somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানুষ গড়ার প্রিয় কারিগর: মিস র্যামজি

২৭ শে জুন, ২০০৬ রাত ৯:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছবিটায় এক পাশে আমি, মাঝে মিস র্যামজি আর এক পাশে অ্যানেট। দাঁড়িয়ে ছিলাম স্কুলের ফ্রন্ট অফিসের সামনে। শেষ বারের মত পড়েছিলাম ওই নেভী ব্লূ আর ধূসর চেক ফাঙ্কি স্কার্ট আর জার্সি। আমার জার্সির পিছনে লেখা 'আন্ডারকাভার 04', অ্যানেটের পিছনে 'মিজটিক্যাল 04'। আমার আর অ্যানেটের চোখ ফোলা, একটু আগে মিস্টার ইনগ্রাডির কথাগুলো শুনে আমরা নি:শব্দে কাঁদছিলাম। মিস র্যামজির মুখ কমিক্যাল হাসিতে বিসতৃত। ছবিতে বা সামনা সামনি দেখে কখনও মনে হবে না এই মহিলা একজন স্কুল শিক্ষক, ইংরেজী সাহিত্য পড়ান। আমার চেয়েও কম উচ্চতার কিন্তু হেভী মাসলবান মহিলা। সোনালী চুলগুলো ছোট করে ছাঁটা আর স্পাইক করা। কানে পাঙ্কু স্টাইলে কয়েকটা দুল। সবুজ চোখগুলো তীক্ষ। দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে পুুরুষালী ভাব স্পষ্ট।

প্রথমবার, যখন ইয়ার টেন থেকে ইলেভেনে উঠতে গিয়ে ভাবলাম, ইএসএল (ইংলিশ এজ এ সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ) পড়তে পড়তে আমি ত্যক্ত বিরক্ত, একটু সাহিত্য পড়তে চাই, ব্যকরণ না। তখন চ্যালেঞ্জ নিয়ে অ্যাডভান্সড ইংলিশ পড়তে চেয়েছিলাম। মিস র্যামজি, ইংলিশের হেড অফ দ্যা ডিপার্টমেন্ট হিসেবে আমাকে কাছে ডেকে বলেছিলেন (প্রথম দর্শনেই ভয় পেয়েছিলাম), সাধারণত এক বছর আগে নন-ইংলিশ ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা কাউকে আমরা করতে দেই না, তুমি চাইলে এক সপ্তাহ আমার ক্লাসে থাক, আমি তোমাকে দেখব, তুমি আমাদের দেখ। তারপরে সিদ্ধান্ত নিও। ওই এক সপ্তাহ পরে তিনি আমাকে বলেছিলেন, তোমার কনসেপচুয়্যাল আর ক্রিয়েটিভির দিক দিয়ে কোন সমস্যা নেই, বরং ক্লাসের বাকিদের চেয়ে অবস্থান ভাল। ভাষাগত যা আছে সেটা কাটিয়ে উঠতে পারবে, অসুবিধা হবে না।

তখন থেকেই মিস র্যামজি সব হিসেব গোলমাল করে দিয়ে আমাকে পছন্দ করতেন। স্কুলের যত কনজারভেটিভ শিক্ষকরা আছেন, ভারতীয়/বাঙালী/পাকি ছাত্রীরা আছে সবাই মিস র্যামজিকে অপছন্দ করতেন। মিস র্যামজির সাথেও আপাত দৃষ্টিতে আমার বহুত তফাৎ, উত্তর মেরু দক্ষিণ মেরু টাইপের অবস্থা। আমি আগা গোড়া হিজাবে মোড়া, তিনি পারলে প্রকৃতিবাদী হন। গরমে স্কুলে আসতেন স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পড়ে। লেসবিয়ান। শেক্সপিয়ার, জেইন অস্টেন যাই পড়াবেন, তারই একটা যৌন সম্পর্কীয় ব্যাখ্যা দিবেন। জেইন অস্টেন পড়াতে পড়াতে একটা বই নিয়ে আসলেন, 'দ্যা মিসিং লাভ সীনস অফ প্রাইড এন্ড প্রেজুডিস'। ইউফেমিজমের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বললেন, শারিরীক সম্পর্কের বহুল প্রচলিত ইউফেমিজম হল 'ইট'...ইহা!

তারপরেও মিস র্যামজিকে এত ভাল লাগত, কারণ আমি এসবের আড়ালের মিস র্যামজিকে দেখতে পেতাম যিনি মিথ্যাচার, অন্যায়, দ্বিমুখোচরিত্র একদম সহ্য করতে পারতেন না। প্রচন্ড নীতিবান। একবার পরীক্ষায় একজন হাতের কনুইয়ের একটু নিচে লিখে এসেছে, পরীক্ষার হলে জাম্পার গুটিয়ে ওখান থেকে খাতায় টুকছে। মিস র্যামজির চোখে পড়ায়, তিনি মেয়েটাকে সোজা প্রিন্টিং রুমে নিয়ে গেলেন। মেয়েটার নকলওয়ালা হাতের ফটোকপি করলেন। তারপরে সেটা স্কুলের জায়গায় জায়গায় টাঙিয়ে দিলেন (মেয়েটার নাম কাউকে বলেন নি অবশ্য)। খুব স্পষ্টভাষী ছিলেন। যা বলার সামনা সামনি বলতেন, পিছনে কথা ছড়ানো মারাত্মক অপছন্দ করতেন। বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু শোভনতা অশোভনতা মানতেন। 'গড' কে কখনও পবিত্র কিছু ভাবেন নি, কিন্তু তাঁকে নিয়ে অসম্মানজনক কথা বললে কিছু মানুষ যে সত্যিই কষ্ট পায় সেটাকে শ্রদ্ধা করতেন। মনে আছে, এইচ এস সি এর টেক্সট হিসেবে আমি করছিলাম 'নট উইদাউট মাই ডটার'। একজন আমেরিকান মহিলা ইরানে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন। হ্যা, বিচ্ছিরি অভিজ্ঞতা, কিন্তু তিনি ইরানী কালচারকে ইসলামী কালচারের সাথে মিশিয়ে খুব খারাপ ধরণের ম্যানুপিলেশন করলেন। বইটা একটু ক্রিটিক্যালি পড়লে অনেক অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়। বইটা মহিলা একা লিখেন নি, বায়োগ্রাফী লিখতে আরেকজনের সাহায্য লাগবে কেন? পাবলিশিঙের সময়টাও দারুণ টাইমলি ছিল, ঠিক যখন ইরানের উপর সারা বিশ্ব ক্ষেপে আছে। এইচ এস সিতে ওটা নিয়ে রেজিস্টিভ রিডিং করে লেখা যায় কি না তাই মিস র্যামজির সাথে কথা হল, তিনি খুব খুশি হয়ে রাজি হলেন। আমাকে আরও কিছু পয়েন্ট ধার দিলেন।

প্রচন্ড শক্ত আর তেজী মহিলা, এনার মধ্যে নরম কিছু খুঁজতে যাওয়াই বৃথা। যাকে অপছন্দ করতেন প্রচন্ড অপছন্দ করতেন। মুখের বিষে জান অতিষ্ঠ করে ফেলতেন। কখনও অপ্রস্তুত হতে দেখিনি মিস র্যামজিকে। সফিস্টিকেইটেড, তারপরেও আমার মধ্যে কি দেখেছেন আমি জানি না, খুব স্নেহ করতেন, অব্যক্ত কিন্তু সুস্পষ্ট স্নেহ।

আজ বহুদিন পরে মিস র্যামজিকে দেখলাম। দেড় বছর পরে। আজ স্কুলে গিয়েছিলাম ছোট বোনের টিচারদের সাথে কথা বলতে। দেড় বছর পরে গেলাম ওই চেনা অলি গলিতে। করিডরে দাঁড়িয়ে ছোট বোনের সাথে কথা বলছিলাম, হঠাৎই পিছনে শুনলাম, 'হ্যালো স্ট্র্যাঞ্জার!' পিছনে তাকিয়ে দেখি মিস র্যামজি তাঁর অতি চেনা পুরুষালী হাঁটা দিয়ে কোথাও যাচ্ছেন। দেড় বছর পরে আমার এত প্রিয় একজন শিক্ষক আমাকে পিছন থেকে দেখেও চিনে ফেললেন! আমি আর যাই কই! খুব তাড়াহুড়ায় ছিলেন, অল্প সময় কথা হল। তবু কি যে ভাল লাগা নিয়ে বাসায় আসলাম... খুব নস্টালজিক লাগছে। শুধু ইচ্ছা করছে হাই স্কুলের সেই ইংলিশ ক্লাসগুলোতে ফিরে যাই। একজন তেজী এবং ভালমানুষের অসাধারণ ক্লাসগুলো করি...
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৪৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=আমার মন খারাপ, ফুল দিয়ো=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১২ ই মে, ২০২৬ দুপুর ২:৫৮



অকারণে মন ভালো না আজ
তুমি কোথায়?
এসো এক গুচ্ছ রঙ্গন নিয়ে
বাঁধো আমায় ভালোবাসার সুতায়।

অকারণে ভালো লাগে না কিছু;
তুমি কই গেলে?
রক্ত রঙ ফুল নিয়ে এসো;
উড়ো এসে মন আকাশে - প্রেমের ডানা মেলে।

কী... ...বাকিটুকু পড়ুন

সূর্যমুখী ফুলের মত দেখি তোমায় দূরে থেকে....

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ১২ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৫


সূর্যমুখী
অন্যান্য ও আঞ্চলিক নাম : রাধাপদ্ম, সুরজমুখী (হিন্দি)
সংস্কৃত নাম : আদিত্যভক্তা, সূর্যকান্তি, সূর্যকান্তিপুষ্প
Common Name : Sunflower, Common sunflower
Scientific Name : Helianthus annuus

সূর্যমুখী একটি বর্ষজীবী ফুলগাছ। সূর্যমুখীকে শুধু ফুলগাছ বলাটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাত যত গভীর হয় প্রভাত তত নিকটে আসে

লিখেছেন আরোগ্য, ১২ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:২১

গতবছর এই মে মাসের ১৭ তারিখেই আমার চোখের প্রশান্তি, আমার কর্মের স্পৃহা, আমার জননী এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী ও আমাদের কাছ থেকে মহান রব্বের ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে পাড়ি জমান। আব্বু... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইচ্ছে করে

লিখেছেন বাকপ্রবাস, ১২ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৮

ইচ্ছে করে ডিগবাজি খাই,
তিড়িং বিড়িং লাফাই।
কুমারী দীঘির কোমল জলে
ইচ্ছে মতো ঝাপাই।

রাস্তার মোড়ে সানগ্লাস পরে
সূর্যের দিকে তাকাই,
সেকান্দর স্টোর স্প্রাইট কিনে
দুই-তিনেক ঝাঁকাই।

ঝালমুড়িতে লঙ্কা ডাবল,
চোখ কচলানো ঝাঁঝে,
ছাদের কোণে যাহাই ঘটুক,
বিকেল চারটা বাজে।

ওসবে আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মায়া বড় কঠিন বিষয় !

লিখেছেন মেহবুবা, ১২ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪০


মায়া এক কঠিন বিষয় ! অনেক চেষ্টা করে জয়তুন গাছ সংগ্রহ করে ছাদে লালন পালন করেছি ক'বছর।
বেশ ঝাকড়া,সতেজ,অসংখ্য পাতায় শাখা প্রশাখা আড়াল করা কেমন আদুরে গাছ !... ...বাকিটুকু পড়ুন

×