রাইফেলের বাঁট দিয়ে বেধড়ক পেটানোর এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মকবুল হোসেন। ওই অবস্থায় চ্যাংদোলা করে কাদাপানিযুক্ত একটি ডোবায় ছুড়ে ফেলা হয় তাকে। ওখানেই কেটে যায় সারারাত। ভোরের দিকে জ্ঞান ফিরলে পানি পানি বলে কঁকিয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু এতটুকু দয়ামায়ার উদ্রেক করেনি তাদের মাঝে। পানি না দিয়ে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আহত এবং পিপাসায় কাতর মকবুলকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল ওরা। হত্যার পর ওখানেই লাশ ফেলে রাখল। এই মর্মান্তিক ও পাশবিক ঘটনাটি ঘটায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মানকারচর এলাকার সাহাপাড়া ক্যাম্পের বিএসএফ জওয়ানরা।
দু’দিন ধরে ওই ডোবাতেই পড়েছিল হতভাগ্য মকবুলের লাশ। এরই মধ্যে কোনো এক বন্য জন্তু লাশের বাম হাতটি খেয়ে ফেলে। লাশের গন্ধ বেরুলে ডোবার পাশেই গর্ত করে পুঁতে রাখা হয় তার মৃতদেহ। গত ৬ জুলাই বাংলাদেশের এক গরু ব্যবসায়ীর কাছে প্রত্যক্ষদর্শী
এক ভারতীয় নারী এ হৃদয়বিদারক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন।
গত ৯ জুন সকালে খাওয়া-দাওয়া করে বাড়ি থেকে বের হন মকবুল। তিনি কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। কথাবার্তা গুছিয়ে বলতে পারতেন না। ওইদিন বিকেলে তিনি নোম্যান্সল্যান্ডের কাছাকাছি গেলে বিএসএফ সদস্যরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে তাকে আটক করে সাহাপাড়া ক্যাম্পে নিয়ে যায়। ঘটনাটি স্থানীয় অনেকেই প্রত্যক্ষ করেন। আটকের পর বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তার কথাবার্তায় অসঙ্গতি দেখা যায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে বিএসএফ সদস্যরা। এরপরই তার ওপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন।
ভারতীয় বিএসএফ মকবুলকে ধরে নিয়ে গেছে—এ খবর পেয়ে তার বড় ছেলে আজাদ মিয়া ও অন্য স্বজনরা ছুটে আসেন রৌমারীস্থ বিজিবি সদর ক্যাম্পে। তারা বিজিবি সুবেদার আবুল কাশেমকে ভারতীয় বিএসএফের নিকট পত্র দিতে অনুরোধ করেন। সুবেদার আবুল কাশেম নিজের দায়ভার অন্যের কাঁধে চাপাতে থানায় জিডি করতে বলেন। সে মোতাবেক রৌমারী থানায় সাধারণ ডাইরি করতে যান ছেলে আজাদ মিয়া। তাতে উল্লেখ করা হয়, ‘গত ৯ জুন মানসিক ভারসাম্যহীন মকবুল হোসেন (৪০) সীমান্তে নোম্যান্সল্যান্ডের নিকট গেলে বিএসএফ সদস্যরা তাকে ধরে নিয়ে যায়।’ এমন লেখা দেখে রৌমারী থানা পুলিশ বিষয়টি সাধারণ ডাইরিভুক্ত করতে অস্বীকার করেন। উপায়ান্তর না দেখে ছেলে আজাদ আবারও ফিরে আসেন বিজিবি ক্যাম্পে। কিন্তু সাধারণ ডাইরির কপি না পেলে বিজিবি’র কিছুই করার নেই বলে সুবেদার সাফ জানিয়ে দেন। অগত্যা পিতা মকবুল হোসেন হারিয়ে গেছে মর্মে নতুন একখানা দরখাস্ত লিখে ১০ জুন সাধারণ ডাইরিভুক্ত করে এর ফটোকপি বিজিবি সুবেদারের হাতে দেয়া হয়। তিনি বিষয়টির যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়ে তাকে বিদায় করেন।
এ ঘটনার প্রায় দেড় মাস পার হলেও পুলিশ, বিজিবি কেউই মকবুলের সন্ধান করেননি।
গত ৭ জুলাই বাংলাদেশের এক গরু ব্যবসায়ীর নিকট একটি বাংলালিংক মোবাইল নম্বর দিয়ে মকবুলের পরিবারকে ফোন করতে বলেন স্থানীয় সোনারপাড়া গ্রামের এক নারী। সীমান্ত লাগোয়া ভারতের সাহাপাড়া বিএসএফ ক্যাম্পের অদূরেই তার বাড়ি। মকবুলের পরিবার ওই মোবাইল নম্বরে ফোন করে জানতে পারেন হত্যাকাণ্ডের এক নজিরবিহীন ঘটনা। মৃত্যু সংবাদ শোনার পর এখন শোকের মাতম চলছে মকবুলের পরিবারে। ছোট ছোট ৫ সন্তান নিয়ে মকবুলের স্ত্রী আবেদা বেগম পড়েছেন মহাবিপাকে। গত শনিবার (১৬ জুলাই) পিতৃতুল্য বড়ভাই আনোয়ার হোসেন (৬০) একখানা ময়লাযুক্ত কাগজ (দরখাস্ত) নিয়ে আসেন সাংবাদিকদের নিকট। তার শেষ ভরসা, পত্রিকায় খবরটি ছাপা হলে ছোটভাই মকবুলকে বিএসএফ ছেড়ে দেবে। এখনও তিনি মনে করেন, মকবুল ভারতের কোনো জেলখানায় বন্দি রয়েছেন।
তিনি পিতৃহারা ছোট ৫ ভাইকে কিভাবে মানুষ করেছেন সে বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার চোখ মুছছিলেন। তার ৬ ভাইয়ের মধ্যে মকবুল ছিলেন ৪ নম্বর। আনোয়ার হোসেন এখন বৃদ্ধ। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই মানুষটি ভ্রাতৃবিয়োগে এতই মর্মাহত হয়েছেন যে, এ ক’দিনে কাঁদতে কাঁদতে তার একটি চোখ প্রায় অন্ধ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশী কোনো মানুষকে আর গুলি করে হত্যা করা হবে না মর্মে বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিজিবি ও বিএসএফ’র উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কোনো মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে না বলে দাবি করা হচ্ছে। যেহেতু সিদ্ধান্ত হয়েছে ‘হত্যা করা হবে না’ সেহেতু মকবুলকে হত্যা বা গুম কোনোটিই আর স্বীকার করছে না বিএসএফ। ফলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে বিএসএফ মকবুলকে ধরে নিয়ে গেল এবং হত্যা করে লাশ গুম করল, এটা কাউকে জানতেও দিল না। এদিকে এর জন্য তার পরিবার এখন দায়ী করছে বিজিবিকে। তারা বলছেন, বিজিবি তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিলে মকবুলের ভাগ্যে আজ এমনটি ঘটতো না।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



