somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

অভ্রনীল হৃদয়
সকল অপূর্ণতায় পূর্ণ আমি। সব অসাধারন মানুষের ভীরে আমি অতি সাধারন এক মানুষ। পেশায় ছাত্র, নেশায় মুভিখোর আর বইপড়ুয়া। নিজেকে খুঁজে পাবার জন্য হাঁটতে থাকি। স্বপ্নের সাথে হাঁটি, স্বপ্নের জন্য হাঁটি। আর মাঝে মাঝে হাবিজাবি লেখি আমার ভার্চুয়াল খাতায়।

গল্পঃ পর-আপন

১৬ ই অক্টোবর, ২০১৫ রাত ৮:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গন্তব্যহীনভাবে রেললাইনের পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছি আমি। ঠিক কতক্ষণ ধরে হাটছি জানা নেই আমার। মাঝে মাঝে জীবনের প্রতি এতোটাই বিতৃষ্ণা লাগে যে আমরা বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা হারিয়ে ফেলি। এই মুহূর্তে আমার মাঝে বেঁচে থাকার আর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে অবশিষ্ট নেই। সকাল সকাল আম্মুর সাথে ঝগড়া করে বাসা হতে বেড়িয়ে পড়েছি।
.
আজ প্রিয়ন্তির জন্মদিন। অনেকদিন থেকেই প্ল্যান করে রেখেছিলাম আজকের এই দিনটায় ওকে একটা সারপ্রাইজ গিফট দিবো। এরপর ওকে নিয়ে সারাদিন ঘুরে বেড়াবো আর দুজনে মিলে একসাথে সময় কাটাবো। কিন্তু সকাল বেলা আম্মুর কথা শুনে মাথা খারাপ হয়ে গেলো। আম্মুর কাছে টাকা চাইতেই বললো মাসের শেষের দিক। এসময় হাতে টাকা নেই। আর হঠাৎই এতো টাকা কিভাবে দিবে। মূলতো এই নিয়েই আম্মুর সাথে মাত্রাতিরিক্ত ঝগড়া হয় আমার। রাগের মাথায় পাশ হতে ফুলদানিটা নিয়ে সজোরে ড্রেসিং টেবিলের দিকে ছুড়ে মারি। এরপর আম্মুর কোনো কথা না শুনেই বাসায় আর ফিরবোনা বলে চলে আসি।
.
প্রিয়ন্তির সাথে আজ রেস্টুরেন্টে দেখা করার কথা। বাসা থেকে তো রাগ করে বেড়িয়ে এলাম। কিন্তু টাকার ব্যাবস্থা তো কোনো কিছুই হলো না। মানিব্যাগ হাতরিয়ে মাত্র পাঁচশ টাকার একটি নোট আর কিছু খুঁচরো টাকা ছাড়া কিছুই পেলাম না। এই টাকা দিয়ে গিফট তো দূরে থাক। প্রিয়ন্তিকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যেতেও পারবো না। নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছিলো। তার সাথে সাথে আম্মুর উপর আরো বেশি রাগ হচ্ছিলো।
.
অনেকক্ষণ ধরে রেস্টুরেন্টে কোনার একটি বেন্ঞ্চে বসে আছি। সকালবেলা কিছু না খেয়ে আসার কারণে পেট চো চো করছে। কি করা যায় ভাবতে ভাবতেই দরজা ঠেলে প্রিয়ন্তিকে ভেতরে আসতে দেখলাম। আজ ও খুব সেজেগুজে এসেছে। অন্যান্য দিনের চেয়ে যেনো আজ একটু বেশীই সুন্দর লাগছে। ও কাছে আসতেই হাতে গোলাপ ফুল দিয়ে বললাম,
.
-'হ্যাপি বার্থডে প্রিয়ন্তি।'
-'থ্যাংকু।'
-'ওয়েলকাম।'
কিছুক্ষণ দুজন ঠায় নিরবে বসে রইলাম। প্রিয়ন্তি ই নিরবতা ভেঙ্গে আহাল্লাদি কন্ঠে বলে উঠল।
-'অভ্র।'
-'হ্যাঁ। বলো।'
-'তুমি আজ আমার জন্য কি গিফট এনেছো?'
-'ইয়ে মানে প্রিয়ন্তি। আমরা তো প্রায় সময়ই শপিং এ যাই। এই তো সেদিনই গেলাম। আজ একটু প্রবলেমের কারণে তোমার জন্য কোনো গিফট আনতে পারিনি।'
ওর দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর মুখটা কেমন লাল হয়ে গিয়েছে। ওর আহাল্লাদি কন্ঠ কিছুটা চেন্ঞ্জ হয়ে রেগে বলে উঠলো।
.
-'তুমি এসব কি বলতোছো? তুমি কি আমার সাথে ফাজলামী করতোছো? আমি আমার সব ফ্রেন্ডসদের বলে রাখছি তুমি আজ আমায় স্পেশাল গিফট দিবা। আর তুমি কিনা!'
-'আমি তো বললাম ই একটু প্রবলেম হইছে। আই সোয়ার কিছুদিনের মাঝেই তোমায় আমি গিফট দিবো। তুমি যা চাইবা তাই পাবে। তাছাড়া একটা গিফট ই সবকিছু বলো? আমি যে তোমাকে ভালোবাসি। সেটা কি কিছুই না?'
-'রাখো তোমার ভালোবাসা। তোমার সাথে রিলেশনে যাওয়াই আমার ভুল হইছিলো। শুধু শুধু টাইম ওয়েস্ট করলাম। একচুলি ইয়্যু নো হোয়াট? ইয়্যু ডোন্ট ডিজার্ভ মি। ডোন্ট ট্রাই টু কনটাক্ট মি এভার!'
.
কথাগুলো বলেই ফুলগুলো আমার মুখের উপর ছুড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেলো প্রিয়ন্তি। আমি নির্বাক হয়ে ওর চলে যাওয়া দেখতে থাকলাম। কোথা থেকে কি হয়ে গেলো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলামনা। সামান্য একটা ব্যাপারকে ইস্যু করে সম্পর্কটা এভাবে ভেঙ্গে ফেলবে আমি কখনও কল্পনাও করিনি। হঠাৎই কিছু একটার সাথে হোচট খেয়ে পড়ে গেলাম। ভাবনার মায়াজাল হতে বেরিয়ে এসে আমি নিজেকে রেললাইনের উপর আবিষ্কার করলাম।
.
পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পাওয়ায় সেখান হতে রক্ত বের হচ্ছে। যদিও সেদিকে আমার কোনো রকমের ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি তাকিয়ে আছি কিছুটা দুরে বসে থাকা একটি ছোটো ছেলের দিকে। ছেঁড়া জীর্ণ ধরা কাপড় পড়নে ছেলেটি বসে বসে কি যেনো খাচ্ছিলো। ছেলেটি আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আমার কাছে এগিয়ে এসে বললো।
-'ভাইজান মনে হয় সকাল থেইক্কা মুখে কিছু লন নাই। আমার কাছে রুটি আছে। খাইবেন?'
.
আমি যারপনাই বিস্মিত হয়ে কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়লাম। ছেলেটি আমার দিকে একটি শুকনো রুটি এগিয়ে দিলো। বাসায় হলে এমন খাবার ছুয়েও দেখতাম না। কিন্তু না খেয়ে থাকার দরুণ এখন এটাই যেনো অমৃত লাগছে আমার কাছে। আমি ছেলেটিকে বললাম।
-'তোর নাম কি?'
-'মোর নাম রাজু।'
-'সুন্দর নাম তো। কি করিস তুই?'
-'মুই রাস্তায় রাস্তায় কাগজ টোকাই।'
-'আচ্ছা। তোর সাথে পরে গল্প করবো। চল সামনে থেকে ঘুরে আসি।'
-'চলেন ভাইজান।'
.
কিছুটা সামনে গিয়ে ওকে নিয়ে একটি হোটেলে ঢুকলাম। এক প্লেট বিরিয়ানি দিতে ওকে বসতে বললাম। প্রথমে না না করলেও যখন বললাম।
-'তুই না আমাকে ভাই ডাকছিস? তাহলে ভাই থেকে নিতে এতো সংকোচ কিসের?'
এরপর আর বলার মতো কিছু খুঁজে পেলোনা রাজু। ও খাচ্ছে আর আমি দেখছি। প্রিয়ন্তিকে নিয়ে কতো ভালো ভালো জায়গায় খেয়েছি। কিন্তু এই বাচ্চাটিকে খাইয়ে যে সুখ। সেটা কখনও পাইনি আমি। রাজুর মাঝে আছে নিষ্পাপ এক সরলতা। আর প্রিয়ন্তি র মাঝে ছিলো শুধুই ছলনা।
.
হঠাৎই রাজুকে অর্থেক বিরিয়ানি প্যাকেট করতে দেখায় জানতে চাইলাম।
-'কি হলো? এগুলো কি করবি?'
-'ঘরে মা আছে। তার লাই লমু।'
আমি আরো একটিবার বিস্মিত হয়ে বললাম।
-'তোর সেটা নিয়ে ভাবতে হবেনা। তুই সবটুকু খেয়ে ফেল।'
এরপর আরো দুই প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে রাজুর ঘরে গেলাম। ঘরে যেতেই রাজুর মা কান্নারত অবস্থায় ওকে জড়িয়ে ধরে বললো।
-'কোনহানে গেছিলি বাজান? তোরে কতো জায়গায় খুঁজছি। কিন্তু খুইজ্জা পাই নাই।'
রাজু সব খুলে বলার পর একটু স্থির হয়ে আমাকে ভেতরে আসতে বললো। আমি পরে আরেকদিন আসবো কথা দিয়ে তাড়াতাড়ি বেড়িয়ে পড়লাম।
.
রিকসায় করে বাসায় যাচ্ছি। আর ভাবছি যেই মেয়ের সকল ইচ্ছাই কিছু না ভেবে পূরণ করেছি সবসময়। যার জন্য নিজের মায়ের সাথে ঝগড়া পর্যন্ত করেছি। আসলে সেই মেয়ে আমাকে কখনও ভালোই বাসেনি। রাজুর মায়ের ওই অশ্রুর মাঝে আমি খুঁজে পেয়েছি পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র অকৃত্তিম ভালোবাসাটুকু। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। আমি বুঝতে পেরেছি আমি কি হারাতে বসছিলাম। আমি আমার মাকে হারাতে বসছিলাম। আমি আজ প্রকৃত ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছি আমার মায়ের মাঝে। আমি আসছি মা। আমি আসছি।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জানুয়ারি, ২০১৬ সন্ধ্যা ৭:০১
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এগারটি বছর পার হয়ে গেল…. কিছু পরিসংখ্যান নিয়ে একাদশতম বর্ষপূর্তি পোস্ট

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:৪১



পূর্বের বর্ষপূর্তি পোস্টের লিঙ্কঃ দশম বর্ষপূর্তি পোস্ট

সামহোয়্যরইনব্লগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখ রাত ১১টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম কবিতা, বক্ষমাঝে থাকবে তুমি। বলা যায় খুব দ্রুতই, মাত্র তৃতীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্যায়া হুয়া ? হুক্কা হুয়া; হুক্কা হুক্কা হুক্কা হুয়া

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:২৫


২৪ বছর ধরে ঢাবিতে অনার্স পড়ছে; তা-ও নাকি ভাষা শিক্ষা বিভাগে উর্দূ নিয়ে !!! আজতক তার পড়া শেষ হয় নাই !!! এ ভার্সিটিতে নাম লিখালে পন্ডিত মশাই'রা কি কোনও... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুঃখ খচিত পতাকা আমার

লিখেছেন এম ডি মুসা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র প্রাঙ্গণে
আজ হঠাৎ কার ছায়া নামে?
কার দুঃসাহসী কালো হাত
ইতিহাসের বুকের ওপর আঁকে পরাধীনতার নাম?

যে নাম একদিন ভাষার কণ্ঠ রুদ্ধ করতে চেয়েছিল,
যে শাসন একাত্তরে ছড়িয়েছিল মৃত্যুর অন্ধকার
আজ কেন তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ হতো হায়দ্রাবাদ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৫

।।হায়দারাবাদের নিজাম।।


১৯৪৭ সাল ভারতবর্ষের মুসলমানরা যখন নির্যাতনের শিকার অনেকগুলো গণহত্যা হয়েছিল দাঙ্গা হয়েছিল। ১৯৪৬ সালে বা তারও আগে এই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ রাজনীতি শুরু করেছিল কংগ্রেসের রাজনীতি দিয়ে তিনি কংগ্রেসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগীটি মারা গেলো

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩



বাংলাদেশে ডাক্তারদের অবহেলায় কি পরিমাণ প্রাণ অকালে ঝরে গিয়েছে তা কল্পনাতীত। এবং আমাদের দেশের ডাক্তার এই অপরাধে নূন্যতম অনুশোচনা বোধ করে না।

ডাক্তারদের অবহেলার কারণে দেশের পাঠ্য বই ইংরেজি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×