মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বাবা মা দু'জনই বেশ ছোট ছিল। ছয় বছরের মায়ের মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র স্মৃতি--পাকি-বাহিনী আসছে শুনে সবাই যখন বিপুল টেনশনে দামী জিনিস প্যাকেট করে পালাচ্ছে, মা খুব দ্রুত নিজের প্রিয় লাল শাড়িটা বগল দাবা করে নিল। বাড়ি ফিরে এসে দেখা গেল বিস্তর লুটপাট হয়েছে। মায়ের মাথা ব্যথা ছিল না... লাল শাড়িটাতো বাঁচানো গেছে...
কিশোর বাবা তখন্ও নিজের বাবা হারানের শোক সামলাচ্ছিল। অভাব অনটন আর অন্যান্য পারিবারিক সমস্যার কোন কমতি ছিল না। গ্রামে পাকবাহিনী একবার যখন এসেছে তখন প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ গড়তে সাহায্য করেছে।
ব্যস। বাসায় মুক্তিযুদ্ধের মুখে শোনা ইতিহাস আমার এটুকুই। আমাদের প্রজন্মের কেউ মুক্তিযুদ্ধের সময় পৃথিবীতে ছিল না। শুনে শুনে যা জানা। এই শোনানোর ব্যপারে পলিটিক্স আর পলিটিক্স। বিরক্তিকর পলিটিক্স। ভাইয়া আমার চেয়ে মোটে এক বছরের বড় হওয়ায় সারা জীবন ওর পুরানো বই পড়ে এসেছি। ক্লাস সিক্সে , সেভেনে ওঠার সময় আনন্দে আটখানা হলাম আমি। সরকার বদলের সাথে সাথে ইতিহাসও নাকি বদলে গেছে, সমাজ বই নতুন লাগবেই।
একজন সার্টিফিকেটধারী মুক্তিযোদ্ধাকে বলতে শুনেছি... "লেবু বেশি চিপলে তিতা হয়ে যায়।" তা হয়। বিশেষ করে যখন একশো হাতে চিপাচিপি করা হয়...
এটাই অপ্রিয় সত্য কথা।
পাঠক ভুল বুঝেন না, মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা অংশগ্রহন করেছেন, তাঁদের কাউকে আমি অসম্মান করতে চাই নি একদম। অধিকার আদায়ের সে লড়াইয়ে অংশগ্রহনকারীদের, আত্মত্যাগকারীদের অসম্মানের সুযোগই নেই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পঁয়তিরিশ বছর পরে কি আমাদের সামনে পিছনের তাকানোটা আরেকটু ব্যালেন্সড হ্ওয়া উচিত না? হাজার হোক, পাকিস্তানের সাথে আমরা ছিলাম এর চেয়্ওে অনেক কম সময়, চবি্বশ বছর মোটে, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে মোটে নয় মাস জুড়ে। এর সাতচলি্লশ গুণ বেশি সময় পেরিয়ে এসেছি আমরা... ভোট কেনার সময় রাজনৈতিক দলগুলো এক অভাবনীয় (বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অতি মাত্রায় ক্লিশেইড) পন্থা ধরেন। পঁয়তিরিশ বছর আগের নস্টালজিক সময়টাকে পুর্নজীবিত করে, মানুষের আবেগ অনুভূতিতে সুঁড়সুঁড়ি দিয়ে ভোট কিনেন, না হয় প্রতিপক্ষের গায়ে কাঁদা ছুঁড়েন। ভাল অস্ত্র এটা, আমাদের দেশের আবেগপ্রবন মানুষেরা প্রায়শই জিজ্ঞাসা করতে ভুলে যান... তারপর, এখন কি? এখন কি দিচ্ছে?
আমার স্কুল জীবনে স্কুল থেকে মোট তিনবার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে গিয়েছি আমি। সহপাঠিদের মধ্যে জানার আগ্রহ তেমন দেখিনি, পুরো সময়ে একটা সার্বজনীন উৎসব উৎসব ভাব ছিল... হাজার হোক স্কুল জীবনে এগুলো ছাড়া আর কোন শিক্ষা সফরে যাই নি আমরা।
এসব অনেক ক্ষেত্রে দু'মুখো চরিত্র সৃষ্টি করছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চারিদিকে এতো কিছু হচ্ছে যে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে মোটামোটি জানার জন্য মুক্তিযুদ্ধ-প্রেমিক হতে হয় না। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এক রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান একবার যাকে পেতে দেখেছি সে পুরষ্কার হাতে নিয়েই ব্যপারটাকে ফালতু অভিহিত করলো।
পরিবারে বাবা মায়ের মধ্যে ঝগড়া হবেই। কিন্তু এই ঝগড়ার একটা সীমা আছে, ঝগড়ায় শালীনতাবোধ তো থাকতে হবে। মারামারি তুঙ্গে উঠলে, যখন সন্তানের প্রয়োজনের দিকে বাবা মা তাকাতে ভুলে যান, একজন আরেকজনের দিকে গ্লাস ছুঁড়লে অন্যজন প্লেট ছুঁড়ে প্রতিশোধ নেয়, তখন কিন্তু সন্তানের মন দু'জনের থেকেই উঠে যায়। বাংলাদেশে একই কান্ড হচ্ছে, ভেতরে ভেতরে হচ্ছে অবক্ষয়, কেউ কি টের পাচ্ছে না? নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধকে দেখেনি... কানে যা শুনবে, কি শুনে তার উপর নির্ভর করে কতো কিছু হতে পারে...
যেমন... মুক্তিযুদ্ধের একপেশে ইতিহাস শুনে বিশ্বাস করে অতীতের চেয়েও একচোখা নেতার সৃষ্টি, অথবা, আরও ভয়াবহ: বিভিন্ন জায়গা থেকে বি-ভিন্ন ইতিহাস শুনে, চুলোচুলি দেখে পুরো মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের প্রতি বিরাগভাজন এক জেনারেশন সৃষ্টি...
জেএমবির সন্ত্রাসবাদের মতো একটা জাতীয় সমস্যা বয়ে গেলো সারা দেশে, এক্ষেত্রেও মিক্সড ম্যাসেজ, সমস্যার গুরুত্ব-স্বীকারে অস্বীকৃতি, ব্লেইম গেইম... অন্তত: জাতীয় সমস্যার ক্ষেত্রে কবে এক হবে বাংলাদেশ? বাংলাদেশ নতুন প্রজন্মকে একটা সুস্থ সুন্দর গৃহ পরিবেশ কবে দিতে পারবে?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



