প্রায় দশ বছর আগে বলা পিচ্চির সেই কথাটা এখন আমাদের বাসায় ক্লাসিকের পর্যায়ে চলে গিয়েছে। রান্নায় কিছুর কমতি হলেই আমরা চোখ মুখ কুঁচকে বলি, 'মসলা টসলা কিসু্য দিসে না'। সেদিন মুরগি অবশ্য আমাদের দৈনন্দিন রান্নার মতই হয়েছিল। মসলা পরিমাণ মতই ছিল, কিন্তু আমাদের বাসার টিপিক্যাল রান্নার মত ঝাল না থাকায় বিজ্ঞ পিচ্চির চরম বিরক্তির উদ্রেক হয়েছিল।
তখন টের পেয়েছি আমাদের বাসায় ঝাল তেমন হয় না। ছোট বেলা আমরা খেতে পারব না এই ভয়েই অল্প ঝালের রান্না হত বাসায়। ফলে আমাদের খাদ্যাভ্যাস একদম 'নিঝর্াল' হয়ে গড়ে উঠেছে। বাবা মা সময়ে অসময়ে ভর্তা খেলেও আলু ভর্তা ছাড়া আর সব ভর্তার বদলি থাকতই আমাদের জন্য। শুটকি, মূলা ওগুলোও কখনই মুখে তুলে দেখিনি। গন্ধ আর রং ভীষণ অপছন্দ হত।
অস্ট্রেলিয়ায় আসার পরে খাওয়ার ব্যপারে সহনশীলতা বেড়েছে ধীরে ধীরে। যে কোন দেশের যে কোন ধরণের খাবার অবলীলায় খেয়ে নিতে পারি, পছন্দ হয় না সব সময় অবশ্য। একবার কিউরিওসিটি থেকেই ভর্তা খাওয়া শুরু করলাম, এর পরে শুটকি। এখন জটিল সমস্যায় পড়েছি। ভর্তা আর শুটকির ভীষণ রকমের ভক্ত হয়ে পড়েছি। মাকে ঝামেলায় ফেলে দেই, আগে ওরা দুই জন যা খেত এখন আমি একাই সেটা খাই। লাঞ্চে স্যান্ডউইচের ভিতরেও বেগুন ভর্তা বা শুটকি তরকারি নিয়ে যাই। আর ঝাল অনুরাগ বেড়েছে ভীষণ ভাবে। প্রচন্ড রকমের ঝাল খাই। তরকারিতে ঝাল মনমত না হলে আবার সাথে কাঁচা মরিচ নিয়ে কচ কচ করে খাই। বোরহানীর ভক্ত হওয়ার কারণ এটাই। বিষ্মিত হয়ে ভাবি, আমরা দইয়ে নানাবিধ মশলা গুলে কি মচৎকার একটা পানীয় আবিষ্কার করে ফেললাম! বাংলু বলেই সম্ভব হয়েছে। বাইরে খেতে হলে পতর্ুগীজ বা লেবানীজ ভাল লাগে, ওদের খাবারগুলো নিরামিষ না, স্পাইসী। সার্ভস মাই টেইস্ট বাড ওয়েল।
সেদিন তাসিন আর ইশির সাথে বাইরে খাচ্ছিলাম। সবাই নিজের মন মত ভিন্ন ভিন্ন খাবার অর্ডার দিয়েছিলাম। আমারটায় ছিল বেশি করে হট চিলি সস। আমার তো মজাই লাগছিল। পটেটো ওয়েজ নিয়েছে বলে তাসিন খুব শখ করে একটু আমিষের আশায় কাঁটা চামচ দিয়ে আমার কাবাব মুখে তুলেই মরে আর কি! প্রচুর ড্রিংকস গলায় ঢেলে কোন মতে ঝাল প্রশমিত করে করুণ গলায় বলল, হাউ ক্যান য়ু ইট দ্যাট?
বাসায় তাই ইদানিং রান্না করতে ভয় লাগে। অল্প করে মরিচ দিয়ে চামচ তুলে ফেলি। পরে ইচ্ছা করলেও যেন আর ঝাল দেয়া না যায়। নুডুলস হোক আর স্যান্ডউইচ হোক, সাথে হট চিলি সসের বোতলটা নিয়ে বসি। আর ভাইয়া, ছোট বোনকে বলি, দেখ তোমরাও ঝাল খাওয়া শিখ জলদি, নইলে ফিউচারে জুনিয়র আস্তরা তোমাদের বাসায় গিয়ে কিন্তু নাক সিঁটকে বলবে, 'মসলা টসলা কিসু্য দিসে না!'
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




