"তুমি কি তাকে দেখেছ, যে পরকালের ভাল প্রতিফল আর শাস্তিকে (অনুবাদভেদে--দ্বীনকে) মিথ্যা বলে?
সে তো সেই লোক যে এতিমকে তাড়িয়ে দেয় আর মিসকীনকে খাবার দিতে উৎসাহিত করে না।
অতএব ধ্বংস সেই সব নামাযীদের জন্য যারা নিজেদের নামাযের ব্যপারে উদাসীন।
যারা লোক দেখানো কাজ করে।
আর নিত্য ব্যবহারের সাধারণ প্রয়োজনের জিনিস লোকদের দেয় না।"
এই সুরায় পাঁচ রকম দোষের কথা বলে বলা হয়েছে, এই দোষগুলোর একটা বা সবগুলো যার মধ্যে আছে সে আসলে আখিরাতে (অনুবাদ ভেদে দ্বীন ইসলামে) বিশ্বাসী না! অথচ তাওহীদ, রিসালাত আর আখিরাতে বিশ্বাস হল ঈমান আনার পূর্ব শর্ত। এর একটা না থাকলেও একজন 'বিশ্বাসী' হতে পারে না!
এই সুরাটা নাজিল হয়েছিল মদীনায়। মদীনায় হিজরতের আগে যারা মুসলিম হয়েছি মক্কায়, তাদের ইসলাম গ্রহণ করাটা খুব কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। সত্যিকারের আত্মিক পরিশুদ্ধী, চিন্তার জগতে বিপ্লব ছাড়া কেউ মুসলিম হত না। কারণ মুসলিম হওয়া মানেই ছিল বিশাল রিস্ক নেয়া। নিজের জন্মভূমি আর ধন সম্পদকে তালাক দেয়া। মদীনায় মুসলিম হওয়া সামাজিক এবং আর্থিক দিয়ে লাভজনক ছিল। তাই ইসলাম অন্তরে ঢুকার আগেই মানুষ অন্যান্য লোভে বা স্রেফ 'স্বাভাবিকতা'র খাতিরে ইসলাম গ্রহণ করে বসত।
আমাদের দেশে এবং অনেক মুসলিম দেশে বাহ্যিক ভাবে মুসলিম ভাব সাবটাকেই মুসলিম হওয়ার পূর্ব শর্ত হিসেবে ধরা হয়। অথচ আল্লাহ ভিতরটুকুই দেখবেন, যাচাই করবেন সিনসিয়ারিটি। সত্যতা। যা সাধারনের চোখের আড়ালে চলে যায়।
বাংলাদেশে একজন সাধারণ মানুষ জুমার নামাজের সময় মসজিদে অবলীলায় একশ টাকা দিয়ে দেয়। এই মানুষটাই সারা সপ্তাহ ব্যপী ভিখারীদের হয়তো এক টাকাও দিবে না। (দিনে পাঁচ টাকার দশটা সিগারেট খাবে অবশ্য, সিগারেট তো মাকরূহ, হারাম তো না!)। অথচ, আমার মতে, মসজিদের শহর ঢাকায় ওই একশ টাকা মসজিদে না দিয়ে ওই একজন মানুষকে পেট ভরে দুই বেলা খাওয়ালে অনেক বেশি সওয়াব হবে। আর একটা কথা, ইসলামের একটা গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্ট হল, ধন সম্পত্তি কারও একান্তই নিজেস্ব না, এটা আল্লাহর রহমত। এবং পরীক্ষা করার পথ। ধনীদের 'দায়িত্ব' গরীবদের সাহায্য। সবলদের দায়িত্ব অসহায়কে সাহায্য। সাহায্য না করলেই বরং গুণাহ হবে।
সেই সব হাজীদের কথা শুনলে আমার মাথায় রক্ত চরে যায় যারা বাংলাদেশের মত গরীব দেশগুলো থেকে এসে প্রতি বছর একবার করে হজ্জ্ব করে। প্রথমত, সামর্থ্য থাকলে হজ্জ্ব জীবনে একবারই করা ফরজ। রাসুল (সা) একবারই করেছেন, আর তিনি নিঃসন্দেহে আমাদের সবার চেয়ে ভাল মুসলিম ছিলেন। আর দ্বিতীয়ত, যেখানে পাশের বাড়ির মানুষ না খেয়ে মরছে সেখানে এত বার হজ্জ্ব করা সত্যিই পূণ্যের হবে কি না আমার সত্যিই সন্দেহ আছে। বুখারী আর মুসলিমের স্পষ্ট হাদীস আছে, যার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকে অথচ সে ভরা পেটে রাত কাটায়, সে একজন বিশ্বাসী না। আর প্রতিবেশীর সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে আশে পাশের 40 টি বাড়ি পর্যন্ত যারা থাকে তাদের। এই সংজ্ঞায় ঢাকায় অন্তত: কয় জন সত্যিকার 'বিশ্বাসী' আছেন?
মা সব সময় বলে, দুই জনের খাবার তিন জনের খাওয়া যায়। ঢাকার প্রতিটা মানুষ যদি রাসুলের সেই হাদীসটাকে সত্যিই উপলব্ধি করতেন তাহলে কি কাউকে অভুক্ত থাকতে হত?
গৃহহীন যেমন ঢাকা সয়লাব, তেমনি মসজিদেও। একটা ব্যপার জানেন, রাসুলের যুগে গৃহহীনরা মসজিদে রাত কাটাতো, ওদের বলা হত 'বাইত আস সফ'। খাওয়ার সময় হলে সাহাবীদের কারও সাথে চলে যেতেন খেতে। আর আমাদের এখনকার মসজিদ? ওরেব্বাস, প্রথমত, আমার কখনও শুনিনি রাসুলের (সা) যুগে কোন মসজিদ পুরুষদের একার সম্পত্তি ছিল বলে। দ্বিতীয়ত, এখন মসজিদ মাত্রই নামাজের সময় ইমাম খুলে দিবেন, বন্ধ থাকবে বাদ বাকি সময়ে। মসজিদের বাইরে বড় করে লেখা থাকবে, 'এখানে উচ্চস্বরে কথা বলা নিষেধ'। মসজিদে যাবেন আর একদিন আগে কেনা নতুন জুতাটা চুরি যাবে না? হতেই পারে না!
অথচ আরেক দিন, রাসুলের (সা) সময় যখন একজন অমুসলিম বেদুঈন মসজিদ খোলা পেয়ে ভিতরে ঢুকে একটা আড়াল খুঁজে বসে পড়েছিল পেট খালি করতে, তখন সাহাবীরা দেখতে পেয়ে ছুটে যায় আর কি ব্যাটাকে বের করে দিতে। কত্ত বড় সাহস, আল্লাহর ঘরে টয়লেটিং? তখন রাসুল (সা) ই তাদের নিবৃত্ত করেছিলেন। কাজ শেষে লোকটাকে কাছে ডেকে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। যত্ন করে বুঝিয়ে দিলেন মসজিদের পবিত্রতা। আমাদের সমাজে এটা কল্পনা করা যায়? ওহ নো! ওই লোকটাকে সেখানেই পিটিয়ে জ্যান্ত পুঁতে ফেলা হত আর হন্তারা করত জিহাদী মিছিল! আচ্ছা চিন্তা করতে পারেন, অমুসলিম কারও আমাদের মসজিদে প্রবেশের কথা? অথচ ওই বেদুঈন তাই ছিল। আর ইসলামের খলীফারা গীর্জায় নামাজ পর্যন্ত পড়েছেন অনুমতিক্রমে। আমাদের কাছে কি গীজর্া কখনও নামাজ পড়ার মত পবিত্র মনে হয়েছে?
অন্য আলোচনায় চলে যাচ্ছি, যা বলছিলাম। হৃদয়ের সংকীর্নতা দূর হওয়া একজন ভাল মুসলিম হওয়ার পথে অগ্রসর হওয়ার একটা চিহ্ন। 'যারা লোক দেখানো কাজ করে', আহা শুধু এটাকে ছাঁকুনী হিসেবে ধরলেই তো আমাদের সমাজের কত বুজুর্গ মানুষ ধরা পড়ে যাবেন! এতিম খানায় বড় মাপের একটা ডোনেশন যায়, সাথে সাথে নিউজ পেপারে ফলাও করে ছাপানো হয়! অথচ, আরেকটা দান করার সময় গোপনীয়তা সংরক্ষণের গুরুত্ব এমন ভাবে বলা হয়েছে: যেন ডান হাতে দান করার সময় বাম হাতও না জানে। মানুষ জানবে না, একটু বাহবা দিবে না, তারপরেও কি মন খুলে দান করা সম্ভব? খুব উঁচু পর্যায়ের মানুষ হলেই সম্ভব। গভীর রাতে সবার অজান্তে নামাজে দাঁড়ানোও সম্ভব না সেই সব মানুষের পক্ষে যারা হৃদয়ের গভীরে আল্লাহকে উপলব্ধি করতে পারে না।
আর ছোট খাট ব্যপারে সাহায্য... এটা হতে পারে রান্নার সময় লবণ ধার দেয়া থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের সময় কোন টিভিহীনকে নিজের টিভিতে খেলা দেখতে দেয়ার অনুমতি। বড় বড় উদার দানের চেয়ে নিত্যদিনের এই ছোট খাট ব্যপারে উদারতাই একজন মানুষের 'গিভিং' দিকটা খুব বড় করে তোলে। আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ আমার বড় ফুপি। ফুপির গায়ের পানের গন্ধটা আমার প্রিয়। ফুপির পরনের ওই আটপৌড়ে শাড়ির আরামদায়ক অনুভূতিটা আমার প্রিয়। গ্রামেই বড় হয়েছেন তিনি, এখনও ওখানেই থাকেন। এখনও ফোনের কেরামতিতে বিষ্মিত হন। ভীষণ সরল এই মানুষটার চোখগুলো কথায় কথায় টল টল করে উঠে। কি যে ভাল লাগে দেখতে! সেদিন ভাবছিলাম কেন ফুপিকে এত ভাল লাগে। ভেবে পেলাম তিনি এমন একজন মানুষ যিনি নিজের বলে জীবনের কোন অংশ আলাদা করে রাখেন নি। পুরোটা জুড়েই অন্য মানুষ আর স্রষ্টা। কোথাকার কে আসলেও তাকে টেনে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরেন। না খাইয়ে ছাড়বেন না কিছুতেই। অভাব অনটন সব কিছু সত্ত্বেও কখনও মানুষকে ফেরান না। ফুপিকে দেখে মনে হয় সুরা মাউনের অর্থ না জানলেও অক্ষরে অক্ষরে মানছেন ঠিক!
ভাবনা শুরু করিয়ে দেয়ার জন্য ঋনী এই পোস্টটার কাছে:
Click This Link
ছবি কৃতজ্ঞতা:
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




