
১. ক্ষুধা
পৃথিবীর জনসংখ্যা বাড়ছিল, বাড়ছিল মানুষের খাদ্যচাহিদা; কিন্তু সীমিত জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছিল।
মানুষ নির্বাচিত প্রজনন ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে এমন ব্রয়লার মুরগির জাত তৈরি করল, যারা অল্প সময়ে দ্রুত ওজন বাড়ায়। একইভাবে উদ্ভিদের উন্নত প্রজনন ও গবেষণায় তৈরি হলো উচ্চফলনশীল ধানের জাত IR8, IR36, BRRI dhan28, BRRI dhan29 এবং গমের Norin 10-এর মতো জাত, যা কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটাল।
একসময় এসব উন্নত জাতের ফসল ও ব্রয়লার মুরগি পৃথিবীর কোটি মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠল।
মানুষ নিজের ক্ষুধা মেটাতে একটি প্রাণী ও উদ্ভিদের বিবর্তনের পথ বদলে দিল। তাহলে মানুষ নিজের চাহিদা পূরণের জন্য প্রকৃতিকে নতুন করে লিখতে পারলে, নিজের DNA-কে নতুন করে লেখার অধিকার কি তার নেই?
২. ধার করা পিতৃত্ব / মাতৃত্বঃ
দশ বছরের বিবাহিত জীবনে সন্তান না হওয়ায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছিল এক দম্পতি; পরীক্ষায় জানা গেল, স্বামীর শুক্রাণু সন্তান জন্মদানের উপযোগী নয়। অন্য একজনের শুক্রাণু এবং স্ত্রীর ডিম্বাণু দিয়ে IVF পদ্ধতিতে জন্ম নিল তাদের সন্তান। শিশুটির শরীরে বাবার DNA ছিল না, অথচ তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সেই মানুষটিই হয়ে উঠলেন বাবা। তাহলে পিতৃত্ব কি DNA-এর উত্তরাধিকার, নাকি ভালোবাসার মাধ্যমে অর্জিত একটি পরিচয়?
আবার,
দশ বছরের বিবাহিত জীবনে সন্তান না হওয়ায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছিল এক দম্পতি; পরীক্ষায় জানা গেল, স্ত্রীর ডিম্বাণুতে প্রয়োজনীয় গুণগত সক্ষমতা না থাকায় সে মা হতে পারবে না, তখন সে অন্য নারীর ডিম্বাণু গ্রহণ করে IVF-এর মাধ্যমে নিজের গর্ভে সন্তান ধারণ করলেন। শিশুটির জিনগত পরিচয়ে রইল ডিম্বাণুদাতা ও তার স্বামীর DNA, কিন্তু পৃথিবীতে আসার আগে নয় মাস সে বেড়ে উঠল অন্য একজন নারীর শরীরে। তাহলে একজন মানুষকে জন্ম দেওয়ার পরিচয় কি তার DNA-তে লেখা থাকে, নাকি যে শরীর তাকে পৃথিবীতে আসার সুযোগ দেয়, সেখানেই তার প্রথম পরিচয় তৈরি হয়?
আবার,
দশ বছরের বিবাহিত জীবনে সন্তান না হওয়ায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছিল এক দম্পতি; পরীক্ষায় জানা গেল, স্বামীর শুক্রাণু এবং স্ত্রীর ডিম্বাণু—কোনোটিই সন্তান জন্মদানের উপযোগী নয়। অন্য একজন পুরুষের শুক্রাণু ও অন্য একজন নারীর ডিম্বাণু দিয়ে IVF পদ্ধতিতে তৈরি হলো ভ্রূণ, যা স্ত্রীর গর্ভে প্রতিস্থাপন করা হলো।
শিশুটির জিনগত পরিচয়ে রইল দুজন অচেনা মানুষের DNA, অথচ পৃথিবীতে আসার আগে নয় মাস সে বেড়ে উঠল মায়ের শরীরে, আর জন্মের পর তার প্রতিটি মুহূর্তে অন্য দুজন মানুষ হয়ে উঠলেন তার বাবা-মা।
তাহলে পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব কি কেবল DNA-এর উত্তরাধিকার, নাকি ভালোবাসা, দায়িত্ব ও জন্ম দেওয়ার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও তৈরি হয় মানুষের সবচেয়ে গভীর পরিচয়?
৪. আমার অস্তিত্ব
মানুষের প্রতিটি জন্ম নির্ভর করে অসংখ্য জৈবিক সম্ভাবনা, শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর নির্দিষ্ট মিলন এবং সময়ের ওপর। আমাদের বাবা-মা যদি অন্য কাউকে বিয়ে করতেন, তাহলে অন্য একটি শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনে সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষের জন্ম হতো।
পৃথিবীতে হয়তো তারও নাম থাকত, স্বপ্ন থাকত, ভালোবাসা থাকত, কিন্তু আজকের এই 'আমি' কখনো অস্তিত্বই পেতাম না।
তাহলে আমি কি সত্যিই একজন অনন্য মানুষ, নাকি প্রকৃতির অসংখ্য সম্ভাবনার মধ্যে কাকতালীয়ভাবে জন্ম নেওয়া একটি নির্দিষ্ট DNA combination?
৫. ক্লোন
১৯৯৬ সালে ডলি নামে একটি ভেড়ার জন্ম প্রমাণ করেছিল, প্রাপ্তবয়স্ক প্রাণীর দেহকোষের নিউক্লিয়াস ব্যবহার করেও নতুন প্রাণী তৈরি করা সম্ভব। পরবর্তীতে গরু, ছাগল, বিড়াল, কুকুরসহ আরও অনেক প্রাণীর ক্লোনিং সফল হয়েছে।
এমনও তো হতে পারে, একসময় মানুষ ক্লোন পদ্ধতিতে হাজার হাজার মানুষ তৈরি করছে—কারখানায় কাজ করার জন্য, যুদ্ধ করার জন্য কিংবা মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণের জন্য।
৬. সৃষ্টির মালিক
কোটি কোটি বছরের বিবর্তনে তৈরি DNA-এর চারটি রাসায়নিক অক্ষর—A, T, C এবং G—পড়ে মানুষ আজ জীবনের গোপন সংকেত বুঝতে ও তার কিছু অংশ সম্পাদনা করতে শিখেছে।
যদি ঈশ্বর DNA দিয়ে জীবনের প্রথম অধ্যায় লিখে থাকেন, তবে মানুষ কি এখন সেই বইয়ের পরবর্তী অধ্যায় লিখছে, নাকি একদিন নিজেই সৃষ্টিকর্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখবে?
আর যদি আমাদের অস্তিত্ব কেবল অসংখ্য রাসায়নিক সংকেতের সমন্বয় হয়, তবে ঈশ্বরের কাছে আমাদের আলাদা কোনো গুরুত্ব আছে কি? নাকি আমরা মহাবিশ্বের অসীম সম্ভাবনার মধ্যে জন্ম নেওয়া একেকটি ক্ষণস্থায়ী DNA combination?
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




