মাথার উপর সাই সাই করে ক্রমাগত ঘুরে যাচ্ছে ফ্যান। উঠে দাড়িয়ে ফ্যান এর সুইচটা অফ করে দিলো নীরব। ড্রয়ার থেকে দড়িটা নিয়ে সিলিং ফ্যান এ ঢিল মারলো সে।
.
নীরব এবার এস এস সি পরীক্ষা দিয়েছে। ক্লাস এর মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে নিরব ও একজন। যেকোনো পরীক্ষায় সবার আগে যার নাম উঠে আসে। সে আর কেউ নয়; স্বয়ং নীরব। নীরবকে নিয়ে তার বাবা-মা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, আত্মীয়স্বজন সবারই অনেক স্বপ্ন।
.
স্কুল ক্যাম্পাসে বন্ধুরা সহ বসে আছে নীরব। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের কাঙ্খিত ফলাফল প্রকাশিত হবে। আর সবার মতো নীরব ও দুশ্চিন্তায় বিচলিত হয়ে পড়েছে। পাশ হতে নীরব এর বন্ধু সাকিব বলে উঠে।
- আরে মাম্মা। এত্তো টেনশন কিসের? তুই যে এবারোও সবার মুখ উজ্জ্বল করবি। তা আমরা সবাই জানি।
- হা হা। তুই ও করবি। শুধু দেখে যা।
.
একটু পরেই তাদের ফলাফল প্রকাশিত হলো। প্রায় সবার মুখেই খুশীর আভা ফুঁটে উঠেছে। অনেকেই আনন্দ উল্লাশে ফেটে পড়েছে।
.
সবার অগোচরে নীরব মলিন মুখে বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ায় তা কেউ খেয়াল করলো না। নীরবের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। তার চেয়েও খারাপ শিক্ষার্থীরা এ পেয়েছে। আর সে কিনা ক্লাস এর টপ স্টুডেন্ট হয়েও 4.82 পেয়েছে। লজ্জ্বায় মিশে যাচ্ছে নীরব। কোন মুখে সে তার বাবা মা এর সামনে গিয়ে দাড়াবে।
.
বাসায় গিয়েই কাউকে কিছু না বলে নীরব তার ঘরে চুপটি করে বসে রইল। বাবা মা এর স্বপ্ন পূরণ করতে না পারার হতাশা যেন তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সন্ধ্যায় নীরবের বাবা রফিক সাহেব নীরবকে তার ঘরে ডেকে পাঠালেন। নীরবকে যা নয় তাই বলে গেলেন। নীরব শুধুই চুপ করে রইল। বলার মতো কিছু যে সে অবশিষ্ট রাখেনি। শেষমেশ নীরব এর মা এসে রফিক সাহেবকে থামান।
.
নীরব তার ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। আজকে এই ঘরটাকে আর অন্যান্য দিনের মতো সুন্দর লাগছে না। মনে হচ্ছে ভুল করে যেনো সে মৃত্যুপুরীতে এসে পড়েছে। জীবনটা আজ অর্থহীন মনে হচ্ছে নীরবের কাছে। ঠিকই তো বলেছে তার বাবা। সে তার বাবা মা এর অপদার্থ এক ছেলে। ওর মতো ছেলের বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো।
.
রফিক সাহেব এশার নামাজ পড়ে বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করেন। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছেন নীরবকে আজ অতিরিক্তই বলে ফেলেছেন তিনি। বিফলতাই তো সফলতার প্রথম সোপান। তাছাড়া নীরব যে খারাপ শিক্ষার্থী এমনটাও তো নয়। একটা ছোট ভুল নাহয় হয়েই গিয়েছে। এখনি বাসায় গিয়ে নীরবকে কাছে টেনে সব বুঝিয়ে বলবেন তিনি। নীরব বোধহয় অনেক রাগ করে আছে তার উপর। তবে তিনি জানেন তার ছেলে তার উপর বেশীক্ষণ রাগ করে থাকতে পারবেনা। একটু বুঝিয়ে বললেই সব রাগ নিমিষেই পানি হয়ে যাবে।
.
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে তিনি তার বাসায় এসে পড়েছেন টেরই পাননি। কিন্তু তার বাসার সামনে এতো মানুষের ভিড় কেনো। অজানা এক আশঙ্কায় ভিড় ঠেলে ঘরে ঢুকেই নিস্তব্ধ হয়ে যান তিনি। সিলিং ফ্যান এর সাথে তার একমাত্র ছেলে নীরব এর লাশ ঝুলছে। নীরব এর মা নীরব এর লাশকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে আর বলছে তুমিই আমার ছেলেকে মেরে ফেলেছো। তোমাকে আমি কখনও ক্ষমা করবোনা।
.
রফিক সাহেব কিছুই বলতে পারেননা। দু ফোঁটা অশ্রু তার গাল বেয়ে পড়ে যায়। বুকটা হাহাকার করে ওঠে হারানোর বেদনায়। চিৎকার করে বলতে চেয়েও বলতে পারেননা তিনি।
বাবা আমার ফিরে আয়। আর কখনও বকবোনা তোকে। শুধু আরেকটিবার ফিরে আয়। আমি যে তোকে অনেক ভালোবাসি।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ডিসেম্বর, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




