সদ্যসমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাসখানেক আগে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত হয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যার অন্যতম প্রধান শরিক ছিল বিএনপি , আসন ভাগাভাগি করে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে । নির্বাচনে কিছুটা অনিয়ম হয়েছে একথা সত্য কিন্তু চরম বাস্তবতা হল নির্বাচন শতভাগ সুষ্টু হলেও আওয়ামীলীগই জয়লাভ করতো , হয়তো ঐক্যফ্রন্ট কিছু আসন বেশি পেত কিন্তু বিজয়ী হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না । এই নির্বাচনের জন্য ঐক্যফ্রন্ট এর না ছিল কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা , না ছিল কোনো হোমওয়ার্ক , মোটাদাগে ঐক্যফ্রন্ট এর কিছু ব্যার্থতা চিহ্নিত করা হলো :
১. নির্বাচনকে সামনে রেখে ঐক্যফ্রন্ট সরকারের সাথে দুদফা সংলাপে বসে , সংলাপে তাদের দাবি ছিল সাতটি যদিও একটি দাবিও তারা আদায় করতে পারেনি তদুপরি তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা দেখলাম যে ঐক্যফ্রন্ট সরকারের সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখলো না , তাদের উচিত ছিল সরকারের একজন প্রতিনিধি নির্ধারণ করে তার সাথেই নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তাদের প্রয়োজনে সংলাপে বসে সকল অভিযোগ জানানো , বিশেষ করে নেতাকর্মী গ্রেফতার ও প্রচার প্রচারণায় বাধার ব্যাপারটা বিএনপি তাদের কাছে তুলে ধরতে পারতো এবং প্রধানমন্ত্রীর সাথে হওয়া সংলাপে তাদের প্রতিশ্রুতির বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে পারতো ।তা না করে বিএনপি শুধু একের পর এক সংবাদ সম্মেলন করে গেছে যা কোনো কাজেই আসেনি ।
২. এই নির্বাচনে বিএনপির কোনো শক্তিশালী নির্বাচনী পরিচালনা টিম ছিল না । একটি নির্বাচন শুধু মনোনয়ন আর দলীয় প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না , এটি একটি সুবিশাল টিমওয়ার্ক , আওয়ামীলীগে আমরা দেখেছি সাবেক সচিব এইচ টি ইমামের নেতৃত্বে একটি বিরাট টিম নির্বাচন পরিচালনায় যুক্ত ছিল যাদের প্রসাধন বিষয় ব্যাপক অভিজ্ঞতা , একটি নির্বাচনে প্রশাসন অনেক বড় একটা ব্যাপার , বিএনপির কি সেরকম কেউ ছিল নির্বাচনী পরিচালনা কমিটিতে যারা প্রশাসন ও বিচার বিভাগ সম্পর্কে অভিজ্ঞ ??? মনোনয়ন ফর্ম পূরণে সামান্য ভুলের জন্য তাদের অগণিত প্রাথীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে , তারা কি মনোনয়ন ফর্ম পূরণের চেকলিস্ট সম্পর্কে প্রাথীদের কোনো ধারণা দিয়েছিলো ??? মনোনয়ন বাতিলের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কেন উপজেলা চেয়ারম্যানদের কেন মনোনয়ন দেয়া হলো ??
৩. এই নির্বাচনে বিএনপির কোনো প্রচারণা ছিল না , সমস্ত ঢাকা শহরে তাদের একটা পোস্টার চোখে পড়েনি , একটা জনসভা পর্যন্ত তারা করেনি, কোনো সেন্টারে তাদের পোলিং এজেন্ট পর্যন্ত ছিলোনা , ভোটাররা যদি না জানতে পারে বিএনপির প্রার্থী কে তাহলে তারা কাকে ভোট দেবে ।উপরন্তু দলীয় নেতাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্য কাজ করছিলো , বিএনপির মধ্যে অনেকেই চাচ্ছিলেন ভোট বয়কট করতে যা তাদের ফোনালাপ থেকে জানা যায় , এই নির্বাচন কি তারা আন্দোলনের অংশ হিসেবে নিয়েছিল নাকি নির্বাচনে জিতে সরকার গঠনের জন্য নিয়েছিল তা পরিষ্কার ছিলোনা । ফলাফল প্রকাশের পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছে ধানের শীষের ভোট কোথায় গেলো ??? বিএনপি কি তাদের ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসার কোনো উদ্যোগ নিয়েছিল ?? বিএনপি ভেবেছিলো মানুষ ধানের শীষ দেখে একটা নীরব বিপ্লব করে ফেলবে , কিন্তু বিপ্লব সৃষ্টি হবার মতো কোনো উপাদান বা পরিস্থিতি কি দেশে আছে ?? একথা সত্য সরকারের তথা আওয়ামীলীগের অঙ্গসংগঠনের নেতা কর্মীদের কিছু অত্যাচার আছে , কিছু দুর্নীতি আছে , কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা আছে , মানুষের পকেটে টাকা আছে , ব্যাবসা বাণিজ্যের অবস্থা ভালো , বছরের প্রথমদিন শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে বই পাচ্ছে , নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বেশি হলেও তা মানুষের উপার্জন বৃদ্ধির সাথেই এখনো সামঞ্জস্যপূর্ণ আছে ।আমরা এই কোটা আন্দোলন কিংবা আর যত কিছুই তুলে ধরি না কেন এগুলো সবই শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজের আলোচনার বিষয়, গ্রামীণ জনপদে আওয়ামীলীগ ব্যাপক জনপ্রিয় , বিশেষ করে গ্রামের অতিদরিদ্র পরিবারের মধ্যে দশ টাকা কেজি দরে ত্রিশ কেজি চাল সুলভে বিক্রয় এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের ফ্রি চিকিৎসা সুবিধা আওয়ায়ামীলীগকে গ্রামীণ জনপদে ব্যাপক জনপ্রিয় করেছে , এমতাবস্থায় কোনো নীরব বিপ্লবের কমনা করা একেবারেই অবান্তর ।
৪. এই নির্বাচনে বিএনপির কোনো ভিশন সামনে ছিলোনা , বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এখন কারান্তরীণ , বিএনপি তার মুক্তির দাবিকে সামনে নিয়ে এসেছে , সন্দেহ নেই বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির ঐক্যের প্রতীক , কিন্তু তা চার বিএনপির উচিত ছিল এসবকিছুর পরেও একটি স্লোগান সামনে নিয়ে আসা , বিএনপি তা করেনি । ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামিলিগ ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং ভিশন ২০২১ সামনে নিয়ে আসছিলো যা তরুণ সমাজের কাছে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলো যা আওয়ামীলীগের বিশাল বিজয় এনে দেয় , যদিও আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ইশতেহারে গ্রেনেড হত্যা মামলার বিচার ও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারের রায় কার্যকরের বিষয়টি ছিল কিন্তু তারপরেও তারা সেগুলোকে ছাপিয়ে জনগণ ও তরুণ প্রজন্মের চাহিদার কথা মাথায় রেখে সম্পূর্ণ একটি ব্যাতিক্রমী বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে যা নির্বাচনে সেই সময় তাদের বিশাল বিজয় এনে দিয়েছিলো , বিএনপি কি তেমন কিছু দিয়ে জনগণকে আকৃষ্ট করেছে ? বেগম খালেদা জিয়া ইতিপূর্বে ভিশন ২০৩০ ঘোষণা করলেও বিএনপি তা নিয়ে জনগণের সামনে যেতে পারেনি
এই মুহূর্তে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের উচিত আবেগ পরিহার করে তাদের পরাজয়ের সঠিক কারণ খুঁজে বের করা এবং তা থেকে শিক্ষা নেয়া , এই বিশাল পরাজয় বিএনপিকে এখন অস্তিত্বের সংকটে ফেলেছে ।নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেখলাম অনেক বিএনপি ঘেঁষা বুদ্ধিজীবী ও সংবাদপত্র সরকার এবং মহাজোটের প্রশংসা করছে । মানুষ সবসময় জয়ীর পক্ষে থাকে , শক্তির কাছাকাছি থাকতে চায় , ইটা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি ।এই মুহূর্তে বিএনপি অনেক বেশি একা , তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বলে দেবে দলটি সব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে আবার ঘুরে দাঁড়াবে না কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে ।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১৯ সকাল ১১:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




