somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাভাষীদের ইংরেজি দুর্বলতা

২৬ শে জুলাই, ২০১৪ বিকাল ৪:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি ভাবি, কী আমাদের অনেককে বাংলা বাক্যে অযথা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে প্রলুব্ধ, প্ররোচিত, পরিচালিত করে? বাংলাভাষায় স্থায়ীভাবে স্থান করে নেয়া নতুন ও পুরাতন ইংরেজি শব্দগুলো ছাড়া, আরোপিত বাচন-ভঙ্গিমায় অত্যন্ত সাধারণ ইংরেজি শব্দ দ্বারা বাংলা শব্দগুলোর অকারণ প্রতিস্থাপন অত্যন্ত শ্রুতিকটু হলেও আমাদের অনেকেই নির্বিকারভাবে, নির্বিচারে এই কাজটি করেন! কেউ কেউ শুধু নির্বিচার প্রতিস্থাপনই নয়, ইংরেজি শব্দের সঠিক ব্যবহারেও অবিচার করেন। উদাহরণ স্বরূপ- ''এটার মধ্যে একটা কালার-ফুল ব্যাপার আছে'', ''এটা খুবই ব্যাড হল'', ''অনেক সময় লুক করি'', ''সবসময় লাইক করি'' ইত্যাদি। এমনকি টেলিভিশনে বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক-উপস্থাপিকাদেরও এভাবে বাংলা বাক্যে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে শোনা যায়। টকশো শ্রেণীর অনুষ্ঠানগুলোতে আমন্ত্রিত ছোট-বড় পর্দার অনেক তারকাও এটা করে থাকেন। এফএম রেডিওর চ্যানেলগুলো তো এই প্রবণতার প্রবর্তকদের মধ্যে অন্যতম!

চিন্তা করি, আমরা কেন এটা করি? কী প্রমাণ বা প্রকাশ করতে চাই? নিজেকে অন্যের কাছে আধুনিক হিসেবে উপস্থাপন করাই কি এর উদ্দেশ্য? লিও তলস্তয়, ফিওদর দস্তোয়ভস্কি, আন্তন চেখবদের উপন্যাসগুলোয় তৎকালীন রাশিয়ার যে বনেদী সমাজ ফুটে উঠে, তাতে দেখা যায় রাশিয়ানরাও নিজেদের মধ্যকার কথোপকথনে রুশ ভাষার পাশাপাশি ফরাসী ভাষা ব্যবহার করত নিজেদের শিক্ষা, সামাজিক অবস্থানকে প্রমাণ করার জন্য। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষাভাষীদের মধ্যে এধরণের চর্চা আছে। আমরাও কি তাদের মতই নিজেদেরকে অন্যের কাছে উচ্চ শিক্ষিত, উঁচু সমাজের প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে ইংরেজিকে ব্যবহার করি? কিন্তু বাংলা কথোপকথনে, বাংলা বাক্যের ভেতর হুট করে কাম, লুক, ব্যাড, গুড ইত্যাদি অতি সাধারণ ইংরেজি শব্দের ব্যবহার সেই উদ্দেশ্য অর্জন করে কি? আমরা যদি এভাবে, ইংরেজি জ্ঞান দ্বারা নিজেদেরকে অন্যের কাছে শিক্ষিত প্রমাণ করতে চাই (এবং তার সাথে সাথে আধুনিকও), তবে ইংরেজি ভাষার প্রতি আমাদের অনুরাগ জন্ম নেয় না কেন? কেন সত্যি সত্যি আমরা ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করার চেষ্টা করি না? নিজ সম্পর্কে বিশেষ ধারণা জন্ম দেওয়ার স্বার্থে ইয়েস-নো-ভেরি-গুড দিয়ে অন্যকে বিব্রত, বিভ্রান্ত, বিরক্ত করা কেন?

এই অভ্যাস আছে, এমন কারো সাথে কথা বলার সময় আমি ব্যক্তিগতভাবে অপমানিত বোধ করি। কারণ, স্বাভাবিকভাবেই, আমার মনে হয় ঐ ব্যক্তি আমাকে একজন সপ্রতিভ, আধুনিক মানুষ হিসেবে বিবেচনা করছেন না, যেহেতু, স্পষ্টতই তিনি আধুনিকতাকে ভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। তাছাড়া আমার এও মনে হয় যে তিনি আমার বুদ্ধিমত্তাকে খাটো করে দেখছেন এবং আমাকে তার নিজের সম্পর্কে ভুল ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের আরোপিত বাচনভঙ্গি এবং ইচ্ছাকৃত বাংলা শব্দের বিকৃত উচ্চারণও (যেমন, শেষ কে সেস বলা, সেটা না বলে সেতা বলা) অত্যন্ত বিরক্তিকর এবং কুৎসিত। আমি যা নই, অন্যের কাছে তা প্রমাণ করার চেষ্টা অগৌরবের। আমাদের কাছে নিজের জন্য যথেষ্ট সম্মান নেই, ভালবাসা নেই; তাই এই অদ্ভুত চর্চার সৃষ্টি। আমরা নিজের পছন্দ মোতাবেক কিছু করি না, ফলে, অন্যের কাছে নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করতে চাই, যা আমরা ভাবি যে আমাদের জন্য গৌরবময় হবে। অথচ তেমনটা আসলে হয় না। হয় ঠিক তার উল্টোটা।

আমরা কেন নিজের জন্য কিছু করি না? হয়ত শুধু এই বিষয়টিতে কিছুটা স্বার্থপর হলেই কল্যাণ হয়! যে লেখক নিজের জন্য লেখেন, তার লেখাই অমর হওয়ার যোগ্যতা রাখে। প্রয়াত জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ যদি তার নিজের জন্য লিখতেন, তবে নিশ্চয়ই আমরা, বাংলাভাষীরা, এই অসাধারণ মেধাবী লেখকের কাছ থেকে কালজয়ী কিছু উপন্যাস পেতাম;আমাদের সন্তানদের বলতে পারতাম- "বাছা, তাঁর এই উপন্যাসটি তোমার জন্য অবশ্য পাঠ্য"। কিন্তু তিনি সচেতনভাবে বিলাসবহুল বাড়ির জীবন বেছে নিয়েছিলেন এবং স্বেচ্ছায় মানুষের মনে আজীবন বেঁচে থাকাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন (তবে হ্যাঁ, এই দিক থেকে চিন্তা করলে, তিনি স্বার্থপর ছিলেন বটে)। হুট হাট ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেও বোধ করি সাময়িকভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত (কাউকে মুগ্ধও কি?) করা যায়, কিন্তু নিজেকে, নিঃসন্দেহে, প্রমাণ করা যায় না। ফেসবুকে-- বন্ধু, অনুসারীদের সাড়া, পোস্টে লাইকের সংখ্যা বিবেচনা করে যারা লেখার ধরণ-আকার-বিষয় নির্ধারণ করেন, তাদের সাথে বাংলিশ-ভাষীদের মিল খুঁজে পাই। এই দুই শ্রেণীর ব্যক্তিরা নিজেদের সনাক্ত করেন অন্যের দৃষ্টি দিয়ে। আমি তাদের জন্য দুঃখবোধ করি। কথাটা উন্নাসিকের মত শোনালেও, এটা মিথ্যে নয়। কিন্তু এখনো নিশ্চিত নই এতে অন্যায় কিছু হচ্ছে কিনা! হয়ত এটা বিরক্তিকর হলেও স্বাভাবিক। একে মেনে নিতে হবে। এই'ই জগতের নিয়ম যে বিস্ময়কর রকম জনপ্রিয়তা পেতে শরত, হুমায়ূনরা আসবেন, মানুষ কোনো না কোনো উপায় খুঁজে নেবে নিজেদের অন্যের তুলনায় ভিন্ন প্রমাণ করতে এবং বিক্রি হবে অপরের পছন্দ-অপছন্দের কাছে। এই নিয়ে ভাবিত হবার কিছু নেই।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে জুলাই, ২০১৪ বিকাল ৪:৪৫
১০টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পরিস্থিতি কি জটিল?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি, অথচ বাইরে পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড আর টিয়ার গ্যাসের শব্দে চারদিক প্রকম্পিত! মিরপুরে আমার বাসার কাছেই মেট্রো রেলের নিচে আগুন দেওয়া হয়েছে; কিছুক্ষণের জন্য মেট্রো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৯



খাওয়া দাওয়া করাটা আজকাল বিরক্তকর লাগে।
কিন্তু মানুষের বেঁচে থাকতে হলে- খেতে হবে। না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে। প্রিয় খাবার গুলোও খেতে ইচ্ছা করে না। ভালো লাগে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৬


এই লেখাটি যখন লিখছি, তখন এই গুজবটি ছড়িয়ে পড়েছে যে, ইসরায়েল ট্রাম্পকে রাজি করিয়েছে, যাতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই আমেরিকা ইরানে পারমাণবিক বোমা হামলা করে। বিগত বছরগুলোতে ইসরাইল সারা বিশ্বের... ...বাকিটুকু পড়ুন

Haze দমনে সিঙ্গাপুরের কুটনৈতিক দক্ষতা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১

সিঙ্গাপুর সাম্প্রতিককালে স্মরনকালের ভয়াবহ Haze (ধোঁয়াশা ও বায়ুদূষণ) এর কবলে পড়ে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সারা শহর ঘন ধোয়ার আবরনে ঢেকে যায়। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার বেঁচে থাকাই তাদের ভয়ের কারণ॥

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫১





শেখ হাসিনার বেঁচে থাকা নিয়ে আক্ষেপ কেন? একটি রাজনৈতিক সমীকরণের বিশ্লেষণ

সম্প্রতি তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদুর রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে - "শেখ হাসিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×