somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মরে গিয়েছিলাম (প্রায়)

২৯ শে মার্চ, ২০০৬ ভোর ৬:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আজকে আমার ছয়শো ডলারের মোবাইল হারিয়ে ফেলেছিলাম। ছয়শো ডলার। আমার রক্ত ঘাম করা উপার্জন দিয়ে কেনা জীবনের প্রথম মোবাইল। ছবির কালো সুন্দর মোবাইলটা। অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল পাঁচটায়। একটা নতুন টিউশনি শুরু করলাম আজ। লেইট লতিফা হলে যা হয়, বাসা থেকে বেরুলাম তাড়াহুড়ায়। মানিব্যাগ, এমপিথ্রি প্লেয়ার, মোবাইল সব জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে হিজাব ঠিক করতে করতেই স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে দেঁৗড়। কিছু দূর হাঁটা-দৌড় দিয়ে বুঝলাম, নাহ, দৌড়েও এ যাত্রায় পার পাবো না। ট্রেইন কখন না কখন আসে ঠিক নেই। বাসাটা স্টেশন থেকে চিনে যেতে হবে। ভীষন দেরি হয়ে যাবে। অ্যাপয়েন্টমেন্টে দেরি হ্ওয়া... উফ! আর না ভেবেই একটা ট্যাক্সি ডেকে উঠে পড়লাম। উঠেই মনে হল একটা চড় লাগাই নিজের দুই গালে। ড্রাইভার দেখতে আরব আরব।
যাই হোক নিয়ে গেল আমাকে গন্তব্যে। পাঁচটা বেজে আট মিনিট। আট মিনিট লেইট। কোন মতে টাকা দিয়ে ছুটে বেরুলাম।
সূচনা পর্বটা আন্তরিক ছিল। পূর্ব ইউরোপের কোন দেশ থেকে হবে। মেয়েটার নানু ইংরেজি বলে ভাঙা ভাঙা... শুনতে মিষ্টি লাগে... ব্যকরনে ভুল। ড এর জায়গায় দ, ট এর জায়গায় ত।
মেয়েটাও মিষ্টি। ইংরেজিতে বেশ ভাল। বুদ্ধিমতি। কিন্তু অংকে পেয়েছে 60 এ 20। পড়ানো শুরু করেই সময় দেখে নিতে পকেটে হাত দিয়ে বুক ধড়াস করে উঠল... মোবাইল নাই! এ পকেট ও পকেট... কোথথাও নাই। ব্যাগে দুপুরের না-খাওয়া স্যান্ডউইচ, গলগলে পীচ, নোটবই, পেন্সিল কেইস সব আছে নেই শুধু মোবাইল। তখন মনে পড়ল আমি চাকরিতে এসেছি। খোঁজা বাদ দিয়ে পড়ানো শুরু করলাম। কিন্তু মনে হাহাকার। আহারে, আমার মোবাইলটু। ভাবার চেষ্টা করলাম কোথায় হারিয়েছি। ট্যাক্সিতে হওয়ার সম্ভবনা সবচেয়ে বেশি। আমার জিন্সের জ্যাকেটের পকেট থেকে আগেও জিনিসপত্রের লাফ দেয়ার প্রবনতা খেয়াল করেছি। কয়েকবারই উঠে যাওয়ার পরে সিটে মোবাইল আবিষ্কার করেছি... আজকে কি তাহলে তাড়াহুড়ায় খেয়াল করি নি?
মেয়েটার অঙ্কে অনেক সমস্যা। তাই সময় কেটে গেল। শুধু মনে একটা চোরা হাহাকার...
বাসা থেকে বের হওয়ার সময় একটা মজার ঘটনায় মনটা প্রায়ে ভরে গেল। মেয়েটার নানু আমাকে বাইরের গেইট পর্যন্ত আগিয়ে দিয়ে গেল। ভাঙা ইংরেজিতে বিষ্ময় প্রকাশ করছিল, আমি এতো ছোট মেয়ে পড়াতে এসেছি... "সাচ আ ইয়াং গার্ল... বি কেয়ারফুল, তেইক কেয়ার"... আমি হেসে বাঁচি না... বললাম, "ডোন্ট ওয়ারি, আই গো টু ইউনি বাই মাইসেলফ..." মহিলা বলে... "আই নো ইউ দু, বাট আই অ্যাম আ মাদার, আই অ্যাম আ গ্র্যান্দমাদার..." আমার মনটা হুট করে ভাল হয়ে গেল। একদম নানু নানু লাগছিল। হাত জড়িয়ে ধরলাম বুড়ির।
আবার যখন মনে পড়ল আমার জানের জান মোবাইল হারিয়ে গেছে তখন বুকটা ধক করে উঠল। এদিক ওদিক তাকিয়ে হাঁটছিলাম। ট্যাক্সি্ দেখলেই ভিতরে সরু চোখে তাকাচ্ছিলাম একটা আরব চেহারা দেখার জন্য। নেই নেই। ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে গিয়ে ট্যাক্সিগুলো ভাল করে দেখলাম। নাহ। তারপরে আর না পেরে এক ট্যাক্সিওয়ালার কাছে গিয়ে বলেই ফেললাম। হাতে উল্কি অাঁকা লোকটাও দয়ালু। "ডার্লিং" ডেকে বুঝিয়ে দিল ট্যাক্সির নাম্বার জানা না থাকলে ওটা অসম্ভব।
ট্রেইন ধরলাম ফিরতি পথে। মন ভোঁতা।
ট্রেইন স্টেশনে নেমে দৌড়ে গেলাম যেখান থেকে ট্যাক্সি ধরেছি সেখানে। মনে মনে ইন্নালিল্লাহ জপতে জপতে। নিচু হয়ে ট্যাকি্নওয়ালাদের মুখ দেখতে দেখতেই দেখি এক ট্যাক্সি এসে থামল... সেই, সেই ট্যাক্সিওয়ালা! আমি মনে মনে সোবহানাল্লাহ আলহামদুলিল্লাহ থেকে আনন্দের আতিশয্যে আল্লাহকেও জাযাকুমুল্লাহু খাইরুন (আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিক) বলে যাচ্ছি।
মন চুপসে যেতে বেশি সময় লাগল না। ট্যাক্সিতে মোবাইল নেই। আরও দু:সংবাদ, আমি যেই সিটে বসেছি, সেখানে আরও যাত্রী বসেছে। ট্যাক্সিওয়ালা আমার মুখের চেহারা দেখে নিজের মোবাইল থেকে কল দিয়ে দেখাল, মোবাইল বাজছে, কেউ ধরছে না।
এবার আমি পারলে চিৎকার করে কাঁদি। আমার প্রথম উপার্জন দিয়ে কিস্তিতে কিনেছিলাম। এখনও একটু একটু করে শোধ করছি। আমার জান মোবাইল। আমার কত রাত জাগা সংলাপের সাক্ষী মোবাইল। কত নি:সঙ্গ সময়ে কনটাক্ট ধরে ধরে সব প্রিয় মানুষকে ম্যাসেজ করে গেছি। কত অশ্রু ফেলেছি মোবাইলের গায়ে। এক ভীষন মন খারাপের রাতে তো টানা ছয় ঘন্টা মোবাইলে কথা বলেছি। একবার মোবাইলে কথা বলতে বলতে ঘুমিয়েই গিয়েছি। অপরপক্ষ এত হতভম্ব হয়েছে যে রাগ করতেও ভুলে গিয়েছে। আমি হেসে কুটি কুটি। এখনও মনে পড়লে পেট ফেটে হাসি আসে। হাসির সময়ও কি কম কেটেছে নাকি? আর.. আর... আমার ছবিগুলো? প্রিয় প্রিয় মানুষদের সাথে স্মরনীয় মুহুর্তের ছবি তো আছেই, মামার বাসার কাজের মেয়ের ছবিও আছে। এই মোবাইল আমাকে কত্তো গান শোনালে, আর সে-ই কিনা আমাকে ছেড়ে ঝাপ দিল কার না কার বুকে? কত সকালের ফজরের নামাজ কাজা হ্ওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিল ঠিক মত এলার্ম দিয়ে, আমি ভাবছিলাম, বেহেস্তে যাওয়ার সময় একেও নিয়ে যাব... কিসের কি! যাহ তুই জাহান্নামে যা... হাহাকারে বুক ফেঁটে যাচ্ছিল।

বাসায় এসে ঢুকতেই মা ছুটে আসল। সাথে অনুযোগ: "কি এতো দূরে গেলা একা একা, মোবাইল রেখে গেলা ক্যান? কই না কই ছিলা... আমি চিন্তায় অস্থির..." মা না হয় চিন্তায় অস্থির, আমি হলাম চিন্তামুক্ত। প্রথমে মাকে তারপরে মোবাইলকে আদর করে দিলাম... আমাকে বাঁচিয়ে দেয়ার জন্য...
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
২৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের খারাপ দিনের পর

লিখেছেন সামিয়া, ০৫ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৪




আমার মাথা যেন আর কাজ করছিল না। বাইরে থেকে আমি স্বাভাবিক হাঁটছি, চলছি, পড়ছি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিলাম মায়ের কথা ছোট বোনটার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কিংকর্তব্যবিমূঢ়

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ৯:৩৩


দীর্ঘদিন আগে আমার ব্যক্তিগত ব্লগ সাইটের কোন এক পোস্টে ঘটা করে জানান দিয়ে ফেইসবুক থেকে বিদায় নিয়েছিলাম। কারণ ছিলো খুব সাধারন বিষয়, সময় অপচয়। স্ক্রল করে করে মানুষের আদ্য-পান্ত জেনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গেরুয়া মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ: একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও শিক্ষা।

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৮


দীর্ঘ ১৫ বছরের টিএমসির শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। গেরুয়া শিবিরের এই ভূমিধস জয়ের পেছনে অবশ্য মোদি ম্যাজিকের চেয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার ব্যর্থতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা: ইতিহাসের প্রতি অবমাননা।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৪৩

বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফায়েল আহমেদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা: ইতিহাসের প্রতি অবমাননা।
=======================================
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যাঁরা অমর হয়ে আছেন, তাঁদের অন্যতম হলেন তোফায়েল আহমেদ। উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে মহান... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজের দোষ দেখা যায় না, পরের দোষ গুনে সারা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই মে, ২০২৬ রাত ২:১০


ভারতের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতন নিয়ে বাংলাদেশে যে পরিমাণ চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে, তা দেখে অবাক না হয়ে উপায় নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই দেখা যায় অদ্ভুত সব তত্ত্ব। ফেইসবুক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×