somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে হবে যেন শীতের সকালের ঠান্ডা কুয়াশায় ছেয়ে গেছে চারিদিক। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ঠান্ডার পরিবর্তে অনুভুত হয় তীব্র গরম। নিঃশ্বাষে ঢুকে পড়ে বিশাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাস। সিঙ্গাপুরে Haze এর প্রধান কারণ হচ্ছে - ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা (Sumatra) ও কালিমান্তান (Kalimantan) অঞ্চলে বন ও পিটল্যান্ডে আগুন জ্বলছে। এসব আগুনের ধোঁয়া বাতাসের সঙ্গে সিঙ্গাপুরে চলে আসছে।

ইন্দোনেশিয়ায় এই দাবানল প্রাকৃতিক নয় , বরং মানুষের সৃষ্টি। কৃষক এবং বড় বড় কৃষিভিত্তিক কোম্পানিগুলো জঙ্গল পরিষ্কার করার সবচেয়ে সস্তা ও সহজ উপায় হিসেবে ইচ্ছাকৃতভাবে বনাঞ্চলে আগুন লাগিয়ে দেয়। শুষ্ক মৌসুমে এই নিয়ন্ত্রিত আগুনগুলো সহজেই চারপাশের শুকিয়ে যাওয়া পিটভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনিয়ন্ত্রিত দাবানলে রূপ নেয়। এই দাবানলগুলোর ফলে প্রতিবছর বিশাল পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে ছড়ায় এবং সৃষ্ট বিষাক্ত ধোঁয়া (Haze) ইন্দোনেশিয়া ছাড়িয়ে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর বায়ুমণ্ডলকে মারাত্মকভাবে দূষিত করে তোলে।


ট্রান্সবাউন্ডারি হেজ বা আন্তঃসীমান্ত ধোঁয়াশা (Transboundary Haze) নিয়ে ইন্দোনেশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব রয়েছে, যা ২০২৬ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে ভয়াবহ দাবানলের কারণে আবারও চরম আকার ধারণ করে। Haze বিষয়ে সিঙ্গাপুর উদ্বেগ জানানোর পরেও ইন্দোনেশিয়া কোন ব্যবস্থা গ্রহন না করায় 'ট্রান্সবাউন্ডারি হেজ পলিউশন অ্যাক্ট' (THPA)-এর অধীনে ধোঁয়াশা সৃষ্টির জন্য দায়ী ইন্দোনেশীয় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও জরিমানা করার প্রক্রিয়া শুরু করে সিংাপুর। সিঙ্গাপুরের জাতীয় পরিবেশ সংস্থা (NEA) ১০টি কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত এবং সতর্ক নোটিশ পাঠিয়েছে। তবে ইন্দোনেশিয়া একে তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখে! ইন্দোনেশিয়ার মতে, তাদের দেশের ভেতরের কোম্পানিগুলোর বিচার করার অধিকার সিঙ্গাপুরের নেই !!

রাস্ট্র হিসাবে অতি ক্ষুদ্র দেশ সিঙ্গাপুর চারদিক দিয়ে মালয়েশিয়া ও ইন্দনেশিয়া দ্বারা পরিবেষ্টীত । সুবিশাল দেশ ইন্দোনেশিয়ায় রাস্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা অতি ভঙ্গুর । আইনের শাষন সেখানে অনুপস্থিত। haze এর মারাত্মক প্রভাবের শিকার খোদ ইন্দোনেশিয়া। সেপ্টেম্বরে ইন্দোনেশিয়ায় ৫২০০র উপড় মানুষ দুষিত বায়ু সেবনের ফলে acute respiratory infections এ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যূবরন করে , অথচ haze দমনে কোন কার্যকরী পদক্ষেপ না নিয়ে ইন্দোনেশিয়ান সরকার ঝাপিয়ে পড়ে সিঙ্গাপুরের বিরুদ্ধে। ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে ইন্দোনেশিয়ার সরকারি যোগাযোগ সংস্থার প্রধান, স্যাহগান্ডা নাইনগোলান (Syahganda Nainggolan) একটি ভাইরাল ভিডিওতে দাবি করেন যে, যখন ইন্দোনেশিয়ায় কোনো দাবানল বা ধোঁয়াশা থাকে না, তখন তাদের দেশের বন থেকেই সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় অক্সিজেন যায়। তিনি এই দাবানলকে মানুষের ভুল নয়, বরং একটি "প্রাকৃতিক ঘটনা" বলে অভিহিত করেন !!
সিঙ্গাপুরের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী কে শানমুগাম (K Shanmugam) এই মন্তব্যটিকে অত্যন্ত "হতাশাজনক" এবং "অনুচিত" বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, যখন অবৈধভাবে বনাঞ্চল পুড়িয়ে মুনাফা লোভী কিছু কোম্পানির কারণে পুরো অঞ্চলের মানুষ তীব্র ধোঁয়াশায় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভুগছে, তখন এমন মন্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সিঙ্গাপুরের প্রাকৃতিক গ্যাসের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী ইন্দোনেশিয়া। ইন্দোনেশিয়ান দ্বায়িত্বশীল কতৃপক্ষের haze সম্পর্কিত হঠকারী মন্তব্যের পর তারা সিঙ্গাপুরে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি কমিয়ে দেয়া শুরু করে। তবে সিঙ্গাপুর এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং চুক্তি মেনে চলার তাগিদ দিয়েছে।

তবে রাস্ট্রীয় পর্যায়ে যে এত কিছু ঘটছে তার লেশমাত্র প্রভাব পড়েনি সিঙ্গাপুরের জীবন যাত্রায়। বাড়েনি গ্যাস , ইলেক্ট্রিসিটির দাম বা দ্রব্যমূল্য। এখানকার শাষনব্যবস্থা এতটাই জনবান্ধব যে , মানুষের জীবনযাত্রাকে যে কোন মূল্যে স্টেবল রাখাকে এখানে সবচেয়ে বেশি প্রায়োরিটি দেয়া হয়।

সিঙ্গাপুরের দৃঢ় অবস্থান ও জোরালো কুটনৈতিক তৎপরতায় দুই দেশের মধ্যকার বৈ্রিতার অবশেষে অবসান হয়েছে। সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া সম্প্রতি একটি যৌথ টাস্ক ফোর্স (Joint Task Force) গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো বন ও ভূমিেতে আগুন এবং আন্তঃসীমান্ত ধোঁয়াশা (transboundary haze) নিয়ন্ত্রণে দায়ী কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং তথ্য আদান-প্রদান করা।

টাস্ক ফোর্সের উদ্দেশ্য: ইন্দোনেশিয়ার বন ও জঙ্গলে আগুন এবং এর ফলে সৃষ্ট ধোঁয়াশা রোধে দুই দেশের যৌথ তদন্ত ও তথ্য বিনিময় ।
সরাসরি যোগাযোগ: সংকট দ্রুত সমাধানের জন্য দুই দেশের মধ্যে একটি হটলাইনসহ সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম জোরদার করার বিষয়েও একমত হয়েছেন দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।


দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক: সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালাকৃষ্ণণ এবং ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরমানাথা নাসির জাকার্তায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে জ্বালানি সরবরাহ (গ্যাস কাটা), বাণিজ্য এবং দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি: ২০২৭ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে 'RISING 60' উদ্যোগসহ বিভিন্ন যৌথ কর্মসূচি বাস্তবায়নে দুই দেশ কাজ করছে।

তথ্যসুত্র ঃ গনমাধ্যম













সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বেকার গ্র্যাজুয়েটের ২০ হাজার, গার্মেন্টস শ্রমিকের ৩০ হাজার- অর্থনীতির এই বৈপরীত্যের জবাব কে দেবে?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

বেকার গ্র্যাজুয়েটের ২০ হাজার, গার্মেন্টস শ্রমিকের ৩০ হাজার- অর্থনীতির এই বৈপরীত্যের জবাব কে দেবে?

দ্রব্যমূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, সীমিত আয়ে সংসার চালানো অসম্ভব- এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দেশে শিক্ষিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার চায়ের কাপে বিশ্বযুদ্ধ: একজন ঢাকাবাসীর একদিন

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৫


সকালে ঘুম ভেঙে চুলায় চায়ের পানি বসানোর আগে আমি কখনো ভাবিনি, এই নীল আগুনটার পেছনে আরব সাগর, আমেরিকার বন্দর আর একটা যুদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে।
আমরা ভাবি, পৃথিবী অনেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

তোমাকে দেখতে বড় ইচ্ছে করে

লিখেছেন মেহবুবা, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:৪৮


তোমাকে শুধু একটিবার দেখতে বড় ইচ্ছে করে
ইচ্ছে ঘুড়ি উড়িয়ে দিলাম
বন্ধ চোখের অন্ধকারে তোমায় যেন দেখতে পেলাম
জড়িয়ে নিলে ইচ্ছে ঘুড়ি
আলতো হাতের মৃদু ঘায়ে ছিড়লো সূতো পথ হারাল
তোমার কাছে রয়ে গেল
দৃষ্টিপ্রদীপ... ...বাকিটুকু পড়ুন

রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না; কবীরা গুনাহ, জাহান্নাম ও আল্লাহর অসীম ক্ষমা: কুরআন ও হাদীসের আলোকে একটি বিশ্লেষন

লিখেছেন নতুন নকিব, ০২ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৪৭

রহমতের দরজা কখনো বন্ধ হয় না; কবীরা গুনাহ, জাহান্নাম ও আল্লাহর অসীম ক্ষমা: কুরআন ও হাদীসের আলোকে একটি বিশ্লেষন

ছবি গুগল থেকে গৃহিত।

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

◆ ভূমিকা: এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আফগানিস্তানে একজন বেগম রোকেয়া কোনোদিন জন্মাবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২৮


২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের চিহ্ন মুছে ফেলার এক অভিনব অভিযান শুরু হয়েছিল। শেখ হাসিনার ছবি, আওয়ামী লীগের কুশপুত্তলিকা, শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য, কিছুই বাদ যায়নি। বড়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×