somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভারতে সামরিক অভ্যুথান হয় না কেন ?

১৮ ই জুলাই, ২০১৬ রাত ৮:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভারতে সামরিক অভ্যুথান হয় না কেন ?

তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুথান নিয়ে বিশ্বের মিডিয়া সরগরম। এশিয়া , মধপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার অনেক দেশেই সামরিক অভ্যুথান অনেকবার ঘটতে দেখা গেছে।
একাধিকবার সামরিক অভ্যুথান হয়েছে ভারতের প্রতিবেশী দেশ গুলিতে , পাকিস্তান , বাংলাদেশ ,শ্রীলঙ্কা এবং মিয়ানমারএ। ভারত কি করে ব্যতিক্রম ? ভারতের সেনাপ্রধানরা কি নিকর্মা ?

দুটি ঘটনা :

১) সময় ১৯৫৭ সাল। স্থান নতুন দিল্লী। জওহরলাল নেহেরু ভারতের প্রধানমন্ত্রী , সেনাপ্রধান জেনারেল থিমাইয়া (Gen K .S Thimaiyya ) . প্রধানমন্ত্রী নেহেরু এসেছেন জেঃ থিমাইয়ার সাথে দেখা করতে সেনার সদর দপ্তরে। জেঃ থিমাইয়া এক সুদক্ষ সেনাপ্রধান হিসাবে ভারতে পরিচিত। তাঁর সম্বন্ধে বলা হয় " the most distinguished combat officer the Indian Army has produced " প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নেহেরু সেনাপ্রধান কে তাঁর অফিসেই ডেকে পাঠাতে পারতেন কিন্তু কি মনে করে নেহেরু নিজেই এসেছেন জেঃ থিমাইয়ার সাথে দেখা করতে।

নেহেরু লক্ষ্য করলেন জেঃ থিমাইয়ার বসার চেয়ারের পিছনে রয়েছে নজরকারা বিশাল এক স্টীল আলমারী।
নেহেরু: জেনারেল ওটাতে কী আছে?
জেঃ থিমাইয়া : এই আলমারীতে তিনটি কক্ষ আছে। প্রথম টিতে আছে ভারতের সামরিক সুরক্ষা প্লান , দ্বিতীয়টিতে আছে আমার অধস্তন অন্যান্য জেনারেলদের কনফিডেনটিয়াল রিপোর্ট ফাইল গুলো ।
নেহেরু : আর তৃতীয় টিতে ?
জেঃ থিমাইয়া : ওহ , তৃতীয়টিতে আছে আপনার বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুথান করার প্ল্যান , যদি কখনো দরকার পরে , মিস্টার প্রাইম মিনিস্টার । জেঃ থিমাইয়া অকপট।

প্রধানমন্ত্রী নেহেরু অট্টহাস্য করে উঠলেন। কিন্তু তাঁর মনের মধ্যে কোথাও কি একটা ভয় ঢুকে রইলো? জেঃ থিমাইয়াকে কি তিনি অবিশ্বাস করা শুরু করলেন? জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে আরো দু বছর । ইতিমধ্যে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে হল প্রথম সামরিক অভ্যুথান।
১৯৫৯ সালে জেঃ থিমাইয়া তাঁর পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে দেন নেহেরুর কাছে। কারণ : তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভি.কে. কৃষ্ণমেনন এর সাথে তাঁর তীব্র মতবিরোধ। নেহেরু গ্রহণ করেন নি জেঃ থিমাইয়ার পদত্যাগ পত্র। ভি.কে. কৃষ্ণমেনন কে উপেক্ষা করে সেনাপ্রধান পদে বহাল রাখেন জেনারেল থিমাইয়াকে।

২) সময় ১৯৭২ সালের প্রথম দিক। স্থান নতুন দিল্লী। দেশের প্রধানমন্ত্রী তখন নেহেরু কন্যা ইন্দিরা গান্ধী। সেনাপ্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশ। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের যুদ্ধে পাকিস্তান হয়েছে সম্পূর্ণ ভাবে পরাজিত। পূর্ব পাকিস্তান হয়েছে বাংলাদেশ। ইন্দিরা গান্ধীর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। জেনারেল মানেকশ যেন এক জীবন্ত কিংবদন্তী। দেশের জনগণ আদর করে তাঁকে ডাকে স্যাম বাহাদুর নামে।

একদিন হঠাত করে ইন্দিরা গান্ধী ডেকে পাঠালেন জেঃ মানেকশ কে।
জেঃ মানেকশ বয়সে ইন্দিরা গান্ধীর থেকে দু-তিন বছরের বড়। প্রোটোকল অনুযায়ী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান সেনাপ্রধানের অনেক উপরে। কিন্তু জেঃ মানেকশ প্রোটোকলের অত ধার ধারেন না। প্রধানমন্ত্রী গান্ধী কে তিনি ম্যাডাম প্রাইম মিনিস্টার ও বলেন না , সম্বোধন করেন মিসেস গান্ধী বলে। ১৯৭১ এ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সেনা নামানোর আগে ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন , " স্যাম, আর ইউ রেডি ?" " আই এম অলওয়েজ রেডি Sweety !" স্যাম বাহাদুরের তৎক্ষনাত উত্তর !
যাইহোক , জেঃ মানেকশ প্রধান মন্ত্রীর অফিসে ঢোকার পর দেখলেন পরিবেশ এক্কেবারে থমথমে। ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত অস্থির ভাবে পায়চারী করছেন। চোখে মুখে তীব্র বিরক্তির ভাব। তিনি ঢুকতেই বিনা ভণিতা করে ইন্দিরা বলে উঠলেন :

ইন্দিরা : স্যাম আপনি এটা করতে পারেন না।
স্যাম : কি করতে পারি না ?
ইন্দিরা : আপনি আমাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেন না।
স্যাম : কেন ? আমাকে এতটাই অদক্ষ মনে করেন ?
ইন্দিরা : আমি বলছি না আপনি অদক্ষ। কিন্তু আমি জানি এটা আপনি করতে পারেন না।
স্যাম : আপনি গণতান্ত্রিকভাবে নিবাচিত প্রধানমন্ত্রী। আমি আপনার সেনাপ্রধান। আপনি আপনার কাজ করুন আমি আমার।

ঘটনা ছিল , ইন্দিরা গান্ধী গোপন গোয়েন্দা সূত্রে খবর পেয়েছিলেন (যে খবর ভুল ছিল) জেঃ মানেকশ তাঁকে সরিয়ে সামরিক অভ্যুথান করতে পারেন। যদিও জেঃ মানেকশর সে রকম কোন পরিকল্পনা কখনই ছিল না। ( তথ্য সূত্র : জেঃ মানেকশর আত্মজীবনী )
১৯৭৩ সালে ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকা কালীন স্যাম বাহাদুর মানেকশ প্রথম ভারতীয় আর্মি জেনারেল যাকে মিলিটারীর সর্বোচ্চ পদ " ফিল্ড মার্শাল" পদে উন্নীত করা হয়।

প্রশ্ন হলো , স্বাধীন ভারতে একাধিক অনন্য সাধারণ সেনা প্রধান আসার ফলেও একটাও সামরিক অভ্যুথান হল না কেন? এমন নয় যে ভারতের রাজনীতিবিদরা সবসময় ভালো ছিলো।

আমার মনে হয় ভারতে সামরিক অভ্যুথান না হওয়ার পিছনে ভারতের গণতন্ত্র এবং সময়ে সময়ে মোটামুটি ঠিকঠাক হওয়া নির্বাচন গুলো একটা অন্যতম কারণ। ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায় , সেনা অভ্যুথান তখনি হয়ে থাকে যখন দেশের সরকারের ওপর জনগণের বিরূপভাব তৈরী হয়। ভারতের প্রতিবেশী দেশ গুলিতে এটাই দেখা গেছে। সেনাপ্রধান রা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা দখল করে। ভারতের ক্ষেত্রে প্রতি পাঁচ বছর পর পর সাধারণ নির্বাচন যেটা মোটামুটি ঠিকঠাক পরিচালিত হয় , তা সাধারণ জনগণের হাতে এক ব্রহ্মাস্ত্র। এটা অপদাৰ্থ সরকারকে সরিয়ে ফেলে। ১৯৭১ সালের প্রবল ক্ষমতা সম্পন্ন ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে সম্পূর্ণ ভাবে পরাজিত হয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী নিহত হবার পর বিপুল ভোটে জয়ী রাজীব গান্ধী সম্পূর্ণ ভাবে ধরাশায়ী হয়েছিলেন ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে।

ভারতের ক্ষেত্রে ওপরের কারণ গুলি কিন্তু একমাত্র কারণ না। সেনা প্রধানরা হয়তো জানে ভারতের মতো দেশে সামরিক অভ্যুথান করা এক জিনিস আর এই বিশাল এবং জটিল দেশকে গভর্ন (Govern ) করা অন্য জিনিস। ভারতের প্রায় ২৯ টির ওপর রাজ্য এবং কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল যেন এক একটা দেশের মধ্যে দেশ এবং এগুলির মুখ্যমন্ত্রীরা আপন আপন রাজ্যের ডি ফ্যাক্টো প্রধান মন্ত্রী। দিল্লীতে ক্ষমতা দখল করে এত এত রাজ্যকে গায়ের জোরে চালানো এক কথায় অসম্ভব।

তৃতীয়তঃ , ভারতের সেনা বাহিনীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লক্ষ যার কমান্ডার দেশের সেনা প্রধান। কিন্তু এছাড়াও আছে প্রায় আরো ১৫ লক্ষ , সেনাদের মতোই আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত , পারা মিলিটারী। যেমন Central Reserve Police Force বা CRPF ( দেশের অভন্তরীন insurgency দমন করার জন্য ) , বিমান বন্দর এবং দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান গুলি রক্ষা করার জন্য Central Industrial Security Force বা CISF , Sashastra Seema Bal (SSB ) , Assam Rifels , Indo -Tibetan Force , BSF এবং NSG . এদের প্রধানরা সেনা বাহিনীর থেকে স্বতন্ত্র এবং সেনা প্রধানের অধীনে আসে না। এছাড়া আছে প্রায় ৩০ লাখ রাজ্য পুলিশ কর্মী যারা নিজ নিজ রাজ্যের দায়িত্বে থাকে।

কোনো সামরিক অভ্যুথান সফল হতে গেলে এই বিশাল সংখক আর্মড বাহিনী গুলোকে সাথে নিতে হবে যেটা প্রায় অসম্ভব।

সুতরাং স্বাধীন ভারতে অতীতে যেমন কখনো সামরিক অভ্যুথান হয়নি তেমনি ভবিষ্যতেও হওয়া প্রায় মুস্কিল ই নেহি না মুমকিন ভি হ্যায় !!

সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জুলাই, ২০১৬ সকাল ১১:৪৮
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আন্দোলনের সময় বেকারদের দরকার ছিল, এখন কি আর নেই?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:২০


সারজিস আলমকে দেখে একসময় মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনীতিতে হয়তো সত্যিই নতুন কিছু আসতে যাচ্ছে। কোটা আন্দোলনের আইকনিক মুখ, গর্বিত ঢাবিয়ান, এনসিপির বড় নেতা। শেখ হাসিনার আমলে সকাল বিকাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৩২

বাংলাদেশ কি মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে?

প্রশ্নটি এখন আর নিছক কল্পনা নয়।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান Makkah Joint Defence Agreement-এ স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা জানেন না তাদের জন্য! কফি এনিমা (Coffee Enema)!

লিখেছেন সাহাদাত উদরাজী, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৩

কফি এনিমা হলো মলদ্বার দিয়ে কোলন বা বৃহদন্ত্রে তরল কফি প্রবেশ করিয়ে পেট পরিষ্কার করার একটি বিকল্প পদ্ধতি। নিচে এটি শরীরে দেওয়ার সাধারণ প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে উল্লেখ করা হলোঃ

প্রয়োজনীয় উপকরণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

মিলাদুন্নবী: ভালোবাসার নবী, মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮


মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিন বা মিলাদুন্নবী শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মরণদিন নয়; এটি মানবতার জন্য এক মহান আদর্শের কথা স্মরণ করার উপলক্ষ। তাঁর আগমন ছিল এমন এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৫ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০

মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা কোথায়?
====================
একটি ১১ বছরের শিশু যার বয়স খেলাধুলা, পড়াশোনা আর স্বপ্ন দেখার। সেই শিশুকে যদি যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয় এবং তার গর্ভে একটি সন্তান জন্ম নেয়, তাহলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×