ভুমিকা
কিউবা দেশ সম্পর্কে আমার প্রথম জানার সুযোগ হয় দূর সম্পর্কের দাদা সূনীল মৈত্রের বাসায় উনিশশো একাত্তর সালে। স্বাধীনতা সংগ্রামের সে বছরে ছয় মাসের শরনার্থী জীবনে আশ্রয় জুটেছিল কোলকাতার জে,কে, মিত্র রোডের দাদার পরিবারে।দাদা ছিলেন সিপিএম এর একজন শীর্ষ নেতা এবং পরবর্তী কালের ভারতীয় পার্লামেন্টের সদস্য। দাদার বাসায় কমিউনিজম এর উপর মার্ক্স, লেনিন, ক্যাস্ট্রো, মাও সেতুং প্রভৃতি লেখকের বইয়ের বিশাল ভান্ডার ছিল।হাতে অফুরন্ত সময় থাকায় দাদার পারিবারিক লাইব্রেরীর অনেকগুলো বই পড়ে ফেলি এবং মনে প্রানে কমিউনিস্ট হয়ে উঠি।সে সময়ে কিউবা এবং চে গুয়েভারা সম্পর্কে পড়া যে দুটো বইয়ের নাম আজও আমার মনে পড়ে তা হল “আখের স্বাদ নোনতা” এবং Che Guevera in Bolivia। এরপর ত্রিনিদাদে থাকার সময় পরিচয় হয় সেখানে কর্মরত কিউবার ডাক্তার লোপেজের সাথে।গত বছর দেশে ফিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাসের ভাইয়ের সাথে টেলিফোনে কথা প্রসঙ্গে উঠে আসে কিউবা।সর্বশেষ মাত্র কিছুদিন আগে টোরোন্টোর বাংলা পত্রিকা “আজকাল” এর সম্পাদক বিদ্যুৎদা বলছিলেন অল্প খরচে কিউবা দেশ ভ্রমনের সুযোগের কথা।
যাত্রা
জার্মান ভাষার শব্দ ফান্ডেরলুস্ট ( Wanderlust) বা ভ্রমনের নেশা সবসময় আমাকে তাড়া করে নিয়ে বেড়ায়। ফান্ডেরলুস্টের তাড়নায় এবং সাধ্যের মধ্যে থাকায় এ বছরের গ্রীস্মে সফরের জন্য বেছে নিলাম কিউবাকে।ইন্টারনেট ঘেটেঘুটে বার করলাম যে সবচে’ কম পয়সায় কিউবা ঘুরে আসার সুযোগ দিচ্ছে Sunwing Airlines। গিন্নীর ছুটি যেদিন মঞ্জুর হল সেদিনই বিমানের টিকেট, হোটেল, খাওয়ার ব্যাবস্থা সমস্তকিছু সহ সাত দিনের “All inclusive travel package” কিনে ফেললাম।কিউবাতে পর্যটকদের জন্য ভিসা লাগে না,Valid Travel Document থাকলেই চলে, ফলে ভিসা নেওয়ার বাড়তি ঝামেলা থেকে রেহাই পেলাম।প্রায় ৭০ ডলার দিয়ে কানাডার বাইরের জন্য Travel Insurance কিনতে হল যা সবার জন্য বাধ্যতামুলক।
অতঃপর আটই সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু। সন্ধ্যা ছয়টা্র ফ্লাইট ধরতে টোরোন্টোর পিয়ারসন এয়ারপোর্টের এক নম্বর টারমিনালে হাজির হলাম বিকেল সাড়ে তিনটায়।টোরোন্টোর এয়ারপোর্টের নাম পিয়ারসন এয়ারপোর্ট হল কেন এ প্রশ্ন মনের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে অনেক বার।গত বছর অটোয়ার পার্লামেন্ট হিলে ঘুরতে গিয়ে দেখা পাই লেস্টার,বি,পিয়ারসনের পাথরের মূর্তির।পৃথিবীর অনেক বিমান বন্দরের নাম রাখা হয়েছে বিখ্যাত ব্যাক্তিদের নামে যেমন নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডী এয়ারপোর্ট, কোলকাতার নেতাজী সুভাস চন্দ্র এয়ারপোর্ট ইত্যাদি।একইভাবে টোরোন্টোর এয়ারপোর্টের নামকরন করা হয়েছে কানাডার নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী ১৪তম প্রধানমন্ত্রী লেস্টার বি পিয়ারসন(Lester B Pearson) এর নামে। এয়ারলাইন্সের বুথে লাগেজ বুক করে দিয়ে বোর্ডিং পাস নিয়ে হাজির হলাম নিরাপত্তা তল্লাসীর জন্য। বিরাট লম্বা লাইনে প্রায় আধ ঘন্টা শেষে নিরাপত্তা তল্লাসী পার হলাম।এখানে একটা মজার ব্যাপার ঘটেছিল একজন মহিলাকে নিয়ে। সমস্ত কিছু খুলে আলাদা ঘরে নিয়ে গিয়ে তল্লাসী করার পরও মেটাল ডিটেক্টর বার বার লাল আলো জ্বালিয়ে শব্দ করে জানান দিতে লাগল মহিলার কাছে থাকা ধাতব পদার্থের অস্তিত্ব। শেষমেষ এক্স-রে করে আবিস্কৃত হল যে ভদ্রমহিলার প্রতিস্থাপিত হাটু এবং উরুসন্ধিতে স্টীলের উপস্থিতিই এই বিপত্তির কারন।নির্ধারিত সময়ের চেয়ে৩০/৩৫ মিনিট দেরী করে বিমান ছাড়ল। ক্যাপ্টেন জানালেন যে বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষের কারনেই এই দেরী তবে তিনি আশা করেন নির্দ্দিস্ট সময়েই ভারাডেরো পৌছে যাবেন।অপেক্ষাকৃত ছোট বিমানে মোট যাত্রী ১৯২ জন এবং সমস্ত বিমান কানায় কানায় পূর্ন। বিমানবালা এবং স্টুয়ার্ডরা অধিকাংশই ত্রিভাষী অর্থাৎ ইংরাজী,ফরাসী এবং স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলতে সক্ষম। বিমানবালা হাতে ট্যুরিস্ট কার্ড দিয়ে জানালেন যে সঠিকভাবে যেন তা পুরন করা হয় কারন অতিরিক্ত কার্ড নিতে হলে পঁচিশ ডলার গুনতে হবে।এই ট্যুরিস্ট কার্ডই হল কিউবার ভিসা।কাস্টমসের যে ফর্ম দিলেন বিমানবালা তাতে এক অংশে জানতে চাওয়া হয়েছে কি কি ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী নিয়ে আপনি কিউবাতে ঢুকছেন।আমার দেখা ২০/২৫ টা দেশের কোথাও এই অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় নি।পরে কিউবার দোকান ঘুরে দেখেছি ওখানে ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীর দাম কানাডা আমেরিকার তুলনায় দ্বিগুন।৩৫,০০০ ফুট উচু দিয়ে উড়ে গিয়ে তিনঘন্টার কিছু বেশী সময় নিয়ে ভারাডেরো বিমান বন্দরে যখন বিমান নামল ঘড়িতে তখন প্রায় রাত দশটা এবং বাইরে তাপমাত্রা ২২ ডিগ্রী।


সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ডিসেম্বর, ২০১৫ ভোর ৬:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




