somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিশি রাতে একলা ভ্রমন

৩০ শে মার্চ, ২০০৬ রাত ১০:১৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কাল মন ভাল ছিল না একদম। আমারকিচ্ছুভালল্গছেনা... এরকম লাগছিল। তাই ইউনি থেকে বেরুলাম দেরি করে। নয়টার বেশি বাজে তখন। এত দেরি করে ইউনি থেকে আগে কখনও বের হয়নি, কারন আমার বাসা পর্যন্ত যেতে লাগে দুই ঘন্টার উপরে। লাইব্রেরি থেকে বেরিয়েই দেখি বৃষ্টি পড়ছে টিপটিপ। চারিদিকে খুব কম মানুষ জন... কিন্তু তবু নিরাপদ লাগছিল নিজেকে। চেনা পরিবেশ বলেই হয়তো। আমাদের ইউনিটা সবচেয়ে সুন্দর লাগে রাতের বেলা। চারিদিকে বিভিন্ন রং ঢঙের আলোর বন্যা, বিশাল উঁচু উঁচু বিলিডংগুলোর ছাদে বড় বড় লাইট। চকচকে টাইলস বিছানো ইউনিভার্সিটি ওয়াক দিয়ে হাঁটার সময় উড়ছিলাম। ঝিরঝিরে বৃষ্টি গায়ে মেখে। চারিদিকের লাইটগুলোর সামনে গুড়ো গুড়ো বৃষ্টির অপরূপ কারুকাজ। মৌনতার সৌন্দর্যমাখা সব কিছু।
বৃষ্টির মধ্যে বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হল বেশ খানিকক্ষন। বাসে উঠে রাতের অনিয়মিত বাস ধরার জন্য রাস্তার ওই পাড় থেকে কয়েকজনকে জীবন মরনের দেঁৗড় দিতে দেখে হাসি পেয়ে গেল। রাত নয়টার বাসে সিরিয়াস মুহুর্তেসিরিয়াস মুখ করে বসে থাকা এক পাল মানুষের মধ্যে এক হিজাব পড়া তরুনী আপন মনে হাসছে... বেমানান বড়ই। মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কানে হেডফোনটা লাগিয়ে নিলাম... নোরাহ জোনস মায়া মায়া গলায় তার কাছে যাওয়ার আহবান দিচ্ছিল। পিচঢালা ভেজা রাস্তা নিয়নের আলোয় চকচক করছিল। হঠাৎ বেরসিক মোবাইলটা আমার ভাব ছেদা করে দিয়ে বেজে উঠল। নয়টার মধ্যে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, মা চিন্তা করছে, ভাইয়া ফোন করেছে। অজুহাত খাড়া করলাম... ইউনিতে লাইব্রেরিতে ছিলাম। আশ্বাস দিলাম... আসছি।
সেন্ট্রাল স্টেশনে পেঁৗছে ট্রেইনের সময় দেখে হেসে ফেললাম। আধা ঘন্টা পরে প্রথম ট্রেইন। হাসিটা খুশির ছিল না। নিজের বেগতিক অবস্থার জন্য ছিল। এর কিছুক্ষন পরেই বাবার ফোন... কোথায় তুমি মা? বেচারাকে বলতে খারাপ লাগছিল... তবু বললাম। বাবার চিন্তিত কনঠ শুনলাম কিছুক্ষন।
তারপরে বোরডম কাটাতে হাঁটা শুরু করলাম স্টেশনের আশেপাশে। এক দঙ্গল টিনেজার হুজ্জোতি করতে জমা হয়েছে। স্কেইট বোর্ড দিয়ে স্টেশনের সামনের রাস্তায় সাই সাই করে যাওয়া আসা করছে। গা বাঁচিয়ে সরে আসলাম। এক টিনেজ কাপল স্ট্রীট ল্যাম্পের সামনে জড়াজড়ি করে আস্তেআস্তেদুলছে। কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, টিনেজারগুলোর হঠাৎ মাথা খারাপ হয়ে কি করে বসে সেই আশংকায় হয়তো। আমি আর একটু এগিয়ে কাবাব শপটায় গেলাম। একটু শীত শীত করছিল। আলু ভাজা খেলাম। মোবাইল মর মর। যে কোন সময় চার্জ চলে যাবে। তবু ফোন করলাম একজন প্রিয় মানুষকে। টাসকি দিলাম... "এখনও সেন্ট্রালে?!"
ট্রেইনের জন্য আর অপেক্ষা করতে ভাল লাগছিল না। একই দিকে যাবে এমন একটা ট্রেইনে উঠে পড়লাম। খুব কম মানুষ, এরমধ্যেও কপাল এতই খারাপ যে বসে পড়ার পরে শুনতে পেলাম পিছনে এক বাঙালি ফোনে কথা বলছে বিশাল হাউ কাউ করে। কি কার সাথে ব্যবসা করেছে, সে নিশ্চিত ঠকিয়েছে, ভাগনিকে গছিয়ে বিয়ে দিয়েছে এই সব বিরক্তিকর কূটনামী... সাথে "হালার পুত" মসলা...। কানের হেডফোনের ভলিউম বাড়িয়ে দিলাম। যত সময় যাচ্ছিল তত ফাঁকা হচ্ছিল কম্পার্টমেন্ট। এয়ার কন্ডিশনড কম্পার্টমেন্টে টিউব লাইটের আলোয় বাইরে কিছু দেখা যাচ্ছে না বললেই চলে। দেখা যাচ্ছিল শুধু জানালার গায়ে ছুটে আসা শব্দহীন পানির ফোটা। মাবাইলে লাল দাগ জ্বলছিল, তবুনি:সঙ্গতা কাটাতে কিছুক্ষন ফোনে কথা বলে নিলাম।
প্রায় এক ঘন্টা পড়ে ট্রেইন শেষ স্টপে গিয়ে থামল। রাতের ক্লান্তিযেন ট্রেইনটাকেও পেয়ে বসেছিল। আস্তে আস্তেথামল। এরপরে আরও একটা ট্রেইন ধরে তবেই গন্তব্যে পেঁৗছব।
স্টেশনে দুই একজন বিচ্ছিন্ন ভাবে বসে ছিল। দোকানপাট, টিকিট কেনা বেচা সব বন্ধ। আলোকজ্জল স্টেশনের ভিতরে হাঁটাহাঁটি শুরু করলাম। এক কোনায় তিনটা আইল্যান্ডার ছেলেমেয়ে জড়াজড়ি করে হাসাহাসি করছিল। অস্ট্রেলিয়ায় আইল্যান্ডারদের অবস্থান অনেকটা আমেরিকায় ব্ল্যাকদের মতো। একসময় বর্ণবাদীর স্বীকার হয়েছে, অনেক অবিচার করা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের আইল্যান্ডার আর অ্যাবরিজিনদের কাছে তাই দেশবাসী ক্ষমাপ্রাথর্ী। প্রচুর সংখ্যক নতুন প্রজন্ম ভীষন উদ্ধত টাইপের। আইন ভাঙে অবলীলায়। এক সময় তাদের প্রতি করা অবিচারের প্রতিবাদেই হয়তো। আমার চোখের সামনে পোলাপানগুলো থুতু ফেলছিল পরিষ্কার টাইলসে। গা জ্বলে যাচ্ছিল। এত লম্বু না হলে নির্ঘাত কিছু বলতাম।
আরেকটু হেঁটে অন্যদিকে যেতেই এক পঞ্চাশোর্ধের চোখাচোখি হল। কোন দেশের বুঝলাম না, ভূমধ্যসাগরীয় কোন দেশের হবে। চোখাচোখি হওয়ার সাথে সাথে বুড়ো হাসি মারল। ভাব বসানোর ভঙ্গিতে কাছে আসছিল। আমি তাড়াতাড়ি হাসিটা ফিরিয়ে দিয়ে অন্যদিকে হাঁটা দিলাম। নি:সঙ্গ দু:খী বুড়ো মনে হলে কথা বলতাম, একে দু:খী মনে হল না।
ততক্ষনে আবার ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমি প্লাটফর্মে চলে গেলাম। আস্তেআস্তেবৃষ্টিতে হাঁটতে কি যে সুখ!
ট্রেইনে যখন উঠলাম তখন এগারোটা বাজে। ভিতরে ক্লান্ত কিছু মুখ, কেউ কেউ ঘুমিয়েও পড়েছে। আমি বসার পরে আমার সামনে বুক পর্যন্ত লম্বা গুম্ফধারী, দাঁড়িওয়ালা, জটালো এক লোক এসে বসল। হাতে একটা কাগজের প্যাকেট। আপাত: নিদের্াষ। কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যেই আসল রূপ বের হল। লোকটা ভিক্টরিয়া বিটারের বিয়ারের বোতল বের করে চুক চুক করে চুমুক দেয়া শুরু করল। মদ খাক মানুষ, আল্লাহ খোদায় বিশ্বাসের মত এত বড় জিনিস টপকে মদ খাওয়া নিয়ে ধরতে যাই না আমি। কারন আমার দৃঢ় বিশ্বাস আল্লাহর উপর বিশ্বাস থাকলে মানুষ কখনও খেতে পারবে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সমস্যা অন্য জায়গায়। ট্রেনে এখানে সেখানে বড় করে লেখা থাকে "নো অ্যালকোহল পারমিটেড"... এই ব্যাটা বেআইনী কাজ করছে সেটাই হল কথা। তার চেয়েও বড় কথা... প্রচন্ড বাজে গন্ধ পাচ্ছিলাম। গন্ধটা তার গায়ের না বিয়ারের জানি না, কিন্তু বমি আসছিল সত্যি। অনেক্ষন নাক চেপে বসে ছিলাম। কারও সামনে থেকে উঠে যাওয়ার মত অভদ্রতা করতে ইচ্ছা করছিল না... কিন্তু বমি আসি আসি করছিল, তখন আর না উঠে পারি নি। তবে হেঁটে সোজা কম্পার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে গেলাম। যেন ওই ব্যাটা না বুঝে কেন উঠেছি। এমন বেরসিক ভাগ্য... আমি যেখানে নামলাম, লোকটাও নামল সেখানে। না তাকিয়ে হাঁটা দিলাম।
স্টেশনের বাইরে ভাইয়া গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। গল্প করতে করতে ওর ডাকাইত্যা গাড়ি চালানো উপভোগ করলাম। গত দুই ঘন্টায় বাসা থেকে ফোন এসেছে মোট ছয়টা। বাসায় গিয়ে দেখি মা খাবার বেড়ে ঢুলু ঢুলু চোখে অপেক্ষা করছে... আমি আসলে ঘুমাবে। আদর নিয়ে নিলাম মন ভরে। মাঝে মাঝে ভালবাসার প্রকাশগুলো আদায় করে নিতে খারাপ লাগে না... মন ভাল হয়ে যাওয়ার জন্য অতি উপাদেয় সমাধান...
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কিংকর্তব্যবিমূঢ়

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ৯:৩৩


দীর্ঘদিন আগে আমার ব্যক্তিগত ব্লগ সাইটের কোন এক পোস্টে ঘটা করে জানান দিয়ে ফেইসবুক থেকে বিদায় নিয়েছিলাম। কারণ ছিলো খুব সাধারন বিষয়, সময় অপচয়। স্ক্রল করে করে মানুষের আদ্য-পান্ত জেনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গেরুয়া মানচিত্রে পশ্চিমবঙ্গ: একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও শিক্ষা।

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৫ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৮


দীর্ঘ ১৫ বছরের টিএমসির শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে অবশেষে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। গেরুয়া শিবিরের এই ভূমিধস জয়ের পেছনে অবশ্য মোদি ম্যাজিকের চেয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতার ব্যর্থতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজের দোষ দেখা যায় না, পরের দোষ গুনে সারা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই মে, ২০২৬ রাত ২:১০


ভারতের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পতন নিয়ে বাংলাদেশে যে পরিমাণ চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে, তা দেখে অবাক না হয়ে উপায় নেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই দেখা যায় অদ্ভুত সব তত্ত্ব। ফেইসবুক... ...বাকিটুকু পড়ুন

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়: সব কিছু ভেঙে পড়ে

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৬ ই মে, ২০২৬ দুপুর ২:২৮


"তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও - আমি এই বাংলার পারে
র’য়ে যাব; দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;
দেখিব খয়েরি ডানা শালিখের..."

জীবনানন্দ দাশ ''রূপসী বাংলা'র কবিতাগুলো বরিশালে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে বসে লিখেছিলেন। জীবনানন্দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার কারণে দিদি হেরেছন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৬ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩




আপা এপারের হিন্দুদেরকে স্নেহ করতেন তাতে ওপারের হিন্দু খুশী ছিল। আপা ভারতে বেড়াতে গেলে মোদীর আতিথ্যে আপা খুশী। কিন্তু আপার আতিথ্যে দিদি কোন অবদান রাখলেন না। তাতে হিন্দু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×