somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পপাঠ: কাঠপরাণের দ্রোহ

১৫ ই নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১০:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কাঠপরাণের দ্রোহ তরুণ গল্পকার রিপনচন্দ্র মল্লিকের একটি ছোট গল্প। রিপন তার এ গল্পটি শব্দগাথুনিতে এক ভিন্ন জগতে নিয়ে গেছেন পাঠককে। গল্পে সবচে’ বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, সমসাময়িক বাস্তবতার নিরিখে তার এ গল্পের প্লট রচিত হয়েছে। শুধু শব্দের গাথুনিই নয়; ঘটনার বাস্তবতা গল্পে চরিত্রগুলোকে আরো বেগবান করে মূর্ত করে তুলেছে। গল্পের মধ্যে গল্পকার পাঠককে কখন যে এক চরম সত্য সন্ধানের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন তা পাঠক হয়তো টেরই পায়নি। এমন করে নয়, বলতে হবে গল্প বলার কৌশলী রিপন পাঠককে বুঝে ওঠার আগেই নিয়ে গেছেন তার মূল গল্পের জমিনে। যেখানে রোপন করেছেন সবুজ এক অরণ্য ঘেরা গ্রামীণ জনপদ, মাটি আর মানুষের সাথে মিশে থাকা সেই জনপদের সারল্য আখ্যান এর মাঝে সাংঘাতিকভাবে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প রোপিত হচ্ছে দিনের পর দিন। এসবই তুলে ধরা হয়েছে এ ছোট গল্পে।
আউলিয়াপুর গ্রামের ছোটবেলায় বাবা হারানো প্রতিবন্ধী আলম মাকে হারায় যখন সে ক্লাস এইটে পড়ে। কাজেই তার জীবন সংগ্রাম তখন থেকেই শুরু। গল্প শুরু হয়েছে গ্রামের সেই সহজ সরল জীবন সংগ্রামী খোঁড়া আলম এর সংগ্রামী জীবন নিয়ে। আউলিয়াপুর গ্রাম কিভাবে দ্রুত গ্রাম থেকে যেন শহরমূখি পরিবেশে ফিরে যাচ্ছে। তারও বর্ণনা দেয়া হয়েছে গল্পে। কারণ দেশের গ্রামগুলো তার গ্রামীণ চরিত্র হারিয়ে শহরের সাথে পাল্লা দিতে চাচ্ছে। কারণ, আউলিয়াপুর গ্রামটি একটি বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও এই বাজারকে কেন্দ্র করে বাহারী নকশাময় মসজিদ আর মসজিদ গড়ে উঠেছে। আর সেখানে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটি গোষ্ঠি কিভাবে শকিড় গড়েে বসছে তারও ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে এখানে। প্রতিবন্ধী হিসাবে মাদ্রাসায় পিওনের চাকরি যোগাড় করে কোন মতে সে সংসার চালায়।
পরে তার পারিবাবিক জীবনের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে আলেখ্য এ গল্পের প্রধান চরিত্র। তার সামান্য আয়ের মধ্যে দুই মেয়েকেই কলেজে পড়াচ্ছে। ভবিষ্যতে তাদের বিয়ের বিষয়টি মাথায় রেখেই আলম গাছ লাগায়। বউকে জানায় চিন্তার কারণ নেই। মেয়েদের বিয়ের সময় এই গাছই তাকে টাকার যোগান দেবে। গাছগুলো বড় হলে মেয়েদের বিয়ের সময় তা বিক্রি করে বিয়ের খরচ যোগান দেবে। মেয়েদের আলম স্কুল কলেজে পড়ায় তার এ স্বপ্নেই সে বিভোর থাকে। প্রায় প্রতিদিন গাছের আত্তি যতœ করে। গাছের সাথে আলম একাকী নীরবে নিভৃতে কথা বলে। গাছ ও যেন আলমের কথায় সায় দিয়ে তর তর করে আসমান ছুঁতে চায়। গাছের সাথে আলমের একটা আত্মীক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
গল্পের পরস্পরায় দেখা যায়, আলম গ্রামের চায়ের দোকান গুলোতে বসে মওলানা সাহেবের লোকজনের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে। আর মনে মনে নিজেই নিজের সাথে কথা বলে এই সব রাজাকারী কায় কারবারের। মাওলানার সাথে তাদের লোকজনের কথাবার্তায় আলম বিরক্ত হয়, শঙ্কিতও হয়। মসজিদ আর মাদ্রাসা কেন্দ্রিক গ্রামটি মৌলবাদীদের আখড়ায় পরিণত হয়। গ্রামে রাজনৈতিকভাবে মৌলবাদীদের আস্ফালন কতটা প্রকটভাবে বিরাজ করছে, তা এ গল্পে বড় হুজুরের বর্ণনায় স্থানীয় জামায়াতের আমীর তার কথাবার্তার মধ্যে তুলে ধরেছেন।
এদিকে বড় মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ আছে। এক দুবাই থাকা ছেলের সাথে। আলম ও তার বৌ জেসমিনের মনে আনন্দ আর ধরে না। তাদের সেই গাছও বেশ বড় হয়েছে। তা বেচেইতো বিয়ের খরচ হয়ে যাবে। এমন সময় রাতের বেলা কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে জামাত-শিবির গাড়ি পোড়াচ্ছে, মানুষ মারছে। এসবই সে রাতের বেলা টিভিতে দেখতে থাকে। হঠাৎ করে তার চোখে পড়ে টিভির নিচের স্ক্রলে দেখাচ্ছে ‘আউলিয়াপুর বাজারে শিবির কর্মীদের সড়ক অবরোধ, পুলিশের সাথে ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়া।’ সারা রাত আলম ঘুমাতে পারে না। রাতভর সে শুধুই গ-গোলের আওয়াজ শুনেছে।
সকালে বাড়ি থেকে বের হয়েই আলম রাস্তায় এসে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। চারপাশের থমথমে পরিবেশ। রাস্তার মাঝে মাঝে গর্তের সৃষ্টি করা হয়েছে। যেখানে সেখানে গাছের গুড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করা হয়েছে। আলম দ্রুত তার ভিটায় চলে যায়। তার গাছ। সে ডুকরে কেঁদে ওঠে। কেও তাকে থামাতে পারে না। আলমের কান্না কিছুতেই থামেনা। সে শুনতে পায় রাস্তায় মৃত লাশের মতো পড়ে থাকা স্বপ্নময় গাছগুলোর পরাণ ডুকরে কেঁদে ওঠে। আর গাছগুলোর সাথে আলম কথা বলে, ওঠ। ওঠ। উঠে দাঁড়া। উঠে ওদের বিরুদ্ধে দাঁড়া। একথা বলে গল্পকার চোখে আঙ্গুল দিয়ে সমাজকে দেখিয়ে দিয়েছেন। গাছ আমাদের বন্ধু, গাছই আমাদের জীবন জীবিকার আশ্রয়। আর সেই গাছকে অবিবেচনায় দেদারসে কেটে সাবাড় করা হয়েছে মৌলবাদীদের রুদ্র আস্ফালনে। যা অতি সাম্প্রতিক কালের বাস্তব ঘটনা আবার পাঠককে সচেতনভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন গল্পকার। গল্পটি একটি সার্থক বলে তাকে ধন্যবাদ দিতে হয়। পাঠক বারবার পড়লেও অরুচি হবে না বলে আমার বিশ্বাস

০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গাজীপুর থেকে কক্সবাজার: চার বাইকে ছয় সহকর্মীর ১৪ ঘণ্টার নাইট রাইড অ্যাডভেঞ্চার

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:০২


আমি শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, থাকি সাভার এলাকায়। ভ্রমণের নেশা আর মোটরসাইকেলের প্রতি ভালোবাসা আমার দীর্ঘদিনের। আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করব গাজীপুর থেকে কক্সবাজার হয়ে টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপের দিকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

Personal Cancer Vaccine: আশার আলো দেখাচ্ছে

লিখেছেন কলাবাগান১, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৩২


আপনি কি কখনও চিন্তা করে দেখেছেন যে ক্যান্সার টিউমারকে কেন শরীর এর রোগ প্রতিরোগ করা ইমিউন সেল (যেমন টি সেল) একেবারে ধ্বংস করতে পারে না!!! যেখানে টি সেল... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের শাহেদ জামাল- ১০০

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৮



মাঝে মাঝে খুব অবিশ্বাস্য ব্যাপার সহজ ভাবে ঘটে যায়।
এই যে আমি শাহেদ। শাহেদ জামাল। রমিজ উদ্দীনের ছেলে। আমাকে একটা ঘরে বন্ধী করে রাখা হয়েছে। ছোট ঘর। ঘরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:০২



শিশুর নিরাপত্তা কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনামের চেয়ে বড়

গতকাল এক বাবার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অভিযোগ, তাঁর মেয়েকে একটি মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপাল যৌন নিপীড়ন করেছেন। বাবার প্রতিক্রিয়া সঠিক ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেশটাতো এখন রাজাকারদের....

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:২৮




একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বাদী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী (৮৭)। মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রস্তুতি চলার সময় জামাতের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×