somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্লগীয় হাইস্কুলের রম্য কাহানী!

১৬ ই জানুয়ারি, ২০০৭ বিকাল ৫:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার অস্ট্রেলিয়ার একমাত্র হাইস্কুল, যেখানে টেন থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত পড়েছি, সেখানে বেশ কয়েকজন ভারতীয় আর শ্রীলংকান বন্ধু ছিল আমার। আমি সাধারনত কখনও কোথাও পিছনের সারিতে থাকি না। খুবই পরিচিত মুখ ছিলাম হাইস্কুলে। কিছু কিছু মানুষ ছিল 'নি:শব্দ', যাদের হাঁটাচলা, খাওয়া দাওয়া সব কিছুই নি:শব্দ ছিল, কেউ টের পেত না। তাদের দিকে তাকানোর সময় পেতাম না। একবার হলো কি, লাঞ্চ টাইমে আড্ডা দেয়ার নির্দিষ্ট জায়গা এসে দেখি একটা জটলা। দিনোজা নামের চুপচাপ, শান্ত, উত্তর ভারতীয় মেয়েটার চারপাশে সবাই জটলা বেঁধে আছে। দিনোজা উথাল পাথাল কাঁদছে। ভিড় ঠেলে কাছে গিয়ে ঘটনা শুনেই তো আমার আক্কেল গুড়ুম। দিনোজা থাকে ওর চাচা চাচীর সাথে। বাবা মা ভারতে। ওর চাচাটা ওকে খুন করার চেষ্টা করেছে আজকে সকালে। ও খুবই ভীত। খাওয়া দাওয়া কিচ্ছু করতে পারছে না সপ্তাহ কয়েক ধরে। আমি ভালো করে তাকিয়ে দেখি মেয়েটার চেহারা খুব লাবণ্যময় হতে পারতো। কাজলের মত চেহারার অনেকটাই। অথচ চোয়াল ভেঙে একাকার। শুকনো ঠোঁট কাঁপছে। চোখের কেতুর, এলোমেলো খুসকি মাখা তৈলাক্ত চুল, গায়ে ঘামের গন্ধ সব মিলিয়ে চরম অবহেলা স্পষ্ট। আমি বুঝতে পারছিলাম, মেয়েটা খুব কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বুক টলমল করে উঠলো। পাশে বসে হালকা জড়িয়ে ধরলাম। এ কথা সে কথা বলে মন ঘুরানোর চেষ্টা করলাম। একটু পরে গিয়ে মিস্টার ইনগ্রাডির সাথে কথা বললাম, মেয়েটার সাহায্য দরকার। আহারে দু:খী মেয়েটা!

আমাদের পরের লাঞ্চ টাইমগুলো কেটেছে দু:খী মেয়েটাকে শান্তনা দিয়ে। খেতে পারতো না বেচারা। অভুক্ত, ক্ষুধার্ত মেয়েটাকে জোড় করে খাওয়ানোর চেষ্টা করতাম আমরা সবাই। টিভি সিরিয়ালের চরিত্রের এনলারজড হার্টের কথা শুনে আমি কেঁদে মরি, বাস্তব জীবনে কি হবে বলাই বাহুল্য। বাসায় এসে খাওয়ার টেবিলে রীতিমত আলোচনার বিষয় বস্তু হলো সেটা। রাতে পড়তে বসে আমার পড়া হয় না। মন ছুটে যায় দু:খী মেয়েটার কাছে।

খুব শীঘ্রই প্রমানিত হইলো, সেটা আসলে পুরা ধাপ্পাবাজি ছিল । নিজের সম্পর্কে যা বলেছে, তার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হান্ড্রেট পারসেন্ট চাপাবাজি। একা একা ঘুরে বেড়াতো, কারো কাছে বেইল পেতো না। মানুষের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য এত কিছু।

জাভারিয়া যখন বললো আমি কিছুতেই বিশ্বাস করবো না। এ হয় নাকি? ছিহ! মেয়েটার অশ্রু ভেজা কেতুর মাখা করুণ চোখ ভাবতেই আমি কুঁকড়ে যেতাম যে! কিন্তু বেশ কয়েকজন ভালো, বিশ্বাস যোগ্য, খুব কাছের বন্ধুরা যখন এসে বললো, তখন বুঝলাম, কি বিশ্বাস করতে হবে!

দাগা খাইছি, কিন্তু বাসায় এসে খাওয়ার টেবিলে সে কি হাসি! এরপরও কিন্তু মেয়েটাকে কনফ্রন্ট করি নাই। কারণ মেয়েটার মানসিক সমস্যা ছিল, মনোযোগ চাচ্ছিল বুঝতে পেরেছি। দেখা হলেই সদয় দু'একটা কথা বলতাম, মেয়েটা গদ গদ হয়ে যেত। আমি দীর্ঘশ্বাস ছাড়তাম!

মিথিমিথি মিথ মিথ খেলায় আগের কথা মনে হয়ে কালকে সারাদিন হাসি আসতেছে!!! আহা, মরা মেয়েটার জন্য এত দোআ করলাম, সব এখন কোন ভ্যাকুয়ামে ঘুরপাক খাচ্ছে কে জানে!


আমি যে রম্য লেখার কথা বলে ডুব দিলাম, তার আসল কারণ হলো, বাবা মা এসেছে, সময় পাচ্ছি না। তারপরে মিথিলা মারা গেল, আমার এত মন খারাপ হলো, ভাবলাম ধুশশালা ব্লগাবোই না আর। মেয়েটা মরে নাই শুনে কালকে সারাদিন হাসি আসতেছে!!! আসলে আমি হাসতে পারি, আর আতলামি করতে পারি। কিন্তু রম্য আমার দ্বারা অসম্ভব। রম্যের যেই আইডিয়াটা আসছিলো, সেটা বলতেসি, আপনারা যে কেউ আইডিয়া নিয়ে রম্য লিখতে পারেন...

আমি সেদিন সাদিকের ডাকের পরে বুঝলাম সাধু ক্ষেপসে। না হলে সাধু সাহেব এত সহজে একজন ব্যক্তিকে নিয়ে রম্য লেখার আহবান করবেন না। তখন হঠাৎ করে পুরা ব্যাপারটা মহা রম্য হয়ে আমার সামনে আসলো। হঠাৎই মনে হলো, পুরা ব্লগটাই একটা আস্ত হাই স্কুলের ভার্চুয়াল ভার্শন। পনের বছরের মীরা থেকে পঞ্চোশার্ধ কালপুরুষ, সবাই সুযোগ পেয়ে জীবনের যাবতীয় সব কিছু ভুলে ভার্চুয়ালিটির আড়ালে এক এক জন হাইস্কুল স্টুডেন্ট। সেই পনের-ষোল-সতের-আঠারো বছরের লাগাম ছাড়া মনটাকে ফিরে পেয়ে পুরাপুরি সদ্ব্যবহার করছেন। মনে আছে, পৃথিবী উদ্ধার করা আঁতলামি, খুব ছোট খাট ব্যাপারে জীবন মরণ ঝগড়া, মারামারি, কাটাকাটি, গালাগালি, প্রেম প্রেম খেলা, বাসা-স্কুল-বাসার যান্ত্রিকতা, এক হাজার এক রকমের মানুষ, সব কিছু এক সাথে থাকার দিনগুলো? বলেন, হাই স্কুলে যেই সিরিকাস ঝগড়া গুলা করেছেন, সেগুলার কথা ভেবে এখন হাসি পায় না?

ক্লাসে শোমচৌ এর মত কেউ ছিল না, যে পৃথিবী উদ্ধার করতো কথায় কথায়, সব ব্যাপারেই সুবিজ্ঞ মতামত থাকতো? আমার মত মহা সিরিকাস আঁতেল ছিল না, যে এমনি খুব বুঝে, কিন্তু আসলে সব কিছুর আড়ালে পুরা বালিকা বাস করে? তীরন্দাজ, শুভর মত খুব ভালো, স্বচ্ছ মনের আঁতেলগুলা ছিল না, যাদের অপছন্দ করা অসম্ভব? রাসেলের মত কেউ ছিল না, যার ট্যালেন্টেড বিছুটির জ্বালায় টিচাররা পর্যন্ত অস্থির? ত্রিভুজের মত ক্যারেক্টারও কি ছিল না, যাকে সবাই একটা নাড়া দিয়ে মজা পায়? নামকরণ... উফ, নামকরণের মজাটা সবাই মিস করেন টের পেলাম ব্লগে যেই হারে নামকরণ হয় সেটা থেকে! আর দলাদলি... গ্রুপিং... দোস্তের জন্য সব হালাল!

আসলে আমাদের সবার ভিতরের যেই উত্তাল কৈশোর থাকে, যে 'আঠারো বছর মানে' কবিতা থেকে উঠে আসা, সেই কৈশোরকে ছুটিয়ে দেয়ার একটা মহা সুযোগ ব্লগ। ভদ্রতা, সুস্থতা আর ম্যাচুয়ারিটি, সেনসিবিলিটির মুখোশ আঁটা সামাজিক জীব আমরা, এই সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করি না!

কাম অন গাইজ, এডমিট ইট, মিথিলা মিথ থেকে কিছুটা হলেও মজা পেয়েছেন আপনারা! বোকা হইছেন তাতে একটু ক্ষেপসেন আর কি। এত কথার কি আছে রে বাবা, পুরা ঘটনা তৃতীয় পক্ষের চোখ দিয়ে দেখে দম ফাটা একটা হাসি দেন তো সবাই!
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জানুয়ারি, ২০০৭ বিকাল ৫:৩৯
৩৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চোখ

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৫:১৬

এতদিন উপমা হিসাবে জেনেছি কারোর চোখ থাকে পটল চেরা, কারোর থাকে বাবুই পাখির বাসার মতন।
এই প্রথম দেখলাম গ্রে'স এলিয়ানের চোখ - এত মায়ায় ভরা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সব দুনিয়ার আহার যোগাই, আমরা না পাই খাইতে

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৬:৩৪



সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বাওন হাওরের বর্গাচাষি আলী আকবর। কেমন আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ কৃষিকাজ করি খালি বাঁইচ্যা থাকার লাগি। কোনো লাভ নাই।’ হিসাব কষে বলেন, এখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

লজেঞ্জুষ খাওয়াবে

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪৫


বাতাসের নিঃশ্বাস, পিঠ ঠেকে যাচেছ
শহরের ধূলি বালির নর্দমার কাছে;
কখন চিৎকার করে বলে ওঠবে-
দূষিত নিঃশ্বাস তোমরা সরে যাও
তোমরাই স্বার্থপুরের রাক্ষস রাক্ষসী;
সাবধান বাতাসের কোটি নিঃশ্বাসগুলো
লজেঞ্জুষ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে-
খুব আদর করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গুম আর গুপ্ত

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:১৫


খোঁজ করলে দেখাি যাবে, কুকুর-বিড়াল পালকদের অনেক কাছের আত্মীয়-পরিজন অনেক কষ্টে জীবন কাটাচ্ছে। তাদের প্রতি কোনও দয়া-মায়া নেই; অথচ পশুদের জন্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

=পাতার ছাতা মাথায় দিয়ে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৫ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২৯


মনে আছে ছেলেবেলায়
ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি এলে,
পাতার ছাতা মাথায় দিয়ে
হাঁটতাম পথে এলেবেলে।

অতীত দিনের বৃষ্টির কথা
কার কার দেখি আছে মনে?
শুকনো উঠোন ভিজতো যখন
খেলতে কে বলো - আনমনে?

ঝুপুর ঝাপুর ডুব দিতে কী
পুকুর জলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×