মা ন ব তা র জ ন্য
একজন শাশ্বতর বেঁচে থাকা
------------------------------
সেলিম রেজা নিউটন, দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস, মো· খাদেমুল ইসলাম, মো· মশিহুর রহমান, তানভীর আহমদ, আ-আল মামুন, আকতার জাহান, মো· শাতিল সিরাজ, মুসতাক আহমেদ, মোছা· দিল আফরোজা খাতুন
আমাদের বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী শাশ্বত সত্য শরীরের গিঁটে গিঁটে ব্যথা আর নষ্ট বাঁ হিপ-জয়েন্ট নিয়ে এক ক্র্যাচে ভারসাম্য রেখে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিল। কিন্তু গত মে মাসের মাঝামাঝি ইন-কোর্স পরীক্ষা চলাকালে তার কোমরের ডানপাশের জয়েন্টও গেল নষ্ট হয়ে। পরীক্ষা ফেলে শরীরের কাছে চূড়ান্ত পরাজয় মেনে নিয়ে সে বিছানায় আশ্রয় নিল। তখনই আমরা জানতে পারলাম, ওর শরীরে আছর করে আছে ‘অ্যাঙ্কাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস’ (অষরীলসঢ়মষব ঝহসষনমলীয়মঢ়) নামের ভয়ানক এক রোগ। এটা এমন বিরল এক রোগ, যা বিশেষ অ্যান্টিবডি তৈরি করে হাড়গুলো দুর্বল ও জয়েন্ট নষ্ট করে দেয়।
আপন শরীর নিয়ে ওর লড়াইয়ের ইতিহাস বড়ই করুণ আর দীর্ঘ। সেই ১৯৯৮ থেকে ২০০৮। পরিস্থিতির নিয়মিত অবনতি ঘটেছে, শরীরের অঙ্গগুলো একটার পর একটা বিদ্রোহ করেছে, অচল হয়েছে। তবু প্রচণ্ড মনোবল সম্বল করে শাশ্বত এগিয়ে চলেছে, সামনে নিশ্চিত পরাজয় জেনেও। ২০০৪ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিছানায় পড়ে ছিল সে, পিঠে গোটা গোটা ঘা হয়েছিল। শরীরের ওজন ৬০ কেজি থেকে ২৮ কেজিতে নেমেছিল। সবাই ওর পঙ্গুত্ব মেনে নিলেও মানতে পারেনি শাশ্বত নিজে। তাই দেহ-মনের সর্বশক্তি জড়ো করে ২০০৬ সালের প্রথম দিকে ও হামাগুড়ি দিয়ে, ছ্যাঁচড়ে উঠে বসেছিল। তারপর একসময় দুই ক্র্যাচে ভর দিয়ে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে এক-পা দুই-পা করে হাঁটতে শুরু করেছিল শরীরের অসীম যন্ত্রণা উপেক্ষা করে।
বাবা-মা ছেলের এই প্রচেষ্টা দেখে তখন নিয়ে গিয়েছিলেন ভারতের ভেলোর ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেই ২০০৬ সালের জুনে এ হাসপাতালের ডা· দেবাশীষ দণ্ড (মেডিসিন) ও ডা· ভি এন লি শাশ্বতকে দেখেছিলেন। রায় দিয়েছিলেন যে তার শরীরে দীর্ঘদিন বাসা বাঁধা সিরোনেগেটিভ রিউমেটয়েড আর্থ্রাইটিস আরও একধাপ এগিয়ে অ্যাঙ্কাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিসে রূপান্তরিত হয়েছে। আরও জানিয়েছিলেন, শাশ্বতর বাঁ হিপ-জয়েন্ট সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে এবং শরীরের প্রত্যেকটি জয়েন্ট নষ্ট হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। অতিসত্বর চারটি বিশেষ ইনজেকশন দেওয়া না হলে তার দেহের অন্যান্য হাড়ের জয়েন্টও নষ্ট হয়ে যাবে। পঙ্গুত্ব ও অকালমৃত্যু অনিবার্য। সে সময় বিষাদগ্রস্ত মনে ফিরে আসতে হয়েছিল, কারণ তখন চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অন্তত ২০ লাখ টাকা সংগ্রহ করা তার স্কুলশিক্ষক বাবার জন্য ছিল নিতান্তই অসম্ভব। কারণ ততদিনে গৃহিণী মা-বাবা ১৫-২০ বার কলকাতা ও তিনবার ভেলোরে ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আর উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যথানাশক কিনতে কিনতে নিঃস্ব হয়েছেন। লিখিত হিসাব অনুযায়ী তাঁরা ১১ লাখ টাকা ব্যয় করেছেন, আর অলিখিত ব্যয় কত, তা আমরা জানি না।
তবু, সাহস হারায়নি শাশ্বত। ২০০৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তিযুদ্ধে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থীর সঙ্গে লড়াই করে এ বছর আমাদের বিভাগে ভর্তি হতে পেরেছে। ও যেন মৃত্যুর সঙ্গে, পরাজয়ের সঙ্গে নিয়মিত পাশা খেলে চলে। কিন্তু পাশার দান এবার বুঝি উল্টে গেল, এবার বুঝি সেই দিন এসে গেল। নজরকাড়া উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় ছেলেটির বিপন্ন-বিষণ্ন মুখের দিকে আমরা তাকাতে পারি না।
আমরাও বিপন্ন বোধ করি করিডোরে ক্র্যাচের ঠকঠক শব্দে হেঁটে আসা শাশ্বতকে আর না দেখে। অল্প দিনেই বিভাগের শিক্ষক-ছাত্র-কর্মচারীদের প্রিয়ভাজন হয়ে ওঠা মৃদুভাষী শাশ্বতর জন্য একটা কিছু তো করা চাই-ই। দুঃসাহসী হয়ে বিভাগের সবাই মিলে আমরা উদ্যোগ নিলাম, গঠন করলাম ‘শাশ্বত চিকিৎসা-সহায়তা কমিটি’। আর আমাদের আশ্বাসে আশান্বিত হয়ে বাবা অরুণ সত্য পেনশনের অবশিষ্ট তলানিটুকু নিয়ে আবার তাকে ভেলোর নিয়ে যেতে সাহস করলেন শরীরের বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করতে।
গত ২১ জুন ডা· দণ্ড তো শাশ্বতকে দেখেই অবাক। এত দিন পর্যন্ত যে শ্বাশ্বত টিকে আছে, এখনো দাঁড়াতে পারে, তা দেখেই বি্নিত হয়েছেন। আরও অবাক হয়েছেন যখন জানতে পারলেন শাশ্বত সব বাধা অতিক্রম করে এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আর একেবারে মুগ্ধ হয়ে পড়লেন যখন জানতে পারলেন যে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে ইতিমধ্যে ‘শাশ্বত চিকিৎসা-সহায়তা তহবিল’ গঠনের জন্য মাঠে নেমে পড়েছে।
ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শাশ্বতর শরীরের পরীক্ষা মঙ্গলবার শেষ হলো। হাসপাতাল কতৃêপক্ষ, আমাদের অনুরোধে, ই-মেইলে যে প্রাথমিক খবর পাঠিয়েছে, তা আতঙ্কিত হওয়ার মতোঃ এ রোগের কারণে ওর কোমরের দুটো জয়েন্টই নষ্ট হয়েছে, অস্ত্রোপচার করে না বদলানো পর্যন্ত ও আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না। দুই চোখের রেটিনা আক্রান্ত, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা দরকার। দুই পায়ের হাঁটুর জয়েন্টও আক্রান্ত, অদূর ভবিষ্যতে বদলাতে হতে পারে। শরীরের সমস্ত হাড় ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছে, ক্ষয়ে যাচ্ছে। রোগটি এখন সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে, আরও নানাভাবে ওকে আক্রান্ত করবে। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা আবশ্যক।
চিকিৎসকেরা চিকিৎসা-ব্যয়ের হিসাব যোগ করে একটা অঙ্কও আমাদের জানিয়েছেন। প্রায় স্বাভাবিক জীবনে শাশ্বতকে ফিরিয়ে আনতে লাগবে এখন প্রায় ২৫ লাখ টাকা। আর আজীবন ওকে প্রতি মাসে কয়েক হাজার টাকার ওষুধ খেয়েই যেতে হবে। চিকিৎসা মুলতবি রেখে ৮ জুলাই ট্রেনে চেপে কলকাতা হয়ে বাবাসহ সে দেশে ফিরে আসবে। যদিও চিকিৎসক ট্রেন বা বাসে ভ্রমণ করতে বারণ করেছেন। বলে দিয়েছেন, নিতান্ত প্রয়োজন হলে কোনো একজন নিকটাত্মীয়সহ বিমানে যাতায়াত করতে।
ইতিমধ্যে আমরা প্রায় ছয় লাখ টাকা সংগ্রহ করেছি। আরও অনেক প্রয়োজন। আমরা, বিভাগের সবাই একজন প্রতিশ্রুতিশীল সন্তান হারানোর গুরুতর উদ্বেগের মধ্যে আছি। উদ্যোগও নিয়েছি বটে, কিন্তু কতটুকু আর আমাদের সামর্থেø কুলোবে, যদি সবাইকে সঙ্গে না পাই!
দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আমরা অর্থ সংগ্রহের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিঃ শাশ্বত চিকিৎসা-সহায়তা, সঞ্চয়ী হিসাব নম্বরঃ ৩৪২৬০৪৯৮, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেড, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, রাজশাহী এবং সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর ১৩৫-১০১-৩৩৭০৫। 135-101-33705| Swift Code : DBBL-BD-DH-100, Dutch-Bangla Bank Ltd., রাজশাহী শাখা।
শাশ্বত, তার বাবা-মা ও আত্মীয়-পরিজন এবং আমাদের বিভাগের সব শিক্ষাথী-শিক্ষক-কর্মচারী আর শাশ্বতর হেঁটে যাওয়া করিডোর-ক্লাসরুম-ক্যাম্পাস এখন তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে, আপনার দিকে-কবে নাগাদ আমরা পুরো টাকাটা তুলে শাশ্বতকে আবার ভেলোরে পাঠাতে পারব, কবে নাগাদ ক্র্যাচ ছাড়া শাশ্বত আমাদের দশজনের মতোই হেঁটে-খেলে বেড়াবে।
ভেলোর রওনা হওয়ার আগে আমরা শেষবার ওকে দেখেছিলাম ছ্যাঁচড়ে ছ্যাঁচড়ে বাথরুমে যাচ্ছে-কারণ কোমরে একবিন্দু শক্তি ছিল না ওকে দাঁড় করিয়ে রাখার। আমরা আপনাদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি, সহযোগিতাও পাচ্ছি, কিন্তু শেষ হাসিটা আমরা সবাই মিলে হাসতে পারব তখনই, যখন থেকে শাশ্বত সটান হেঁটে ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারবে···আর আমাদের সঙ্গে সমাজ-রাষ্ট্র-মিডিয়া নিয়ে আবারও তর্ক জমাতে পারবে।
(লেখকেরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে কর্মরত শিক্ষক
ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষিত হল প্রথম আলোতে আজ ৫ জুলাই প্রকাশিত লেখাটি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



