। হুম... কিয়ামত। আইডিয়াটা একটু অদ্ভূত বটেই। একটু না, অনেকটুকু। আসলে বিশ্বাসের পুরো ব্যপারটাই এমন। অনেক কিছূ আছে, যেগুলোতে শুধু বিশ্বাস আসে, এসে যায়। এগুলো লজিক্যালি রিফিউট করা সম্ভব না। লজিক্যালি প্রুফ করাও সম্ভব না... একটা 'কিন্তু' থেকেই যায়। অনেক ডটস জয়েন করতে হয়। কিয়ামত, আল্লাহর অস্তিত্ব... এগুলো সব সে রকম ব্যপার। পৃথিবীতে এখনও অবিশ্বাসীর চেয়ে বিশ্বাসীই বেশি, তাদের এক চতুর্থাংশই মুসলিম।এখন পৃথিবীতে জীবিত মুসলিমদের কারও সাথে আল্লাহ কখনও সরাসরি কথা বলেন নি, তারা কেউ আল্লাহকে দেখেননি... তবু, তবু, কেন আল্লাহতে তাদের বিশ্বাস? চিন্তার বিষয়, ভাবনার ব্যপার। আল্লাহর অস্তিত্বের সত্যতার ব্যপারে দ্্বিধাহীন অনেকে আছেন, যারা আখিরাত প্রসংগে একটু অস্বস্তিতে নড়ে চড়ে বসেন। ঠিক করে হ্যা বা না বলতে পারেন না। মুখে হ্যা বললেও হয়তো ভিতরে খুতখুতি, খুতখুতি... কি করে হয়! বিশেষত সত্যের প্রতি বিজ্ঞানের যেই এপ্রোচ... 'পঞ্চইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব না করা পর্যন্ত আছে বলে ভাবা যাবে না', তাতে যে কোন আধুনিক শিক্ষিত মানুষের জন্য আখিরাতে নি:শর্ত ভাবে বিশ্বাস করা কষ্টকর... অথচ, আখিরাতের সত্যতা সেভাবে বুঝার নয়। মৃত্যুর পরের জীবন থেকে আজ পর্যন্ত কেউ ফিরে এসে সে জীবনের বর্ণনা দেন নি... এই ব্যপারটা, প্রমানের অভাব, আখিরাতে বিশ্বাস সত্যিই কঠিন করে তুলে... বুঝি আমি, কারণ আমি নিজে একই সংকটে ছিলাম এক সময়...
অথচ ইসলামে বিশ্বাসের তিনটি মৌলিক ব্যপার আছে:
1. তাওহীদ (আল্লাহর পরিচয়ে বিশ্বাস... একত্ববাদ ইত্যাদি)
2. রিসালাত (আল্লাহর পাঠানো বিশেষ মানুষের মাধ্যমে বিশেষ জ্ঞানে বিশ্বাস)
3. আখিরাত (মৃতু্যর পরের জীবনে বিশ্বাস) এর একটাতেও কোন ফাঁক থাকলে বিশ্বাস পূর্ণ হয় না... তাই আখিরাতের ব্যপারে খুব পরিষ্কার ধারণা এবং বিশ্বাস থাকাটা জরুরী, ভীষন জরুরী। এরপরে বাকি কাজগুলো অর্থ্যাৎ ইসলামের বিভিন্ন অনুশাসন মেনে চলা সহজ।
আখিরাতের উপর পূর্ণ বিশ্বাসের জন্য প্রথমে আল্লাহ এবং তার রাসুলের (সা) প্রতিটা কথাকে সত্যি বলে মেনে নিতে হবে। এটা পূর্ব শর্ত। দেখা যাক, আল্লাহ মানুষের সত্ত্বা কি করে সংজ্ঞায়িত করেছেন...
1. মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, শুধু মানুষের জন্যই সমস্ত মহাবিশ্ব সৃষ্টি করা হয়েছে। যদি কখনও মহাবিশ্বের অন্য কোথাও প্রাণের আবিষ্কার হয়ও, তাহলেও 'মানুষের জন্য সৃষ্ট মহাবিশ্ব' ... এই সত্যের কোন অদল বদল হবে না।
2. মানুষের দেহটা কেব্ললই আসল অস্তিত্বের ধারক। মানুষের আসল অস্তিত্ব বা প্রাণ (soul) বা আত্মা সৃষ্টি করা হয়েছে অনেক আগে। সমস্ত মানব অস্তিত্বকে একই সাথে। এই প্রাণ কয়েকটা স্তর পার করে। প্রথমত, দৈহিক অস্তিত্ব পাওয়ার পূর্ব কাল, তারপরে মাতৃগর্ভ, তারপরে পার্থিব জীবন, তারপরে কবরের জীবন, তারপরে আসল, অনন্ত জীবন। দেখুন, মাতৃগর্ভে আসার আগে কিন্তু কোন দৈহিক অস্তিত্ব ছিল না, থাকলেও সেটা আমাদের এই রক্ত মাংসের দেহ ছিল না.. ছিল অন্য কিছু... মৃত্যুর পরেও তাই হবে।
তিন বছর আগে একটা প্রোগ্রামে মিশরীয় একজনের বক্তৃতা শুনে এই ব্যপারে আমার ধারণা পরিষ্কার হয়ে গেছে... বক্তৃতায় বক্তা মাতৃগর্ভের জীবনের সাথে আমাদের পার্থিব জীবন, আর আমাদের পার্থিব জীবনের সাথে আখিরাতের জীবনের তুলনা করেছেন। এই তুলনাটা কিন্তু নেহাতই বক্তার কল্পনাপ্রসূত না। তিনি বক্তৃতার শুরুতে কোরআনের একটা আয়াত উদ্ধুতি করেছিলেন যেখানে আল্লাহ মাতৃগর্ভের সাথে এ দুনিয়ার জীবনের তুলনা করেছেন। স্যরি, আয়াতটার রেফারেনস আমার মনে নেই। (বক্তৃতাটা শুনেছি অনেক আগে, মনে যা গেঁথে আছে তা থেকেই বলছি... এম্ব্রিওলজিক্যাল কোন ফ্যাক্টে ভুল হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন...)
মাতর্ৃগর্ভ আর পৃথিবীর জীবন... মাতৃগর্ভে একটা প্রাণের বিকাশ হয়। নয় মাস ধরে একটা প্রাণ তিলে তিলে তৈরি হয় পার্থিব জীবনের জন্য। আর দেখুন, আমাদের এখনকার জীবনটা কিন্তু পরকালের জন্য প্রস্তুতি...
মাতৃগর্ভ... এ পৃথিবীর কিছুর সাথেই তার মিল নেই, তাই শুধু মাতৃগর্ভের অভিজ্ঞতা দিয়ে এ পৃথিবী বোঝা মুশকিল। একটা প্রাণ, একটি অস্তিত্ব যার সূচনাই হয় নিকষ অন্ধকারে, শব্দহীন এক জলে ভাসা নিরাপদ জগতে, তার পক্ষে কিন্তু "আলো" কি কল্পনা করা সম্ভব না। শব্দ কি জানা সম্ভব না। আপনি একজন জন্মান্ধকে অনেক চেষ্টা করে দেখুন তো আলোর মানে বুঝাতে পারেন কি না? আপনি বলে যাবেন এবং যাবেন কিন্তু শেষ মেষ সে দুধের সাদা রঙকে দা কোদাল ভেবে ভয় পাবে। মাতৃগর্ভের এয়ার কন্ডিশনড উষ্ণ, আলোহীন, শব্দহীন, পানির জগত থেকে আলোময় শব্দময় বায়ুময় বৈরি পৃথিবীতে এসে তাই শিশু চিৎকার শুরু করে... আমরা আখিরাতকে খুব চেষ্টা করেও বুঝতে পারবো না... আমাদের সে জীবন সম্পর্কে কোন অভিজ্ঞতাই নেই! শুধু কল্পনা করতে পারবো, কোরআন আর হাদীসের জ্ঞান থেকে...। আমাদের এখনকার বুদ্ধি বিবেচনা আর "প্রকৃত পৃথিবী" সম্পকর্ীয় ধারণা দিয়ে তাই আখিরাতকে না বুঝার চেষ্টা করাই ভাল...
মাতর্ৃগর্ভের শিশুর অ্যানালজি আরেকটু চিন্তা করলে মজা পাবেন। তাদের খাওয়ার ধরণটা কিন্তু আলাদা... আমাদের মত 32 দাঁত, জিহবা, পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত-বৃহদান্ত লাগিয়ে খেতে হয় না, ডাইজেসচন প্রসেস ভিন্ন। জান্নাত জাহান্নামের খাওয়া দাওয়া, শ্বাস প্রশ্বাস ইত্যাদির ভিন্ন প্রসেসে তাহলে অবাক হওয়ার কি আছে?
আপনার কোন যমজ ভাই বা বোন আছে? আমার নেই.. কিন্তু যাদের আছে, তারা নয় মাস কাটিয়ে দেয় যমজের সাথে জড়াজড়ি করে, খুনসুটি করে, রেসলিং করে... সেই যমজই তাদের জন্য বাস্তবতা... তাদের পৃথিবীর "একমাত্র মানুষ"। যেই যমজ শিশুটার আগে জন্ম হয়, তার কষ্ট পাওয়ার ক্ষমতা থাকলে এত দিনের পরিচিত প্রিয় মানুষটাকে ছেড়ে যেতে কি তার কষ্ট হত না? এত দিনের নিরাপদ আশ্রয় সংকুচিত হয়ে তাকে ঠেলে বের করে দিচ্ছি... তাদের কি প্রচন্ড ভয় হত না? কথা বলার ক্ষমতা থাকলে দেখেন পৃথিবী থেকে আমরা আমাদের "প্রিয়" মানুষের সাহচর্য ছেড়ে যাওয়ার সময় যা বলি, তাই কি বলতো না?
জন্মের আগে নয় মাস আপনাকে যেই "প্রটেক্টিভ" পর্দা-- "প্ল্যাসিন্টা" পানির জগতে ভাসিয়ে রেখেছিল, বাইরের রোগ জীবানু থেকে রক্ষা করেছিল... আপনার জন্মের সাথে সাথে সেই অসম্ভব প্রয়োজনীয় পর্দাটার ভাগ্য কি হয়েছিল ভেবে দেখুন? হাসপাতালের বিন। আমাদের পরবর্তী জীবনে ট্রানসফারের সময়ও তেমনি প্রচন্ড মায়ার, এককালীন অসম্ভব প্রয়োজনীয় এই দেহটার এক ফোঁটা মূল্য থাকবে না... সেখানে যে নতুন সব কিছু!
শিশুগুলো মার্তৃগর্ভ থেকে নতুন এ পৃথিবীতে আসতে হয়তো ভয় পায়... সব কিছু অন্য রকম তাই... অথচ জন্মের আগে কত সুখময় প্রতীক্ষা নিয়ে মা বসে থাকেন... অপেক্ষা করেন সেই প্রথম নড়ে ওঠাটা অনুভব করার জন্য... একটা সুন্দর নাম ঠিক করেন, ঘর সাজান, অনাগত শিশুর কথা ভেবে নাক চেপে অপছন্দের দুধ ডিমটুকু খেয়ে নেন, গভীর রাতে ঘুম ভেঙে অনাগত শিশুর কথা ভেবে শিহরিত হন... কি সুন্দর না এই প্রতীক্ষা? নাড়ী-ছেড়া যন্ত্রনা সহ্য করেন, জন্মের পরও কি নির্ঘুম রাত কম কাটে? যেই মা এত কিছু করে, সন্তান বড় হয়ে যদি তার অবাধ্য হন... কৃতজ্ঞতার ছিটে ফোটা না থাকে তার মধ্যে, তাহলে মায়ের প্রতিক্রিয়া কি হয়?
এবার ভাবুন, আল্লাহ আমাদের জন্য সব কিছু সৃষ্টি করেছেন... সমগ্র মহাবিশ্ব... না চাইতেই কত কত মায়া দিয়ে ঘিরে রেখেছেন... এখন প্রতীক্ষাও করছেন জান্নাত সাজিয়ে আমাদের জন্য। অবাধ্যদের জন্য জাহান্নামতো আছেই, কিন্তু, নিজের সৃষ্ট মানুষকে তিনি খুব আনন্দ নিয়ে সেখানে ফেলবেন না। বরং ফেলবেন সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে... আর অবশ্যই কেউ ভুল থেকে ফিরে আসলে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি খুশি হন... যাই হোক, কিয়ামত এবং আখিরাত সম্পর্কে আমার মূল বক্তব্য... তখন ভিন্ন সে জগতে সব কিছুর ভিন্ন নিয়ম থাকবে... এটুকু মাথায় না রেখে আখিরাত এবং কিয়ামত বুঝা যাবে না... কারণ কিয়ামত হচ্ছে, আল্লাহ যেই নিয়মগুলো (ফিজিক্স, কেমিস্ট্রির যত ল') দিয়ে পৃথিবীকে তার এখনকার রূপে রেখেছেন, সে সব নিয়মের সমাপ্তি... এটুকু মাথায় না রেখে যারা সাধারণ বিবেক বুদ্ধির কথা বলে আখিরাত হেসে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন, তাদের কথার ভ্যালিডিটি নেই...
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে এপ্রিল, ২০০৬ রাত ১১:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



