যাই হোক নিয়ে গেল আমাকে গন্তব্যে। পাঁচটা বেজে আট মিনিট। আট মিনিট লেইট। কোন মতে টাকা দিয়ে ছুটে বেরুলাম।
সূচনা পর্বটা আন্তরিক ছিল। পূর্ব ইউরোপের কোন দেশ থেকে হবে। মেয়েটার নানু ইংরেজি বলে ভাঙা ভাঙা... শুনতে মিষ্টি লাগে... ব্যকরনে ভুল। ড এর জায়গায় দ, ট এর জায়গায় ত।
মেয়েটাও মিষ্টি। ইংরেজিতে বেশ ভাল। বুদ্ধিমতি। কিন্তু অংকে পেয়েছে 60 এ 20। পড়ানো শুরু করেই সময় দেখে নিতে পকেটে হাত দিয়ে বুক ধড়াস করে উঠল... মোবাইল নাই! এ পকেট ও পকেট... কোথথাও নাই। ব্যাগে দুপুরের না-খাওয়া স্যান্ডউইচ, গলগলে পীচ, নোটবই, পেন্সিল কেইস সব আছে নেই শুধু মোবাইল। তখন মনে পড়ল আমি চাকরিতে এসেছি। খোঁজা বাদ দিয়ে পড়ানো শুরু করলাম। কিন্তু মনে হাহাকার। আহারে, আমার মোবাইলটু। ভাবার চেষ্টা করলাম কোথায় হারিয়েছি। ট্যাক্সিতে হওয়ার সম্ভবনা সবচেয়ে বেশি। আমার জিন্সের জ্যাকেটের পকেট থেকে আগেও জিনিসপত্রের লাফ দেয়ার প্রবনতা খেয়াল করেছি। কয়েকবারই উঠে যাওয়ার পরে সিটে মোবাইল আবিষ্কার করেছি... আজকে কি তাহলে তাড়াহুড়ায় খেয়াল করি নি?
মেয়েটার অঙ্কে অনেক সমস্যা। তাই সময় কেটে গেল। শুধু মনে একটা চোরা হাহাকার...
বাসা থেকে বের হওয়ার সময় একটা মজার ঘটনায় মনটা প্রায়ে ভরে গেল। মেয়েটার নানু আমাকে বাইরের গেইট পর্যন্ত আগিয়ে দিয়ে গেল। ভাঙা ইংরেজিতে বিষ্ময় প্রকাশ করছিল, আমি এতো ছোট মেয়ে পড়াতে এসেছি... "সাচ আ ইয়াং গার্ল... বি কেয়ারফুল, তেইক কেয়ার"... আমি হেসে বাঁচি না... বললাম, "ডোন্ট ওয়ারি, আই গো টু ইউনি বাই মাইসেলফ..." মহিলা বলে... "আই নো ইউ দু, বাট আই অ্যাম আ মাদার, আই অ্যাম আ গ্র্যান্দমাদার..." আমার মনটা হুট করে ভাল হয়ে গেল। একদম নানু নানু লাগছিল। হাত জড়িয়ে ধরলাম বুড়ির।
আবার যখন মনে পড়ল আমার জানের জান মোবাইল হারিয়ে গেছে তখন বুকটা ধক করে উঠল। এদিক ওদিক তাকিয়ে হাঁটছিলাম। ট্যাক্সি্ দেখলেই ভিতরে সরু চোখে তাকাচ্ছিলাম একটা আরব চেহারা দেখার জন্য। নেই নেই। ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে গিয়ে ট্যাক্সিগুলো ভাল করে দেখলাম। নাহ। তারপরে আর না পেরে এক ট্যাক্সিওয়ালার কাছে গিয়ে বলেই ফেললাম। হাতে উল্কি অাঁকা লোকটাও দয়ালু। "ডার্লিং" ডেকে বুঝিয়ে দিল ট্যাক্সির নাম্বার জানা না থাকলে ওটা অসম্ভব।
ট্রেইন ধরলাম ফিরতি পথে। মন ভোঁতা।
ট্রেইন স্টেশনে নেমে দৌড়ে গেলাম যেখান থেকে ট্যাক্সি ধরেছি সেখানে। মনে মনে ইন্নালিল্লাহ জপতে জপতে। নিচু হয়ে ট্যাকি্নওয়ালাদের মুখ দেখতে দেখতেই দেখি এক ট্যাক্সি এসে থামল... সেই, সেই ট্যাক্সিওয়ালা! আমি মনে মনে সোবহানাল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ থেকে আনন্দের আতিশয্যে আল্লাহকেও জাযাকুমুল্লাহু খাইরুন (আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিক) বলে যাচ্ছি।
মন চুপসে যেতে বেশি সময় লাগল না। ট্যাক্সিতে মোবাইল নেই। আরও দু:সংবাদ, আমি যেই সিটে বসেছি, সেখানে আরও যাত্রী বসেছে। ট্যাক্সিওয়ালা আমার মুখের চেহারা দেখে নিজের মোবাইল থেকে কল দিয়ে দেখাল, মোবাইল বাজছে, কেউ ধরছে না।
এবার আমি পারলে চিৎকার করে কাঁদি। আমার প্রথম উপার্জন দিয়ে কিস্তিতে কিনেছিলাম। এখনও একটু একটু করে শোধ করছি। আমার জান মোবাইল। আমার কত রাত জাগা সংলাপের সাক্ষী মোবাইল। কত নি:সঙ্গ সময়ে কনটাক্ট ধরে ধরে সব প্রিয় মানুষকে ম্যাসেজ করে গেছি। কত অশ্রু ফেলেছি মোবাইলের গায়ে। এক ভীষন মন খারাপের রাতে তো টানা ছয় ঘন্টা মোবাইলে কথা বলেছি। একবার মোবাইলে কথা বলতে বলতে ঘুমিয়েই গিয়েছি। অপরপক্ষ এত হতভম্ব হয়েছে যে রাগ করতেও ভুলে গিয়েছে। আমি হেসে কুটি কুটি। এখনও মনে পড়লে পেট ফেটে হাসি আসে। হাসির সময়ও কি কম কেটেছে নাকি? আর.. আর... আমার ছবিগুলো? প্রিয় প্রিয় মানুষদের সাথে স্মরনীয় মুহুর্তের ছবি তো আছেই, মামার বাসার কাজের মেয়ের ছবিও আছে। এই মোবাইল আমাকে কত্তো গান শোনালে, আর সে-ই কিনা আমাকে ছেড়ে ঝাপ দিল কার না কার বুকে? কত সকালের ফজরের নামাজ কাজা হ্ওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিল ঠিক মত এলার্ম দিয়ে, আমি ভাবছিলাম, বেহেস্তে যাওয়ার সময় একেও নিয়ে যাব... কিসের কি! যাহ তুই জাহান্নামে যা... হাহাকারে বুক ফেঁটে যাচ্ছিল।
বাসায় এসে ঢুকতেই মা ছুটে আসল। সাথে অনুযোগ: "কি এতো দূরে গেলা একা একা, মোবাইল রেখে গেলা ক্যান? কই না কই ছিলা... আমি চিন্তায় অস্থির..." মা না হয় চিন্তায় অস্থির, আমি হলাম চিন্তামুক্ত। প্রথমে মাকে তারপরে মোবাইলকে আদর করে দিলাম... আমাকে বাঁচিয়ে দেয়ার জন্য...
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



