চার পাঁচ বছরের তিনটি শিশু বিছানায় এলোমেলো ভাবে শুয়ে আছে। চার বছরের একমাত্র মেয়েটা এক পাশে, মাঝে বেড়াতে আসা মজার কামরান ভাইয়া আর এক পাশে ভাইয়্যূন। গত রাতে শিশুদের বাবা মশারি টাঙিয়ে লাইট নিভিয়ে যা্ওয়ার অনেক পর পর্যন্ত ফিসফাস চলেছে। অনভ্যাসের নিঘর্ুম রাতের মাশুল দিতে শিশুর দল তাই বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। ্ওদের বাবা যখন মশারি তুলতে তুলতে ডাক দিল, তখন স্বাভাবিক ভাবেই বেগ পেতে হল:
- এই মামনি বাবারা উঠো, উঠো, উঠো।
নৈ:শব্দ।
- এই, এই যে, দেখি উঠো তো, উঠো।
- উ... উ... উ...
- আরে, তাড়াতাড়ি উঠে দাঁত মেজে আস, একটা মজার খবর আছে।
এবার তিনজনই এক চোখে পিটপিট করে তাকালো। বাবার দাঁড়ি্ওয়ালা মুখটা বহু কষ্টে ফোকাসে এনে শুধাল,
- কি মজার খবর?
- তাড়াতাড়ি দাঁত মেজে আসো, নাস্তা খেতে খেতে বলবো।
- না, আগে বল।
- আচ্ছা, উঠে বস ঠিকমত, তারপর বলি।
- উহু, আগে বল।
- আচ্ছারে বাবা, তোমাদের একটা ছোট আপু হয়েছে, আমি এখন আনতে যাব।
এবার আর বলতে হল না, তিনজনেরই চোখ বড় করে খুলে গেল। তড়াক করে উঠে সে কি নাচ! মেয়েটা বেশি খুশি। কয়েক দিন ধরেই অবসর সময়ে মা বাবা ছেলেমেয়েদের ডেকে একে একে জানতে চান,
- বলতো, আমাদের একটা ছোট বাবু আনলে কেমন হবে?
- খুব ভাল হবে, খুব মজা (নি:শর্ত ঐক্যমত)
- কি চা্ও, ভাইয়া না আপু?
এবারে দ্বৈতমত: মেয়েটা চায় আপু আর ছেলেটা ভাইয়া। বাবা মা হাসেন।
মেয়েটার চাওয়াই সত্যি হল। তবে ছেলেটা মন খারাপ করল না। একটা নতুন বাবু, নতুন খেলনা... ভাইয়া হোক আপু হোক, ভাবনাটাই কেমন আনন্দের। কিছুক্ষনের মধ্যেই বারান্দায় মিস্ত্রী-মিস্ত্রী খেলতে থাকা ব্যস্ত শিশুদের রেখে বাবা গেলেন নতুন আপুকে আনতে।
বেশ কিছুক্ষন পরে বাসার সামনে স্কুটারের ভটভট শব্দ শুনে শিশুর দল দৌড়ে গেল গ্রীলের কাছে। ঐতো বাবা নামছে। দুদ্দাড় খালি পায়েই নিচে দৌড়। যাওয়ার আগে স্যান্ডেল খুঁজে দিতে না পারার অপরাধে কাজের মেয়েটাকে বারান্দায় ছিটকিনি তুলে আটকে রাখা হল...
মায়ের কোলের পোটলাটাকে বিছানায় আস্তে করে শুইয়ে দেয়া হল। সাথে ডিক্রী জারি হল, হাত পা মুখ ধুয়ে এসে তবেই পোটলাকে খুঁচিয়ে দেখা যাবে। তাই সই। সাবান দিয়ে তড়িঘড়ি করে ঘষাঘষি করে তিনজনই উবু হয়ে লাল মুখো ইঁদুরের বাচ্চা পর্যবেক্ষনে লেগে গেল:
- ওমা, এত্তো ছোট!
- খালি ঘুমায়।
- কখন উঠবে?
- ওর চামড়া এমন কেন?
- চুল এতো কম কেন?
- আল্লা ওর নখ এতো বড় কেন?
- এই দেখ ও আমার হাত ধরে আছে... বাবুটা আমাকে লাইক করে...
- উমম পা গুলা কি নরম...
এরই মাঝে বাবার দেয়া এক তোড়া রজনীগন্ধা আর একটা কার্ড সাজিয়ে রাখা হল পাশে। কার্ডটায় ভীষন সুন্দর সর্ষে ক্ষেতের মাঝে বসে একটা বড় মেয়ে পিচ্চি একটা মেয়ের চুলে বেনী করে দিচ্ছে। দুই জনের পরনে লাল শাড়ি, অাঁচল কোমরে গোজা। দুই বোন। ছোট মেয়েটার অভিমান হল, "হুহ, বাবু কি শুধু মামনির? আমাদের না?"
কার্ডের ছবিটা পনের বছর পরে এখনও মনে আছে মেয়েটা। সে এখন আস্ত মেয়ে হয়ে গিয়েছে। পোটলাটা হয়ে উঠেছে পনের বছরের একজন কিশোরী। রাতে অন্ধকার ঘরের দুই প্রান্তের বিছানায় শুয়ে শুয়ে মেয়ে দু'টি এখন রাত পার করে দেয় গুট গুট গল্পে। কাপড় পাল্টা পাল্টি করে পড়ে। চুল বাঁধাবাঁধি করে ঠিক সেই কার্ডের ছবির মতই। একসাথে শপিঙে গেলে হুশ থাকে না। রান্নাও চলে দারুন। চলে একই বই পড়ে ভাব বিনিময়। আর মাঝে মাঝে আস্ত মেয়ে কিশোরীর দিকে তাকিয়ে ভাবে, পোটলাটা এতো বড় হল কবে?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



