পাঠ্যক্রম। অথচ কার্যকর পাঠদানের সময় খুবই সীমিত। এর মধ্যে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে ছাত্রদের ওপর চাপ কম নয়।

এই পরিস্থিতিতে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা শুধু পাঠ্যবই শেষ করানো হতে পারে না। তাকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হয়, যেখানে ছাত্ররা পড়াশোনাকে গুরুত্ব দেবে, আবার পড়াশোনার বাইরেও নিজেদের সক্ষমতা আবিষ্কার করবে।

নটর ডেমের বিশেষত্ব সম্ভবত এখানেই।

কলেজটির অসংখ্য ক্লাব ও সহশিক্ষা কার্যক্রম আছে। বিজ্ঞান, বিতর্ক, প্রকৃতি অধ্যয়ন, দাবা, সাহিত্য, সংস্কৃতি—নানা বিষয়ে ছাত্ররা কাজ করে। এসব কার্যক্রম কেবল বার্ষিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বা সনদ সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই রয়েছে নিয়মিত সভা, প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ের কাজ, প্রকাশনা ও সাংগঠনিক দায়িত্ব।

আমি নিজে নটর ডেম নেচার স্টাডি ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্লাবটি বাংলাদেশের প্রকৃতি অধ্যয়নভিত্তিক সংগঠনগুলোর অন্যতম পথিকৃৎ। প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, মাঠপর্যায়ের কাজ, আলোকচিত্র, পরিবেশ নিয়ে পড়াশোনা—এসবের সঙ্গে কলেজজীবনেই পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

একজন ছাত্র গণিতে ভালো হতে পারে, অন্যজন বিতর্কে, কেউ সংগঠনে, কেউ প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে। ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে না। বরং এর মধ্য দিয়ে ছাত্রদের দায়িত্বশীল ও আত্মবিশ্বাসী হতে শেখায়।

আরও একটি বিষয় আছে, যা সংখ্যায় মাপা কঠিন। সেটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি।

নটর ডেমে পড়ার সময় একটা ধারণা ধীরে ধীরে ছাত্রদের মধ্যে তৈরি হয়—এখানে পড়াশোনাকে গুরুত্ব দিতে হয়। এখানে ভালো করার একটা প্রত্যাশা আছে। শিক্ষক, সহপাঠী, সিনিয়র, ক্লাব, কলেজের ইতিহাস—সব মিলিয়ে সেই প্রত্যাশা তৈরি করে।

এটি শুধু পরীক্ষায় ভালো করার চাপ নয়। বরং একটি প্রতিষ্ঠানের অংশ হওয়ার অনুভূতি। একধরনের যৌথ পরিচয়, যা কলেজ ছাড়ার বহু বছর পরও টিকে থাকে।

এই পরিচয়ের অবশ্য বিপদও আছে। প্রতিষ্ঠানের প্রতি গর্ব কখনো কখনো আত্মতুষ্টি কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানকে ছোট করে দেখার প্রবণতা তৈরি করতে পারে। সে কারণে নটর ডেমকে ব্যতিক্রমী বলে প্রশংসা করার চেয়ে বেশি জরুরি হলো, এর কার্যকর পদ্ধতিগুলো বোঝা।

বাংলাদেশে আরও অনেক ভালো কলেজ আছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ভালো কলেজের সংখ্যা আরও বেশি হচ্ছে না কেন?

প্রতিটি কলেজের পক্ষে নটর ডেমের মতো ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব নয়। সবার একই অবকাঠামো, অর্থ কিংবা শিক্ষকসংখ্যাও থাকবে না। কিন্তু নিয়মিত পাঠদানের প্রতি দায়বদ্ধতা, পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা, সহশিক্ষা কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া এবং শিক্ষক-ছাত্রের মধ্যে একটি কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলা—এসব কি অসম্ভব?

একটি কলেজের সাফল্য বিচার করতে হলে শুধু কতজন জিপিএ-৫ পেল, সেটি দেখলে চলবে না। দেখতে হবে, ভর্তি হওয়ার সময় একজন ছাত্র যেখানে ছিল, দুই বছর পর সেখান থেকে কতটা এগিয়েছে। যে ছাত্র আগে থেকেই ভালো ছিল, তাকে ভালো রাখা যেমন সাফল্য, তেমনি যে ছাত্র পিছিয়ে পড়েছিল, তাকে এগিয়ে নেওয়াও সাফল্য।

এমনকি পরীক্ষায় ভালো না করলেও একজন ছাত্র যদি অনুসন্ধিৎসু, দায়িত্বশীল ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে বেরিয়ে আসে, সেটিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্জন।

সাতাশ বছর আগে আমাদের গণিত পরীক্ষায় ব্যর্থতার পর নটর ডেম কলেজ যে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করেছিল, সেটি কোনো বৈপ্লবিক শিক্ষা সংস্কার ছিল না। কিন্তু এর মধ্যে একটি সহজ নীতি ছিল—ছাত্রের দুর্বলতা দেখলে তাকে আরও শেখানোর চেষ্টা করতে হবে।

আজ এইচএসসির ফলাফল নিয়ে যখন আমরা ভালো কলেজ, খারাপ কলেজ, জিপিএ-৫ আর পাসের হার নিয়ে আলোচনা করছি, তখন সেই পুরোনো ‘গাধা উন্নয়ন প্রকল্প’-এর কথাই মনে পড়ছে।

কারণ একটি ভালো কলেজের পরিচয় শুধু তার সেরা ছাত্রদের দিয়ে হয় না। এর ছাত্ররা তাদের কলেজের মান রক্ষার জন্য কি করে, সেটাও একটা ব্যপার হতে পারে।

প্রকাশিত : বিডিনিউজ২৪ ডট কম view this link

সর্বশেষ এডিট : ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এইচ এস সি রেজাল্ট ২০২৬ -ঢাকা বোর্ড

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৯

খুব অদ্ভুত ব্যাপার। আমাদের সময়ে চলে এলো নাকি? সেই চার দশক আগের মতন !
যা তথ্য পেলামঃ

In the 2026 HSC examinations, a total of 297,621 candidates appeared... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেখে শূন্য চাকত

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫২


কেমন করে সাজাও তুমি?
কলমের সাথে- খাতার প্রেম,
মাটির সাথে মৃত্যুর লাশ,
ঘাসের গায়ে ঘাসফড়িংর কাশ।
শেষ বিকালে ভাবনার সাথে
চিন্তার হয় রে অবকাশ-
সবিই যেনো শূন্যে প্রেমে আশ
হাত গুটানো-জীবনের নাশ;
বাস্তবতার হয় নির্দয় স্বার্থপর
সময়ের শুধুই... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের হ্যালোইন উদযাপন

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩


আজ ছিল হ্যালোইন। এই উৎসব ফসল কাটার মৌসুমের শেষ ও শীতের শুরু - এই উপলক্ষে হলেও বছরের এ সময়ে কানাডায় ঠান্ডা পড়ে যায়। তবে আজ আবহাওয়া ছিল ভালো। সারাদিন রোদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৫



সেই মেয়েটিকে খোঁজ....

ফরাসি ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বাক্য- Cherchez la femme। অর্থাৎ, ‘সেই মেয়েটিকে খোঁজ’।

ফরাসি লেখক আলেকজান্ডার ডুমা (Alexandre Dumas) ১৮৫৪ সালে তাঁর উপন্যাস Les Mohicans de Paris-এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

দারিদ্র্য কি মানুষকে মহান করে তোলে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬


হুমায়ূন আহমেদ। বাংলাদেশের শেষ জনপ্রিয় লেখক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন গুণী লেখক ও নাট্যনির্মাতা। হুমায়ূন আহমেদ সমুদ্রবিলাস নামে একটি নাটক নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে একজন শিক্ষক ছিলেন, নাম চ্যালেঞ্জার। তাঁর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×