ডা ভিঞ্চি কোডের মুভ্যি বের হবে শুনেই দেখার জন্য মুখিয়ে ছিলাম। কিন্তু রিভিউগুলো শুনে দমে গেলাম একদম। যারাই আগে বই পড়েছে, তারা এক বাক্যে মুভ্যিটাকে ফালতু বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। কি যে মন খারাপ হল!
ভাইয়া বলে রেখেছিল আমার সাথে যাবে। ছোট বোনটাও যাওয়ার জন্য এক পায়ে খাড়া। অথচ গত সপ্তাহে যখন ইশি আর তাসিনের সাথে লাঞ্চ করছিলাম, তখন ইশি হঠাৎই ঘোষণা দিল, ডা ভিঞ্চি কোড দেখতে সিনেমায় যেতে ইচছা করছে। তাসিন সাথে সাথে দিল ঢোলে বাড়ি, যাবা নাকি? আমি তো এক পায়ে খাড়া। দিন তারিখ ঠিক হল পরের শুক্রবার যাব। তাও ব্রডওয়ে হয়েটসে, সিডনীর খুব ভাল সিনেমা হলগুলোর একটায়। ছোট বোনকে প্রতিজ্ঞা করলাম, এর বদলে সামনের ছুটিতে পাইরেইস অফ ক্যারিবিয়ান দেখতে নিয়ে যাব। একটু গাই গুই করে রাজি হয়ে গেছে। ভাইয়াকে ভয়ে ভয়ে বললাম, বেচারা ভালই আহত হল, 'তুই আমারে ডিচ করে তোর বন্ধুদের সাথে যাচ্ছিস? যা ভাগ!' ওকে নিবৃত্ত করলাম এই বলে, 'আরে ভাইয়া, চিন্তা কর, যদি বইয়ের সব, মানে ওই সেইক্রেড ফেমিনিজমের থিওরীগুলো সব গ্রাফিক ডেস্ক্রিপশন সহ দেখায় তাইলে তোমার সামনে দেখাটা একটু বিব্রতকর হবে না? ভাল হল না, বন্ধুদের সাথে যাচ্ছি?' বন্ধুদের যখন বললাম এই বলে নিবৃত্ত করেছি তখন ওরা হাসিতে ফেটে পড়ল, 'য়ু প্লেইড দ্যা বেস্ট কার্ড'!
আল্লাহ বাঁচাইসে, হলিউড স্ট্যান্ডার্ডে খুবই শালীন এবং ভদ্র একটা মুভ্যি। না করে উপায়ও ছিল না ডিরেক্টরের। 593 পৃষ্ঠার একটা বইকে যখন 120 মিনিটের মুভ্যিতে পরিনত করতে হয়, তখন সস্তা শুড়শুড়ি দেয়ার সুযোগ থাকে কম।
রবার্ট ল্যাঙডন সম্পর্কে বইয়ে মোটামোটি এমন ধারণা দেয়া: পঞ্চোশার্ধ, ক্যারিজমেটিক, হার্ট স্টপিং, ব্রিথ টেকিংলি হ্যান্ডসাম ইতিহাস ভালবাসা অধ্যাপকের জন্য ছাত্রীরা সব পাগল। আহেম, পঞ্চোশার্ধ এক ব্যাক্তি কি করে এত হ্যান্ডসাম হয় বুঝি নি, ভাবলাম, মুভ্যি দেখে বুঝব, কিন্তু টম হ্যাঙকস এই চরিত্রে অভিনয় করছে শুনেই দমে গেলাম। ব্যাটাকে রোমান্টি মুভ্যিতে ছোট ছোট পোলাপানের বাপ হিসেবে দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। মুভ্যি মান ইজ্জ্বত বাঁচাল, সময়াভাবের জন্যই মনে হয় ল্যাঙডনের চরিত্রায়নটা একটু অন্যরকম করেছে। নো রোমান্টিকতা এন্ড ফুল অফ একশন। প্রফেসর হিসেবে হ্যাঙকসকে ভালই মানিয়েছে
আর সোফি... ভলাপচুয়াস? আহেম
। তবে ক্রীপটলজির বিশেষজ্ঞ হিসেবে উজ্জ্বল কাল চোখের ফ্রেঞ্চ মহিলাটার চরিত্রায়ন ভাল হয়েছে। মিষ্টি ফ্রেঞ্চ একসেন্টের প্রতি আমার দুর্বলতা অতি পুরান, সেটাও ভাল লাগার অন্যতম কারণ হতে পারে।
এলবিনো সাইলাস? পারফেকতো, পারফেকতো। ঠিক যেমনটা হওয়া উচিৎ ছিল তেমনই। ভয়ংকর!
ফ্যানাটিক অপাস ডেই বিশপ, প্রফেসার লী টিবিং, ফ্রেঞ্চ ডিটেকটিভ সবার চরিত্রায়ন ভাল।
সবের্াপরীভাবে, মুভ্যিটা আমাকে বইটা 'ভিজুয়ালাইজ' করতে সাহায্য করেছে, গীর্জাগুলো কল্পনায় ছিল, ভাস্কর্যগুলো থেকে সিম্বলগুলো মনে মনে ভেবে নিয়েছিলাম, মুভ্যিটা ভাল করে দেখিয়ে দিল। বই পড়ার জন্য মুভ্যিটা চমৎকার গ্রাফিক্যাল গাইড। কিন্তু, স্বাধীন চলচ্চিত্র হিসেবে ফালতু দ্যা গ্রেইট। প্রথমত, খুব ঘটনা নির্ভর। বইয়ের ঘটনাই তুলে দিয়েছে, একটুও ক্রিয়েটিভিটি ছাড়া। ঘটনা খুব দ্রুত ঘটে যায়, ব্যাখ্যার স্বল্পতার কারণে পটভূমি সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলে অনেক ধারণাই পরিষ্কার হবে না, প্রচুর প্রশ্ন থেকে যাবে।
কারও সাথে একবার তর্ক হচ্ছিল দ্যা ডা ভিঞ্চি কোডের রিপ্রিজেনটেশনের সাথে ইসলামের রিপ্রেজেনটেশন কাছাকাছি। আজ একটা চমৎকার কোটেশন পেয়ে গেলাম আমার মন্তব্যকে সাপোর্ট করার জন্য। "পিপল য়ুসড টু সি হিম এজ এ মোর্টাল প্রফেট, এ গ্রেট এন্ড পাওয়ারফুল ম্যান, বাট নট 'দি সান অফ গড' ", পরবতর্ীতে, সনাতনী ধর্মে বিশ্বাসী রোমানদের কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য যীশুর 'ঈশ্বরের পুত্র' ইমেজটা সৃষ্টি করা হয়। চমৎকার! আসলে ডা ভিঞ্চি কোডের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বিতর্কিত ম্যাসেজ ছিল এটাই, যীশু ঈশ্বরের পুত্র না, একজন মানুষ। বইয়ের অন্যান্য থিওরীগুলো একটু ফারফেচড মনে হয়েছে, সত্য বলে মানতে পারছি না ঠিক। আবার হতেও পারে, খ্রীষ্টিয়ানদের সিক্রেট ব্রাদারহুডের লম্বা ইতিহাস আছে। ফ্রী মেসন, ক্লু ক্ল্যাক্স ক্ল্যান এগুলোর নাম তো সবার জানা।
ওহ, বইটা বিতর্কিত ছিল, মুভ্যি করার সময় খ্রীষ্টিয়ান চার্চগুলোর চাপের মুখে সুর অনেক নরম করেছে ডিরেক্টর। চরিত্রদের দিয়ে বার বার বলিয়েছে, এগুলো নেহায়তই থিওরী, সত্য হতেও পারে, নাও হতে পারে।
ওহ হা হা, একটা মজার ব্যপার না বললেই না। রবার্ট ল্যাঙডন আর সোফি যখন দেঁৗড়ে আলেকজান্ডারের টুম্বে ঢুকে, যার একটু পরেই টিবিং ওখানে আসে, তখন ব্যাকগ্রাউন্ডে অনেক লোকের ভিড়ে আমি পুরোদমে কাল বোরখা পরিহিতা দুই জন নিকাবী মহিলাকে দেখেছি! একদম আরব স্টাইলে! আমি প্রথমে ভেবেছিলাম দেখায় ভুল হয়েছে, কিন্তু তাসিন আর ইশি দু'জনেই একই জিনিস দেখেছে! আপনারা কেউ মুভ্যিটা এখনও না দেখে থাকলে দেখার পরে আমাকে জানাবেন তো, আমি ঠিক দেখেছি না ভুল?
মুভ্যি শেষে ব্রডওয়ে অপর্ততে পেট পূজায় ঢুকলাম। অপর্ত, পর্তুগীজ দোকানটায় চিকেন হালাল, আহ হোয়াট আ বি্লস! যে কোন বড় জায়গায় অপর্ত থাকবেই, তাই হালাল এবং মজাদার খাবারের জন্য বেশি দূরে যেতে হয় না। হট চিলি সস দিয়ে ডাবল ফিলেট বন্ডাই বার্গারে একটা আয়েশী কামড় দিতেই দোকানে এক ভদ্রলোকের আর্বিভাব, আমাদের তিন হিজাবীর দিকে কোলগেইট হাসি দিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলেন, 'ইটস অল হালাল, লেডিস?' আমরা হেসে ফেললাম। এই শতাব্দীর মজা এটা, মানুষের যোগাযোগ বাড়ায়, আন্ডারস্ট্যান্ডিং বাড়ছে অনেক অনেক।
বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি। জানি না কেন, যখনই আমরা কাজের চাপে অতিষ্ট হয়ে কোথাও বেড়িয়ে পড়ি তখনই আকাশের কান্না শুরু হয়। নিয়ম করে আমি আর ইশি ছাতা আনতে ভুলে যাই (ইচ্ছাকৃত ভুল), তাসিনের একার ছাতায় আর কি হবে, ছাতা ছাড়াই আমরা আকাশের কান্না গায়ে মেখে হেঁটে চলি সিডনীর রঙিন প্রাণকেন্দ্রে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



