প্রবাসী বাঙালিরাও হিন্দি প্রভাব মুক্ত নয় বরং তাঁদের অবস্থা আরো জটিল। যে যেই দেশে বসবাস করবে সেই দেশের ভাষা ও সংস্কৃতিই তাঁর প্রধান ভাষা, শিল্প-সংস্কৃতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। ব্যস্ততা এবং অবস্থানগত কারণে ফেলে আসা দেশের শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার সময় বের করা অনেক সময় দুস্কর হয়ে দাঁড়ায়। আমার এক ভারতীয় বন্ধুর ছোট্ট ছেলে রোদ্দুর। সবে কথা বলতে শিখেছে। চার মাস কলকাতা বেড়িয়ে এসেছে। অনেক শিশুদের মতই কোক-পেপসি দেখলেই খেতে চায়। রোদ্দুরকে চোখে চোখে রাখতে হচ্ছে যাতে কোক-পেপসিতে চুমুক না দেয়। দরোজার বাইরে রোদ্দুর একটি কোকের কৌটা আবিস্কার করে চুমুকের অপেক্ষায় ওর চোখ দুটো যখন জ্বলজ্বল করছে ঠিক তখনি আমি ওকে বাধা দিলাম। আমি ওকে বলছি কৌটোটা আমাকে দিতে, বলছি কে না কে যেন খেয়ে বাইরে ফেলে রেখেছে ওতে চুমুক দিওনা। আর রোদ্দুর তখন খুব রেগে আমাকে বললো "নেহি"। রোদ্দুর প্রবাসে থেকে নেহি বলতে শিখেনি, শিখেছে পশ্চিম বাংলায় হিন্দির প্রসারতার কারণে। আমার আরেক বাংলাদেশের বন্ধুর বৌ ভারতীয়। পূর্বপুরুষ বাঙালি কিন্তু বড় হয়েছে দিল্লিতে। ও যখন প্রথম প্রথম বাংলা বলতো তখন তাতে হিন্দি শব্দ থাকতো প্রচুর। উচ্চারণের ভিন্নতাতো আছেই। ওর মনের অজান্তেই দুই ভাষার সংমিশ্রন হতো। ওর পরিস্থিতি সম্পুর্ণ ভিন্ন। ওর এই ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা অসচেতনতা থেকে নয়। কিন্তু আমার দেখা সিংহভাগ প্রবাসী বাঙালি বাংলার চেয়ে হিন্দি চর্চাই বেশী করে। বাঙালি মালিকানাধীন দেশীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে থাকে হিন্দি চলচিত্রের নায়ক নায়িকাদের ছবি এবং সারাক্ষন চলতে থাকে হিন্দি গান কিং বা ছায়াছবি। বাড়ীতেও একই অবস্থা। ছেলেমেয়েদেরকে নিয়ে যেটুকু সময় বাসায় কাটানো হচ্ছে তার সংহভাগ যাচ্ছে হিন্দি ছায়াছবি, হিন্দি নাটক কিংবা হিন্দি গানে। সাত আট বছরের শিশু কন্যা হিন্দি নিম্বুরা গানের হুবুহু রপ্ত করতে পেরেছে এই খবর বলতে চোখ মুখ উজ্জল হয়ে ওঠে গর্বিত পিতা-মাতার। প্রবাসী বাঙালিরা যে ভাবে হিন্দি চর্চা করছে তাতে শিশুরা ভাবছে হিন্দিই তাঁদের ফেলে আসা দেশের পূর্বপুরুষের ভাষা ও সংস্কৃতি।
আমার খুব দুঃখ হয়, খুব ভয় হয় আমাদের বাংলাদেশের বাঙালিদের কথা ভেবে। যখন সহস্র কোটি রোদ্দুর প্রতিনিয়ত হিন্দি ছায়াছবি, নাচ-গান আর নাটকের মাঝে বড় হবে তখন তাঁদের ভাষাকি আমাদের এই বাংলা থাকবে? যখন ঐ রোদ্দুরেরা গল্প কবিতা নাটক লিখবে তা কতটা বাংলা ভাষা, শিল্প-সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হবে তা বোঝার ক্ষমতা আমাদের কারো কি আছে? বর্তমানে যে লেখক, কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী কিংবা নাট্যকার হিন্দি প্রভাবিত তা নিতান্তই অসচেতনার জন্য। কিন্তু আজকের যে শিশু বড় হয়ে গল্প কবিতা নাটক লিখবে এবং তাতে হিন্দির যে প্রভাব পড়বে তার কারণ তাদের পূর্বপুরুষের ধর্মান্ধতা, অশিক্ষা এবং অসচেতনতা। তাঁরা যখন তাঁদের মাতৃ ভাষায় কথা বলবে তা শুনে হয়তো মনে হবেনা বাংলা। মনে হবে বাংলা নয়, বাংলা এবং হিন্দির মতো কোন এক ভাষা।
এই অশুভ ভবিষ্যত বদলাতে হবে আমাদেরকেই। বদলাতে হবে আমাদের বর্তমান জীবন ধারা। কোন কিছু দেখার বা শোনার নেই বলেই সর্বক্ষন হিন্দি চর্চা করলে চলবেনা। আমাদের শিশুদেরকে জড়াতে হবে বিভিন্ন গঠনমূলক দৈনন্দিন কার্জক্রমে। পিতা-মাতাকে আরো বেশী সময় দিতে হবে তাঁদের সন্তানদেরকে যাতে হিন্দি ছাড়া যদি কিছু দেখার বা শোনার নাই থাকে তাতে অন্তত কিছুটা সময়ের জন্য হলেও হিন্দি প্রভাব মুক্ত থাকা যাবে। রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী, নীতি নির্ধারক, নাট্যকার, অভিনেতা-অভিনেত্রী কিংবা ব্যবসায়ীদের উপর এর দায় ভার চাঁপিয়ে দিলে চলবেনা। সচেতন হতে হবে আমাদেরকে। আমাদের শিক্ষা, সচেতনতা এবং ধর্ম নিরপেক্ষতাই তাঁদের অশিক্ষা, অসচেতনতা এবং ধর্মান্ধতায় আঘাত হানবে।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই এপ্রিল, ২০০৭ রাত ৮:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


