একদা হযরত ওমর ফারুক (রা: )
একদা হযরত ওমর ফারুক (রা: ) মদীনার কোন এক গলিপথ দিয়ে হেঁটে চলছিলেন। হঠাৎ একটি যুবকের প্রতি তাঁর দৃষ্টি পড়ে গেল। সে তার পরিহিত বস্ত্রের নীচে একটি বোতল লুকিয়ে রেখেছিল। হযরত ওমর (রা: ) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে যুবক! তুমি তোমার বস্ত্রের নীচে কি ঢেকে রেখেছ ?
বোতলটি মদ ভর্তি ছিল; সুতরাং যুবকাটি আজ্ঞান প্রায় দশা!আর ওমর ছিল অন্যায়ের প্রতি ভিষণ কড়া,অন্যায়ে একটুও ছাড় নেই।আর গত পর্বে তো দেখলেনই নিজের ছেলেকে পর্যন্ত ছাড় দেই নি! তাই যুবকটি জবাব দিতে ইতস্তত করছিল; কিন্তু সে তখন আত্ম অনুশোচনায় ও ভয়-ভীতিতে বিহবল অবস্থায় আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করল:
হে মাবুদ ! আমাকে তুমি খলিফা ওমর (রা: ) এর সামনে লজ্জিত করো না।তাঁর কাছ থেকে ত্রুটি ও অপরাধ গোপন রাখ। আমি তোমার নিকট খাঁটি তওবাহ করছি এবং এই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, জীবনে আর কোনদিনই আমি মদ স্পর্শ করবো না। এরুপ তওবাহ করার পরক্ষণেই যুবক হযরত ওমর (রা: ) এর প্রশ্নের জবাব দিল যে, হে খলিফা! আমার কাছে এটি একটি সিরকার বোতল; কিন্তু খলিফা তার কথায় পূর্ণ আস্থা না এনে বোতলটি দেখতে চাইলেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তখন বোতলটি তার সামনে পেশ করা হল।দেখা গেল যে, বোতলটি মধ্যে সত্যিই সিরকা ভর্তি রয়েছে।সুবহানআল্লাহ!!! আমামাদের তওবাও যদি এমন হই আর এমন অন্তর দিয়ে আমাদের আল্লাহ কে স্মরণ করতে পারি তাহলে আল্লাহ আমাদেরও এভাবে সাহায্য করবে।কারণ তিনি তো মহান,করুণাময়, দয়াময়,ক্ষমাশীল রব।
কেউ এভাবে ভীত মনে কোন লজ্জাজনক ও পাপকাজ থেকে।আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানালে এবং খাঁটি তাওবাহ করে নিলে আল্লাহ পাক এক বস্তুকে অপর বস্তুতে পরিণত করেও ফরিয়াদির পাপ মার্জনা করে দেন এবং তার মান সম্মান পর্যন্ত অক্ষুণ্ন রাখেন।
— সুবহানাল্লাহ —
হযরত ওমর ফারুক রা.-এর শাসনকালীন ঘটনাঃ
। একজন ইরানি শাহজাদাকে গ্রেফতার করে আনা হলো মদীনায়। মুসলমানদের অনেক ক্ষতি সাধন করেছে সে। অংশগ্রহন করেছে মুসলমান বিরোধী বহু যুদ্ধে। হযরত ওমর রা. জল্লাদকে ডাকলেন। ফায়সালা করার পূর্বে শাহজাদাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কোনো অন্তিম ইচ্ছে আছে? সে বললো, হ্যাঁ, আমার পানির তৃষ্ণা হচ্ছে। পানি চাই। হযরত ওমর রা. তার জন্য পানির ব্যাবস্থা করতে নির্দেশ দিলেন। তাকে পানি দেয়া হলো। সে পান করতে পারছিলো না। ভয়ে তার হাত-পা কাঁপছিলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী হলো? পানি পান করছো না কেনো? শাহজাদা বললো,আমীরুল মুমিনীন! আমার ভয় হচ্ছে ! পানি পান করতে গেলেই জল্লাদ হয়তো আমার গর্দান কেটে নিবে।
:
হযরত ওমর রা. তাকে অভয় দিয়ে বললেন, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। পানি পান করার আগে তোমাকে হত্যা করা হবে না। তখন শাহজাদা কৌশল অবলম্বন করে পানির পেয়ালাটি মাটিতে ফেলে দিলো। মাটিতে পড়ে পানি শুকিয়ে গেলো।
সে বললো, হে আমীরুল মুমিনীন ! আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনি আপনার ওয়াদার ওপর অবিচল থাকবেন। আমি যেহেতু পানি পান করিনি তাই আপনি কৃত ওয়াদার কারণে আমাকে হত্যা করতে পারবেন না।
:
হযরত ওমর রা. সংকটময় পরিস্থিতির মুখে পড়ে গেলেন। একদিকে ইসলামের ভয়ঙ্কর শত্রু দাঁড়িয়ে, অপর দিকে নিজের ওয়াদা। বিবেক তো বলে, শত্রুর কথা না শুনে বরং তাকে হত্যা করে দাও, যেহেতু সে ইসলামের দুশমন। অথচ ওয়াদা পূরণ করাও ইসলামে জরুরী। আর ওমর রা. তো সে ওমর! যিনি “আশাদ্দুহুম ফী আমরিল্লাহি ওমর“-এর মিসদাক।
হযরত ওমর রা. কিছু সময় ভেবে বললেন, হ্যাঁ, তুমি যথার্থই বলেছো। আমি ওয়াদার খেলাফ করবো না। যেহেতু তুমি পানি পান করোনি তাই আমি তোমাকে হত্যা করতে পারি না। সুতরাং তোমাকে হত্যার নির্দেশ স্থগিত করে দিলাম। তুমি এখন মুক্ত।
:
ইসলামের এমন ভয়ঙ্কর শত্রুর হত্যার আদেশ রহিত হওয়ায় মুসলমানগন হতাশ হয়ে গেলেন। সবাই বলাবলি করতে লাগলো, শাহজাদা চতুরতার মাধ্যমে রক্ষা পেয়ে গেলো। কিন্তু আসল ব্যাপার ছিলো ভিন্ন।
ক্ষমা পাবার পর সে বলতে লাগলো, হে আমীরুল মুমিনীন ! এ হেনো বাহানা আমি এ জন্য করেছি যে, যদি আমি জল্লাদকে দেখে কালিমা পড়ে নিতাম তবে বিশ্ববাসী বলতো, আমি শাহজাদা হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যূ ভয়ে কালিমা পড়েছি। তাই আমি একটি বাহানা করে জীবন রক্ষা করেছি। আপনি আমাকে হত্যা করতে পারেননি। এখন আমি স্বাধীন !
:
হে আমীরুল মুমিনীন ! আমি অামি অকপটে স্বীকার করছি, যে ধর্মে ওয়াদা রক্ষা করাকে এতোটা মূল্যায়ন করা হয়। আমি সে ধর্মে দীক্ষিত হয়ে নিজেকে ধন্য করতে চাই। অতঃপর সে কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে গেলো। বর্ণিত আছে, হযরত ওমর রা. অনেক বিষয়ে তাঁর থেকে পরামর্শ গ্রহন করতেন। ইসলামের সেই শত্রু হয়ে গেলেন খিলাফাতের বড়ো জেনারেল।
:
বন্ধুরা ! আমরাতো আমাদের স্বার্থে বিন্দু পরিমান আঘাত এলেই নিজের ওয়াদার কথা বেমালুম ভুলে যাই। বিভিন্ন বাহানা ও মিথ্যার আশ্রয় নিতে অকুন্ঠ হয়ে উঠি । এড়িয়ে যাই “আস-সিদকু ইউনজী অল কিযবু ইউহলিক“-এর মতো শ্বাশত সত্যকেও। ফলে, আমাদের সমাজে দিন-বদিন অশান্তির দাবানল বেড়েই যাচ্ছে। প্রতিটি রসনা আজ ওয়াদা খেলাফের অভয়াশ্রম। ফলে আমরা হারিয়ে যাচ্ছি অমানুষের অরণ্যে। আমাদের আদর্শ দেখে এখন আর কেউ ইসলামের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে না।
:
তাই আসুন ! সোনালী যুগের সেই আদর্শকে আবারো নিজের মাঝে জাগিয়ে তুলি। হয়ে উঠি একেকজন নববী আদর্শের মূর্তপ্রতীক। পুনরুদ্ধার করি হৃত সেই মর্যাদাকে।
:
আল্লাহ আমাদের সবাইকে তৌফিক দিন। আমীন।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

