somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মরীচিকা

২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


তোমার চোখে আমি প্রতিবার দেখি ঝড়ের ঘূর্ণি। সেই ঘূর্ণির ভেতরে জমে থাকে এমন এক শঙ্কা, যার কাছে পৌঁছাতে গেলেই আমার নিজের বুকের ভেতরটাও কেমন অস্থির হয়ে ওঠে। তবু আমি প্রতিদিন নিঃশব্দে, কারও নজরে না পড়ে, সেই শঙ্কা পেরিয়ে তোমার ভেতরের শান্তিটুকু খুঁজতে চাই।
কেন চাই, জানি না।
হয়তো কিছু মানুষকে ভালোবাসার জন্য কাছে যেতে হয় না। দূরে দাঁড়িয়েও তাদের ভেতরের কান্না শোনা যায়। তোমার ক্ষেত্রেও তাই। তোমার চারপাশে যত নীরবতা, যত উদাসীনতা, যত অবিশ্বাস, সবকিছুর আড়ালেও আমি একটা চাপা ক্রন্দন শুনতে পাই।
হাঁটার সময় মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, বাতাসের গভীরে কেউ কাঁদছে। অথচ সেই কান্নার কোনো শব্দ নেই। আমি প্রতিদিন সেই অদৃশ্য কান্নার ওপর পা রেখেই তোমার দিকে এগিয়ে যাই।
পৃথিবীর সব রক্তক্ষয়, সব মৃত্যুর মিছিল, সব নিষ্ঠুরতা পাশ কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত আমি এসে থেমে যাই তোমার একাকী নীরবতার দোরগোড়ায়।
আমার শিরায় কখনও আশা দাপিয়ে বেড়ায়। কখনও হাহাকার। কখনও মনে হয়, পৃথিবীতে এখনও অনেক কিছু বাকি আছে। আবার কখনও মনে হয়, কিছুই বাকি নেই। উদাসীনতা এসে সবকিছুকে ঢেকে দেয়। তারপর অদৃশ্য কোনো ক্ষয় ধীরে ধীরে ভেতরটা খেতে থাকে।
তোমার দৃষ্টিতে একদিন আমি অবিশ্বাস দেখেছিলাম।
সেই অবিশ্বাস কণ্টকিত ঝোপঝাড়ের মতো ছড়িয়ে ছিল তোমার চোখজুড়ে। আমি এগিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। বারবার চেষ্টা করেছিলাম। আর প্রতিবারই কোনো না কোনো কাঁটা আমার শরীরে বিঁধেছে। ঠোঁট থেকে রক্ত নেমেছে। তবু আমি জানতে চেয়েছি, তোমার ভেতরে আসলে কী আছে।
তুমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ।
আমি প্রশ্ন করেছি, তুমি নীরব থেকেছ।
আমি হাত বাড়িয়েছি, তুমি হাত সরিয়ে নিয়েছ।
আমার হৃদয়ের অগ্নিতে হাত বাড়িয়ে তাকে একটু উষ্ণতা দেওয়ার বদলে তুমি বেছে নিয়েছ স্তব্ধতা।
সেদিন প্রথমবার আমার মনে হয়েছিল, আমি যেন ফেলে রাখা কোনো ভগ্ন মন্দির।
যে মন্দিরে আর ঘণ্টা বাজে না। কেউ প্রদীপ জ্বালায় না। কেউ প্রার্থনা করতে আসে না। কেবল পুরোনো দেয়ালের গায়ে ধুলো জমে থাকে, আর বাতাস এলে কোথাও থেকে শুকনো পাতার শব্দ ভেসে আসে।
আলোও বড় অদ্ভুত জিনিস।
কখনও কখনও সে মেঘের আড়ালে চলে যায়। পৃথিবী তখন অন্ধকার হয়ে যায় না, কিন্তু আলোটা আর আমাদের কাছে পৌঁছায় না। তোমার নীরবতাও ঠিক তেমন। তুমি হয়তো নিজের ভেতরে আলো নিয়ে বেঁচে আছো, কিন্তু তোমার চারপাশের মানুষ সেই আলো দেখতে পায় না।
আমিও পাই না।
তোমার নীরবতা আমার সমস্ত আলো গ্রাস করে ফেলে।
আমি দুঃখ পাই।
কিন্তু আমার দুঃখে মহাবিশ্বের কিছুই যায় আসে না।
তারারা তাদের নিয়মে জ্বলে। সূর্য তার নিয়মে ওঠে। চাঁদ তার নিয়মে আকাশ পেরোয়। নদী তার নিয়মে বয়ে যায়। পৃথিবী তার নিজের গতিতে ঘুরতে থাকে।
শুধু আমি থেমে যাই।
রাত নামে।
বাতাসে কখনও কখনও নিঃশব্দ কান্না ভেসে আসে। পাশের গাছের পাতাগুলো অকারণে কেঁপে ওঠে। দূরে কোনো কুকুর ডেকে ওঠে, আবার হঠাৎ সব চুপ হয়ে যায়।
আমি তখন নিজের ভেতরের শব্দগুলো শুনতে পাই।
কত কথা জমে আছে সেখানে!
কত প্রশ্ন!
কত অভিমান!
কত অপূর্ণতা!
কখনও মনে হয়, আমি ধীরে ধীরে পাথর হয়ে যাচ্ছি।
যত আঘাত আসে, পাথর ততই নিশ্চুপ থাকে। তাকে ভাঙতে গেলে শব্দ হয়, কিন্তু পাথর নিজে কখনও অভিযোগ করে না। আমার ভেতরের নীরবতাও এখন অনেকটা তেমন।
কেউ আঘাত করলে আমি চুপ থাকি।
কেউ ভুল বুঝলে চুপ থাকি।
কেউ দূরে সরে গেলে চুপ থাকি।
এমনকি কখনও কখনও খুব প্রয়োজন হলেও নিজের জন্য কথা বলি না।
কারণ কথা বলতে বলতে একসময় মানুষ ক্লান্ত হয়ে যায়।
অভিমান করতে করতে একসময় অভিমানও মরে যায়।
আর ভালোবাসতে ভালোবাসতে একসময় মানুষ বুঝতে পারে, ভালোবাসারও একটা সীমা আছে।
তবু আশ্চর্য, পাথরের ভাগ্যেও বৃষ্টি নামে।
দীর্ঘ খরার পর একদিন বৃষ্টি এসে পাথরের গায়ে ভিজে থাকা শ্যাওলাকে জন্ম দেয়। নদী এসে তার বুক ছুঁয়ে যায়। কখনও কোনো পথিক ক্লান্ত হয়ে তার পাশে বসে। কখনও কোনো পাখি এসে তার ওপর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়।
অর্থাৎ পাথরও পুরোপুরি পরিত্যক্ত নয়।
তাহলে আমার ভাগ্যে কি কেবল শুকনো মরুভূমি?
আমার জন্য কি কোনো বৃষ্টি নেই?
কোনো নদী নেই?
কোনো সবুজ শ্যাওলা নেই?
নাকি আমি নিজেই এতদিন মরুভূমির দিকে তাকিয়ে ছিলাম যে, আমার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটাকেও দেখতে পাইনি?
কখনও কখনও মনে হয়, তোমার দিকে তাকিয়ে আমি আসলে তোমাকে নয়, নিজেরই একটা হারিয়ে যাওয়া অংশকে খুঁজছি।
তোমার চোখের শঙ্কায় আমার নিজের ভয় দেখি।
তোমার নীরবতায় আমার নিজের না বলা কথাগুলো শুনি।
তোমার একাকীত্বে আমার নিজের একাকীত্বের ছায়া দেখতে পাই।
হয়তো এ কারণেই তোমার কাছ থেকে বারবার দূরে সরে গিয়েও আবার ফিরে আসি।
কারণ কিছু মানুষকে ছেড়ে যাওয়া যায় না।
তাদের সঙ্গে থাকা যায় না, আবার তাদের ছাড়া থাকাও যায় না।
তাই মাঝখানে একটা অদ্ভুত জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
সেখানে কোনো দাবি নেই।
কোনো অধিকার নেই।
শুধু অপেক্ষা আছে।
হয়তো একদিন তুমি মুখ ফিরিয়ে তাকাবে।
হয়তো একদিন তোমার চোখের সেই অবিশ্বাস একটু নরম হবে।
হয়তো একদিন তুমি বুঝবে, যে মানুষটি প্রতিদিন তোমার নীরবতার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ায়, সে তোমার কাছ থেকে কিছু নিতে আসেনি।
সে শুধু জানতে চেয়েছে, এত অন্ধকারের ভেতরেও তুমি বেঁচে আছো কি না।
আর যদি কোনোদিন তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করো, এতদিন পরও কেন দাঁড়িয়ে আছো?
আমি হয়তো কোনো উত্তর দিতে পারব না।
শুধু চুপ করে তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকব।
কারণ কিছু অপেক্ষার কোনো শেষ নেই।
আর কিছু মানুষকে ভালোবাসা মানে তাদের কাছে পাওয়া নয়।
কখনও কখনও ভালোবাসা মানে হলো, তারা যতই নীরব থাকুক, দূরে সরে যাক, অবিশ্বাস করুক, তবুও তাদের ভেতরের অন্ধকারের জন্য একটুখানি আলো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা।
হয়তো সেই আলো কোনোদিন তাদের কাছে পৌঁছাবে না।
তবুও আলো জ্বালিয়ে রাখতে হয়।
কারণ পাথরের বুকেও একদিন বৃষ্টি নামে।
নদী আসে।
শ্যাওলা জন্মায়।
আর মরুভূমিরও কোথাও না কোথাও, বালুর নিচে চাপা পড়ে থাকে একফোঁটা পানির অপেক্ষা।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:২৯
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাজার থেকে নৌকাবাইচ- এরপর কোথায়?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০

মাজার থেকে নৌকাবাইচ- এরপর কোথায়?
মাজার বিদ্বেষ, বাউলগান বিদ্বেষ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আপত্তি- এরপর কিছুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কলেমা লেখা পতাকা টানানো; আর এখন সিলেটের বিয়ানীবাজারে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে ঐতিহ্যবাহী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা - 'সত্য বলার সনদ'

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮



রাত দুটায় রাকিবের ফোন বেজে উঠলো।

—ভাই, আপনার মুক্তিযোদ্ধা সনদটা কোথায়?

—কেন?

—একজন আমেরিকা-প্রবাসী ব্লগার বলেছেন, আপনি নাকি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা।

রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
—আমার সনদ তো আলমারিতে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাবিতে "মব সায়েন্স" পড়তে হলে কী কী যোগ্যতা লাগে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:১৮



- রাজনৈতিক সুবিধার জন্য তৌহিদী জনতার ব্যবহার করা জানতে হবে।

- রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও মবকে থামাতে না পারলে সেটাকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা না বলে "জনতার শক্তি" বলতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ রক্ত ঋণ

লিখেছেন ইসিয়াক, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫৪




আমাদের পরিবারে সাব্বির নামটা উচ্চারণ করা নিষিদ্ধ । সাব্বির ভাইয়া আব্বুর প্রথম সংসারের একমাত্র সন্তান আর আমরা দুই ভাই -বোন তার দ্বিতীয় সংসারের।
সাব্বির ভাইয়ার মা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আর্কাইভ থেকে: আহ প্রিয়তমা, মিলনের গল্প জানো না

লিখেছেন অর্ক, ২৩ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:১৫



ফেলে আসা এক সড়কের কথা মনে পড়ে। হলুদ নিয়ন বাতির ম্লানাভ সন্ধ্যেবেলা। পলেস্তারা খসা বয়োজীর্ণ দেয়াল। দুয়েকটি রিক্সা। সিটের ’পর পা তুলে আঁটোসাটো ঝিমানো চালক। খেলা শেষে ঘরে ফেরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×