somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বন্ধুদের আড্ডামুখর প্রহর...

১৭ ই মার্চ, ২০০৬ রাত ৮:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"সুশান্ত স্যার কথা বলেন 'একটি হারানো বিজ্ঞপ্তি' স্টইলে। কেউ ক্লাস করে না।... SSC এর Bio prac পরীক্ষা। জানোই তো, রাশা bio dislike করে, যার জন্য সে বইয়ের কিছুই জানে না। সে দাঁত মেজে আসছে, প্রশ্ন করলে উত্তর পারবে না বলে দাঁত দেখায় দিবে এই উদ্দেশ্যে। রাশা চেয়ারে বসে ছিল, আমি একটু তফাতে দাঁড়ায় আছি। আপা জিজ্ঞাসা করে, ' বল, কুনোব্যাঙের অপটিক স্নায়ুর কাজ কি?' রাশা একটু আকাশ বাতাস দেখে বলে, 'এটি শ্বসনের কাজে সাহায্য করে।' তারপরে আপার চেহারাটা যা হইল। মাথায় ঠাডা পড়লেও মানুষ এতো চমকায় না। একটা ছাগলও বুঝবে যে 'অপটিক' শব্দটা আছে মানে এটা চোখ সম্পর্কিত কিছু। যদিও রাশা মদনের জন্য এটা না বুঝাটাই স্বাভাবিক। রাশা যেই বুঝলো ভুল করছে সাথে সাথে গ্যালগ্যালা একটা হাসি দিল...."
অনেকদিন চিঠি দেয় না টিটুম্পুশ। ওর চিঠিগুলো খুব মজা, 20-25 পৃষ্ঠার সুদীর্ঘ সাবলীল চিঠি জুড়ে ঘটে যাওয়া সব কিছুর বিস্তারিত বিবরন। মাঝে মাঝে ছবি, ছবির পিছনে ক্যাপশন।
টিটুম্পুশ আসলে টুম্পা, আমি ডাকি টিটুম্পুশ না হয় টুমু। টুমু বি.বি.এ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। বায়ো অপছন্দ করা রাশটুটা মেডিক্যালে ক্লাস শুরু করেছে। সানজু, রোইয়ূন ইলেক্ট্রিক্যালে, আর অন্যা ঢাবি তে। এ ডিসেম্বরে আমি প্রায় 4 বছর পরে বাংলাদেশে গেলাম। সব এইচ এস সি এর যাতাকলে পড়ে শুকিয়ে শেষ। তাও ছাড়াছাড়ি নেই, ভর্তি যুদ্ধ্ওে নামতে হয়েছে ঢাল তলোয়ার নিয়ে, ওদের জীবন=কোচিং+বাসা+কোচিং। তবু, আমাকে প্রচুর সময় দিয়েছে।
আমি ঠিক করেছিলাম কাউকে না জানিয়ে যাবো, গিফট নিয়ে সবার বাসায় বাসায় হাজির হবো। সবার মুখের অবস্থা যা হবে... শুধু সেটা ভেবেই মজা লাগছিল। বাসার ঠিকানা সংক্রান্ত জটিলতা + নির্ধারিত সময়ে সবার বাসায় থাকা নিশ্চিতকরনের জন্য শুধু অন্যাকে জানালাম। ও দেখলাম আমার প্ল্যান শুনে খুব খুশি, কথা দিল আর কেউ জানবে না। ওদের শুকনো জীবনে নাকি একটু রং দরকার। ঠিক হলো অন্যার বাসায় আমি প্রথমে যাবো, সেখান থেকে অন্যদের বাসায়। সকালে কামরান ভাইয়া (উহ আহ... ওকে নিয়ে পুরো একটা পোস্ট করতে হবে) এসে নিয়ে গেল ধানমণ্ডি 9 নম্বরের বাসাটায়। অন্যা দরজা খুলে ওর স্বভাব-সুলভ উচ্ছ্বাসহীন সহজ গলায় বললো, এসে গেছো? আসো ভিতরে আসো...
ডাইনিঙে ঢুকতেই ঘরে যেন ডাকাতের হামলা হলো... চারপাশ থেকে চারজন হই হই করে ছুটে আসল, সবার হাতে দু'টো করে বেলুন। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাথায় বেলুনের ধামাধাম বাড়ি, তারপরে পাঁচ জোড়া হাত আমাকে জড়িয়ে ধরলো। বুঝলাম, অন্যাটা বিট্রে করেছে কিন্তু মন খারাপের সুযোগই দিল না, বিশাল এক ফুলের তোড়া এনে আমার হাতে ধরায় দিল। ওদের সব জমানো টাকা দিয়ে নাকি ফুল আর বেলুন গুলো কিনেছে। এতো সুন্দর ফুল পেয়ে শুধু ওর মোটা বেনী গুলো টেনে ছেড়ে দিলাম। ফুলগুলো আমি রোদে শুকিয়ে নিয়ে এসেছি, আমার সাইড টেবিলের শোভা বাড়াচ্ছে এখন।
গিফট দিতে আমার ভাল লাগে, গিফট পেয়ে ভাল লাগলে সেই ভাল-লাগা-ভরা মুখ দেখতে ভাল লাগে। কিন্তু মুসকিলে পড়লাম, কেউ গিফট খুলতে চাচ্ছিল না, র্যাপিং নাকি বেশি সুন্দর হয়েছে। শেষ মেষ অবশ্য খুলল। সাথে গল্প, গল্প। আমি চলে এসেছি ক্লাস নাইনের শেষে। ভিকারুননিসা স্কুল শেষে সব আবার ভিকারুননিসা কলেজেই ভর্তি হলো। কলেজের পুরোটাই আমি মিস করেছি। যদিও চিঠিতে আর ফোনে কথা হতো, তবু কলেজের সবই আমার জন্য নতুন, তাই কখনো কথা ফুরায় না। কবে কে নাকি পালিয়ে বিয়ে করে খুব মিডিয়া হাইলাইট পেয়েছে... রোকেয়া আপা ওরফে এম পি (মুখপুড়ি), গান্জু স্যার, মৎস্যকন্যা স্যারের গল্প আরও কতো কি...
দুপুর হতেই সবাইকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলাম। বাইরে খাবো। কাছাকাছি শর্মা হাউজ ছিল, সেখানেই গেলাম। ঠিক স্কুলের মতো কাড়াকাড়ি করে খেলাম, অকারণে হেসে গড়িয়ে পড়লাম, একজনের এক কথার সূত্র ধরে পাঁচজনের পাঁচ রকমের মন্তব্য করলাম। কে বলবে, এরা দু'দিন পরের ভর্তি পরীক্ষার মডেল টেস্ট ফাঁকি দিয়ে চলে এসেছে... কে বলবে মাঝখানে এতোগুলো বছর কেটে গেছে?
শর্মার ব্যাটাদের চুড়ান্ত ত্যাক্ত করে, এক টাকা বখশিশ রেখে বেরিয়ে গেলাম। পরবর্তী গন্তব্য: ঢাকা ইউনিভার্সিটি এলাকা। আমার পুরো শৈশব, কৈশোরের অনেকটুকু কেটেছে সেখানেই... সাইন্স ফেয় ারে পুরস্কার না পাওয়ায় মন খারাপ ছিল বলে রাতে বাসায় ফেরার পথে ড্রাইভার চাচা আমাদের অনেক্ষণ ঢাকা ইউনিভার্সিটির ফাঁকা রাস্তায় ঘুরালেন। হঠাত হঠাত এরকম পাগলামি চাপলে আমাকে নামাতে এসে সবাই মিলে ঢাকা ইউনি এলাকা চক্কর মারতাম। এক একবার শুধু ইচ্ছা করতো বলে শাহাবাগ থেকে 2 টাকায় লাল গোলাপ কিনতাম। নীলক্ষেতে বইয়ের দোকানে হানা দিতাম যখন তখন। আমি চলে যাওয়ার পরে এক বৃষ্টিঘন দুপুরে ওরা সবাই কোচিং ফাঁকি দিয়ে আমার পুরানো বাসার সামনে গাড়ি থামিয়ে চুপচাপ বসে ছিল। মধুর ক্যান্টিনে গিয়ে ভাত খেয়েছে মনোজ্বালা জুড়াতে। আমার অস্তিত্বের সাথে ঢাকা ইউনিভার্সি টি আর সুপার গ্লু দিয়ে লাগানো, সাথে আমাদের বন্ধুত্ব্ও।
ফুলার রোডের চির পরিচিত রাস্তায় পেঁৗছে চির পরিচিত রেইন ট্রী গুলো দেখছিলাম আর পরিচিত গন্ধটা বুক ভরে নিচ্ছিলাম, তখনই হঠাৎ মনে পড়লো জোহর পড়া হয়নি। ঠিক করলাম নামাজ পড়তে কনু আন্টির বাসায় হানা দিবো। কহিনূর আন্টি সানজুর খালা আর আমাদের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী ছিলেন। এস এম হলে পাশাপাশি বাসায় থাকতাম আমরা। আন্টির মতো ভাল, "গিভিং", মায়াবতী মহিলা আমি সত্যিই খুব কম দেখেছি। আমাদের সব আবদার আন্টির কাছে ভ্যালিডিটি পেতো। টাকা লাগবে: আন্টি, স্কুলে ঝামেলায় পড়েছি: আন্টি, কোন ছেলে পিছে লেগেছে: আন্টি, ক্ষুধার্ত: আন্টি, আচার পিয়াস: আন্টি। যখন তখন দল বেঁধে আন্টির বাসায় হানা দিতাম, জুতা খুলে আন্টির বেডরুমের বিছানায় উঠে বসতাম। আন্টি চট জলদি মজার কিছু ভেজে এনে আচারের বয়াম আমাদের হাতে তুলে দিয়ে কথা শুনতেন। ঠিক করলাম, সেখানেই জোহর পড়বো। কলিংবেলের শব্দে দরজা খুলে আন্টি অবাক। খুব শক্ত করে বুকে চেপে ধরলেন আমাকে। আন্টির চোখে ভালবাসার অশ্রু... ভালবাসার অশ্রু জিনিসটা কি সুন্দর! আন্টি বিচার দিলেন, আমি যাওয়ার পরে সবাই নাকি একসাথে আর একবারও আসে নি... বহু , বহুদিন পরে সেদিন সবাইকে একসাথে পেয়েছেন। প্রায় এক ঘন্টা আন্টিকে ঠিক সেই সব সময়ের মতো জ্বালিয়ে তবেই ছাড়া পেলাম।
সেদিন আর তেমন সময় ছিল না, ফুলার রোড থেকে রং চা খেলাম, রাস্তার এ মাথা থেকে ও মাথা হাঁটলাম। হিন্দী সিনেমায় মেয়েদের অধ:পতন নিয়ে কথা বলতে বলতে গলা একটু উচ্চগ্রামে চলে যেতে চাটি খেলাম টুমুর, দর্শক-শ্রোতা জুটে গেছে।
সেদিনের পরে ওদের আরও কতো মডেল টেস্ট ফাঁকি দেয়া সময় কাটিয়েছি একসাথে... রাইফেলস স্কয়ার থেকে বসুন্ধরা সিটিতে হানাদারী, সান্জু-টুমুর বাসায় সারাদিন ব্যাপী আড্ডা, শাড়ি পড়া-পড়ি, আশুলিয়া যাওয়ার প্ল্যান স্বর্বস্র প্ল্যানিং, ফুচকা অভিযান এগুলো ছিলই। এরপরেও ফোন করলেই টুমুর ঝাড়ি খেতাম: "তুই ব্যাপক বদ হইছিস। কে বলছিল আমাদের ভর্তি পরীক্ষার মাঝখানে আসতে? না পারতেছি মজা করতে, না পারতেছি পড়তে..."
কয়েকদিন ধরে আমাকে নষ্টালজিয়ায় পেয়েছে... সেই ক্ষেপাটে সময়গুলো আবারও ফিরে পেতে ইচ্ছা করছে... আবারও...
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ০৫ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১:২৯

পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয় এবং এর ফলে উদ্ভূত আদর্শিক পরিবর্তন কেবল ভারতের একটি প্রাদেশিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের খারাপ দিনের পর

লিখেছেন সামিয়া, ০৫ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৪




আমার মাথা যেন আর কাজ করছিল না। বাইরে থেকে আমি স্বাভাবিক হাঁটছি, চলছি, পড়ছি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলাম মায়ের কথা ছোট বোনটার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিংকর্তব্যবিমূঢ়

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ৯:৩৩


দীর্ঘদিন আগে আমার ব্যক্তিগত ব্লগ সাইটের কোন এক পোস্টে ঘটা করে জানান দিয়ে ফেইসবুক থেকে বিদায় নিয়েছিলাম। কারণ ছিলো খুব সাধারন বিষয়, সময় অপচয়। স্ক্রল করে করে মানুষের আদ্য-পান্ত জেনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গেরুয়া মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ: একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও শিক্ষা।

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৮


দীর্ঘ ১৫ বছরের টিএমসির শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। গেরুয়া শিবিরের এই ভূমিধস জয়ের পেছনে অবশ্য মোদি ম্যাজিকের চেয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার ব্যর্থতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজের দোষ দেখা যায় না, পরের দোষ গুনে সারা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই মে, ২০২৬ রাত ২:১০


ভারতের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতন নিয়ে বাংলাদেশে যে পরিমাণ চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে, তা দেখে অবাক না হয়ে উপায় নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই দেখা যায় অদ্ভুত সব তত্ত্ব। ফেইসবুক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×