
খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে শুধু ঘুম। মনে হয়- ঘুমের চেয়ে শান্তি আর কিচ্ছুতে নেই। গতকাল রাতে বাসায় অনুষ্ঠান ছিলো। মুল অনুষ্ঠান হবে শনিবার। ব্যুফে'তে। রাতে খেতে বসে দেখি- অনেক কিছু রান্না করেছে। আমার কিছুই খেতে ইচ্ছা করছে না। সুরভিকে বললাম, আমাকে ভাত দাও। আর ডিম ভর্তা করে দাও। এসব আমার খেতে ইচ্ছা করছে না। সুরভি রেগে গেলো। বলল, বাসার সবাই খাচ্ছে, আর তুমি খেতে পারবে না! বললাম, পোলাউ এর গন্ধটাই সহ্য করতে পারছি না। সুরভি রাগ দেখিয়ে বলল, পারবো না। আমি জানি, না বললেও সে ঠিকই গরম ভার আর ডিম ভর্তা করে দিবে। হয়তো ডাল ভর্তাও দিবে। আমার কন্যা ফারাজা খেতে বসে বলবে, চিকেন নাই? যদিও জিজ্ঞেস করা হয়- স্কুলে টিফিন কি নেবে? সে সাথে সাথে বলবে চিকেন। লেগ পিস। রান্না করতেও তো অনেক দিনদারি। যে রান্না করে তারও তো অনেক কষ্ট হয়। যে বাজার করে তারও কষ্ট হয়। অথচ মুখের উপর বলে দেই, খাবো না।
আমার মনে পড়ে ছোটবেলার কথা।
তখন আমি স্কুলে পড়ি। পরিবারের সবাই মিলে যাচ্ছি- 'পাবনা ক্যাডেট কলেজ'। প্যারেন্টস ডে। বড় ভাইকে দেখতে। ফেরীতে উঠেছি। ফেরী চলছে তো চলছেই। মা আর ছোট ভাই গাড়িতে বসে আছে। আমি আর আব্বা ফেরীর ছাদে উঠেছি। ফেরীতে অনেক হকার। ঝালমুড়ি, ডাব থেকে শুরু করে ডিম সিদ্ধ সবই পাওয়া যাচ্ছে। একজনকে দেখলাম- ইলিশ মাছ বিক্রি করছে। আব্বা বলল, কি খাবি? আমি দেখেছি লঞ্চে হোটেল আছে। সেখানে অনেকে আরাম করে ভাত খাচ্ছে। আব্বা আমি ভাত খাবো। খেতে বসলাম। সাদা ভাত আর চিংড়ি মাছ। সাথে ডাল আছে। ডাল ফ্রি। খেতে বসে বুঝলাম- অনেক ক্ষুধা পেয়েছে। আমার মনে হলো- এত ভালো রান্না আমি আর কোনোদিন খাই নাই। ফেরীর রান্না এত ভালো! ফেরীর খাবার খেয়েছি, শুনে মা অনেক রাগ করেছে। বলল, তাহলে আমি রান্না করে এত খাবার আনলাম কেন? এরপর বহু বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু আজও আমার সেই ফেরীর খাবারের কথা মনে পড়ে। এরপর অনেকবার ফেরীতে গেছি। ফেরীর খাবার খেয়েছি, কিন্তু ভালো লাগেনি।
বাসার কাছে একটা রেস্টুরেন্ট আছে।
ছোটবেলা থেকেই এই রেস্টুরেন্ট থেকে খাই। এরা গরুর মাংস রান্না করে। এদের গরুর মাংস অনেক স্বাদ হয়। মা আমাকে প্রায়ই টাকা দিতো- আমি গরুর মাংসের কালো ভূনা নিয়ে আসতাম। গরম ভাত দিয়ে খেতাম। এই খাবারটা খেতে আমার কখনও বিরক্ত লাগেনি। রুটি দিয়ে খেতেও ভালো লাগে, গরম গরম সাদা ভাত দিয়েও খেতে ভালো লাগে। গতকাল বাসায় গরুর মাংস রান্না করেছে, আমার খেতে ইচ্ছা করেনি। আমি ডিম ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়েছি। খুবই ভালো লেগেছে। সুরভিকে একটু আগে ফোন করে বললাম, আজ আমি লাল শাক দিয়ে ভাত খাবো। আর কিচ্ছু না। সুরভি বলল, বাবু তুমি ইদানিং খাওয়া নিয়ে খুব বেশি বিরক্ত করো। আমি মনে মনে বলি, সুরভি খাওয়া নিয়ে সত্যিকারের বিরক্ত করেছি, আমার মাকে। মা কখনও রাগ ত্যাজ দেখায়নি। মা'দের ধৈর্য্য সহ্য অনেক বেশি। স্ত্রীদের ধৈর্য্য সহ্য অনেক কম। এরা অল্পতেই হাপিয়ে যায়। ক্যাট ক্যাট করে। অথচ এদের কাজের লোক আছে। কাজের লোক ঘরের ৮০% কাজ করে দিয়ে যায়। রান্নার জন্য কাটাবাছা এমনকি পেঁয়াজও কেটে দিয়ে যায়।
তখন হাই স্কুলে পড়ি।
অনেক বড় হয়ে গেছি। সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত ক্লাশ। প্রতিটা ক্লাশ চল্লিশ মিনিট করে। শিক্ষকরা সচেতন ও কঠোর নজরদারির কারনে ক্লাসে কথা বলা যায় না। কাটাকুটি খেলা যায় না, এমনকি কথাও বলা যায় না। যাইহোক, দুপুর বেলা মারাত্মক ক্ষুধা লাগে। আমি বাসা থেকে খাবার আনি না। স্কুলের পাশেই একটা ছোট হোটেল আছে। দুপুরবেলা রুটি সবজি পাওয়া যেতো। আমরা দুপুরবেলা সেই হোটেলে যেতাম। তন্দুর রুটি আর ভাজি খেতাম। খেয়ে খুব আরাম পেতাম। ভালো লাগতো। আমাদের ভাজি দিতো পরিমানে বেশি করে। শেষ হয়ে গেলে আবার দিতো। খাবারও সস্তা। রুটি দুটা করে। আর ভাজি ছিলো ৭ টাকা। আর এখন রুটি ২০ টাকা। আর ভাজি ৩০ টাকা। খেতে স্বাদও লাগে না। ডায়বেটিস হয়ে গেছে, তাই খাবার নিয়ে কিছুটা সাবধান থাকি। চা খাওয়া কমিয়ে দিয়েছি। খাবার নিয়ে বিলাসিতা করতো আমার দাদা। ৭ পদ ছাড়া দাদা খেতে বসতেন না। আমার বাবা বিলাসিতা করেছেন জামা কাপড় নিয়ে। আমার কোনো বিলাসিতা নেই। সহজ সরল জীবন যাপন করি।
গত বছর শীতের সময়। একটা দরিদ্র হোটেল।
এই হোটেলের সামনে দিয়েই আমি যাতায়াত করি রোজ। দেখি রিকশা চালক আর সিএনজি ড্রাইভাররা খাচ্ছে। তাদের খাওয়া দেখে, আমার ইচ্ছা হয়- এই হোটেলে একদিন খাবো। কিন্তু সাহস পাই না। সুরভি জানতে পারলে- সে আমার দিকে অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকবে। যেন বিরাট কোনো অন্যায় করে ফেলেছি। একদিন শীতের সন্ধ্যায় সেই হোটেলে বসে গেলাম। আমার পাশে রিকশা চালক আর সিএনজি চালকরা খাচ্ছে। তারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জোরে কথা বলছে। আমাকে রুটি আর সবজি দেওয়া হলো। শীতের সিজন বলে- সবজিতে ফুলকপি, শিম, নতুন আলু সবই আছে। খেতে মন্দ নয়। খাওয়া শেষে জানলাম, তাদের গরুর কালো ভূনাও আছে। খাওয়া শেষ করে এক কাপ চা খেলাম। সুরভির বাবা ভালো বাজার করেন। উনি সব সময় দেশি মাছ কিনেন। সুরভিদের বাসায় গেলে দেশি মাছ খেতে পারি। মাছ বিক্রেতাদের সাথে তার খাতির আছে। দেশি মাছ পেলেই তারা ফোন করে। বাসায় এসে দিয়ে যায়।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



